আরিফুজ্জামান

ইসলামি দল ও কমিউনিস্টদের ঐক্যর ভিত্তি, রাষ্ট্র বিপ্লবের ইতিহাস ও বেহাত বিপ্লব

বামপন্থি ও কমিউনিস্টরা কি ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে জোট করতে পারে-এসব নিয়ে নানারকম চর্চা হচ্ছে। এর মধ্যে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর নেতা রাষ্ট্র চিন্তা নামে একটি সংগঠনের আলোচনা সভায় গিয়ে ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন (ইশা) নেতাকে সেখানে দেখে বিব্রত হন। এর ফলে নানান ধরণের তৎপরতা হচ্ছে যা চোখে পড়ার মত। এ কারণে এই দীর্ঘ লেখা। এটি সবার জন্য না। যাদের আগ্রহ রাজনীতি ও ইতিহাসে আছে তারাই কেবল পড়তে পারেন। বড় লেখা ছোট করার সুযোগ ছিল না।

এই তর্কের ভিত্তিটা হলো, কী ধরণের রাষ্ট্র চান সেটি কি পরিষ্কার? অর্থাৎ ঐক্যর নীতি কী হবে? শুধুই কৌশল? নাকি নীতিও থাকবে? নাকি নীতি পর্যবেশিত হবে কৌশলে?

আমি মার্কস-এঙ্গেলস প্রণিত কমিউনিস্ট ইশতেহার দিয়ে শুরু করতে চাই। কমিউনিস্ট ইশতেহারা বলা হয়েছে, কমিউনিস্টরা তাদের নীতি ও উদ্দেশ্যর কথা গোপন করে না। তো, কমিউনিস্টরা তাদের আগামি রিপাবলিকের চিত্রায়ানটা দেন। অন্তত বুর্জোয়া গণতন্ত্রাকি রাষ্ট্র পেলে (সমাজতন্ত্রে উত্তরণের আগের ধাপ) কী কী করবেন? বিস্তারিত কি কি থাকবে সেখানকার তালিকা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিক্ষাখাতে পরিবর্তন, স্বাস্থ্যে পরিবর্তন, আইনের আমুল পরিবর্তন, নারী পুরুষের মধ্যেকার সম্পর্ক ও সম্পত্তির মালিকানার প্রশ্নে পরিবর্তন, বিভিন্ন ভাষা ও ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের স্বাধীনভাবে তা পালন করার অঙ্গিকার, কৃষক ও শ্রমিক সহ নানান বিষয়ে পরিবর্তনের রূপরেখা দেন। কারণ শুধুমাত্র একটি সরকার পরিবর্তন করে আরেকটি সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নিশ্চয় কমিউনিস্টরা কাজ করবে না। আওয়ামী লীগ খুব খারাপ, তাকে ফেলে বিএনপিকে আনো। এটাতো কোনো কথা হতে পারে না।

সরকার পরিবর্তন হলে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিতে কি পরিবর্তন হবে? আগের আইনগুলো কি একই রকম থাকবে নাকি একদম খোলনোচল বদলে যাবে-এসব আগে ঠিক করুন। তারপর দেখুন কোনো ইসলামী অথবা ধর্মভিত্তিক দল সাথে আসে কিনা। যদি এসব মেনে আসতে চায়, নতুন রিপাবলিকে তাদের স্বাগত।

‘ইসলামি’ বা ‌হিন্দু’ বা ধর্মীয় দলের সঙ্গে জোট কতটা দরকার?

দুনিয়া সামনের দিকে যায়, পেছনের দিকে তারাই টানে যাদের সামনে গেলে সবকিছু হারাবে। দুনিয়ার এই চলার পথে আদিম অবস্থা থেকে বর্তমান পরিস্থিতি আসতে বহুকিছু সময়ের পরতে পরতে অভিজ্ঞতা রেখে এসেছে সভ্যতা। ফলে আপনি হুট করে সভ্যতা আধুনিক বলে গালি দিয়ে উড়িয়ে দেবেন বিষয়টি এতো সহজ না। এই ইরর অ্যান্ড ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে সময়কে আগাতে হয়েছে। সেখানে মানুষ যা শিখেছে তার তাৎপর্য অনেক। তা হুট করে ঠেলে ফেলা যায় না। সেই শেখা থেকেই সভ্যতা বুঝেছে ইতিহাস সামনের দিকেই যায়, বড়জোড় ইতিহাসের এই গতিকে আটকে রেখে তার চলার গতি মন্থর করা যায়, কিন্তু পুরান নিয়ম টেকইসইভাবে স্থায়ী করা যায় না।

ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দলের প্রধান বয়ান পরকাল। অথচ আমরাতো ইহকালেই বাঁচি। ইহকালে থাকা একজন মানুষকে পরকালের কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা হয়। রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় সেই পরকাল পেতে যে চর্চা ও ব্যবস্থা সেটা ধর্মভিত্তিক দলগুলো কায়েমের কথা বলে। সেটা হোক হিন্দু বা মুসলিম দল। ইহজাগতিক দুনিয়ার যে সমস্যা ধর্মীয় নীতির আলোকে ব্যাখ্যা করা ও সমাধান করার এই চর্চা মানুষের সভ্যতার ইতিহাসকে সামনে নিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু তাই বলে মানুষের কী পরলৌকি চর্চা ও আত্মার ক্ষুদা থাকবে না? আলবৎ থাকবে। এবং সেটা সে পালন করবে। এইসব ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর আর্বিভাবের বহু আগে থেকে পূর্ববাংলায় সেই চর্চা মানুষ করে আসছে, তাতে কোনো অসুবিধা হয়নি।

যারা ইতিহাসের গতি প্রগতির দিকে নিতে চান, একটা বৃহৎ সম্মিলনের দিকে নিতে চান-যার লক্ষ্য বা কেন্দ্রে ‘মানুষ’ তারা ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে বৃহৎ মোর্চায় কৌশলগতভাবে যেতে পারে কিন্তু কৌশল ও নীতির প্রশ্নটা পরিষ্কার হতে হবে।আমি মনে করি নতুন যুগের সংস্থারহীন (অর্থডক্স নন এমন অর্থে) কমিউনিস্টদেরই একমাত্র কেন্দ্রীয় চিন্তা মানুষ হওয়া উচিত।

কিন্তু বামপন্থি ও কমিউনিস্টদের আত্মত্যাগের দুনিয়াজুড়ে যে ইতিহাস সেখানকার দিকে তাকালে ‌’ইসলামী’ দলগুলোর বিষয়ে হতাশা ছাড়া আর কিছুই খুজে পাওয়া যায় না একমাত্র লেবাননের হিজবুল্লা গেরিলা ছাড়া। কিন্তু বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো ইতিহাস হলো পেছন থেকে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে ছুরি মারা, গণতন্ত্রের আন্দোলনের ভেতর আপোষকামিতা ছড়িয়ে দেওয়া।

নারী পুরুষের সমানাধিকার চাওয়া, প্রান্তিক জনগোষ্টীর ক্ষমতায়নের কর্মসূচী কৃষকের নানাবিধ সংকট সমাধানে অংশ নেওয়া, শ্রমিকের সমস্যায় কথা বলা, পরিবেশ ধবংসের বিরুদ্ধে দাড়ানো, আন্তর্জাতিক পুজির লুণ্ঠন বন্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি আত্মমর্যাদাশীল জনগোষ্ঠী গঠনে ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা নেই। বরং এসব কর্মসূচীগুলোর কিছু অংশের বিরুদ্ধে অবস্থা নেয় আর কিছু অংশকে তারা নিরবে পাশ কাটিয়ে যায়। তাদের কর্মসূচী পরলৌাকি জীবনের অর্জন ও ইহকালে মানুষের এসব দাবির হয় বিরুদ্ধে যাওয়া না হয় পাশ কাটানো। এগুলো নিছক হরেদরে অভিযোগ নয়, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বৃহৎ দল জামাত ইসলাম, মুলিম লীগের কথা বাদ দিলেও পরবর্তী দশকগুলোতে ‘ইসলামি’ দলগুলোর অবস্থা এরকমই।

