অনুপম সৈকত শান্ত

কী করবেন, কী করবেন না

  • বাজারে যে ১০ টাকার মাস্ক ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো পরার কোন দরকার নাই। কেননা, এইসব মাস্ক করোনা ভাইরাসকে আটকাতে পারে না, ঐ মাস্কের ছিদ্রের চাইতেও ছোট করোনা ভাইরাস, যদিও অন্য অনেক ভাইরাসের তুলনায় করোনাভাইরাস আকারে একটু বড়; মাস্কের ভিতর দিয়ে সহজেই ভাইরাস বহনকারী ড্রপলেট চলাচল করতে পারে। করোনা ভাইরাস যেতে পারে না এমন মাস্কও আছে, বিশেষ ধরণের মাস্ক বস্তুত সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে আসা চিকিৎসক, নার্সদের জন্য প্রয়োজন। ঢালাওভাবে সবার মাস্ক পরার কোন মানে নেই।
  • অত শত টিস্যুও কেনার দরকার নাই। নাকে-মুখে হাত দিবেন না, সেটা খালি হাত হোক আর টিস্যু দিয়েই হোক। যদি আপনার সর্দি জ্বর হয়ে থাকে, তবে বাসা থেকে একদম বের হবেন না। হাতের কাছে একটা গামছা রাখুন এবং নিজে গরম পানি, সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। বেশি জ্বর, শ্বাস কষ্ট এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। আর, হঠাৎ করে আসা হাঁচির ক্ষেত্রে হাতের তালু দিয়ে বা কনুই দিয়ে ঢেকে হাঁচি দিন, তালু দিয়ে ঢাকলে সাথে সাথেই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন।
  • কারো সাথে কথা বলার সময়ে কমপক্ষে ৬ ফুট (WHO, CDC এর পরামর্শ মোতাবেক) দূরত্ব বজায় রাখুন এবং একদম মুখোমুখি না হয়ে কিছুটা তেরচা দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। হ্যাণ্ডশেক, কোলাকুলি এসব এড়িয়ে চলুন। ভিড় এড়িয়ে চলুন। লোকাল বাস, ব্যস্ত মার্কেট- এসব এড়িয়ে চলুন। পাবলিক প্লেসের বিভিন্ন স্থাপনায় (যেমন, সিড়ির রেলিং, লিফটের বাটন, দরজার হাতল ইত্যাদি) হাত রাখা বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন। ঐসব স্থাপনার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের ঘনঘন এলকোহল-সেনিটাইজার দিয়ে পরিস্কার করতে বলুন।
  • প্রতিবার কনটাক্টের পরে, সাবান দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। বাসায় ফেরার পরে পূরিপূর্ণভাবে গোসল করুন।
  • প্রচুর পানি খান। প্রতিদিন ফলমূল খাওয়ার চেষ্টা করুন। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খান (অনিয়মিত খাদ্যাভাস যাদের), খাবারের মেন্যুতে দুধ-ডিম-মাছ-মাংসের পাশাপাশি অতি অবশ্যই শাক সবজি যুক্ত করুন। ব্যায়াম করুন। অর্থাৎ সুস্থ সবল থাকার জন্যে যা করার দরকার, তাই করুন।
  • নিজে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন, চারপাশের পরিবেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। যেখানে সেখানে থুতু, ক্বফ, পানের পিক, নাকের ময়লা (হাত দিয়ে খুটে), সর্দি- এসব ফেলবেন না। দৈনন্দিন ময়লা আবর্জনাও যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

দুই

করোনা ভাইরাস নিয়ে প্যানিকড হওয়ার কিছু নেই? পুরাটাই ব্যবসায়িক কারণে প্যানিক ছড়ানো হচ্ছে? করোনা ভাইরাসের মৃত্যুহার যেহেতু মাত্র ১-৩%, ফলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই?

এটা ঠিক যে, যেকোন ক্রাইসিস মোকাবেলার প্রথম শর্তই হচ্ছে প্যানিকড না হওয়া। আর, আমাদের মত দেশে অসৎ ব্যবসায়ীরা ক্রাইসিস পিরিয়ডে মুনাফার লোভে চারদিকে আতংক তৈরি করে, যাতে করে ১৫ টাকার মাস্ক ২০০ টাকায়, ১০ টাকার টিস্যু ৫০ টাকায় বিক্রি করা যায়। ফলে, অযথা আতংকিত হওয়া যাবে না, আতংক ছড়ানোও যাবে না। কিন্তু একই সাথে মনে রাখতে হবে, মাত্র ১-৩% মৃত্যুহার বলে, এই সময়ের করোনা ভাইরাস আউটব্রেক কোনরকম ক্রাইসিসই না- তা কিন্তু নয়।
স্বাভাবিকভাবেই, যেসব সংক্রামক রোগে মৃত্যুহার অনেক বেশি, মানে ৩০%, ৫০%, ৮০%, সেগুলো খুবই ভীতিকর। ঐ অসুখ হওয়া মানে জীবন মরণ নিয়ে টানাটানি। সেই তুলনায় ১%, ২% মৃত্যুহার এই করোনা ভাইরাসের। ফলে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সাধারণ ফ্লু বা ভাইরাল সর্দি-জ্বরকে আমরা যেমন পাত্তা দেই না, করোনা ভাইরাসকেও পাত্তা দেয়ার কিছু নাই – এমনটা মনে হতে পারে। বস্তুত তা নয়। সাধারণ ফ্লু বা ভাইরাল ফিভারের চাইতে এই করোনা ভাইরাসের মৃত্যু হার কিন্তু বেশি! তার চাইতেও ভীতিকর হচ্ছে, এর সংক্রমণের হার। ভয়ানক দ্রুত সে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এই তিন চার মাসে আজ কতগুলো দেশে ছড়িয়ে গেল। শেষ খবর মোতাবেক বর্তমানে ১০৪ টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী মিলেছে। অথচ ১ মাস আগেও হাতে গোনা ২৪-২৫ টা দেশে আক্রান্ত ছিল। সপ্তাহকয়েক আগে ইতালিতে প্রথম ৩ জন আক্রান্ত পাওয়া গেল, সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লোই না, বাংলাদেশ সহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশেও ভাইরাস ছড়িয়ে দিল। সর্বশেষ ৭ মার্চ পর্যন্ত ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৬৩৬ জন, এ পর্যন্ত মরেছে ১৯৭ জন। ৭ তারিখে, একদিনেই নতুন ৭৭৮ জন আক্রান্ত হয়েছে, মারা গিয়েছে ৪৯ জন (সূত্রঃ WHO এর প্রতিদিনকার স্ট্যাটাস আপডেট রিপোর্ট, ৭ মার্চঃ https://www.who.int/docs/default-source/coronaviruse/situation-reports/20200307-sitrep-47-covid-19.pdf?sfvrsn=27c364a4_4)।
হ্যাঁ, মৃত্যুর হার এখনো বেশ কম। সমগ্র পৃথিবীতে এ পর্যন্ত আক্রান্ত’র সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার, যার মধ্যে মারা গিয়েছে মাত্র ৩৮০৫ (সূত্রঃ লাইফ আপডেট সাইটঃ https://www.worldometers.info/coronavirus/), অর্থাৎ এখন পর্যন্ত মৃত্যুর হার হচ্ছে মাত্র ৩.৪%। কিন্তু, ভীতিকর বিষয় হচ্ছে- এই ভাইরাসের সংক্রমণের হার। এই সমস্ত দেশে যাবতীয় সাবধানতার পরেও যে হারে ভাইরাস ছড়াচ্ছে, তা রীতিমত ভয়ানক।
উপরে বামদিকের গ্রাফে আক্রান্তের গ্রাফটি উপরের দিকে উঠছে তো উঠছেই! থামার কোন লক্ষণ নাই। ফলে ডানদিকের মৃত্যুর গ্রাফটাও উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, যদিও পার্সেন্টেজে বামের সংখ্যার ৩.৪% হচ্ছে ডানে গ্রাফ, কিন্তু ডানের গ্রাফের মৃত্যুর সংখ্যাটা বেড়েই চলেছে, যেহেতু আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। সুতরাং, ভয়ের ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, অন্যান্য মরণঘাতী ভাইরাস, যাদের ফ্যাটালিটি রেট ৩০%, ৫০%, ৮০%, সেগুলোর তুলনাতেও এই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হার অনেক গুন বেশি। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রাণঘাতী ইবোলায় ২০১৪ সালের গিনি-লাইবেরিয়া-সিয়েরে লিয়নের আউটব্রেক বাদ দিলে যতজন মারা গিয়েছে, তার চাইতে করোনা ভাইরাসে এই ৩-৪ মাসে অলরেডি বেশি মারা গিয়েছে। অথচ, এই ইবোলায় বিভিন্ন বছরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মৃত্যুর হার ছিল গড়ে ৫০%, ক্ষেত্রবিশেষে কোথাও ৯০%। (২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকান আউটব্রেকে ১১ হাজার মারা গিয়েছে, কেননা ঐ আউটব্রেকে ভাইরাসটি ছড়িয়েছিল সবচেয়ে বেশি, আক্রান্তের সংখ্যা ছিল- ২৮৬০০)। অর্থাৎ বলতে চাইছি যে, পার্সেন্টেজের হিসেবে একটা ছোট ফাঁকি আছে। এই পার্সেন্টেজ আক্রান্তের সংখ্যার উপরে করা, ফলে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি হলে পার্সেন্টেজ কম হলেও মৃতের সংখ্যা বেশি হতে পারে। মানে, ১০ জন আক্রান্তের ৯০% এর চাইতে ১০,০০০ জন আক্রান্তের ১% কিন্তু অনেক বেশি।

