মাসকাওয়াথ আহসান

 সমাজ-রাজনীতিতে মিডিয়া ইলিউশান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ওয়ার অন টেররের প্রয়োজনীয়তা আর ইরাক যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে সিএনএন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে একটি ইলিউশান বা আলেয়া তৈরি করতে পেরেছিলো। পশ্চিমা হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা; যারা শ্রমে-দক্ষতায় এশিয়ার মানুষের সঙ্গে পেরে ওঠেনা; তারা সবসময় তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য কাউকে না কাউকে দায়ি করতে চেষ্টা করে। সিএনএন সেই নাইন ইলেভেনের টুইন টাওয়ার হামলাকে এমনভাবে টিভি স্ক্রিনে তুলে ধরেছে; সেই সাড়ে তিন হাজার লোকের মৃত্যুর শোকগাথার সাদা শ্রেষ্ঠত্বের চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে; ইরাক-আফঘানিস্তান-সিরিয়া-পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন চালিত মারণাস্ত্র দিয়ে লাখ লাখ মানুষের গণহত্যা।

সাদা মানুষের মৃত্যু “শোকে”র আর বাদামি ও কালো মানুষের মৃত্যু “অবহেলার-অস্বীকারে”র আর বিস্মৃতির; এই হচ্ছে সিএনএন-এর ইলিউশনারি সম্পাদকীয় নীতি। চিন্তক নোয়াম চমস্কি একে বলেছেন, শাসকের জন্য নেসেসারি ইলিউশান। জর্জ-ডব্লিউ বুশের মুসলিম হত্যার মৃগয়ার মাঝ দিয়ে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের আধিপত্য ফিরিয়ে আনার বিষবৃক্ষ রোপন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিদের বাতাবি লেবু মিডিয়া এই সিএনএন। আর ফক্স নিউজ নামেও ফক্স; কামেও ফক্স। তাদের কাজ ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট ঝান্ডা নিয়ে দৌড়ানো; আর এমেরিকায় বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলন ফলিয়ে সহমত ভাইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি।

বাংলাদেশের পটভূমিতে “বাঁশের কেল্লা” সিএনএন ও ফক্স টিভির মতোই মুসলিম শ্রেষ্ঠত্বের ঝান্ডা বাহক মিডিয়া।সিএনএন আর ফক্স বড় বিনিয়োগের মিডিয়া; পেশাদার সাংবাদিকেরা কাজ করে সেখানে। তারা এতো মিডিয়া ম্যাজিক দেখিয়েও জনমনে যতটা জায়গা নিতে পারেনি; বাঁশের কেল্লা; গোটা কয়েক শিবিরের মালিক; হেফাজতের হাছান আর ওলামা লীগের হোছেন নিয়ে রীতিমত বাহুবলি মিডিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

এরা একাত্তরের খুনি সাঈদির ছবি চাঁদে লেজার বিম করে সিএনএনকে পিছে ফেলে দিয়েছে শুরুতেই। এদের মিডিয়া ট্যাগ লাইন, সব কিছুই “ইহুদি-নাসারাদের ষড়যন্ত্র”। মানে পড়াশুনা না করা, গবেষণা না করা, কোরান শরিফ পড়ে বুঝতে পারার ক্ষমতা অর্জন না করা, দান বাক্সের খুচরা পয়সা আর জনগণের চামড়া তুলে নেয়া চাঁদার টাকায় শুয়ে বসে খেয়ে চর্বি জমিয়ে “আত্মনির্ভর উন্নয়ন কৌশল অর্জনে” ব্যর্থ হবার যাবতীয় দায় ইহুদি নাসারার।

ইহুদি ছেলে জুকারবার্গ ছাত্রজীবনেই গবেষণা করে; ফেসবুকের মতো জন মিডিয়ার আইডিয়া উদ্ভাবন করেছে; আর মুসলিম ছেলে জাকারিয়া সেই ফেসবুকে বাঁশের কেল্লার মিডিয়ায় বসে, বয়কট জুকার বার্গ বলে ডাক দেয়। ভারতেও দেখবেন, গো-খামারের জগাইচন্দ্র একইভাবে “বয়কট চীন” বলে। জীবনে ব্যর্থ হলে তখন সফলদের বয়কট করার ডাক অবশ্য দক্ষিণ এশীয় সমাজের সামষ্টিক মনোভঙ্গি।

বাঁশের কেল্লা নেসেসারি ইলিউশান তৈরিতে সিএনএন-এর চেয়ে অনেক সফল হয়েছে। বাতাবি লেবু টিভির উন্নয়নের নেসেসারি ইলিউশান এখন রীতিমত হাসাহাসির খোরাক হয়েছে। কিন্তু বাঁশের কেল্লার মালিক ভাইয়া, এখনো এসে পেরুর ছবি দেখিয়ে “শাপলা চত্বরের গণহত্যা”র একটা নেসেসারি ইলিউশান সৃষ্টি করতে সক্ষম। অনেক লোকই এই রকম ইলিউশান ভালোবাসে। বাঁশের কেল্লার বাহুবলি ভাইয়ারা ইলিউশনিস্ট হিসেবে যুগসেরা। তারা একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়ে কলতলা গরম করে রামুর বৌদ্ধপল্লী ও নাসির নগরের হিন্দুপল্লীতে দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এরকম সাফল্য সিএনএন বা ফক্স টিভি কখনো দেখাতে পারেনি।