ইসলাম পরিচয় ও ইসলামি দল সমর্থক নয়। ইসলাম নাম শুনলেই আতকে ওঠা হলো ইসলামি ফোবিক। এটা ওয়ার অন টেররের কালচারাল হেজিমনি। ইসলাম পরিচয় ধর্ম পালন ও জীবন যাপন কোনো সংকট রাষ্ট্র তৈরি করলে তার বিরোধীতা করা আবার কমিউনিস্টদের ঐতিহাসিক কর্তব্য। কমিউনিস্টরা আজকে চীনে উইঘর মুসলিমদের ওপর চীন যে বর্বরোচিত সন্ত্রাস অব্যাহত রেখেছে এটার কড়া সমালোচনা করাই হলো আজকের দুনিয়ার নতুন কমিউনিস্টদের চরিত্র হওয়া উচিত। কারণ চীনে আর সমাজতন্ত্র নেই, তারা আর কমিউনিস্ট নেই এসব কথাবার্তা ও তত্বায়নে বাস্তব অবস্থার কোনো হেলদোল হচ্ছে না। চীনের কমিউনিস্ট পার্টিই যেমনই হোক, তা কমিউনিজমের নামেই মানুষের ওপর, মার্কসের সিলমোহরের নামেই এই অত্যাচার করছে। এই লেখার উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট চর্চার বিষয় কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে নয়। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মিত্র শক্তি কে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কি বিপ্লব হয়?

‘মিত্র শক্তি যদি ভাবি শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ পুরাতন এই মাওবাদী চীনা লাইন হলো তত্ব তাহলে বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক শক্তিই হলো আমার মিত্র শক্তি। সেখানে কে হেফাজত, কে জামাত, কে ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলন, আর তারেক জিয়ার হাতে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার রক্ত লেগে আছে না কি শুকিয়ে গেছে তা ভাববার সুযোগ নেই। শত্রুর বিরুদ্ধে যারা শত্রু, তারা চোর, ছ্যাচ্ছড়, ছোট চোর বড় চোর থেকে ব্যাংক ডাকাত, প্লেন হাইজ্যাককারি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য নিজেকেই এগিয়ে যেতে হবে।

গত প্রায় ১২ বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সব থেকে বেশি ক্ষতির স্বীকার হয়েছেন ইসলামি দলগুলো। এগুলো নেহাৎ ক্ষমতার দ্বন্ধের বাইরে আপাতোতো কিছু দেখছি না। আওয়ামী লীগের প্রবল বিরোধী দল বিএনপিকে নিঃশ্বেষ করার চেয়ে ইসলামি দলগুলোর ডাল পালা কেটে দিয়েছে। এতে বামপন্থিদের উল্লাস করার কিছু নেই। কারণ তারাও এভাবেই স্বাধীনতার আগেও পরে কাটা পড়েছিল। তখন ইসলামী দলগুলো কি করেছে? তারা বামপন্থিদের নাস্তিক হিসেবে ঘোষণা করে জনগণের বিরুদ্ধে দাড় করানোর চেষ্টা করেছে। বামপন্থিদেরই প্রধান শত্রু হিসেবে দেখেছে। এদের মধ্যে জামাত ইসলামতো বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে নামাতে ৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনও করেছে। ফলে এসবই ক্ষমতার দ্বন্ধ। ক্ষমতার দ্বন্ধ হলেও বিরোধী মতের ওপর নিপিড়নের বিরোধীতা করা কমিউনিস্টদের ঐতিহাসিক কর্তব্য। অনেক সময় এটি এন্টি পপুলার বিষয় হয়, তাও সেই নিপিড়নের বিরোধীতা করতে হবে। মনে রাখতে ফরাসী বিপ্লবের প্রিমিসেসের ওপর দাড়ানো আধুনিক রাষ্ট্র ভিন্নমতের কাউকে দমন করতে পারে না।