তিন

যারা মারা যাচ্ছে, তারা সব বয়স্ক, বা অলরেডি কোন ক্রনিক অসুখের রোগী। ফলে, আমাদের জন্যে কোন ভয় নেই?

এরকম চিন্তাটা হচ্ছে সবচাইতে ভয়ংকর। প্রথমত, যেকোন মহামারীর ব্যাপারটাই হচ্ছে কমিউনিটি বা একটা জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ক্রাইসিস, যেখানে ব্যক্তি বিশেষ কারোর একার সুস্থতার বিষয়টি মুখ্য হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, এই যে বয়স্ক, ক্রনিক রোগে অসুস্থ ব্যক্তি, তিনি কিন্তু আমার বাবা, মা, আত্মীয়, আপনজন হতে পারে। তারও চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- এরকম সংক্রামক রোগ যখন এপিডেমিক (মহামারী) থেকে একদম প্যানডেমিক (পৃথিবীব্যাপী মহামারী) পর্যায়ে ছড়াতে থাকে, তখন প্রতিটি ব্যক্তির ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ, সবল, তরুন লোকেরাই যেহেতু বয়স্কদের তুলনায় বেশি সচল থাকে, তাদের মাধ্যমে এই ভাইরাসের বিস্টার ঘটার সম্ভাবনাও কিন্তু অনেক বেশি, যদিও তাদের আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা খুবই কম। তার মানে বস্তুত কি দাঁড়াচ্ছে? যে করোনা ভাইরাসে আমি আক্রান্ত হলেও মারা যাবোনা বলে খুশিতে বগলদাবা করছি, সেই ভাইরাসটি মূলত বহন করে এনে পাশের একজন বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ কিন্তু হয়েও যেতে পারি আমি। ফলে, ব্যাপারটা যতখানি না আমার সুস্থ থাকার বা মারা না যাওয়ার, তার চাইতেও আমাদের সকলের সম্মিলিত সুস্থ থাকার।
নেদারল্যাণ্ডে গত সপ্তাহে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ধরা পড়ে। তারপর থেকে প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল পর্যন্ত ৩ জন মারা গিয়েছে। ৩ জনের বয়স ৮৬ বছর, ৮২ বছর ও ৮৬ বছর। (এখানকার ৮০-৮৫ বছরের লোকজন বাংলাদেশের ৬০ বছরের বৃদ্ধের চাইতেও তরুন, রীতিমত কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেড়োয়, সাইকেল চালিয়ে বাজার যায়, এখানে ওখানে যায়)। তো, নেদারল্যাণ্ডে ৬০+ লোকের সংখ্যা অনেক। আমি যে গ্রামে থাকি, সেখানে বৃদ্ধদের সংখ্যাই বেশি। করোনা ভাইরাসে বৃদ্ধদের মৃত্যুকে যদি স্বাভাবিক ও অগুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তবে এই গ্রামটি প্রায় উজাড় হয়ে যাবে। গতকাল এক ইংলিশ সায়েন্টিস্ট এর সাক্ষাৎকার শুনলাম। সেখানে তিনি এভাবেই বললেন, ‘আমি জানি আমার করোনা ভাইরাসে কিছু হবে না, কেননা আমি খুবই সুস্থ সবল। কিন্তু আমি সেজন্যে এই ভাইরাসের আক্রমণ, সংক্রমন নিয়ে উদাসীন থাকতে পারি কি? ধরেন, আমি ভাইরাস বহন করে আমার বয়স্ক কলিগ বা প্রতিবেশী একজনের সাথে হ্যাণ্ডশেক করলাম বা কথাবলার সময়ে ঝুকে কথা বললাম বা হাগ করলাম, যার ফলে আমার কাছ থেকে তার কাছে ভাইরাস পৌছে গেল, এবং তিনি মারা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। তাহলে কি আমি তাঁর মৃত্যুর জন্যে দায়ী হিসেবে বিবেচিত হবো না?’

চার

বাংলাদেশের মত উষ্ণ দেশে ভাইরাস টিকতে পারবে না। আর কটা দিন যাক, আরেকটু গরম পড়ুক, গ্রীষ্মের সেই কাঠফাঁটা রোদে সব ভাইরাস মারা পড়বে?

