মাসকাওয়াথ আহসান

      প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশ্ন করেছেন,করোনাভাইরাস মহামারীর সময়ে অনেকে সরকারের সমালোচনা আর খুঁত ধরায় ব্যস্ত থাকলেও তাদের কতজন সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ, যারা সৎ উপার্জনের অন্নগ্রহণের মানুষ; তারা বাংলাদেশে আবহমান কাল ধরে; একা না বেঁচে; সবাইকে নিয়ে বাঁচে। এই করোনাকালে বেশিরভাগ মানুষই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এটাই নিয়ম; যারা গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকেন; তাদের দায়িত্ব গৃহের অভিভাবকেরা নেন। শুধু কর্মকালেই নয়; পরেও আত্মীয়ের মতো একটা সম্পর্ক রয়ে যায়; বিয়ে-শাদী, অসুখ-বিসুখে তাদের পাশে দাঁড়ান সৎ উপার্জনের মানুষেরাই।

এই সৎ উপার্জনের মানুষ যখন দেখে; প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ পাওয়া গার্মেন্টস মালিকেরা; যারা দেশের মন্ত্রী-এমপিও; তারা গরীব শ্রমিকগুলো নিয়ে রাজপথে ফুটবল খেলছে; দর্জি সংঘ শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বলছে; করোনার ভয়ে গ্রামে চলে যাওয়া শ্রমিকরা শহরে ফেরার পথে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ করছে; এইভাবে অব্যবস্থাপনা আর সিদ্ধান্তহীনতার ঝালমুড়ি মাখানোর মাধ্যমে পুরো দেশ করোনাভাইরাসের বোমায় পরিণত হলে; সাধারণ মানুষ কেন তার সমালোচনা করতে পারবে না।

আর খুঁত ধরা মানে! পুরো করোনা-ব্যবস্থাপনাটাই তো খুঁতের শতছিদ্র চাদরের মতো। হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে সাধারণ নাগরিক যখন খোলামাঠে-ভ্যানগাড়িতে-রাস্তায় ঢলে পড়ে মরে থাকছে; তখন সরকারের ভি আই পিদের জন্য মেডিকেল বোর্ড বসানো; সিএমএইচ সুবিধা দেয়া, প্রয়োজনে এয়ার এম্বুলেন্সে বিদেশে পাঠানো; এসব খুঁত তো সমালোচনার অযোগ্য। এরকম সামন্ত মানসিকতার ভি আই পি রুলিং এলিট বিশ্বের কোন দেশে দেখা যায়নি।

করোনাকালে শুধু করোনা-ব্যবস্থাপনা ছাড়া অন্য কোন নতুন/রুটিন নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অবাস্তব একটা সিদ্ধান্ত। করোনাকালে সরকারি পাটকল বন্ধ করে দেয়া কোন ধরণের মানবদরদী সিদ্ধান্ত; জনগণ তা জানতে চায়।

সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী গোটা দেশের নেতা; সেইখানে সমালোচকেরা মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি; আর আওয়ামী লীগ জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে; এটা অত্যন্ত বিভাজনমূলক বক্তব্য। একজন এতো অভিজ্ঞ নেতা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে; তার ডিটেইল বর্ণনা; আর কেবল অনুমানের ভিত্তিতে; যারা সমালোচনা করে তারা মানুষের পাশে দাঁড়ায় না; এমন সংশয় ও কটাক্ষঘন বিবৃতি; গণতন্ত্রের ইনক্লুসিভ স্পিরিটকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখানে “সহমত হলে তুমি আমার সঙ্গে; সমালোচনা করলে তুমি আমার সঙ্গে নও”-এরকম বিভাজনমূলক বক্তব্য প্রদানের মধ্যে অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নৈর্ব্যক্তিকতা ও নিরপেক্ষতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগের নেতার হাসপাতালের ভুয়া করোনা টেস্ট সার্টিফিকেট বিক্রির ঘটনায়; সমাজ যখন আহত; বিদেশে যখন দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ; ইউরোপের দরোজা বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়; ক্ষমতাসীন দলের ওপর নির্ভর করার সামান্য পাটাতনটুকু যখন; সরে সরে যায়; তখন প্রধানমন্ত্রীকে সেসব অভিভাবকের মতো মনে হয়; যিনি নিজের দলীয় সন্তানের কোন অপরাধ দেখতে পাননা; আর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অনাথ নাগরিকের উপায়হীন সমালোচনাতেই সব দোষ খুঁজে পান।

চোখের সামনে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি চার্টার্ড প্লেনে করে সেকেন্ড হোমে গেলে-চক্ষু চিকিতসায় গেলে; আওয়ামী লীগের রুলিং এলিটের গত দশবছরে তৈরি হওয়া ধন-সম্পদ, বড় লোক হয়ে যাবার কালটিতে; ক্ষমতার বাইরের মানুষদের প্রান্তিকতর হয়ে ওঠা; এইভাবে সৃষ্ট বিকট শ্রেণী বৈষম্য করোনা-বাস্তবতায় স্পষ্টভাবে ধরা দেয়।