কিন্তু নতুন দিনের কমিউনিস্টদের কর্তব্য কি শুধু রিজিমের পরিবর্তন? আবার সময় হয়নি বলে রিজিম বা শাসন পরিবর্তনের জন্য লড়াই না করা? সত্যিই এ দুটি ভিষণ প্রয়োজনীয় বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করাই হলো নতুন দিনের কমিউনিস্টদের কাজ। কারণ শুধু শাসন পরিবর্তন হলে বাংলাদেশে কী হয় সেটা আমার ৫০ বছর দেখে আসছি। নেহাৎ সরকার পরিবর্তন কখনই কমিউনিস্টদের প্রধান কর্মসূচী হতে পারে না। বরং গুনগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে আজকে থেকেই সংগ্রাম গড়ে তোলা হলো প্রকৃত কর্মূসূচী। কারণ যেনতেন প্রকার একটি সরকার পরিবর্তনের পরে ফের যদি পুরানো ভুতগুলোই রাষ্ট্র চালায় এবং রাষ্ট্রের কাঠামো, তার বাহিনী ও আইন কানুন একই থাকে তবে সেই পরিবর্তনের ঝোকের মধ্যে কমিউনিস্টদের যাওয়া হলো আত্মহত্যা করা এবং তাদের উত্থানের সম্ভাবনাকে আরও বহুদিন মাটি চাপা দেওয়া। নিশ্চয় এরকম ঐক্য কোনো কমিউনিস্ট চিন্তাধারার মানুষ চাইতে পারেন না। ইসলামি দলগুলোর কর্মসূচী, তাদের রাষ্ট্র কাঠামো, নতুন দিনের সরকারের আইন কানুন কী হবে সেটি পরিষ্কার নয়? ফলে একটি রিপাবলিকে কি কি থাকবে তা আগে পরিষ্কার করতে হবে। তারপর নতুন রিপাবলিকে যদি ইসলামি দলগুলো আসতে পারে তাহলে গণতন্ত্র তাকে ঠেলে দিতে পারে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রের মতাদর্শ কী হবে সেটি আগে ঠিক না করে ইসলামি দলগুলোর সাথে ঐক্যর ডাক হলো যেনতেন প্রকার একটা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এভাবে ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য হবে না। বড়জোর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের কর্মসূচী যেমন জামাত মেনে নিয়ে নিজেরা আলাদাভাবে রাজপথে থেকেছে বড়জোর এটা হতে পারে। যেহেতু যেনতেন প্রকার সরকার পরির্বতন কমিউনিস্টদের লক্ষ্য হতে পারে না-সে কারণে একটি পূর্নাঙ্গ রিপাবলিক গঠনের কর্মসূচী তৈরির আগে ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যর বাস্তবিক কোনো সম্ভাবনা যেমন নেই, সেটা কেউ করতে যাবার চেষ্টা করলেও হবে হটকারিতা। বরঞ্চ রাষ্ট্রচিন্তার আলাপে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ইশা বা ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনকে দেখে বিব্রত হয়েছেন, সেটাই হওয়াটা ঠিক মনে করি। কারণ ঐক্যর বিষয়গুলোই পরিষ্কার না, বরং বহুবিধ ফাটল আগে থেকেই তৈরি তার মধ্যে এরকম একটা খিচুড়ি রান্নার অর্থ হয় না, যে খিচুড়ির সামান্য অংশও জনগনের প্লেটে যাবে না। শেয়ালের রুটি ভাগের মতই হবে।

বাংলাদেশে বিপ্লব হয়?