গ্রীষ্মের কাঠফাঁটা রোদেই যদি দেশ থেকে সব করোনাভাইরাস উধাও হয়ে যেত, তাহলে বাংলাদেশের চাইতেও অনেক উষ্ণ দেশ সেই ইরান, সৌদি আরবে এতদিন ধরে এরকম আক্রান্তের সংখ্যা দেখা যেত না। এবারের করোনাভাইরাসই শুধু নয়, এর আগেও করোনাভাইরাসের আরেকটি স্পিসিস, মারস (MERS: Middle East Respiratory Syndrome), নামেই বুঝছেন- এর উৎপত্তি বা বিস্তৃতি মিডল ইস্টের সেই উষ্ণ মরু দেশগুলো থেকে হয়েছিলো। সাধারণভাবে, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া সহ যেকোন রোগ-জীবাণুই উচ্চ তাপমাত্রায় টিকতে পারে না, ফলে পানি ভালো করে ফুটিয়ে পান করতে বলা হয় (পানিবাহিত জীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে), মাংসও খুব ভালোভাবে সিদ্ধ করে খেতে বলা হয় (পশুবাহিত রোগ জীবাণুর হাত থেকে রক্ষার জন্যে)। কিন্তু, করোনাভাইরাস যখন কোন সারফেসে পড়ে থাকে, তা কতক্ষণ কত ডিগ্রী তাপমাত্রা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে এখনো জানা যায়নি। যদি ধরেও নেয়া যায়, সরাসরি রোদে কয়েকঘন্টার মধ্যে এটি ধ্বংস হয়ে যায়; তারপরেও ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে খুশি হওয়া যাচ্ছে না। কেননা, এই ভাইরাস সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে ডিরেক্ট হিউম্যান কন্ট্যাক্ট থেকে এবং সামনা সামনি সর্দি-হাচির মাধ্যমে বাতাসে ড্রপলেট একজন থেকে অন্যজনে চলে যাচ্ছে। মানে হোস্ট মানবদেহই বস্তুত সেই কাঠফাঁটা রোদ থেকে ভাইরাসকে সবচাইতে বড় প্রোটেকশন দিচ্ছে। আর, যেসব বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে স্থাপনায় ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে, সেগুলোর সবই নিশ্চয়ই আউটডোরে বা ওপেন ফিল্ডে না। ইনডোরে, বিল্ডিং এর সিড়ির হাতল, লিফটের বাটন, পাবলিক টয়লেটের দরজার হাতল ইত্যাদিতে পর্যন্ত কাঠফাঁটা রোদ পৌঁছতে পারবে? এছাড়া আউটডোরের খুব সচল বা জনবহুল স্থাপনা, যেমন ওভারপাসের সিড়ির হাতল, এ ধরণের স্থাপনাতেও রোদে বা গরমে ভাইরাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগেই কিন্তু আরেকজনের হাতের বা শরীরের সংস্পর্শে চলে আসতে পারে।
আসলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিপদ বা ভয় আমার মতে আরো বেশি। দুটো কারণে-
১) বাংলাদেশ দুনিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটা, ঢাকা শহর সবচাইতে ঘনবসতি শহর, সবচাইতে দূষিত শহর। আমাদের দেশে- বিশেষ করে মেট্রোসিটিগুলোতে ন্যুনতম পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কোন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি, আমাদের জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কোনরকম অভ্যাস, কালচারই গড়ে ওঠেনি। এখানে পরিস্কার থাকা মানে- ম্যাক্সিমাম নিজে পরিস্কার থাকা, আচ্ছামত সাবান দিয়ে হাতধোয়া আর গোসল করা। চারপাশ পরিস্কার রাখার প্রয়োজন কেউ দেখে না। যেখানে সেখানে থুতু, ক্বফ ফেলা, সর্দি ঝাড়া, নাকের ভিতরে নখ দিয়ে ময়লা খুটিয়ে বের করে নিজ জামায় বা যেখানে সেখানে মুছা- এগুলো খুবই স্বাভাবিক নৈমত্তিক ব্যাপার। এমনকি, কৃমিতে আক্রান্তদের দেখা যায় প্যান্টের ভেতর দিয়ে পশ্চাদ্দেশে চুলকিয়ে সেই হাত না ধুয়েই এখানে সেখানে মুছতে। এগুলো একেবারে সাধারণ অভ্যাস বা বদভ্যাস, এদেশের অধিকাংশ মানুষের। ফলে, দুনিয়ার যেকোন প্রান্তের চাইতে এইদেশে যে সংক্রমণের হার অনেক বেশ হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।
২) বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যগত অবস্থা চীন, ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় অনেক খারাপ। বাংলাদেশে প্রতিবছর অপুষ্টিতেই ভুগে মারা যায় অনেক শিশু। FAO এর ডাটা অনুযায়ী ২০১৭ সালে দুনিয়ার গড় খাদ্য গ্রহণ ২৯৪০ কিলোক্যালরি পার পারসন পার ডে। সেখানে বাংলাদেশে এভারেজ ফুড কনজাম্পশন গ্রহণ ২৬০০ কিলোক্যালরির নিচে, চীনে প্রায় ৩২০০ কিলোক্যালরি, আর ইতালিতে ৩৫০০ কিলোক্যালরির উপরে (সূত্রঃ http://www.fao.org/faostat/en/#data/FBS)। বাংলাদেশের প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির খাদ্য গ্রহণ যদি ২৬০০ কিলোক্যালরি হতো, তাহলে খুব যে বেশি ডেফিসিয়েন্সি থাকতো তা নয়। আসলে সমস্যাটা আমাদের দুই জায়গায়। প্রথমত, আমাদের ধনী অংশের লোকেরা প্রয়োজনেরও অনেক বেশি কিলোক্যালরি গ্রহণ করায় এভারেজটা এত বেশি দেখাচ্ছে, আমাদের দরিদ্রসীমার নিচে বাস করা জনগোষ্ঠীর কিলোরি ইনটেক ১২০০-১৫০০ এর মত, অনেক ক্ষেত্রে তার আরো কম। এবং, দ্বিতীয়ত এই গড় ২৬০০ কিলোক্যালরি ফুড কনজাম্পশনের সিংহভাগটাই আমরা পাই ভাত, আলু, আটা থেকে, এখানে প্রোটিনের পরিমাণ খুব কম। আর, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যে সবচাইতে দরকারি যে শাকসব্জি, ফলমূল, তার পরিমাণ তো আরো অনেক কম। ২০১৭ সালের ডাটা অনুযায়ী সবজি খাওয়ার পরিমাণ বাংলাদেশে ৩৫ কেজি পার পারসন পার ইয়ার, চীনে ৩৭৭ কেজি, ইতালিতে ১৩০ কেজি। ফলমূল খাওয়ার পরিমাণ বাংলাদেশে ২৭ কেজি পার পারসন পার ইয়ার, চীনে ৯৮ কেজি, ইতালিতে ১১৩ কেজি (সূত্রঃ https://ourworldindata.org/diet-compositions )। মানবদেহের ইম্যুউন সিস্টেম – অর্থাৎ সুস্থ সবল থাকা নির্ভর করে প্রধানত তার পুষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও খেলাধুলা, জীবন ধারণ প্রণালী ইত্যাদির উপরে। সবদিক দিয়েই বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে। ফলে, চীন ও ইতালি সহ ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের আক্রমণে মৃত্যুহার বলছি মাত্র ৩.৪%, সেটি বস্তুত বাংলাদেশের মত থার্ড ওয়ার্ল্ড দেশগুলোতে আরো বেশি হওয়ার আশংকা রয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশে মানুষ যেমন আক্রান্ত হবে অনেক বেশি ও অনেক দ্রুত, তেমনি মারা যাওয়ার আশংকাও এখানে অনেক বেশি।

পাঁচ

বাংলাদেশের মানুষের ভাইরাস- ব্যাক্টেরিয়ার সাথে বসবাস, ফলে আমাদের শরীরে ইম্যুউন সিস্টেম খুব শক্তিশালী। করোনা ভাইরাসে কিছু হবে না?

