মাসকাওয়াথ আহসান

অন্যের অপমান দেখার নেশা মানুষের বড় নেশা। গত একটি দশকে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আয়নায়; অন্যের অপমান দেখার নেশায় বুঁদ একটি জনগোষ্ঠী চোখে পড়ে। বিস্ময়কর হলেও সত্য; পাশের মায়ানমারে, নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নেশা খুঁজে পাওয়া যায় না।

কেন বাংলাদেশের মানুষ ‘অন্যের অপমান দেখার নেশায় আসক্ত’; এর পেছনে মনের ভূগোলটি কী তা খুঁজে বের করা দরকার; এই মারণ নেশা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য।

অন্যের অপমান দেখার নেশার প্রথম কারণ ভুল সেন্স অফ সুপিরিওরিটি; বা শ্রেষ্ঠত্বের বোধ। আমাদের নানী-দাদীর রূপকথার মধ্যে প্রচুর ছেলে ভোলানো মিথ্যা কথা থাকে। এরা হচ্ছেন আমাদের জীবনে প্রথম মোটিভেশনাল স্পিকার সুখনের মতো; সাফল্যের ছদ্ম সুখ দিতে যারা; এই জনপদ একসময় সেরা ছিলো; স্বর্গ ছিলো; এরকম বোগাস ন্যারেটিভ শুনে বড় হয় আমাদের শিশুরা। ঐ শ্রেষ্ঠত্বের বোধটাই পরে “বাঁশের কেল্লা” কিংবা “সিপি গ্যাং” হয়ে ফেসবুকে হুটোপুটি খায়; অন্যকে অপমান করতে গালির নহর বইয়ে দেয়।

অন্যের অপমান দেখার নেশার দ্বিতীয় কারণ ভুল সেন্স অফ ইনফেরিওরিটি বা হীনমন্যতার বোধ। আমাদের নানী-দাদীদের গল্পের রাজপুত্র সব সময় তেপান্তর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে আসে; তার চেহারার বর্ণনা শুনলে মনে হয় সে মেট্রোসেক্সুয়াল; পার্লার থেকে বেরিয়ে এসে ঘোড়ায় চড়েছে। তার চেহারা ‘গ্লেজ’ দিতেছে। আর রূপকথার গল্পের রাজকন্যা তো রূপবতী কইন্যা; দুধে-আলতায় গায়ের রঙ তার। এরকম বর্ণবাদি গল্প শুনে বড় হওয়ায়; বাংলাদেশের শিশুরা ছোট বেলাতেই রেসিস্ট হয়ে ওঠে। ফেয়ার এন্ড লাভলি ক্রিমের প্রথম বিজ্ঞাপন হচ্ছে নানী-দাদির রূপকথার গল্প। গাত্রবর্ণের ইনফেরিওরিটির কারণে ফেসবুকে ‘গালাগাল’ ক্রিম মেখে অনেকে হীনমন্যতাজনিত শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে বসে।

অন্যের অপমান দেখার নেশার তৃতীয় কারণ; অপমানিত শৈশব; নিজের বাবা-মাকে দারিদ্র্যের কারণে পদে পদে অপমানিত হতে দেখা ছেলেমেয়েরা ফেসবুকে এসে অন্যকে অপমান করে; বা অন্যের অপমান দেখে আনন্দ পায়। এই ব্যাপারটা ভ্যাম্পায়ার স্টোরির মতো; ক্ষমতা শেয়ালের কামড় খাওয়া মানুষ; ফেসবুকে ক্ষমতা শেয়ালকে লাইক দেয়ার লাইক্যানথ্রপিক রোগে ভুগে নেকড়ে হয়ে ওঠে। নির্যাতনের স্বীকার মানুষ; নির্যাতক হয়ে ওঠার পুনরাবৃত্তিক সমাজ আজকের বাংলাদেশ সমাজ।