স্বাধীন বাংলাদেশে বিপ্লব হয়না, এমন কী স্বাধীনতাও একটা লাল বিপ্লবের গর্ভপাত। কেন এটা বলছি? কারণ আমরাতো বিরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনেই বড় হয়েছি। তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার অবমাননা নয়? আমার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারদের অবমাননাতো নয়-বরং মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ী হবার আগেই যুদ্ধ শেষ করেছে চারটি বিদেশী শক্তি সেটা বলা। ফলে আমাদের পায়ে আমরা হাটতে শেখার আগে আমাদেরকে ট্রেনে ওঠিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ দুনিয়ার সব থেকে মহান যুদ্ধের সুচনা আমরা পুর্ববাংলার মানুষ শুরু করেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের তরুন ছাত্র শিক্ষক কৃষক শ্রমিক মধ্যবিত্ত গরিব মানুষ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধটা আন্তর্জাতিক চক্রটি তাদের মত করে শেষ করেছে। ফলে কাঙ্খিত যে মুক্তি এবং সেই মুক্তির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা যে মহান সংস্কৃতি তা অর্জন করতে আমরা পারিনি। প্রধানভাবে এই চারটি দেশ হলো ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কথা আমরা জানি, তারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর অভিমুখে তাদের নৌ যাত্রা শুরু করেছিল। আর চীন এরকম কিছু না করলেও জাতীসংঘে ভেটো দেওয়া, ভারত সীমান্তের তীব্বত অংশে সৈন্য বাড়িয়ে ভারতকে চাপে রাখা এবং বিভিন্ন সময় পাকিস্তানের পক্ষে উকালতি করেছিল। চীন সাথে আছে এই ভেবেই পাকিস্তান আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের কিছু বছর আগে ১৯৬২ সালে চীন ভারত যুদ্ধে চীনের শক্তি ও সামর্থের আঁচ পেয়েছিল ভারত। যদিও সে সময় আরেক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের বিপক্ষে ভারতকে মদদ দিয়েছে, দিয়েছে দুনিয়ার অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধ বিমান মিগ। ফলে চীন যদি ভারত আক্রমণ করে তাহলে পাকিস্তান গোটা ভারত ধবংসে পরিণত করবে। সম্ভবত এই খায়েশ পাকিস্তানী নির্বোধ মিলিটারি নেতাদের মাথায় ঘোরাফেরা করছিল। ফলে চীনা বিরোধীতাটা আমরা বুঝতে পারি, মূলত চীনা স্বার্থ দিয়ে। এর মধ্যে বিপ্লব ও আন্তর্জাতিকতাবাদের কোনো বালাই ছিল না। কিন্তু পূর্ববাংলার মাওবাদী বা চিনপন্থিরা চীনকেই বিপ্লবের কেন্দ্র ভেবে বিপ্লবের ডিমে তা দিচ্ছিল। সে কারণে চীন যখন পাকিস্তানের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয় তখন পূর্ববাংলার সব থেকে বড় মাওবাদী নেতা আবদুল হকের দল একাত্তরের যুদ্ধ থেকে সরে দাড়ায়। এরকম মৌলবাদী অর্থডক্স মাওবাদী দুনিয়ার দুটি খুজে পাওয়া যাবে না। কারণ অন্য মাওবাদীরা তখনো লড়ছিলেন।

ভারত কেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে এ নিয়ে বহু গবেষণা গ্রন্থ রয়েছে। বিশেষত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সাবেক গোয়েন্দা যারা একাত্তর সালে সরাসরি কাজ করেছেন তাদের লেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তারা সরাসরি বলেছেন, পূর্ববাংলায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করায় ভারতের হাতে সহস্রাব্দের সেরা সুযোগ এসেছে দেশটিকে ভাঙার।

ভারতের এই চাওয়া কঠিন কিছু না। কিন্তু ভারতের পক্ষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেসব নক্মালবাদীরা লড়ছিলেন তাদেরকে মেনে নেওয়াটাও কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। তাতে গোটা ভারতে নক্সাল প্রভাব আরও বাড়ত, সেটি যাতে না হয় সে কারণে ভারতের নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করাটাই ছিল ভারতের প্রধান লক্ষ্য এবং ভারত সেটা সফলভাবে করতে পেরেছে। এ জন্য ভারতের বড় বুর্জোয়াদের উচিত শ্রীমতি ইন্দ্রিরা গান্ধীর আবক্ষমুর্তী করে তাদের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে রাখা। একমাত্র শ্রীমতি ইন্দ্রিরা গান্ধী কম সময় সফলভাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণে রেখে মুক্তিযুদ্ধ শেষ করতে পেরেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধ থেকে কমিউনিস্টদের বিদায় ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

রাশিয়া মানে সোভিয়েত ইউনিয়নতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এই বক্তব্যইতো শুনে আসছে বাংলাদেশের মানুষ। এটা হলো সত্যকে চাপিয়ে রেখে রাশিয়াকে মহান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা। তৎকালিন সোভিয়েত সুপ্রিমো বা প্রেসিডেন্ট পোদগর্নি ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল ইয়াহিয়া খানকে লেখা এক চিঠিতে , পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি মিটমাট করে নিতে বলেন। চিঠির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বের্নার-অঁরি লেভির গবেষণামূলক গ্রন্থ (লেখক মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে বেশ কিছুকাল বাংলাদেশে ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পর কিছুদিন প্লানিং কমিশনেও কাজ করেছিলেন) ‘অবিকশিত জাতীয়তাবাদ ও অঙ্কুরে বিনষ্ট বিপ্লবের পটভূমিতে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছিল (গ্রন্থটি অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন শিশির ভট্টাচার্য। আলিয়াস ফ্রাসেস প্রকাশক) এখানে পাবেন।