আগেই জানিয়েছি, মানবদেহের ইম্যুউন সিস্টেম নির্ভর করে তার পুষ্টি গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস, খেলাধুলা, জীবন ধারণ প্রণালী- এসবের উপরে। মোটেও নোংরা, অপরিস্কার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগ-জীবাণুপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে উঠলে ইম্যুউন সিস্টেম বেশি ভালো হয়ে যায় না। একজন ইউরোপীয়ান তাগড়া মানুষ আমাদের দেশে এসে এমনকি ফুটানো পানিও দুইদিন খেয়েই অসুস্থ হয়ে পড়ে, অথচ আমাদের এখানকার হাড়জিরে মানুষ বছরের পর বছর ওয়াসার দূষিত পানি বা পুকুর-নদীর নোংরা পানি খেয়ে, রাস্তার ধারের খোলা খাবার খেয়েও দিব্যি সুস্থ থাকে, ফলে আমাদের দেশের মানুষের ইম্যুউন সিস্টেম ঐ তাগড়া ইউরোপীয়ান, আমেরিকানদের চাইতে খুব ভালো, এইরকম দাবিও অনেককেই করতে শুনা যায়। আসলে, এটা একটা মিথ। বস্তুত আমাদের মত থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিতে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা মারা যায়। WHO এর একটি রিপোর্ট (সূত্রঃ https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/the-top-10-causes-of-death) মতে ২০১৬ সালের সবচেয়ে বেশি মারা যায় এমন ১০ টা রোগের মধ্য বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি মারা গিয়েছে হার্ট ডিজিজে, তারপরে মরে স্ট্রোক করে। ৩-নাম্বারে মারা গিয়েছে লোয়ার রেসপিরেটরি ইনফেকশন (যেমন নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, এগুলো সব সংক্রামক রোগ) , ৫ নাম্বারে হচ্ছে ডায়রিয়া ধরণের রোগে। ঐ রিপোর্টেই লো-ইনকাম দেশগুলোর গ্রাফটা যদি পাশাপাশি দেখি, তাহলে পাই, সবার উপরে আছে লোয়ার রেসপিরেটরি ইনফেকশন এবং দুই নাম্বারে ডায়রিয়া ধরণের অসুখ, মানে সেই রোগ-জীবাণুর সংক্রামক রোগবালাই। লো-ইনকাম দেশগুলোতে ৬৩% মৃত্যু হয় সংক্রামক রোগে, যেখানে উন্নত বিশ্বে মাত্র ১২% মৃত্যু ঘটে সংক্রামক রোগে; দুনিয়ার এভারেজ ধরলেও মাত্র ২২% মৃত্যু হয় সংক্রামক রোগে। সুতরাং, লো-ইনকাম কান্ট্রিগুলোতে পাবলিকের ইম্যুউন সিস্টেম খুব ভালো- এটা পুরোই একটা মিথ।
আসলে কী ঘটে? আমাদের শরীরে যখন ভাইরাস আক্রমণ করে, তখন আমাদের ইম্যুউন সিস্টেম সেই ভাইরাসকে পরাস্ত করতে একরকম এন্টিবডি তৈরি করে। এই এন্টিবডি শরীরের ভেতরে থাকা ভাইরাসকে ধ্বংস করে দিতে থাকে, সম্পূর্ণ ধ্বংস করার আগে ভাইরাস যাতে আর নিজের রেপ্লিকা তৈরি করতে না পারে, সে ব্যবস্থাও নেয়। এভাবে ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষার একটা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আমাদের শরীরের মাঝেই আছে, যদিও পুরা প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে শেষ হতে বেশ কিছুদিন সময় লেগে যায় (কথায় আছে সর্দি জ্বরে ডাক্তার দেখালে এক সপ্তাহ, না দেখালে সাত দিন), ফ্যাটাল বা মরণঘাতী রোগ হচ্ছে সেগুলো যেগুলোতে ইম্যুউন সিস্টেম পুরাপুরি কাজ করে ওঠার আগেই ভাইরাস একদম ভাইটাল অর্গানে গিয়ে আক্রমণ হানে। এই ইম্যুউন সিস্টেমের ব্যবস্থাটা সুস্থ-সবল শরীরে বেশি শক্তিশালী, শিশু – বয়স্ক ও দুর্বল- অসুস্থ শরীরে ইম্যুউন সিস্টেমটা দুর্বল। তারপরেও ঐ যে উপরের উদাহরণের তাগড়া ইউরোপিয়ান, আমেরিকান ব্যক্তি আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু হাড়জিরজিরে ব্যক্তি বছরের পর বছর আক্রান্ত হচ্ছে না- সেটার কারণ কি? কারণ আর কিছুই না, আমাদের ইম্যুউন সিস্টেম যে এন্টিবডি একবার তৈরি করে, সেটার ইনফর্মেশন শরীরে থেকে যায়। ফলে, একইরকম ভাইরাস পরবর্তীতে যখন আক্রমণ করে, তখন একদম শুরুতেই সেই এন্টিবডি সেই ভাইরাসকে পরাস্ত করে ফেলে, ফলে আমরা আর অসুস্থ হই না (যেমন, যাদের একবার চিকেন পক্স হয়েছে, তাদের আর হয় না। ভাইরাল ফিভার সারাজীবনে অনেকবার হয়, কারণ অনেকগুলো স্ট্রেইন এই ভাইরাল ফিভারের জন্যে দায়ী, চিকেন পক্সের ভাইরাস একটিই)। এসব খাবারে, পানিতে আমরা বছরের পর বছর আক্রান্ত হচ্ছি না, মানেই হচ্ছে আরো অনেক আগেই, হতে পারে শিশু অবস্থাতেই আমরা অলরেডি আক্রান্ত হয়েছিলাম এবং সামহাউ সারভাইভও করে গিয়েছি। ফলে, আমাদের শরীরের মধ্যে ঐ নির্দিষ্ট প্রকারের ভাইরাসের বিরুদ্ধে বা একাধিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে একরকম ইম্যুনিটি অলরেডি গ্রো করেছে। উল্টোদিকে সেই ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান তাগড়া ট্যুরিস্ট আক্রান্ত হয়েছে কারণ তার শরীরে এই ভাইরাসটি প্রথমবারের মত আক্রমণ করছে। এখন ঐ ইউরোপিয়ান, আমেরিকান তাগড়া শরীরের ইম্যুউন সিস্টেম অধিক শক্তিশালী কি না বুঝা যেত যদি দেশি হাড়জিরে আর তাগড়া ইউরোপিয়ান দুজনকে একই সাথে নতুন একটি ভাইরাসে আক্রমণ করতো! নিশ্চিতভাবেই, দুজনই আক্রান্ত হলে আমাদের হাড়জিরজিরে লোকের চাইতে সেই তাগড়া সুস্থ সবল ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। হ্যাঁ, অনেক ভাইরাসসহ রোগ জীবাণু পরিবেশে বাস করলে বেঁচে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেকগুলো প্রাকৃতিক টীকা যুক্ত হয়ে যায়, মানে ঐ সব চেনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরের মধ্যে একরকম ইম্যুনিটি ম্যাকানিজম কাজ করে, যেভাবে বিশেষ বিশেষ টীকার মাধ্যমে সেইসব রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তার মানে এই নয় যে, নভেল-করোনাভাইরাসের মত নতুন কোন ভাইরাসের হাত থেকেও সেই ইম্যুনিটি আমাদের রক্ষা করতে পারবে। এর জন্যে আমাদের শক্তিশালী ইম্যুউন সিস্টেম দরকার।