প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার সমুদয় ব্যর্থ হবার জাস্টিফিকেশান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ট্র্যাজেডিকে বার বার সামনে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু যে “চোরের খনি’-তে ঐসময়ের ক্ষমতাসীন দলের “চাটার দল” সব সম্পদ চেটেপুটে খেয়ে নেবার কষ্টে আকাশ বিদীর্ণ করেছেন আক্ষেপে; সেখানে কোন রূপকথার গল্প শুনে আমরা ধরে নেবো; আমরা জামবাটিতে ধোয়া ওঠা দুধ খেতাম পচাত্তরের আগে!

বঙ্গবন্ধু জাতির জনক; তিনি আমাদের সবার; তাকে আওয়ামী লীগের বর্তমান বিশৃংখল-ব্যবস্থাপনা ঢাকতে জাস্টিফিকেশানের পবিত্র চাদর হিসেবে ব্যবহার অপ্রয়োজনীয়। অন্তত জাতির জনক, মানচিত্র, পতাকা গৌরবটুকু; যেটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের অনন্য উপহার; সম্ভবত এই জাতির জীবনের একমাত্র জয়চিহ্ন; সেটাকে দলের সীমাবদ্ধ স্বার্থের সীমিত জলের ক্ষমতার সোনার হাঁস হিসেবে ছিনিয়ে নেয়া ৩০ লক্ষ শহীদ আর ২ লাখের অধিক নির্যাতিত মা বোন, কোটি শরণার্থী; দেশের অভ্যন্তরে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে জীবন-মৃত্যুর ভয়ালকালে বেঁচে থাকা মানুষ; আর জাতির বীর সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের গভীর ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রতি হৃদয়হীনতা আর অবিচার।

আমাদের সবই তো লুট হয়ে গেছে; শিক্ষা-সংস্কৃতি-স্বাস্থ্য-কথা বলার অধিকার; প্রবাসী শ্রমিক আর গার্মেন্টস শ্রমিকের রক্ত পানি করা জিডিপির সোনার হাঁসটিকে জবাই করে লোভের পাপ-পাপলু-পাপিয়ারা সেকেন্ড হোম আর সুইস ব্যাংকে জড়ো করেছে। গত দশ বছরে দেশের যে সম্পদ লুন্ঠিত হয়েছে; তা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়া যেতো।

অপরাধীদের বিমানে করে উড়ে যেতে দিয়ে তার বিলাসী গাড়ি জব্দ করা; গরু ছেড়ে দিয়ে দড়ি জব্দের ন্যায়বিচারের মাঝে গ্লানি আছে; গর্ব নেই। “আমরা তো তবু অপরাধীকে ধরি”; এই যে গর্বের শেষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে ব্যবস্থাপনা-অক্ষমতার অস্বীকার; উলটো শুধু সাধারণ মানুষ আর সমালোচকের দিকে রাগের চোখে তাকানো; এই রুলিং এলিট মনোজগত তো পাকিস্তানি আর ব্রিটিশ রুলিং এলিটের মতোই উপনিবেশের দাস-প্রজার দিকে করুণার চোখে তাকানোর নির্মমতা।

স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঝাঁঝরা করে দেয়া রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করে; যারা কারাগারে; তাদের করোনাকালে মারা যেতে যেতে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী খলনায়কের সমালোচনা করার শেষ মানবাধিকারটুকু কেড়ে নেয়া হয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এরকম ঘটনা নজিরবিহীন।

করোনাকাল কোন জেদাজেদির সময় নয়; মানুষ বাঁচাতে আর দেশ বাঁচাতে ১৬ কোটি মানুষের ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। যে অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে; সে ব্যবস্থাপনায় উন্নতির পথে সহযোগিতা করছে। আর যে সারাক্ষণ সহমত ভাই; সে “চোরের খনি” আর “চাটার দল”; বঙ্গবন্ধুর খুনীদের প্রেতায়িত আত্মা; দেশের জনককে খুন করে তাদের রক্তপিপাসা মেটেনি; তারা এবার দেশটাকে খুন করতে চায়।

আশা করি সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী; “আমরা বনাম ওরা”; “সহমত বনাম সমালোচক” এসব বিভাজন রেখা টেনে; এই মৃত্যু উপত্যকায় বেঁচে থাকার শেষ স্বপ্নটুকুকে এতোটা বেদনাহত করবেন না। সুখে আছে যারা সুখে থাকুক; আমরা কেবল প্রাণটুকু নিয়ে বেঁচে থাকলেই কৃতার্থ হবো। প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক মঙ্গল প্রার্থনা করি।

0 Shares