বের্নার-অঁরি লেভির সোভিয়েত সুপ্রিমো বা প্রেসিডেন্ট পোদগর্নি ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল ইয়াহিয়া খানকে লেখা চিঠির অংশটুকু এরকম, ” ঠিক যে কারণে এই মুর্হুতে তারা (রাশিয়া) শ্রীমাভো বন্দরনায়েক (শ্রীলঙ্কা) সমর্থন করছেন এবং চে গুয়েভারাপন্থিদের (শ্রীলঙ্কার বামদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত সমর্থন) বিদ্রোহকে দমন করছেন ইয়াহিয়াকেও তারা সমর্থন করছেন ঠিক একই কারণে। বিশৃঙ্খলার যাবতীয় উৎসের (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ) বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। সব ধরণের আগুনকে নিস্তেজ করে দিতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাতে পুরো উপমহাদেশে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে না পারে এবং এই কাজগুলো করতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ‘

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে রাশিার ফারাকটা শুধুমাত্র বাক্য ও শব্দে। মূলগতভাবে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র কেউ চায়নি বাংলাদেশ নামক একটি দেশের অভ্যুদয় হোক আর বিশেষত তা কমিউনিস্টদের মাধ্যমে। এই হলো কথিত দুই বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতবাদের ভরকেন্দ্রের (রাশিয়া ও চীন) অবস্থান। বাস্তবে বিপ্লবের বিশ্ব ভরকেন্দ্র বলে কোনকালেই কিছু ছিল না যা ছিল তা হলো চীন ও রাশিয়াপন্থি নামে দুনিয়াজুড়ে তাদের ছড়ানো ছিটানো কিছু অন্ধ মৌলবাদী সমর্থক যা তারা কমিউনিস্ট আন্দোলন নামে কথিত কমিউনিস্ট পার্টির নামে পরিচালনা করতেন। স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠা এবং বিকাশের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের কমিউনিস্টরা সেই পথে যায়নি। এটাই কমিউনিস্ট আন্দোলনের কালো অধ্যায়।

রুশপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি যা আজকের সিপিবি, তাদের অনেকে দাবি করেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না। কারণ পূর্ববাংলায় পাকিস্তান কি করেছে, এখানে কারা লড়াই করছে সেটা সোভিয়েত ইউনিয়ন খুব ভাল করে জানতো না। সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভালমতো (মানে সোভিয়েত রাশিয়া আকাশে যান পাঠায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাল্লা দেয় তারা জানে না!!) জানানোর জন্য এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পাশে আনার জন্য ১৯৭১ সালের মে মাসে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ইলামিত্র ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিং রাশিয়াতে যান। তারা যাবার পর রাশিয়ার মনোভাব ঘুরে যেতে থাকে এটি বাংলাদেশের অনেক রুশপন্থি কমিউনিস্টদের বলতে শুনেছি। এটি ঢাহা মিথ্যা কথা।

এমনকী ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে রুশ ভারত চুক্তির পরও সোভিয়েত ইউনিয়নের মত পরিবর্তন হয়নি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে। এই চুক্তির পর সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ইন্দ্রিরা গান্ধী মস্কো সফর করেন। সোভিয়েত নেতা কোসিগিন ইন্দ্রিরা গান্ধীকে বলেন, ‘ কী ধরনের ক্ষমতা কাঠামো পাকিস্তানে বহাল আছে তা জেনে ভারতের লাভ কি?’ (লা মন্দে ডিপ্লোম্যাটের নভেম্বর ১৯৭১ সংখ্যার বরাতে লেভি আমাদের এটা জানিয়েছেন)। এরপর দুই নেতা মিলে একটা যুক্ত বিবৃতি দিয়েছেন, সেখানে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার অভ্যন্তরীণ কোনো ধরণের সামরিক সমাধান হতে পারে না।’ অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঠিক আড়াই মাস আগেও সোভিয়েত রাশিয়া রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছেন, সেখানকার মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা কোসিগিন ইন্দ্রিরা গান্ধীর ওই সফরে তাকে মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র দেওয়ার জন্য সমালোচনা করেন এবং তাতে ইয়াহিয়া রেগে যেতে পারেন এবং এতে পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করতে পারেন বলেও জানিয়ে দেন। কোথায় ইন্দ্রিরা গান্ধী সোভিয়েতের কাছ থেকে পাবেন অস্ত্র, গোলা বারুদ, নৌ বহরের আশ্বাস তা না করে উল্টো ভয় নিয়ে দেশে ফিরলেন।