ছয়

করোনা ভাইরাস নিয়ে এত ভয়ের কিছু নেই। প্রতিবছর আমাদের দেশে নিউমোনিয়ায় মরে যায় ৫০ হাজার শিশু, মানে প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন শিশু। গোটা দুনিয়ায় করোনাভাইরাসে আর কয়টা মরেছে সে তুলনায়? করোনাভাইরাসের চাইতে নিউমোনিয়া নিয়ে আলাপ হওয়া দরকার বেশী?

প্রথমত বুঝতে হবে, নিউমোনিয়ার কারণ হচ্ছে শ্বাসপ্রণালিতে ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণ। ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে এন্টিবায়োটিক আছে, কিন্তু ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে শরীরের মধ্যে থাকা সেই ইম্যুউন সিস্টেমই সব। শিশুদের ইম্যুউন সিস্টেম পুরাপুরি ডেভলোপড না, ফলে একটু সময় লাগে, অনেক বাচ্চা মায়ের শাল দুধ পায় না, অনেকে আবার মায়ের দুধও পায় না, অনেকে ৬ মাস পরেও এসে অন্যান্য পুষ্টি উপাদান ঠিকভাবে পায় না; এসবই বাচ্চার ইম্যুউন সিস্টেমকে আরো দুর্বল করে। তারপরেও আমাদের মত দেশে নিউমোনিয়ায় এত সংখ্যক বাচ্চার মারা যাওয়ার কারণ যথাযথ চিকিৎসার অভাব; অর্থাৎ ইম্যুউন সিস্টেম শরীরের ভাইরাস আক্রমণ প্রতিহত করার সময়টুকুতে নানারকম সমস্যায় যে সাপোর্ট দরকার, যেমন উচ্চ তাপমাত্রা কমানোর জন্যে ব্যবস্থা, কোন কিছু খেতে না পারলে বা খাবার সব বমিতে বের হয়ে গেলে স্যালাইনের ব্যবস্থা, শ্বাস কষ্ট হলে অক্সিজেনের ব্যবস্থা- এসবের অভাবে মারা যায়। ফলে, অবশ্যই নিউমোনিয়া নিয়ে আলোচনাটা খুব দরকার, এতে কোন সন্দেহই নাই।
কিন্তু, এখনকার করোনাভাইরাস নিয়ে আলাপটাও আরো বেশি দরকার এই কারণে যে, দেশে বিদ্যমান সাধারণ ভাইরাসের প্রকোপেই যখন নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার এত বেশি, তখন নতুন এই করোনাভাইরাস, যার আরেক নাম SARS-CoV-2 (Severe Acute Respiratory Syndrome- Corona Virus-2) আরো অনেক বেশি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। প্রতিবছর ৫০ হাজার শিশু মারা যায়, মানেই হচ্ছে আক্রান্ত হওয়া শিশুর সংখ্যা সম্ভবত ৫-১০ লাখ (ওয়াইল্ড গেইস)। সাধারণ এইসব ফ্লু-তে মৃত্যু হার করোনাভাইরাসের চাইতে অনেক কম, সেই ফ্লু ভাইরাসের চাইতে এই নভেল ভাইরাসের সংক্রমণের হারও অনেক অনেক বেশি। উন্নত বিশ্বে প্রতি বছর এইসব ফ্লু’তে বয়স্করা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও শিশু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার একেবারে কম, কেননা ওভারল হাইজিন সিস্টেম এবং বাচ্চাদের এক্সট্রা কেয়ার। এসব দেশে বাচ্চাকাচ্চা জন্ম নিলেই বন্ধুবান্ধব- আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে পাড়াপ্রতিবেশি সবাই এসে ভিড় করে না, বাবা মা বাইরে থেকে এসে গোসল টোসল করে পরিস্কার না হয়ে বাচ্চাকে জাপটে ধরে না। বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থা। ফলে, বাচ্চারা এত সংখ্যায় আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার অবস্থাও যাচ্ছেতাই। ফলে, সাধারণ ফ্লু ভাইরাসের সাথে যদি এই করোনাভাইরাস যুক্ত হয়, অচিরেই বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপক বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। করোনাভাইরাসে এতদিন মৃতের সংখ্যা বয়স্কদের মাঝে ম্যাক্সিমাম আর শিশুদের মাঝে মিনিমাম থাকলেও, বাংলাদেশে কিন্তু শিশুরাও বড়রকম স্বাস্থ্যঝুকির মাঝে রয়েছে।

সাত

করোনাভাইরাস কী? ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কী ঘটে?