বাঁশের কেল্লার বিপরীতে সিপি গ্যাং-এর গালির কেল্লা ও হ্যাপি ইনসাইডারের হলুদ বোরহানির গ্লাস অনেক চেষ্টা করেও বাহুবলি হতে পারেনি। ফলে জাতীয় জীবনে বাঁশের কেল্লা শক্তির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই বাঁশের কেল্লার ইলিউশানে বাঁশকে এখন রডের চেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করে বালিশ ও বাঁশের উন্নয়ন ঠিকাদারেরা। রেললাইনে লোহার পাতের পরিবর্তে বাঁশের ছাল বেঁধে দেয়া; ছাদ ও কালভার্ট নির্মাণের ঢালাইয়ে বাঁশের ব্যবহার; বাঁশের শক্তি সম্পর্কে বাঁশের কেল্লার তৈরি করার নেসেসারি ইলিউশানেরই ফলাফল। বাঁশের কেল্লা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কর্মীর মাঝে বাঁশের প্রতি অনুরাগ ও ভরসা তৈরি করেছে।

বাঁশের কেল্লা এর পাঠক ও দর্শকদের মাঝে বাঁশের প্রতি এমন অন্ধ আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে যে, ধর্মচেতনার চেকপোস্টের কীটেরা তাদের টেস্টিং কিট দিয়ে কাউকে নাস্তিক বা কাফের প্রমাণ করলেই; কিছু লোক বাঁশ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করতে।

বাঁশের কেল্লা একটি বেহেশতের পাসপোর্ট বিতরণ কেন্দ্র শুরু থেকেই। বাঁশের কেল্লার “প্লে বয়” শাখাটি বেহেশতের হুরের গল্পের আলোছায়ায় লিবিডোর দীঘিতে তোলপাড় তোলে; এই হুর কিন্তু হালের হিজাবি আপ্পির মতো নয়; হুর হচ্ছে উলালা মালাইকা অরোরা; বিপাশা বসু কিংবা সোন্নত সাহসের আঞ্জেলিনা জোলি।

জোলি জাতিসংঘের দূত হয়ে মাথায় ঘন করে চাদর টেনে; পর্দা পুসিদা সহকারে “রোহিঙ্গা শরণার্থী” শিবির ঘুরে যাবার পর বাঁশের কেল্লার “ধর্মান্তরণ শাখা” তাকে আনুমানারা জলি নাম দিয়ে ইসলাম ধর্মে কবুল করে নিয়েছে। এই এঞ্জেলিনা জোলির ইসলাম ধর্ম গ্রহণের নেসেসারি ইলিউশানের পোস্টে হাজার হাজার বাঁশমত ভাই এসে লাইকে লাইকে লাইক্যানথ্রপিক রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চাঁদের রাতে মানুষ নেকড়েতে রূপান্তরের গল্পের মতোই ফেসবুক লাইকের লাইক্যানথ্রপিক রোগের গণ-হিস্টিরিয়া অসংখ্য নেকড়ে মন তৈরি করেছে। এই নেকড়ে নিউজিল্যান্ডের জোসিন্ডা ইসলাম গ্রহণ করে জোবেদা হয়ে যাবে; এই স্বপ্নে দিন গুজরান করে।

এই যে বাঁশের কেল্লার যে ভোক্তারা তাদের কমরেড হোছনে-আরার পাশে বসে ইলিউশনের লাভ জিহাদের স্বপ্ন দেখছে; তাতে কিন্তু হোছনে আরার কোন আপত্তি নেই। হোছনে আরা বিশ্বাস করে; সে তার “গর্ভ-জিহাদ” করে প্রতি বছর একটি করে শিশু ডাউনলোড করে; মুসলমানের সংখ্যা বাড়াবে; তারপর আবার তুর্কী এর্তোগুল নাটকের ইলিউশানে ” অটোমান সাম্রাজ্য” গড়ে পৃথিবী দখল করে নেবে।

ইহুদি ও নাসারার তরুণেরা যখন গবেষণাগারে; নতুন নতুন উদ্ভাবনের নেশায় সৃজনশীলতার আনন্দে বাঁচে; বাঁশের কেল্লা খিলাফত মিডিয়ার ভোক্তারা তখন কী সব আকাশ-কুসুম কল্পনা আর ভাবনার অপচয় করে; ভেবে দেখুন। অথচ বাঁশের কেল্লার বাহুবলি আগে কথায় কথায় আত্মঘাতি বোমা হামলা করে বেহেশতের পাসপোর্ট নিয়ে বেহেশতের বাঁশের হুরের হারেমে চলে যাবার ভয় দেখাতো। সেই বাহুবলি বাঁশ-ভ্রাতা করোনাভাইরাসের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে; তাকে ধার্মিক ভেবে যদি কেউ মৃত ব্যক্তির জানাজা-দাফনের দায়িত্ব দেয়; এ কারণে বাঁশের বাহুবলিদের এখন টিকিটিরও সন্ধান মেলেনা। আর এখন প্রতিদিনই আবিষ্কৃত হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন নির্মাণ কাজে এরা রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে ভরে ফেলেছে। নখের ছোয়ায় নেইলপলিশ রিমুভারের মতো উঠে আসে উন্নয়নের রাস্তার সোহাগি প্রলেপ।

46 Shares