আনাতোলিয়ার অন্ধ সেকেন্ড হোমারেরা করোনাকালে চার্টার্ড প্লেনে করে একে একে প্রতীচ্যে চলে যেতে শুরু করে। কেউ চক্ষু চিকিতসা, কেউ ভাইয়ের অস্ত্রোপচার এরকম কুসুমকলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ছুটির কারণ দেখিয়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে দরখাস্ত ঝুলিয়ে কেটে পড়ছে।

এইসময় আবার আনাতোলিয়ায় ন্যায়বিচারের আমের আচার বিক্রি শুরু হয়। অভিজাত বাহিনীর থিয়েটার লেখককে ধমক দিয়ে ফোন করে ন্যায়বিচার আমের আচারের বিজ্ঞাপনী সংস্থা।

“আমরা তো ভাই জাস্টিস ম্যাঙ্গো পিকলের প্রোমোশনাল বাতাবি লেবু টেলিভিশনে অন এয়ার কইরা দিছি। আপনার চিত্রনাট্য লেখায় এতো দেরি হচ্ছে কেন?”

অভিজাত বহরের চিত্রনাট্য রচয়িতা চিন্তা করে, চারপাশে যত অপরাধ হচ্ছে; সেইখান থেকে ইজি ক্যাচ চাই; যে কারো বেয়াই-চাচাতো/ফুফাতো ভাই নয়, সামন্ত রুলিং এলিট নয়।

ল্যাপটপের সামনে বসে রঙ্গভবনের পিঠাপুলির আসরের ছবি দেখে। সবই বিগ শট; দশবছর আগে বাটারবন কলা খেয়ে ময়লা গ্লাসে কুলকুচি করে ততোধিক ময়লা হাতল ভাঙ্গা কাপে চা খেয়ে; “ও হাকিম ভাই” বেতন পাইলে বিল দিমুনে বলে সটকে পড়তো যারা; তারা সবাই এখন ব্রাঞ্চ করে; সুইমিংপুলে সাঁতার কেটে কাতলা মাছের মতো হা-মুখ করে উন্নয়নের খোকন সোনা হয়ে ছবি দেয় ফেসবুকে; কফিশপে বসে ইউভাল নোয়াহ হারিরির নামটা ড্রপ করে দিয়ে ইন্টেলেকচুয়াল খঞ্জনি বাজায়; আর কথায় কথায় বাতাবি লেবু টিভির সিলেবাসে “দেশ আমার মাটি আমার”, ” জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন” পোস্ট লেখে ফেসবুকে।

দেখে চেনার উপায় নাই; মাত্র দশবছর আগে বিল দিতে না পারায় যার টিভির কেবল অপারেটর হিরো আলম কুটুশ করে কানেকশান কেটে দিতো; সে এখন স্যাটেলাইট উড্ডয়ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ফিরে হাপুস নয়নে কেঁদে ফেসবুক স্টেটাস দেয়। কথায় কথায় দেশের গর্বে কান্দন; গবেষণা হাইপোথিসিস লিখে পরীক্ষা করার আগে, “দেশ যদি নোবেল পুরস্কার পায়” সে কৃতিত্ব আমার নয়; দেশের বলে ভ্যাঁ করে কেঁদে দেয়।

চিত্রনাট্য রচয়িতা কান্দন-বৃত্তের লোক বাদ দিয়ে; হাসি বৃত্তের লোক খোঁজে। পেয়েও যায়; গোপাল ভাঁড়ের বইয়ের কাভারের লোকটির মতো সদাহাস্য একটি লোককে দৈবচয়নে পেয়ে যায়। যেহেতু পিঠাপুলির আসরের সবাই মোটামুটি অপরাধ স্বর্গে দুধের নহরের পাশে বসে আঙ্গুর খায়; বাহুলগ্না হুরদের নিয়ে; কাজেই গোলগাল সদাহাস্য লোকটিকেও টান দিলে তার অপরাধ পাওয়া যাচ্ছে।

গোলগাল লোকটির একটি গোলগাল হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে ফেসবুকে চেতনার চেকপোস্ট ও ধর্ম-ঈমান চেকপোস্টের সেনারা করোনা টেস্টের কাজ করছে। ফেসবুকে যেমন কইয়া দিলেই হলো, আন্নে দেশদ্রোহী; আন্নে নাশতেক; তেমনি স্যাম্পল না দেখেই রোগীদের নামের পাশে বসিয়ে দিয়েছে, করোনা পজিটিভ ও নেগেটিভ। ট্রিটমেন্ট নাই যে রোগের তার টেস্ট দিয়া কী হবে; রেজাল্টটাই আসল।

“ইউরেকা ইউরেকা” বলে চিত্রনাট্যকার ধামাচাপা নাটকের মুরগা সিলেক্ট করে সিগেরেটের ঠোঁটে ঘন চুম্বন দেয়।

“আহ আমি ইহাকে পাইলাম; উহার নাম দিলাম জাম্বো”