একটি সুষম শিক্ষা-ব্যবস্থা না থাকায়; শিক্ষকের অনাদরে ড্রপ আউট হয়ে যাওয়ায় সামাজিক শেয়ালের সংখ্যা চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ে। আর আমাদের দেশের বনেদি পরিবারগুলো; যাদের অবিচুয়ারিতে ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মেছিলেন’ লেখা হয়; এরা মানুষকে মানুষ মনে করতো না। সনাতন ধর্মের আদিম শ্রেণী বিভাগ প্রথা কিংবা ইসলাম ধর্মের অলিখিত ‘আশরাফ ও আতরাফ’ বিভাজন; ‘জাতে ওঠার রোগটি’ প্রবিষ্ট করেছে সমাজ মনোজগতে।

পার্টির ফুট সোলজার ক্যাডার কিংবা বিসিএস শো বিজ ক্যাডারদের গত দশবছরে ফেসবুকে সুইমিংপুলে কাইত হয়ে কাতলা মাছের মতো খোকন সোনা সেজে ছবি দেয়া; বড় গাড়ির স্টিয়ারিং আঁকড়ে মুক ব্যাঁকায়ে ছবি দেয়া; মান্যবর ডিসি মহোদয় লিখে মাজিস্ট্রেট সাহেব প্রজাদের ধারণা দিতে চেষ্টা করে, আমাকে স্যার বলুন। এসবই সমাজে আদিম কাস্ট সিস্টেম থাকায়, জাতে ওঠার ভুল ও প্রাণান্তকর চেষ্টা।

শিক্ষা-ব্যবস্থার তথৈবচ অবস্থার কারণে যুক্তি ব্যাপারটা একেবারেই শেখা হয়না ছেলে-মেয়েদের। ফেসবুকে যে কোন আলোচনা মানেই প্রথম লাইনে যুক্তি ফুরিয়ে দ্বিতীয় লাইনে গালিতে চলে যাওয়া। যুক্তিতে না পেরে দ্রুত বেড রুমের আলাপে চলে গিয়ে গান্ধা কইরা দেয়ার ফর্মুলার চর্চা রঙ্গভবন থেকে জঙ্গভবন সব জায়গায় সমানভাবে আদৃত।

রঙ্গভবন ও জঙ্গভবনের লোকেদের স্বাস্থ্যকর যৌনজীবন নেই। ভারত-বর্ষই একমাত্র অঞ্চল; যেখানে অনেক গবেষণা করে, ‘কামসূত্র’ ও ‘বাৎসায়ন ‘ ইত্যাদি লেখা হয়েছে; কিন্তু থিওরিতে কাঁপিয়ে দিয়ে প্র্যাক্টিক্যাল ফিল্ডে গিয়ে মিইয়ে গিয়েছে দক্ষিণ এশীয় সমাজের যৌনতা বিষয়টি। এ কারণে খুব অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করে এ অঞ্চলের মানুষ। অগ্রসর জনপদে যৌনতার চিন্তা মাথায় থাকেনা; মাথায় থাকে গবেষণা ও প্রগতির চিন্তা। আর দক্ষিণ এশিয়ার জীবন মানে ঘুরে ফিরে যৌনতার চিন্তা। যেটা ফলিত বিষয়; তা কেবল কামসূত্র ধরে চিন্তাজগত আচ্ছন্ন করে ফেলায়; অধিকাংশের যৌনতা চলে আসে ‘জিভে’। এ কারণে রঙ্গভবন তার প্রতিপক্ষের জঙ্গভবনের প্রতি অশ্লীল ইঙ্গিত দেয় রাজনীতি-যৌন-আবেদনময় জিভে। আরিচাঘাটের মলম বিক্রেতা শেয়ালের তেল বিক্রির সময় যেসব কথা বলে; পলিটিক্যাল স্টেটমেন্টে ওসব আবর্জনা এসে হাজির হয়।

ব্যাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইক্যানথ্রপিক শেয়ালেরা তখন যৌন-পুলকে হুটোপুটি খেয়ে ফেসবুকময় গালাগাল করে বেড়ায়। কেউ একজন মারা গেলে তার শব ব্যবচ্ছেদ হয় শেয়ালের যৌবন জ্বালাময় ভাষায়। এরকম নরভোজি সমাজ বিপজ্জনক।