প্রথমত, করোনাভাইরাস হচ্ছে একটি ভাইরাস। তাহলে ভাইরাস জিনিসটা কি? এর জীবন আছে কি নেই? জীবন না থাকলে এর তো মৃত্যুও থাকার কথা না। ইত্যাদি প্রশ্নের জবাব পাওয়া বেশি দরকার। ভাইরাস হচ্ছে কোন কোষ (Cell) বা অর্গানিজম (Organism) না হওয়া প্রোটিনে আবৃত জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল ডিএনএ (ডিঅক্সি রাইবোনিউক্লিয়িং এসিড) বা আরএনএ (রাইবোনিউক্লিয়িং এসিড)। ডিএনএ বা আরএনএ কী, কিভাবে কাজ করে- এর বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে সাধারণভাবে বলা যায়, এরা বংশগতি বা জেনেটিক ইনফর্মেশন ধারণ করে, এর সাহায্যেই জীবকোষের রিপ্লেকা তৈরি হয়। জীব কোষের ভেতরে থাকে কোষের সেন্টার বা নিউক্লিয়াস, আর সেই নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকে নিউক্লিওলাস ও এই জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল। এই জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালের কাছ থেকে ইনফর্মেশন নিয়ে নিউক্লিওলাস তৈরি করে রাইবোজম। সেই রাইবোজম আবার প্রদত্ত ইনফর্মেশন অনুযায়ী প্রোটিন তৈরি করে, যে প্রোটিন দিয়ে সেই সেলের পুনর্গঠন হয়, নতুন সেল তৈরি হয়, তথা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি ও নানারকম ক্রিয়াতে তৈরি হওয়া প্রোটিন ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, ভাইরাস হচ্ছে কেবলই জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল আর তার চারপাশে ঘিরে থাকা প্রোটিন। এ না পারে নড়তে – চড়তে, না এতে কোন বায়োলজিকাল এক্টিভিটি, যেমন খাদ্য গ্রহণ, শ্বসন, ইত্যাদি ঘটে। এটা আসলে এমনিতে একটা জড় বস্তুর মতই পড়েই থাকে; যদি না অপর কোন অর্গানিজমের জীবন্ত সেলের সংস্পর্শে না আসে। জীবন্ত সেলের সংস্পর্শে আসলে কী হয়? সে সেখানে গিয়ে সেই সেলের ম্যাকানিজম ব্যাবহার করে নিজের রেপ্লিকা তৈরি করতে পারে। মানে জীবের অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি মাত্র বৈশিষ্ট্য- বংশবৃদ্ধি করা- এই কাজটি ভাইরাস পারে, তাও একা একা পারে না, অন্য কোন জীবন্ত সেলের সাহায্যে পারে। এই কাজটি কিভাবে করে, সেটি আমাদের করোনাভাইরাস দিয়েই বুঝানো যাক।
করোনাভাইরাসে থাকে আরএনএ (RNA) আর তার চারদিকে থাকে প্রোটিন। ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে, করোনাভাইরাসে চার রকমের প্রোটিন থাকেঃ এস প্রোটিন (Spike Glycoprotein, S-protein) – ভাইরাসটির চারদিকে কাটার মত বেড়িয়ে থাকা স্পাইক, যার সাহায্যে হোস্ট সেলের আবরণে গিয়ে আটকে বসে। এম প্রোটিন (Membrane, M-protein)- একরকম পর্দা বিশেষ। ই প্রোটিন (Envelope, E-protein) – যা চারদিকের মূল আবরণ এবং এন প্রোটিন (Nucleocapsid, N-protein), যার সাথে আরএনএ আটকে থাকে। এই ভাইরাস যখন কোন জীবন্ত সেলে আক্রমণ করে, তখন আরএনএ গিয়ে কোষের নিউক্লিয়াসে গিয়ে হাজির হয়। এমনিতে- নিউক্লিওলাসের নিজ কোষের ডিএনএ’র কথা মত রাইবোজম তৈরি করার কথা এবং সেই রাইবোজম ডিএনএ’র দেয়া তথ্যমাফিক প্রোটিন তৈরি করার কথা। কিন্তু আরএনএ গিয়ে নিউক্লিয়াসকে হাইজ্যাক করে বসে। ডিএনএ-কে অকার্যকর করে দিয়ে নিজেই ইন্সট্রাকশন দিতে থাকে। ফলে, এতে যে রাইবোজম তৈরি হয়, সে যে প্রোটিন তৈরি করে, সেটি হয় বস্তুত ভাইরাসের প্রোটিন। অর্থাৎ সেই প্রোটিন পেয়ে আরএনএ’র রেপ্লিকা গিয়ে সেখানে হাজির হয় ও নতুন ভাইরাস তৈরি হয়। এভাবে একটা সেলে একটামাত্র ভাইরাস আক্রমণ করে অসংখ্য নতুন ভাইরাস তৈরি করে ফেলে ও একটা সময়ে সেই সেলকে ধ্বংস করে বেরিয়ে এসে অন্যান্য সেলকে আক্রমণ করা শুরু করে। সুতরাং, ভাইরাসের এই জীবন্ত সত্ত্বা বা বেঁচে থাকা, বংশবৃদ্ধি সবকিছুই নির্ভর করছে, সেই হোস্ট সেলের উপরে। বাস্তবে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি হচ্ছে মূলত একটি ভাইরাস বোমা। সেখান থেকেই ভাইরাস একের পর এক অন্য মানুষে হোস্ট খুঁজে নেয়।
আবার, করোনাভাইরাস সম্পর্কে আসা যাক। করোনাভাইরাস বস্তুত কোন নির্দিষ্ট একটি ভাইরাসের নাম নয়, বরং এটি এক বিশেষ ফ্যামিলির ভাইরাসসমূহকে বুঝায়, যারা RNA ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত এবং সাধারণত বিভিন্ন প্রাণীদেহ থেকেই মানবদেহে এসেছে। অর্থাৎ অনেক রকম করোনাভাইরাস আছে। খুব নামকরা, মানে বর্তমান ভাইরাসের চাইতেও মরণঘাতী দুটো করোনাভাইরাসের নাম হচ্ছে MERS আর SARS। এবারের ভাইরাসটিকে বলা হচ্ছে নভেল বা নতুন করোনাভাইরাস, মানে এই ভাইরাসকে আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে প্রথম আউটব্রেক হয় বলে, এর নাম দেয়া হয়েছে nCOVID-19 বা শুধু COVID-19। চীনের উইহান প্রদেশে প্রথম ছড়িয়েছে বলে অনেক সময়ে একে উইহান করোনাভাইরাসও (Wuhan-coronavirus) বলা হচ্ছে। আর, এটি আগের SARS ভাইরাসের সমগোত্রীয় বলে একে সায়েন্টিফিক পেপারগুলোতে বলা হচ্ছে SARS-CoV-2, অর্থাৎ দ্বিতীয় সার্স করোনাভাইরাস। ফলে, বুঝতেই পারছেন, SARS-CoV-1 এর মত অতটা ভয়াবহ না হলেও, এই ভাইরাসেও সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম দেখা দিতে পারে, মানে আমাদের শ্বাসপ্রণালী আক্রান্ত হয়, শ্বাস কষ্ট থেকে শুরু করে নিউমোনিয়া পর্যন্ত হতে পারে।

আট

মানবদেহে ইম্যুউন সিস্টেম কীভাবে কাজ করে?