গোলগাল লোকটির ছবি “অপরাধী” বলে ফেসবুকে ছেড়ে দিলে “সাতে পাঁচে থাকিনা দাদা” রীতিমত বারান্দা থেকে নেমে এসে বলে, “ছ্যা ছ্যা ছ্যা; ১৫ কোটি ৯৯লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ জন সৎ মানুষের আনাতোলিয়ায়; ঐ একটি অসত জাম্বোর জন্য আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ওকে পিটিয়ে মেরে ফেলো।”

“জাম্বো অপরাধ থিয়েটার” করতে গিয়ে দেখা যায়; বস্তা থেকে অনেকগুলো কালো বেড়াল বেরিয়ে পড়ে। জাম্বো ছবি তোলেনি এমন কোন রুলিং এলিট নেই। সবার সঙ্গেই তার ছবি। আর এই ছবিতে রাষ্ট্রপতি-রাষ্ট্র সেনাপতি-রাষ্ট্র উপাচার্য এসব গুরুত্বপূর্ণ মানুষের চেয়ে জাম্বোর বেশি মনোযোগ রাষ্ট্রক্যামেরার দিকে।

সবাই যেন সম্বিত ফিরে পায়; এ কী সেলফি জোকার; এইভাবে “হীরক রাজার দেশের” নতুন ভার্সান স্যুটিং করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খামবাদিকদের হাতে খাম ধরিয়ে দিয়ে সে, বাতাবিলেবু পরিবারের টিভি টকশোতে গিয়ে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নসিহত করেছে; নিজের পেছনে শতছিদ্র নিয়েও অন্যের ‘একটি ছিদ্র’ নিয়ে কথা বলে মুখের ফেনা তুলে ফেলা সিংহের সুভাষায়। পুলিশ বাহিনীর অনুষ্ঠানে গিয়ে সুচিন্তার ধারাপাতে সেলফি জোকার রীতিমত নৈতিকতার ক্লাস নিয়েছে।

এক একটা ছবি দেখে চমকে ওঠে লোকে; খামবাদিকদের বাহুলগ্ন হয়ে সেলফি জোকার অট্টহাসিতে রঙ্গ ভবনের বাগানে; প্রতিবেশি গো-তোলিয়ার বড় বড় নেতাদের সঙ্গে বসে মাইকেল মুরের ভঙ্গিতে; কোথায় নেই সে!

এরমাঝে খবর আসে, সেলফি জোকারের বাবা ফেসবুক ট্রায়ালে তার ছেলের “ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই” আওয়াজে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে; সেই মৃত্যু সংবাদে হাহা ইমো দিয়ে নরভোজিরা ন্যায়বিচারের আমের আচার খায় আঙ্গুল চেটে চেটে।

এর পর পরই একজন সাবেক মন্ত্রীর মৃত্যু হয়। এই দুজন সদ্য মৃত মানুষের সঙ্গে সেলফি জোকারের ছবি আছে। তার মানে কী এই; সেলফি জোকারের সঙ্গে ছবি আছে; এমন সবাই একে একে মারা যাবে। একি মৃত্যুঘন্টা আনাতোলিয়ার বদ-হাওয়ায়; কখন প্রাণপাখি উড়ে যায়।

জাস্টিফিকেশান ভাইয়ারা বলেন, একজন অপরাধীর সঙ্গে সাধুসমাজের ছবি থাকতেই পারে। তাতে সাধুত্বের শূচিতার কোন ক্ষতি হয় না গো।

সেলফি জোকারের সঙ্গে এক ফ্রেমে আছেন; এমন বরেণ্য ব্যক্তিদের ইমেজ পুনরুদ্ধারে ফেসবুকে এসে পড়ে এমভি সোহরাব, এমভি রুস্তম।

কিন্তু তাতেও শংকা কাটেনা বরেণ্যদের। সেলফি জোকারের সঙ্গে ছবি আছে; এমন সবাই যদি মারা যায়; সে শূন্যতা পূরণের নয়; এতো শাণিত মেধা, তীক্ষ্ণ নৈতিকতা, সৌম্য দায়িত্ববোধ, পাহাড়সম সততা, গন্ধমাদন পর্বতসম দেশপ্রেমের হীরের টুকরারা টুপ করে শিউলির মতো ঝরে গেলে; কে ঐ সোনার আনাতোলিয়ার স্বপ্ন পূরণ করবে।

সেলফিজোকারের ছবিদর ভাই ও ছবিদরা বোনেরা ঘুমাতে পারে না। ছট ফট করে মৃত্যু যন্ত্রণায়; চোখ লেগে গেলেও ঘুমায় না; যদি মরে যায়। সেলফি জোকার তার গোপন ডেরা থেকে ফেসবুক লাইভ করে বলে, ভুল তো মানুষই করে; আমার চেয়ে বড় বড় ভুল করে যারা পাওয়ারপ্ল্যান্টে হ্যালান দিয়ে ক্রসফায়ারের বাঁশী বাজায়, সুইস ব্যাংকে সাইকেল চালায়, সেকেন্ড হোমের শেতল পাটিতে গড়াগড়ি খায়, স্বাস্থ্যখাতের বাজেট গায়েব করে দিয়ে হাসপাতালগুলোকে “লাশ কাটা ঘর” করে রাখে; সেইসব ইঁদুর কী ধরা হবে না এবার!

39 Shares