মাসকাওয়াথ আহসান

করোনাকালে প্রতিটি মানুষই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। অদৃশ্য শত্রু যাকে খুশি বেছে নিতে পারে হত্যার জন্য। এর চেয়ে অসহায় অবস্থা আর কী হতে পারে; যখন করোনার তাক করা বন্দুকের গুলিতে যে কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী করোনা যখন তার গণহত্যা অব্যাহত রেখেছে; তখন মানুষকে বাঁচাতে সম্মুখ সমরে ডাক্তার ও তাদের সহযোদ্ধারা।

রাষ্ট্রগুলো সদর দরজায় তালা মেরে জনগণকে ঘরে থাকতে অনুরোধ করেছে। যেহেতু করোনার কোন প্রতিষেধক ভ্যাকসিন বা প্রতিরোধক ওষুধ উদ্ভাবিত হয়নি; করোনার বিরুদ্ধে মানুষ; ঢাল নেই তলোয়ার নেই; নিধিরাম সর্দার যেন। ফলে ঘরে লুকিয়ে থাকা ছাড়া বাঁচার চেষ্টা করার আর কোন উপায় হাতে নেই।

বাংলাদেশের জনগণের প্রতিরক্ষার সুপ্রিম কমান্ড যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে; তাই করোনা মোকাবেলায় সক্ষমতা ও অসক্ষমতার দায়ভার প্রধানমন্ত্রীর।

প্রধানমন্ত্রীর করোনা-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের টিমটি তাকে করোনার আসন্ন বিপদের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।স্বাস্থ্য মন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন জনগণের করোনা পরীক্ষা ও চিকিতসা সেবা দিতে। স্বাস্থ্য-মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র, বিটিভি আঙ্গিকে ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ এমন একটি ভ্রান্ত-বার্তা দিনের পর দিন জনগণকে দিয়েছেন। তা ছাড়া ব্যাপক দুর্নীতিতে ক্লিষ্ট স্বাস্থ্যবিভাগ দৈন্দন্দিন চিকিতসা সেবাই যেখানে দিতে পারে না; সেখানে করোনা-পরিস্থিতিতে ব্যর্থ হয়েছে পুরোপুরি।

“কিছুই ঠিক নেই অথচ সব ঠিক আছে” জাতীয় দক্ষিণ এশীয় মনোভাব করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের অসহযোগী হয়েছে।

সীমিত সামর্থ্যের মাঝে বাংলাদেশের প্রশাসন-পুলিশ-সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক। স্বার্থপর সমাজ যখন করোনা হামলায় নিহতের লাশ বেওয়ারিশ করে একা ফেলে গেছে; তখন প্রশাসন-পুলিশ-সেনা মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। এখন করোনা মোকাবেলায় সেবা দিতে গিয়ে করোনা হামলায় আক্রান্ত এই জনসেবকদের অনেকেই।

ডাক্তারেরা এই সম্মুখ সমরে করোনার হামলায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আক্রান্ত হয়েছেন স্বাভাবিকভাবেই। যদিও সিনিয়র ডাক্তারদের অনেকেই করোনা হামলার কথা শুনেই আত্মগোপন করেছেন। ডাক্তারি পেশার শপথ ভঙ্গ হয়েছে এতে। ইতিহাসে তারা করোনা-কোলাবরেটর হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

দায়িত্বপ্রাপ্ত যে মন্ত্রীরা “করোনা কিছুই নয়; আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী জাতীয় প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে তাদের জীবন ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিয়েছেন; তাদের সে আশার সওদাগর হবার গোয়েবলসীয় প্রচারণা চালানোর দায়ে ইতিহাস তাদের করোনা কোলাবরেটর হিসেবে চিহ্নিত করবে।

শিক্ষা-মন্ত্রী একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে; সবচেয়ে দেরিতে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছেন। করোনা হামলার সময় ছুটি দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দাবি উত্থাপন করতে হয়েছিলো।

শিক্ষা-মন্ত্রণালয়ে একজন টেকস্যাভি ও তরুণ শিক্ষা-উপমন্ত্রী আছেন; তিনি করোনা-পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে শিক্ষা-মন্ত্রীকে সচেতন করার কথা। নীতি নির্ধারণে তরুণদের আনা হয়; অপেক্ষাকৃত বয়েসিদের সিদ্ধান্তের ভ্রান্তিগুলো নিরসনে সাহায্য করার জন্য। করোনা মোকাবেলার প্রাথমিক ধাপে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়েছে।