ভাইরাস যেভাবে কোষদেহে আক্রমণ করে একের পর এক সেল ধ্বংস করে, আর যেভাবে এক শরীর থেকে আরেক শরীরে যেভাবে সংক্রমিত হয়, তাতে তো দুনিয়াজুড়ে আর কোন জীবন্ত কোষ টিকে থাকার কথা ছিল না, একেবারে সবকিছুই কেবল ভাইরাসময় হয়ে যাওয়ার কথা! আসলে, সেটাই হতো- যদি না সমস্ত লিভিং অর্গানিজমেই একরকম ইনিহেরেন্ট ডিফেন্স ম্যাকানিজম না থাকতো। এমনকি এক কোষী যে ব্যাকটেরিয়া, তারও ব্যাক্টেরিওফাজ (বাংলা করলে হবে- ব্যাক্টেরিয়া খাদক) নামের ভাইরাসের বিরুদ্ধে একরকম ডিফেন্স ম্যাকানিজম আছে, একরকম এনজাইম দিয়ে সে ভাইরাসের বিরুদ্ধে ফাইট চালায়। ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া সহ যাবতীয় রোগ-জীবাণু বা প্যাথোজেন (Pathogen) এর বিরুদ্ধে মানবদেহের এই ডিফেন্স ম্যাকানিজমের নাম হচ্ছে ইম্যুউন সিস্টেম। এর আগে আরেকটি প্রশ্নের জবাবে অল্প করে কিছু আলাপ করেছি; এখানে আরেকটু ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
আমাদের ইম্যুউন সিস্টেম দুটা স্তরে বিভক্তঃ ইনেট (Innate, বাংলা কি হবে? সহজাত?) আর এডাপ্টিভ (এর বাংলা কি হবে? অভিযোজিত?) প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune system)। এই ইনেট বা সহজাত ইম্যুউন সিস্টেমটা বিভিন্ন ভাগে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ওভারল প্রতিরোধ ব্যবস্থা, মানে কোন নির্দিষ্ট রোগ – জীবাণুর বিরুদ্ধে না, যেকোন প্যাথোজেন এর বিরুদ্ধে ক্রিয়াশীল প্রতিব্যবস্থা। যেমন, আমরা যখন খাবার খাই, মুখের লালা বা থুতু খাবারের সাথে যুক্ত হয়, সেখানেও বেশ কিছু এনজাইম থাকে যা এন্টিব্যাকটেরিয়াল। অর্থাৎ খাবারের সাথে থাকা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই চালায় এই লালা। চোখের পানিও এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অর্থাৎ চোখকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার কাজে নিয়োজিত আছে চোখের পানি। আমাদের পাকস্থলীতে যে গ্যাস্ট্রিক এসিড থাকে, তা শুধু খাবার হজমেই সাহায্য করে না, প্যাথোজেনকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। শুধু তাই না, আমাদের পরিপাক তন্ত্রে ব্যাক্টেরিয়া সহ অসংখ্য অণুজীব বাস করে, যাদেরকে আমাদের শরীর শুধু ভালোভাবে বাস করতেই দেয়নি, উপকারী বন্ধুর মর্যাদা দিয়ে জীবিত রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আর প্রতিদানে তারাও হজমে সহযোগিতার সাথে সাথে অন্যান্য অনাকাঙ্খিত প্যাথোজেন বা জীবাণুকে ধ্বংস করার কাজেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণে যে আমাদের হাঁচি হয়, নাক দিয়ে অনবরত পানি ঝরে বা আমাদের যে ক্বফ বের হয়, এগুলো আসলে আমাদের শ্বাসপ্রণালির একরকম ডিফেন্স ম্যাকানিজম, ফুসফুস প্যাথোজেন দ্বারা ইরিটেটেড হয়ে- ক্বফ, সর্দির মাধ্যমে যতপারে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াকে শরীর থেকে বের করে দিতে থাকে (অর্থাৎ সর্দি, ক্বফে রোগ-জীবাণু ভর্তি থাকে। আর, এখান থেকে অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমণের কাজটি ঘটে, কত ভালো একটা কাজের কী দুঃখজনক পরিণতি!)। এমনকি প্যাথোজেনের আক্রমণে আমাদের যে জ্বর হয়, সেটাও ঐসব রোগ জীবাণুকে পরাস্ত করারই ম্যাকানিজম, এর মাধ্যমে প্যাথোজেনকে আনফেভারেবল পরিবেশ উপহার দেয়া হয়। এসবই আসলে ঐ ইনেট বা সহজাত ইম্যুউন সিস্টেমের অন্তর্ভূক্ত। সকল জীবন্ত অর্গানিজমেই এই ডিফেন্স ম্যাকানিজম ক্রিয়াশীল। এটার কোন ইম্যুউনোলজিকাল মেমোরি নেই, মানে কোন নির্দিষ্ট ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়াকে সে চিনে রেখে পরবর্তীতে দ্রুত একইরকম প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয় না। তবে, এই ব্যবস্থায় কোষ লেভেলে যে প্রতিরোধ সেখানে বিভিন্ন রিসেপ্টরের মাধ্যমে একটা ওয়াইড রেঞ্জের প্যাথোজেন চিনে ফেলার ব্যবস্থা আছে (যাতে করে উপকারী ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে আক্রমণ যাতে করা না হয়)। তবে, এই সিস্টেমের খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আমাদের রক্তের মাঝে থাকা শ্বেত কনিকা (White blood cells বা Leukocytes) নামের এক ধরণের কণিকা। এই শ্বেত কণিকা তৈরি হয় নানারকম কোষ দিয়ে যারা সরাসরি রোগ-জীবাণুকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দিতে পারে। শ্বেত কণিকা গঠনের এইসব কোষের কাজ অনুযায়ী নানারকম কঠিন কঠিন নাম আছে, আপাতত একটা নাম এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে (সহজ বিধায়)- প্রাকৃতিক খুনী কোষ (Natural killer cells)। এই শ্বেত কণিকাই আরেকটা স্বতন্ত্র ব্যবস্থায় নিউরোইম্যুউন সিস্টেম গড়ে তোলে, যা আমাদের ব্রেইনকে প্যাথোজেনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
এই ইনেট ইম্যুউন সিস্টেম হচ্ছে প্রথম স্তরের ডিফেন্স ম্যাকানিজম। এই ম্যাকানিজম ডিঙ্গিয়েও অনেক সময়ে অনেক ভাইরাস (এবং ব্যাক্টেরিয়া ও অন্যান্য প্যাথোজেন) আমাদের কোষে আক্রমণ করে ফেলে। তখনই দ্বিতীয় স্তরের ডিফেন্স ম্যাকানিজম, মানে এডাপ্টিভ ইম্যুউন সিস্টেম কাজ শুরু করে দেয়। এর আগে যে ইম্যুউন সিস্টেমের আলোচনা করেছিলাম, সেটি বস্তুত এই এডাপ্টিভ ইম্যুউন সিস্টেম। এই প্রসেসটা একটু জটিল, তাই খুব বেশি গভীরে যাবো না। প্রথমে জেনে রাখি, এই এডাপ্টিভ ইম্যুউন সিস্টেমের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব হচ্ছে আমাদের শ্বেত কণিকা বা লিউকোসাইট, আরো স্পেসিফিকালি বললে লিম্ফোসাইট নামের বিশেষ ধরণের শ্বেত কণিকা, যা আমাদের কশেরুকার (Bone marrow) স্টেম সেলে তৈরি হয় (আমরা সম্ভবত ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া রোগটার নাম শুনেছি, এর চিকিৎসায় বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টে অনেক টাকা লাগে, এরকম কথাও শুনেছি)। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমাদের শ্বেত কণিকা হচ্ছে আমাদের ডিফেন্স ম্যাকানিজমের মূল কাণ্ডারি; ন্যাচারাল কিলার সেল সহ বেশ কিছু শ্বেত কণিকা আছে, যা আমাদের ইনেট ইম্যুউন সিস্টেমের সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড হিসেবে কাজ করে আর লিম্ফোসাইট নামের শ্বেত কণিকা এডাপ্টিভ ইম্যুউন সিস্টেম এর হর্তাকর্তা। আর বেশি বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না; ভাইরাসকে আক্রমণ করা বা ঘিরে ফেলে ইনএক্টিভ করে দেয়া বা ভাইরাসে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত সেলকে মেরে ফেলার জন্যে এন্টিবডি তৈরি হয়। এই এন্টিবডির একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে এন্টিজেন, যা মেমোরি সেলের মত কাজ করে। অর্থাৎ, একবার কোন ভাইরাসের আক্রমণ মোকাবেলা করে ফেললে, সিগনেচার এন্টিজেন জমা হয়ে থাকে, পরবর্তীতে আবার সেই একই ভাইরাসের আক্রমণ হলে, শুরুতেই এক ধরণের লিম্ফোসাইট এন্টিজেনকে চিনে সেই ভাইরাসকে দ্রুত ধ্বংস করার কার্যক্রম শুরু করে দেয়। ফলে, সে ভাইরাস আর আমাদের শরীরকে আক্রান্ত করতে পারে না।

৯। ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষার উপায় কী?

