অনুপম সৈকত শান্ত

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নতুন কিটে কিভাবে ১০০% সফলতা এচিভ করা সম্ভব হয়েছে?

এখানে দেয়া ১ম ছবিটা বায়োমেডোমিকসের যে RAPID টেস্টিং কিট তার ম্যানুয়াল থেকে নেয়া। তাদের এই কিটটা দুই রকম এন্টিবডিকে শনাক্ত করতে পারেঃ

IgM আর IgG। ওদের কিটের নির্দিষ্ট জায়গায় (২ নাম্বার ছবি) স্যাম্পল দিলে ১০ মিনিটের মধ্যেই তিনটি জায়গায় লাল লাইন ফুটে ওঠে বা ওঠে না। এই তিনটা পয়েন্ট হচ্ছে- কন্ট্রোল (C), IgG (G) এবং IgM (M)। এখন কন্ট্রোল (C) -তে লাইনটা যদি না আসে, তাহলে এই টেস্টটা ইনভ্যালিড টেস্ট (স্যাম্পলে সমস্যা বা অন্য কোন কারণে)। যদি C ও G লাইন ফুটে ওঠে তাহলে IgG এন্টিবডি পজিটিভ, যদি C ও M লাইন দুটা ফুটে ওঠে তাহলে IgM এন্টিবডি পজিটিভ, আর যদি C, G ও M- তিনটা লাইন ফুটে ওঠে তাহলে IgG ও IgM উভয় এন্টিবডিই পজিটিভ। আর, কেবল C লাইনটা যদি ফুটে ওঠে তাহলে এন্টিবডি টেস্ট নেগেটিভ। খুব সহজ পদ্ধতি।

বায়োমেডোমিক্সের এই কিট একদম শুরুর দিকে তৈরি হওয়া RAPID DIAGNOSTIC কিট, যেটা চীন, যুক্তরাষ্ট্র সহ গ্লোবালি ব্যবহৃত হচ্ছে। এদের একুরেসি কত? সেন্সিটিভিটি হচ্ছে ৮৯% আর স্পেসিভিটি হচ্ছে ৯১%। সেন্সিটিভিটি হচ্ছে ফলস নেগেটিভ না পাওয়ার হার, সূত্রঃ ট্রু পজিটিভ * ১০০/ ( ট্রু পজিটিভ + ফলস নেগেটিভ)। একই ভাবে স্পেসিফিসিটি হচ্ছে ফলস পজিটিভ না পাওয়ার হার, সূত্রঃ ট্রু নেগেটিভ * ১০০/ ( ট্রু নেগেটিভ + ফলস পজিটিভ)। মানে দাঁড়াচ্ছে, বায়োমেডোমিক্সের কিট দিয়ে ১০০ টা টেস্টেড কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর স্যাম্পল পরীক্ষা করলে তারা ৮৯ টাকে পজিটিভ বলবে আর ১১ টাকে নেগেটিভ বলবে। আর ১০০ টা নন-কোভিড-১৯ ব্যক্তির স্যাম্পল দিলে তারা ৯১ জনেরটা নেগেটিভ বলবে আর ৯ জনেরটা পজিটিভ বলবে।

এরপরে, আরেকটা কোম্পানি মাইক্রোটেক, তাদের একই রকম কিটের সেন্সিটিভিটি ও স্পেসিফিসিটি যথাক্রমে ৯৮.৫% আর ৮৮.২%। এরা এই দুই এন্টিবডি ডিটেক্ট করবে। কিন্তু তাদের সেন্সিটিভিটি ৯৮.৫%। সেলেক্স ইঙ্ক নামের কোম্পানির এন্টিবডি (IgG ও IgM) টেস্টিং এ সেন্সিটিভিটি ও স্পেসিফিসিটি এসেছে ৯৩.৮% ও ৯৫.৫%। এইসব কীট সবই অনুমোদন পাওয়া। চীনে অনুমোদন পাওয়া আরেকটা কিট বানিয়েছে ওরিয়েন্ট জিন বায়োটেক নামের কোম্পানি। তাদেরটাও দুই রকম এন্টিবডি (IgG ও IgM) শনাক্ত করতে পারে। তাদের স্পেসিফিসিটি ১০০%, মানে কোন ফলস পজিটিভ পায়নি। IgG এর জন্য সেন্সিটিভিটি পেয়েছে ৮৮% আর IgM এর জন্যে পেয়েছে ৯৭%।