নভেম্বর মাসের গোড়া পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। শুধু তাই নয়-তারা চায়নি পূর্ববাংলায় কমিউনিস্টরা গণযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশ গঠন করুক। তাতে নাকি গোটা দক্ষিণ এশিয়া লন্ডভন্ড হয়ে যাবে এমন কি ভারত ও পাকিস্তানে সেই বিপ্লব পুড়ে যাবে।

নভেম্বর পর্যন্ত যখন পরিষ্কার হয়ে গেছে, বাংলাদেশে একটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে এবং এটি একটি লাল ভূমিতে পরিণত হয়েছে তখনই রুশরা দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার জন্য ভারতের পক্ষে আদাজল খেয়ে লেগেছে যাতে ভারত এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপের গড়ে তোলা যুদ্ধ এবং ভারত থেকে ফেরা মুক্তিযোদ্ধারা দেশের মধ্যে সফলভাবে বড় ধরণের গেরিলা অ্যাকশন তৈরি করতে পেরেছিলেন। এর আচ পাবেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ওসমানের গেরিলা অ্যাকশন তৎপরতার নতুন ম্যানুয়াল থেকে। এ সময় তিনি ছোট ছোট দল বানিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অ্যাকশনের জন্য পাঠাতে শুরু করেন। বাংলার মানুষের রক্ত ও ত্যাগের ওপর দাড়িয়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধ এভাবে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন দ্রুত শেষ করার দিকে গেল এবং তা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আর রইল না।

এরপর যে রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে তার গন্তব্য রিপাবলিকের দিকে হবে এমনটি আশা করা কঠিন। একাত্তর পরবর্তী রাষ্ট্রটির শুধু এক্সটেনশনই আজকের রাষ্ট্র ব্যবস্থা। কিছুই পাল্টায়নি রাষ্ট্রের আর্দশ, আইন কানুন জবরদস্তি। ফলে আজকের দুনিয়াতে দাড়িয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলন একটা নিছক কেতা দুরস্ত ফ্যাশন হতে পারে না। কারণ আমাদের ইতিহাস লাখ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ ও ইজ্জতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জনগণের আত্মসম্মান রক্ষা, জনগণের ক্ষমতায়ন, জনগণের জন কর্তৃত্ব, নারী পুরুষের সমাধানাধিকার, সাম্য, মৈত্রী, মানুষের ওপর মানুষের শোষন মুক্ত, সকল ধর্ম, জাতী ভাষা নিরপেক্ষ একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কর্মসূচী নিয়ে বরং নতুন যুগের কমিউনিস্টরা যদি দাড়াতে পারেন তাহলে মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে। এর আগে আজকে ইসলামি দল কালকে হয়তো অন্য কোনো জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে লেজুড় বেধে হয় নির্বাচন না হয় আন্দোলন আন্দোলন খেলায় বরং জনবিরোধী রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে। এক শাসক যাবেন অন্যজন আসবেন। জনগণের ভাগ্যর পরিবর্তন হবে না।

ফলে এই ভূমিতে কোনো বিপ্লব সম্পন্ন হয়নি। বরং বিদেশী শক্তির মাধ্যমে বিপ্লব নস্ট করা হয়েছে। এখানে পরিবর্তনের প্রশ্নটি খোদ রাষ্ট্রের চরিত্র ও কাঠামো পরিবর্তন না করে শুধু সরকার পরিবর্তনের খেলা যারা খেলতে চায় তারা কোনো না কোনো বিদেশী প্রভুর চ্যালা। বিদেশী প্রভুর আরেক অংশের চ্যালা ক্ষমতায় এলে তাহাতে বাংলাদেশীদের কী?

57 Shares