কাকন রেজা

মুশকিলটা হলো আমি ভালো আলোচনা করতে পারি না। আলোচনা না বলে তর্ক বলতে পারেন। আমি লিখি। তাও আবার গণমাধ্যমে প্রবন্ধ টাইপ জিনিস, যা কলাম নামে প্রকাশিত হয়। ছোটখাটো একটা পরিচিতি আছে। আর এ পরিচিতিই হয়েছে কাল। নতুন যাদের সাথে পরিচয় হয় বা পুরানো যাদের সাথে দেখা হয়, কথা হয়, তাদের অনেকেই কুশল বিনিময়ের পর দেশ-বিদেশের সমস্যা নিয়ে বসে যান। বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করেন তারা নেহাতই আমার চেয়ে কম বোঝেন না। বরং আমার বোঝা ও লেখাতেই ঘাটতি রয়েছে। বাধ্য হয়েই আমি চুপ হয়ে যাই, কুতর্কে অস্বস্তি হয় বলে। এই চুপ হয়ে যাওয়াটাকে তারা জয় হিসাবে ধরে নেন। সেলিব্রেট করেন। তাদের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

আমি তখন সবে কলাম লিখতে শুরু করেছি। এমনি এক ঈদে আমার কয়েকজন আত্মীয় এলেন বাসায়। সবাই মুরুব্বি মানুষ। একজন বললেন, কী করছো এখন? বললাম, তেমন কিছু না, লেখালিখি করছি। বাংলাদেশে মূলত লেখালেখিটা সত্যিকার অর্থেই কোনো কাজের মধ্যে ধর্তব্য নয়। তাই সংকোচে বলা। কলাম লিখছি জানতে পরে ভদ্রলোক আলাপ জুড়ে দিলেন। সারাদেশের সমস্যার সমাধান উনার কাছেই, আলাপের মূলধারাটা ছিলো এমনি। ভদ্রলোক নানা ভাবে নানা সমস্যার ব্যাখ্যা ও সমাধান দুই-ই দিতে লাগলেন। আমি যথারীতি চুপ। ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত আব্বু মানে আমার পিতাকে বললেন, ছেলেকে আরো পড়ালেখা করতে বলেন, কিছুই তো জানে না। না জেনেই লেখালিখি শুরু করছে। আব্বুকেও কিছুক্ষণ নছিহত করে গেলেন। বলা যায় যাওয়ার আগে বেচারা আব্বুর চল্লিশ বছরের বেশি সাংবাদিক জীবনকে রীতিমত নাড়িয়ে দিয়ে গেলেন।

এমন সব মানুষ আমাদের চারিপার্শ্বে। ব্রাত্য রাইসুর ‘কুতর্কের দোকান’ সবখানেই খোলা। বাঙাল আর কিছু না পারুক তর্কটা পারে। সেদিন ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক ও তার জটিলতা নিয়ে এক আলাপচারিতা দেখছিলাম ফেসবুকে। এখন তো ফেসবুকে এমন ‘তর্কের দোকান’ অহরহ। যদিও লাইভ নামের এসব জিনিস বেশিরভাগই গার্বেজ। তো সেই আলাপচারিতার আলাপের সাথে চায়ের দোকানের আড্ডার খুব একটা পার্থক্য আমার চোখে পড়লো না। পার্থক্য শুধু চায়ের দোকানের মুখগুলো অপরিচিত বিপরীতে লাইভের মুখগুলো সুপরিচিত। আমাদের দুর্ভাগ্যটা এখানেই, চায়ের দোকানের আলোচনা যে রাষ্ট্র পরিচালনের উপযুক্ত নয়, এটা অনেকেরই বোধে আসে না।

দুই

বর্তমান অবস্থায় বাঙাল মধ্যবিত্তদের অবস্থা হাফডান। না তারা নিম্মবিত্ত হতে পারছেন, না উচ্চবিত্ত। অবস্থানগত জায়গা তথা নিজের পরিচিতি সংকটে ভুগছেন তারা। আগেকার মতো বিন্দাস থাকার অবস্থা হারিয়েছেন হালের মধ্যবিত্তগণ অযথা উচ্চবিত্তদের সাথে দৌড়ে নেমে। সে সময়ের সমাজ পরিবর্তনের চিন্তাটা আসতো তাদের মধ্যে থেকেই। রাষ্ট্র এবং সমাজ নিয়ে ভাবতো মধ্যবিত্তরাই। নিম্নবিত্তরা থাকতো পেটের ধান্ধায় দিনমান। উচ্চবিত্তরা বিত্ত বাড়ানোর চিন্তায় ধাবমান। বিন্দাস মধ্যবিত্তদেরই সময় ছিলো রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা এবং প্রয়োগের। এখন মধ্যবিত্তরা হয়ে উঠছেন রেসের বেতো ঘোড়া। শারীরিক জোর নেই তবু দৌড়ানোর ইচ্ছেটা রয়েছে। সেই দৌড়টা অর্থ আর বিত্তের পেছনে। তারা চিন্তা করার সময় আর সামর্থ্য দুই-ই হারিয়েছেন। অথচ বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন মধ্যবিত্তদের জাগরণ।

আগের সময়ে মধ্যবিত্ত কোনো বাড়িতে গেলেই যা চোখে পড়তো তা হলো নিদেনপক্ষে একটা বইয়ের আলমিরা। যেখানে নজরুল-রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বিষাদসিন্ধু এমনকি কার্ল মার্ক্সকেও খুঁজে পাওয়া যেতো। মধ্যবিত্ত ঘরে একটা সন্তান জন্ম নিয়েই বইয়ের গন্ধ পেতো। এখন সেদিন আর নেই। এখন বইয়ের বদলে মধ্যবিত্তদের ঘরে জায়গা করে নিয়েছে কুতর্কের বাক্স টেলিভিশন। মধ্যবিত্তদের জ্ঞান এখন সেই বাক্সেই সীমাবদ্ধ। অসঙ্গত হলেও তারা বিদ্যার বদলে তর্কটাকেই বেছে নিয়েছেন। তবে মধ্যবিত্ত চরিত্রটাকে পুরোটা বদলে ফেলতে পারেননি। পরম্পরাগত জানার ইচ্ছেটা তাদের রয়ে গেছে। আর সেই ইচ্ছের জোগানদাতা হচ্ছে বইয়ের বিকল্পে টেলিভিশনের কুতর্ক। ফলাফল, মধ্যবিত্ত বাঙাল চরিত্র ক্রমে্ই বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। প্রত্যেকেই কুতর্কের দোকান হয়ে উঠছেন।

তিন

চাপ-তাপ আর দৌড়ে মধ্যবিত্তদের এখন হাসফাস অবস্থা। বিশ শতক পর্যন্ত মধ্যবিত্তরা মোটামুটি তাদের চরিত্রটা ধরে রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু একুশে সব চিৎপটাং। লোভে কুক্ষিগত হলো মধ্যবিত্তদের মনন। ফলে মেধা হলো বেপথু। নিম্নবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের মাঝখানে জিরো গ্রাভিটিতে পড়ে গেলেন বেচারাগণ। শূন্যে ঝুলায়মান। যাকে বলা যায় পরিচিতি সংকটের অবস্থা। যা তাদের কুতর্কের দোকান হয়ে উঠার জন্য দায়ী।

0 Shares
কাকন রেজা এর ব্লগ   ৩ বার পঠিত