অর্থাৎ, দুই রকম এন্টিবডি টেস্টিং এর ক্ষেত্রেই অলরেডি সেন্সিটিভিটি আর স্পেসিফিসিটি অনেক বেড়েছে! এবারে আসি, আমাদের বিজ্ঞানী ডঃ বিজন শীলের উদ্ভাবিত টেস্টিং কিটে। এখানে দুটি নয়, তিনটি এন্টিবডি শনাক্ত করা যাবে। তার মানে, প্রথম ছবিতে যে তিনটি লাইন, সেখানে আসলে চার নাম্বার লাইন যুক্ত হবে। এতে কি হবে? কিছু স্যাম্পল পাওয়া যাবে, যেখানে IgG ও IgM এন্টিবডি দুটো নেগেটিভ হলেও তৃতীয় ঐ এন্টিবডি পজিটিভ আসতে পারে। ফলে, একজন আক্রান্তের পজিটিভ পাওয়ার সম্ভাবনা আরেকটু বাড়লো।

এই কিটটিতে আরেকটা দারুণ ব্যাপার ওনারা করেছেন। বিশ্বজুড়ে দুইরকম RAPID DIAGNOSTIC TEST কিট পাওয়া যায়ঃ একটা এন্টিবডি ভিত্তিক আরেকটা হচ্ছে এন্টিজেন ভিত্তিক (এন্টিজেন হচ্ছে ভাইরাসের পর্দায় থাকা একরকম অণু আর এন্টিবডি হচ্ছে আমাদের রক্তে তৈরি হওয়া রোধ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একরম প্রোটিন যা প্যাথোজেনের এন্টিজেনকে আটকে ধরে)। এন্টিবডি ভিত্তিক টেস্টের বড় সমস্যা হচ্ছে- এটা আক্রান্তের শরীরের শুরুতেই তৈরি হয় না, ফলে ৩-৭ দিন অপেক্ষা করতে হয়। তার আগে টেস্ট করলে টেস্ট নেগেটিভ আসবে, অর্থাৎ ফলস নেগেটিভের সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে এন্টিজেন ভিত্তিক টেস্টে আক্রান্তের শুরুতেও শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এখন, গণস্বাস্থ্যের এই কিটে তারা দারুণ স্মার্ট একটা কাজ করেছেন। তারা এন্টিজেন ও এন্টিবডি দুটাই শনাক্ত করবেন। আমি ঠিক জানি না, সেটি কিভাবে তারা করবেন- দুটো আলাদা কিট একইসাথে স্যাম্পল পরীক্ষা করবে, নাকি এরকম একটা কিটেই এন্টিজেনের জন্যে আরেকটা লাইন যুক্ত হবে, জানি না। কিন্তু, যেভাবেই করা হোক, এতে তিনটা এন্টিবডি নেগেটিভ আসার পরেও এন্টিজেন এ পজিটিভ আসতে পারে। ফলে ফলস নেগেটিভ পাওয়ার হার আরো কমে যাচ্ছে। মানে, সেন্সিটিভিটি এভাবেই বেড়ে যাচ্ছে। আর, সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- একটা (দুটা) কিটের মাধ্যমে এন্টিবডি আর এন্টিজেন টেস্ট করতে খরচ লাগবে মাত্র ৩ ডলার, গতকাল ডঃ জাফরুল্লাহ জানিয়েছে ওনারা এর দাম আড়াইশ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা করার চেস্টা করছেন!