ফেসবুকের গালাগাল শেয়ালেরা আবার দলান্ধ। এক চোখ কানা হয়ে গেছে দলীয় ওরস বা শোকরানা মেহেফিলের বিরিয়ানি খেয়ে খেয়ে। লোমওঠা অন্ধ অক্ষম নেকড়ের জীবনের সবচেয়ে সাহসী গালাগালবিদদের ফেসবুকে ভাড়া করে নিয়ে আসে রাজনৈতিক নেতারা। তাদের নিয়ে বাঁশের কেল্লা গ্যাং ও সিপি গ্যাং বানানো হয়। রঙ্গভবন বা জঙ্গভবনের লোকেরা যে সব গালাগাল নিজ মুখে দিতে পারে না; তার জন্য ভাড়া করে আনে পর্ন চলচ্চিত্র সার্কেলের তাবড় গালাগাল সেনাদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দখলে রীতিমত ‘স্মার্ট ফোনের বিনিময়ে’ গালাগাল কার্যক্রমে সক্রিয় দেখা যায়; উগ্রজাতীয়তাবাদ ও উগ্রধর্মবাদের যৌনজ্বালাময় লাইক্যানথ্রপিক শিয়াল ও নেকড়েদের।

এইখানে গরিবের ছেলে সাহেদ কিংবা অচৌধুরী সাবরিনাকে ‘চোর বলে ধরে’ বেয়াই-কাজিন-সেকেন্ড হোমার বাঁচানো প্রকল্পে ‘অন্যের অপমান দেখার নেশা’ উস্কে দেবার পলিটিক্যাল খেলাটি চালু আছে একটি দশক। সাহেদের ভুঁড়ি কিংবা সাবরিনার দেহবল্লরী নিয়ে যৌনতা ও বিনোদন বঞ্চিত বুভুক্ষু মানুষের সামনে একডলা মাংসপিন্ড ছুঁড়ে দিলে; লালসার লালা মাখা জিভ বের করে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসে উপমানবেরা। গালি দিয়ে ভুত ছুটিয়ে দেয়; জিভে যৌনতার হাকালুকিতে ফেসবুককে পর্নোসাইট বানিয়ে ফেলে; সেই হৈ হুল্লোড়ে চুরি যায় আমাদের চেতনা; মূল্যবোধের সোনা। স্মরণকালের বৃহত্তম লুটপাট ঘটেছে গত একদশকে; সুতরাং এটা খুব স্পষ্ট যে, এই সংঘবদ্ধ গালাগালের আসর আসলে লুটপাটের অর্থনীতির ব্যাকোয়ার্ড লিংকেজ।

রঙ্গভবনের লোলিতলোভনকান্তি মাংসের সর্দারনীরা; ফেসবুকে টি-শার্ট, জিনস-প্যান্ট গিফট দিয়ে; গালাগাল শিয়ালকে ‘স্মার্টফোনের বিনিময়ে গালাগাল’ প্রকল্পে নিয়ে আসে। জঙ্গভবনের ‘লভ-জিহাদে’-র সহি আপ্পিরা একইভাবে খুরমা-খেজুর-আবে-হায়াত উপহার দিয়ে ‘স্মার্ট ফোনের বিনিময়ে গালাগাল’ কার্যক্রমে নিয়ে আসে গালাগাল নেকড়েকে। আর সমাজ অন্যের অপমান দেখার নেশায় পাগল হলে; এইসব গালাগাল শ্রমিকেরা এসে ফেনসি নেশার পুরিয়া ঢেলে দেয় ফেসবুকে। এইভাবে একটা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে ফেসবুকে। সমাজকে নৈতিক নিমজ্জন থেকে উদ্ধার করতে নাগরিক সমাজকে অত্যন্ত কঠোর হতে হবে এইসব গালাগাল শেয়াল ও নেকড়ের ব্যাপারে।

0 Shares