মানবদেহের এই এডাপ্টিভ ইম্যুউন সিস্টেমকে কাজে লাগিয়েই আমরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচাইতে বড় সফলতা পেয়েছি। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ভাইরাস, মানে দুর্বল (attenuated) ভাইরাস যদি শরীরে প্রবেশ করানো যায়, তাহলে যে এন্টিবডি তৈরি হয়, সেটার ইম্যুউনোলজিকাল মেমোরির কল্যাণে ভবিষ্যতেও সেই ভাইরাসকে মোকাবেলা করে যাবে। এটাই হচ্ছে যাবতীয় ভ্যক্সিন বা প্রতিষেধক বা টীকার মূল কথা। অর্থাৎ আমাদের ছোটবেলায় যে টীকা দেয়া হয়, আসলে আমাদের শরীরে কোন এন্টি-ব্যাক্টেরিয়াল বা এন্টি-ভাইরাল কোন ‘মেডিসিন’ দেয়া হয় না, বরং আমাদের সুস্থ সবল শরীরে ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া প্রবেশ করানো হয়! সেই রোগ জীবাণুকে অবশ্যই আগে দুর্বল বানানো হয়, অনেক ক্ষেত্রে মৃত মাইক্রো অর্গানিজম প্রবেশ করানো হয়, অনেক সময়ে ভাইরাসের আরএনএ বের করে শুধু প্রোটিন প্রবেশ করানো হয়, এতে করেই সেই রোগটা আমাদের শরীরে দেখা দেয় না বা ব্যাপকভাবে দেখা দেওয়ার আগেই এডাপ্টিভ ইম্যুউন সিস্টেম স্টিমুলেটেড হয়ে যায়। আর, যে এন্টিবডি তৈরি হয়, সে এন্টিজেনের মাধ্যমে মেমোরিটা রেখে দেয়, যাতে ভবিষ্যতে একই রোগ-জীবাণুর আক্রমণে সাথে সাথেই সেই রোগ জীবাণুকে ধ্বংস করে ফেলা যায়। যখন কোন মরণঘাতী রোগের ভ্যাক্সিন দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষকে দেয়া হবে, তখন ভাইরাসটি আর কোন হোস্ট না পেয়ে দুনিয়া থেকেই নির্মূল হয়ে যাবে। এভাবেই ভাইরাস বাহিত গুটি বসন্তের (Small pox) ভ্যাক্সিন এর মাধ্যমেই দুনিয়া থেকে গুটি বসন্তের ভাইরাসকে ১৯৭৯ নাগাদ নির্মূল করা হয়েছে, যদিও তার আগেই বিশ শতাব্দীজুড়ে দুনিয়ার ৩০ থেকে ৫০ কোটি মানুষ এই এক গুটি বসন্তেই মারা গিয়েছে। একইভাবে ডিপথেরিয়া (ব্যাক্টেরিয়া), পোলিও (ভাইরাস), হেপাটাইটিস বি (ভাইরাস), হাম (ভাইরাস), ধনুষ্টংকার (ব্যাক্টেরিয়া) ইত্যাদির টীকার মাধ্যমে এককালের মরণঘাতক, এসব রোগেও আজ আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার একেবারে কম।
ব্যাক্টেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পরে শরীরের ব্যাক্টেরিয়াকে ধ্বংস করার জন্যে আছে এন্টিবায়োটিক (যদিও এন্টিবায়োটিক ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহারে নতুন মহাবিপদ আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে- এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স), কিন্তু ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে কার্যত, মানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন ট্রিটমেন্ট নেই! কেবল বিভিন্ন উপসর্গগুলো নিরাময়ের কিছু চিকিৎসা ছাড়া, শরীর থেকে ভাইরাসকে নির্মূল করার কোন উপায় নেই (কিছুক্ষেত্রে কিছু এন্টিভাইরাল মেডিসিন আছে, যেগুলো বিশেষ পদ্ধতিতে ভাইরাসকে ইনএক্টিভ করতে ভূমিকা রাখে, কিন্তু অধিকাংশ রোগের ক্ষেত্রেই এই এন্টি ভাইরাল মেডিসিন নেই), ফলে ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইম্যুউন সিস্টেমের উপর ভরসা করা। গুটি বসন্ত, পোলিও, হাম এর মত মরণঘাতী রোগের ক্ষেত্রে প্রতিষেধক বা টীকার ব্যবহারই হয়তো একমাত্র উপায়। কিন্তু, দুনিয়াতে অসংখ্য রকমের ভাইরাস আছে, অসংখ্য ভাইরাস আমাদের আক্রান্ত করতে পারে, কোনটির ক্ষেত্রে আমাদের ইম্যুউন সিস্টেম যথেষ্ট, কোনটায় সথেষ্ট না। কোনটা খুব বেশি সংক্রামক, কোনটি না। কিন্তু, চাইলেই আমাদের শরীরে একের পর এক, মানে শ’য়ে শ’য়ে টীকা নিতে পারি না। এছাড়াও, নভেল করোনাভাইরাসের মত নতুন নতুন ভাইরাসের আক্রমণও আসছে। সব ভাইরাসের টীকাও এভেইলেবল নয়। তাই, ভাইরাস, এবং যেকোন রোগ-জীবাণু থেকেই বাঁচার সেরা উপায় হচ্ছেঃ
(১) এসব রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ বন্ধ করায় উদ্যোগ নেয়া। রোগ-জীবাণুগুলো যে যে কারণে ও যে যেভাবে সংক্রমিত হয়, সেই পথগুলো বন্ধ করে দেয়া। সর্বস্তরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, দূষণ রোধ করা। পানির কন্টামিনেশন রোধ করা, পানি ফুটিয়ে পান করা, মাংস ভালোভাবে ফুটিয়ে খাওয়া, খাবার দাবার খোলা জায়গায় না রাখা, নিয়মিত হাত পরিস্কার রাখা, যেখানে সেখানে প্রস্রাব মল মূত্র ত্যাগ না করা, যেখানে সেখানে থুত- ক্বফ- সর্দি না ফেলা। অসুস্থ রোগীকে আইসোলেশনে রাখা, ইত্যাদি।
(২) শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, প্রচুর পরিমাণে পানি, শাক সবজি ও ফলমূল খাওয়া। হেলদি জীবন যাপন করা, পর্যাপ্ত ব্যায়াম/ খেলাধুলা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম- এসবই দরকার।
2 Shares