আশরাফুল আলম সম্রাট

বিশ্বরাজনীতিতে কাশ্মীর অপ্রাসঙ্গিক নয়, সকলে সমুহ বিপদের দিকে ধাবিত হচ্ছি। বহিঃর্বিশ্ব থেকে যদি কাশ্মীরীদের ওপর নির্যাতন বন্ধ না করে, তবে দুই পরমাণু শক্তিধর দেশ মুখোমুখি সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যাবে।

– ইমরান খান, পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী।

(নিউইয়র্ক টাইমস-এ আগস্ট ৩০, ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত)

পুলিশের হাতে গ্রেফতার ট্রাক্টর চালক ফায়াজ মীর তার পরিবারের সাথে, তার বোন জায়দার সাথে কথা বলছে। ভারত জোর করে কাশ্মীরের দখল নেওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার ও নির্যাতনের স্বীকার। (ছবি)

গত আগস্টে আমি যখন প্রথমবার পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হই, আমার প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরূপ সম্পর্ক থাকা সত্বেও আমাদের উভয় দেশের নাগরিকদের দারিদ্রতা, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, এবং ব্যাপক পানিসংকট সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

আমি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কাশ্মীর ইস্যুতে আমাদের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ করতে চেয়েছিলাম।

২০১৮ সালের ২৬ জুলাই জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে আমি বলেছিলাম ভারতের সাথে আমি স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই। আর সম্পর্ক উন্নয়নের খাতিরে ভারত একধাপ এগিয়ে আসলে পাকিস্তান দুই ধাপ এগিয়ে যাবে।

এরই ধারাবাহিকতায়, জাতিসংঘ সম্মেলনের পর আমার দু’জন পররাষ্ট্র মন্ত্রী তাঁদের সাথে আলোচনার টেবিলে আসার আমন্ত্রণ জানালে তারা তা প্রত্যাখান করে এবং এই মাসেই (জুলাই ২০১৮) আমি মোদীকে পাঠানো আমার তিনটি চিঠির প্রথমটা পাঠানোর মাধ্যমে তাঁকে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের খাতিরে সংলাপে বসার জন্য আহ্বান জানাই।

দূভার্গ্যবশত শান্তি সংলাপে বসার সমস্ত প্রক্রিয়া জলাঞ্জলি দিয়ে মোদী আমার প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন।

প্রথমদিকে আমি মনে করেছিলাম নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে মোদী বার বার পাকিস্তানের বিরুদ্ধাচরণ করছেন এবং এটা তাঁর জনতুষ্টিরই একটা অংশ।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখে এক কাশ্মীরী তরুণ ভারতশাসিত কাশ্মীরে আত্মঘাতী হামলা চালালে ভারত সে দোষ পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়। ইসলামাবাদ প্রমাণ চাইলে মোদী আমাদের সীমান্তে বিমান বাহিনী পাঠিয়ে দেন আমাদের সেনারা সেটিকে পর্যুদস্ত করে এবং পাইলটকে আটকও করে। এর মাধ্যমে আমরা এটা বুঝিয়ে দিই যে, আমরা আমাদের ওপর করা যেকোন ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখি এবং এটাও বলি যেকোন ধরনের হিংস্রতা শুধু প্রাণহানিই ঘটাতে পারে, অন্য কিছু না।

এরপর আমি ভারত পাকিস্তানের মধ্যে বিরূপ সম্পর্কের আর অবনতি যেন না হয় তাই কোন ধরনের শর্ত ছাড়াই গ্রেফতারকৃত পাইলটকে ভারতের হাতে হস্তান্তর করি।

মে মাসের ২৩ তারিখে মোদী পুনঃনির্বাচিত হলে আমি তাঁকে অভিনন্দন জানাই এবং প্রত্যাশা করেছিলাম ভারত পাকিস্তান তথা এশিয়ার শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা, অর্থনৈতিক সমৃ্দ্ধিসহ যাবতীয় উন্নয়নে ভুমিকা রাখতে একসাথে কাজ করে যাবো। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমি মোদীকে আমার দ্বিতীয় চিঠি প্রেরণ করি। কিন্তু তিনি সেটিরও উত্তর দেন নি।

আমি যখন মোদী ও ভারতের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য চেষ্টায় বিভোর, তখন মোদী সরকার অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন দেশের চোখে আমাদের অর্থনৈতিক ইস্যুকে বিকল করে দেওয়ার জন্য ব্লকলিষ্টের আওতাভুক্ত করতে চাইছেন। সত্যিকার অর্থে যা আমাদের দেউলিয়ার দিকে নিয়ে যাবে।

মোদী দুইদেশের মধ্যে আমার করা শান্তি আলোচনাকে ভুলভাবে নিয়েছে। আমরা কোন আগ্রাসী সরকারের বিপক্ষে নই। আমরা যুদ্ধ চাই না।

বর্তমান সময়ে আমরা এক আগ্রাসী আর হিন্দুপ্রধান রষ্ট্রের মুখোমুখি। যেটি মূলত নতুন ভারত যার অপর নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) আর যারা গোঁড়া সমর্থক মোদীসহ তাঁর অনেক মন্ত্রী ও আমলাগণ। বলাবাহুল্য RSS এর প্রতিষ্ঠাতা স্বৈরশাসক মুসোলিনী ও হিটলারের সমার্থক এবং মোদী এই সংগঠনের দ্বিতীয় প্রধান নেতা এম,এস গোয়ালকারকে অতিভক্তি শ্রদ্ধার সাথে পুজনীয় বলে সম্বোধন করেন।