তাদের ট্রায়ালের ব্যাপারে বলেছেন- দুটো স্যাম্পলে তারা এন্টিবডি টেস্ট নেগেটিভ পেয়েছেন, কিন্তু এন্টিজেন টেস্ট পজিটিভ পেয়েছেন। এভাবেই ওনারা ১০০% সেন্সিটিভিটি পেয়েছেন। তবে, তাদের এই ট্রায়ালটা ছোট পরিসরে করা হয়েছে। কুর্মিটোলা আর IEDCR থেকে অল্প কিছুই নমুনা পেয়েছেন, ট্রায়ালটা আরো বড় পরিসরে (কমপক্ষে ৫০০+ কনফার্মড পজিটিভ ব্যক্তির স্যাম্পল নিয়ে) করা দরকার। তাহলে, আরো ভালোভাবে এই কিটের সেন্সিটিভিটি বুঝা যাবে। স্পেসিফিসিটি নিয়ে অবশ্য আমি কিছুটা সন্দিহান, কেননা আমার মতে- এন্টিজেন ভিত্তিক টেস্ট আর এন্টিবডি ভিত্তিক টেস্ট- উভয়টার ফলস পজিটিভ এখানে এড হতে পারে- সে জায়গা থেকে স্পেসিফিসিটি কিছু বাড়ার কথা (আমি ডিটেইলসে কিছু জানি না, কেবল ম্যাথমেটিকাল প্রজেকশন থেকে ধারণা করছি, আমার ধারণা ভুল হতে পারে)! ফলে, কনফার্মড নেগেটিভেরও স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করে ট্রায়ালটা‍ চালানো দরকার।

আজকে, যারা ঢালাও ভাবে বলে দিচ্ছেন- এইরকম RAPID টেস্ট তো অন্য দেশগুলোর মতই, ফলে চীনের মত এখানেও একুরেসি বেশি হবে না, তারা কি জানেন- বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কোম্পানির একদম একই রকম টেস্টের ক্ষেত্রেও একুরেসির পার্থক্য দেখা যাচ্ছে? তারা কি জানেন, অন্যদের RAPID টেস্টের সাথে ডঃ বিজন শীলের RAPID টেস্ট কিটে কিছু বেসিক পার্থক্য আছে? যারা বলছেন, বিভিন্ন দেশে এই টেস্টিং অকার্যকর হিসেবে ফেলে দেয়া হয়েছে, তারা কি জানেন- দেশে দেশে ইম্যুনিটি ডাটা বেইজ করা জন্যে এখন এই কিটের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে? খোদ যুক্তরাষ্ট্রে সিডিসি ৪ এপ্রিল থেকে RAPID এন্টিবডি টেস্ট দিয়ে তিনটা কার্যক্রম শুরু করেছেঃ

১) যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন হটস্পটগুলোতে যাদেরকে এখনো কোনরকম টেস্ট করা হয়নি- একদম ঢালাওভাবে সবাইকে RAPID টেস্ট করা হবে,

২) পুরা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে একটা সার্ভে করা হবে, সেটায় কম উপদ্রুত স্টেট- সিটিগুলোতেও প্রতিনিধিত্বমূলক জনগণের RAPID টেস্ট করা হবে,

৩) পাবলিক ইন্টারেকশন প্রচুর এইরকম বিশেষ দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন যারা, যেমন সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের- তাদেরকেও লক্ষণ থাকুক বা না থাকুক RAPID টেস্ট করা হবে!

নিশ্চিত থাকুন, বাংলাদেশ সরকার যদি এই কিট নিতে না চায়- সিডিসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ট্রায়ালে সেন্সিটিভিটি- স্পেসিফিসিটি যদি ৯০% এরও বেশি পাওয়া যায়, বিদেশে রপ্তানি করেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বিশাল অর্থ উপার্জন করতে পারবে, এত সস্তায় এরকম ইফেক্টিভ কিট দুনিয়ার কোথাও আর কেউ পাবে না!

176 Shares