আর করোনাকালে যে জন-অসচেতনতা চোখে পড়লো, এই অসচেতন জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থা।

করোনা মোকাবেলায় “সাধারণ ছুটি ঘোষণা”-এই অফিস আদেশটি জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। “যে যেখানে আছেন; সে স্থান ত্যাগ করবেন না” এই বাক্যবন্ধ ব্যবহার না করে “সাধারণ ছুটি ঘোষণা”-র অফিস আদেশ; অকার্যকর দপ্তর নির্দেশ। ৫০ বছরের পুরোনো সিভিল প্রশাসনের কাছে ভাষাগত জনযোগাযোগ স্থাপনের সক্ষমতা প্রত্যাশা করা গিয়েছিলো।

করোনা মোকাবেলায় সরকারি নির্দেশ অমান্য করে গার্মেন্টস খোলা; নীতি নির্ধারণে গার্মেন্টস মালিকদের পেশী প্রদর্শন করেছে। একটা দেশে ব্যবসায়ীদের হাতে নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব তুলে দিলে; তারা প্রথম সুযোগে মানবতা বিরোধী অপরাধ করে; এর প্রমাণ হয়ে রইলো; করোনাকালে গার্মেন্টস মালিকদের ঔদ্ধত্য আর মুনাফা-নিষ্ঠুরতার কর্মকাণ্ডে। করোনা কোলাবরেটর হিসেবে তাদের নাম ইতিহাসে লেখা রইলো।

করোনাকালে নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহ-করোনাকালকে স্বাস্থ্যখাতে “রুপপুরের বালিশ বেচার” আরেক সুযোগ মনে করে করোনা কোলাবরেটরেরা সক্রিয়। তারা সক্রিয় জনগণের জন্য দেয়া “ত্রাণচুরিতে”। ক্ষমতাসীন সরকার “চোরের অভয়ারণ্য সৃজনের” দায়ে অভিযুক্ত রইলো।

জার্মানির শীর্ষনেতা আঙ্গেলা ম্যারকেল জনগণকে সত্য তথ্য দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে করোনা মোকাবেলা করে চলেছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশে দক্ষিণ এশীয় “বাস্তবতা ও সত্য অস্বীকারের” চিরায়ত সংস্কৃতি; করোনা মোকাবেলার সম্ভাবনাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও তথ্য ভিত্তিক বাস্তব ও ইহলৌকিক পদ্ধতিতে করোনা মোকাবেলায় কোন দেশ ব্যর্থ হলে; সেখানে মানুষের পরকাল নিয়ে ভাবা ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা। সাধারণ মানুষের ধর্মের ওপর প্রবল নির্ভরশীলতা; ধর্ম-ব্যবসায়ীদের দোকানের গুরুত্ব বাড়ায়। করোনাকালে ভারতে ইসলামোফোবিয়া তৈরি করে কট্টর হিন্দুত্ববাদের দোকানগুলো যখন প্রশস্ত হচ্ছে; ঠিক তখন বাংলাদেশে “একাত্তরের কোলাবরেটর রাজনৈতিক দল জামায়াতের”-একটি অংশ করোনাকালে প্রতিটি মানুষ যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে; ঠিক তখন একটি নতুন রাজনৈতিক দোকান খুলেছে “আমরাই বাংলাদেশ”।

কোলাবরেটরের চিন্তার জগতে মানবতা বলে কিছু নেই; সে তার দোকানদারি ছাড়া আর কিছু বোঝে না; সে নির্বাচন পরিচালনাকারী নির্বাচন কমিশন হোক, গার্মেন্টস মালিকই হোক, ত্রাণ চোর, মেডিকেল সামগ্রী ক্রয়ের “কমিশন চোর” হোক, গণমানুষ বিনাচিকিতসায় মরার কালে; আলাদা “ভি আইপি হাসপাতাল” গোপনে চালানো লোকেরাই হোক, “সব কিছু ঠিক আছে” গুজব রটনাকারী কীটেরা হোক; কিংবা জামায়াতের নতুন দোকানই হোক; করোনার মহামারীর সময়ে “মানুষের জীবন বাঁচানো”-র চেয়ে নিজ নিজ
মানুষ মারার দোকানগুলো চালু রাখাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে যারা; এরা সবাই করোনা কোলাবরেটর।

95 Shares