মোদীর গুরু আমাদের জাতিসত্তা (১৯৩৯) নামক বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন, জাতিসত্তা ও জাতি পরিচয় রক্ষা করতে জার্মানি ও হিটলার ইহুদি নিধনের মাধ্যমে নিজ জাতির সমৃদ্ধি ও মান অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ভারতেও যদি এক জাতি এক ধর্মের মানুষ থাকে তাহলে চুড়ান্তভাবে ভারতেরই লাভ।

আমি ভেবেছিলাম মোদী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ২০০২ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার মাধ্যমে যা করেছিলেন তা করবেন না, অন্তত হিন্দু মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াবেন না। জেনে রাখা উচিত মোদী তার কাণ্ডের জন্য কুখ্যাত হয়ে আছেন এবং আমেরিকান ভিসা বঞ্চিত হয়েছিল। যা মিলশোভিক এর অনুসারীদের জন্যও প্রযোজ্য ছিল। আর এই নিষেধাজ্ঞা ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগে তার ওপর আরোপ করা হয়েছিল।

মোদী প্রথমদফায় প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলে ভারতে মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিতদের প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগণের মাঝে ব্যাপক বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেন। আমরা এবার দেখছি কীভাবে ভারত অধ্যুষিত কাশ্মীরে সেনাবাহিনী কাশ্মীরীদের সাথে নির্মম অত্যাচার করছে, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে এবং গুলিতে হাজার হাজার তরুণ নিহত, আহত ও দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে।

গত ৫ আগস্ট ভারত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং ৩৫(A) অনুচ্ছেদের বিলোপ ঘটিয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে নেয়, যা শুধু ভারতের সংবিধানের পরিপন্থীই নয়, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংগঠিত সিমলা চুক্তিরও পরিপন্থী।

এরপর মোদী সরকার কাশ্মীরিদের ওপর সান্ধ্যআইন (কারফিউ) জারি করলো, এরপর তাদেরকে সবধরনের যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলো (ফোন, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ) তাদের পরিবার-পরিজন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলো এবং গণগ্রেফতার শুরু করে হাজার-হাজার কাশ্মীরী যুবক বয়োবৃদ্ধকে কারাগারে প্রেরণ করা হলো। কাশ্মীরিরা কারফিউ ভেঙে বের হলে তাদেরকে গুলি করে রক্তবন্যা বইয়ে দেওয়া হলো। এযাবতকালের মধ্যে দুই প্রতিবেশী পারমাণবিক শক্তিধর দেশ (ভারত ও পাকিস্তান) যুদ্ধের সবথেকে কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থান করছে। আর এমন অবস্থায় যদি বহিঃর্বিশ্ব থেকে কোনরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে ভয়াবহ পরিবেশের সৃষ্টি হবে তা বলাই যায়।

তারা (ভারত) বলছে আগে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না, আবার এরইমধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দুইদেশের মধ্যে পারমাণবিক বিষয়টি প্রায় অগ্রাহ্য করছে। এরসাথে তারা এটাও বলছে যে, ভারত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যাবহার করবে কীনা তা আসন্ন অবস্থার ওপর নির্ভর করছে।

অবস্থা এমন যে, পাকিস্তান পরিষ্কারভাবে তাদের এই বক্তব্যকে ধৃষ্টতা হিসাবে দেখছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাতাসে পারমানবিক যুদ্ধের আবহ এই অবস্থা এঁড়াতে এখন আমাদের উচিত দ্বিপাক্ষিক স্বার্থকে ত্যাগ করে আলোচনার টেবিলে বসা এবং কাশ্মীরসহ সকল স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনা করা এবং কাশ্মীর ইস্যুতে অবশ্যই কাশ্মীরীদেরকে আলোচনার টেবিলে বসতে দেওয়া এবং তাঁদের ত্যাগ ও দৃঢ়তাকে শ্রদ্ধা করে জওহরলাল নেহেরুর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।

একমাত্র আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই যুগ যুগ ধরে চলে আসা কাশ্মীরীদের এই ভোগান্তির শেষ হতে পারে এবং এই অঞ্চলে আবারো শান্তি ফিরে আসতে পারে। আর আলোচনা তখনই সম্ভব হবে, যখন ভারত তাদের আগ্রাসী মনোভাব থেকে সরে আসবে, কাশ্মীর থেকে কারফিউ তুলে নেবে, সেনা প্রত্যাহার করে নিবে এবং গৃহবন্দী অবস্থার অবসান ঘটাবে।

এটা বেশ ভালো যে বহিঃর্বিশ্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ ও অন্যান্য সুবিধা ছাড়াও এখন কাশ্মীর ইস্যুতে মাথা নাড়াচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল কারণ মিউনিখ তার নিজের স্বার্থ দেখেছিল এবং সেটা নিয়েই পড়ে ছিল।

এবারও একই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে এবং সেটা পারমাণবিক অস্ত্রসহ। এটা ভয়ংকর।

0 Shares