বঙ্গযান

ইতিহাস জানায় যে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের বাহিনী ক্লাইভের বাহিনীর কাছে হেরে যেতো না – যদি, যুদ্ধ দেখতে আসা হাজার হাজার বাঙালীর প্রত্যেকে একটা করে ঢিল ছুঁড়তো ইংরেজ বাহিনীর উপরে, তাহলে সেদিন সিরাজকে হারতে হতো না, আর ক্লাইভের বিজয়ের মাধ্যমে বাংলা তথা ভারত লুণ্ঠনের দু’শ বছরের ইজারা ইংরেজরা পেতোনা।

আর আজ যে হিন্দী ভাষা ঢুকতে পারছে তার পিছনেও সেই দর্শক বাঙালীতো বটেই, এছাড়াও তাদের দ্বারা নির্ব্বাচিত স্বাধীনতোত্তর দর্শকের ভূমিকায় থাকা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারগুলিও অধিকাংশে দায়ী।

সংবিধানসম্মতভাবেই মহারাষ্ট্রসহ দক্ষিণভারতের রাজ্যগুলির মতই পশ্চিমবঙ্গে – কেন সরকারী ও বেসরকারী কাজকর্ম্মে, রাজ্যে স্থিত কেন্দ্রীর সরকারের দপ্তরগুলিতে ব্যাঙ্ক-বীমা-রেল ইত্যাদি সহ সমস্ত কেন্দ্রীয় ও আধা-সরকারী কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির কাজকর্ম্ম বাংলাভাষায় করা হয় না? কেন রাজ্য সরকারের সমস্ত দপ্তরে ও আদালতে প্রশাসনিক কাজ বাংলায় করা হয় না? কেন বাংলাদেশের মত বা ইজরায়েলের মত স্বীয় দেশীয় বা প্রদেশীয় ভাষায় এই রাজ্যের নেট-ওয়ার্কিং চালু নেই? কেন সম্প্রতি রাজ্যের বিদ্যুৎ বিভাগে রাজ্যের ভাষা অর্থাৎ বাংলাভাষা না-জেনে না-শিখে বাংলাভাষার উপরে পরীক্ষা না-দিয়ে – ১৫০ জন অ-বাংলাভাষী ইঞ্জিনীয়ার চাকুরী পেল – একজন বাংলাভাষী ইঞ্জিনীয়ারকেও নিয়োগ না করে? কেন পশ্চিমবঙ্গের এফ-এম চ্যানেলে বা পরিবহণের সাউণ্ড-সিষ্টেমে বাংলা ভাষাকে বিসর্জ্জন দিয়ে হিন্দী গান এবং হিন্দীতে ঘোষণা বা সংলাপ পরিবেশন করা হয়?

কেন রাস্তার মাইলষ্টোনে, পথনির্দ্দেশে এবং রাজ্যে নথিভুক্ত সবধরণের গাড়ীর নেমপ্লেটে বাংলালিপি/অক্ষর/সংখ্যা অনুপস্থিত? কেন বাংলার সরকারী বেসরকারী সংস্থার, প্রতিষ্ঠানের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, কল কারখানায়, দোকান পাট, পেট্রোল পাম্প, রেলওয়ে ষ্টেশন, রেলের টাইমটেবল, রাস্তায় রাস্তায়, ষ্টেশনে ষ্টেশনে টাঙানো সমস্ত সাইনবোর্ড-নোটিশবোর্ড-চালানে-প্ল্যাটফরম টিকিটে/টিকিটে বাংলা লিপি ক্রমান্বয়ে অদৃশ্য হয়ে পড়ছে? কেন বেসরকারী স্কুলে অবাংলাভাষীদের দিয়ে বাংলা শেখানোর হাস্যকর আইন বাঁচানোর খেলা বন্ধ করে বাংলাভাষী শিক্ষকদের নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না; কেন রাজ্যের উচ্চতর বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে অ-বাংলায় লেখা গ্রন্থগুলির বঙ্গানুবাদ করে বাংলায় ছাপার ব্যবস্থা করা হচ্ছে না; কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি মেনে এই রাজ্যের অ-বাংলাভাষী বাঙালীদের স্বীয় মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারকে সম্মান জানানোর বিপরীতে এই রাজ্যের সেই সব অ-বাংলাভাষামাধ্যম অনুসরণকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি তাদের পাঠ্যক্রম থেকে এই রাজ্যের ৮৪ শতাংশ অধিবাসীর প্রধানভাষা বাংলাভাষাকে পুরোপুরি বাতিল করার লাইসেন্স কীভাবে পেতে পারেন? কেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতের অন্যান্য প্রদেশের বাংলাভাষীদের জন্য বাংলাভাষী অনুবাদক-কর্ম্মচারী নিয়োগ করতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা প্রতিবাদ হচ্ছে না???

আগ্রাসনকারীরা তাদের আগ্রাসনের কাজ চালিয়ে যাবে আর আমরা বাঙালীরা দর্শকের মত সিরাজ-ক্লাইভের দ্বৈরথের দর্শকের মতো আচরণ করে চলবো, আমাদের করণীয় কাজগুলি করবো না – আর আগ্রাসনকারী ভাষা ও ভাষাভাষীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করব এটাতো একধরণের আত্মপ্রবঞ্চনার মতোই একটা কাজ।

বাংলাভাষার স্বার্থে আমাদের এবং আমাদের সরকারের কাজগুলি আমরা যদি নিজেরা সম্পন্ন করতে পারতাম তাহলে অ-বাংলাভাষাভাষীদের কিংবা অ-বাঙালীদের বিরুদ্ধাচরণ না করেও আমাদের বাংলাভাষাকে ও এই বঙ্গের কর্ম্মসংস্থানকেন্দ্রগুলি্তে বাঙালীর উপস্থিতিকে সগৌরবে বিরাজিত হতে দেখতে পেতাম! তিয়াত্তর বছর কেটে গেল এভাবেই ধীরে ধীরে বাংলাভাষার দেহরূপ বাংলালিপি তার দৃশ্যমানতা হারাচ্ছে – কবে রাজ্যসরকারের চৈতন্যোদয় ঘটবে কে জানে?

প্রাদেশিকতার ঊর্দ্ধে উঠেও, অন্য ভাষালিপির দৃশ্যমানতাকে নষ্ট না করেও শুধুমাত্র বাংলালিপি তথা বাংলাভাষার দৈহিক উপস্থিতিকে সর্ব্বত্র প্রাধান্য দিয়ে সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিদৃশ্যমান করার কাজটুকু নীরবে করে গেলেই বাংলাভাষার পতাকাকে ঊর্দ্ধে তুলে ধরা যেতো সংবিধানসম্মতভাবেই।

0 Shares
বঙ্গযান এর ব্লগ   0 বার পঠিত