Avatar

সশস্ত্র যুদ্ধ কখনোই কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। অসভ্য আদিম পরিবেশে সশস্ত্র যুদ্ধের বিকল্প ছিল না। কিন্তু সভ্য সমাজে যুদ্ধ বিভিন্নভাবে হতে পারে কিন্তু কখনোই তা সশস্ত্র না। একাত্তরের কথা যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে বলতে হবে একপাল অসভ্য সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিকদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আমরাও পশুদের পর্যায়ে নামতে বাধ্য হয়েছিলাম, আত্মপক্ষ রক্ষার অধিকার সবারই আছে। কোনো জাতির বিরুদ্ধে যখন আগ্রাসীভাবে কোনো যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয় তখন তা অবশ্যই অন্যায় যুদ্ধ। আর আমি কখনোই বিশ্বাস করি না যে সভ্য সমাজে সশস্ত্র যুদ্ধকে কখনোই “ন্যায় যুদ্ধ” বলে চালানো যেতে পারে। যুদ্ধ সর্বদাই অন্যায়, এটা কখনোই ন্যায় হতে পারে না। তবে নিজ অস্তিত্ব রক্ষার্থে তা আর তথাকথিত যুদ্ধ থাকে না; তখন তা হয় “মুক্তিযুদ্ধ”।

পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের ধারক জামায়াতের নেতারা যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করবে এবং খুন/ধর্ষন বা লুটপাতের সাথে যুক্ত থাকবে তা সহজেই অনুমেয় এবং এটাই স্বাভাবিক ঘটনা; এই কারণে তাদের বিচার করা প্রহসন। তারা এই কাজ মোটেও হুজুগের সাথে করে নাই বরং তাদের জীবন দর্শনই তাদেরকে এই কাজ করার অনুমতি দিয়েছিল। ধর্মের জন্য মানুষ হত্যা করার অনুমতি মওদুদীর রাজনৈতিক দর্শনে খুব ভালো করেই অনুমোদিত। ৫২ তে ভাষা সৈনিক গোলাম আযম এই দর্শনের কারণেই ৭১ এ রাজাকার। মানুষের জীবন দর্শন যখন তাকে সমাজের চোখে অপরাধী করে তুলে তখন তা অবশ্যই ভয়ংকর ব্যাপার। আমরা যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কথা বলি, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের কথা বলি কিন্তু মওদুদীর দর্শন নিষিদ্ধের কথা বলি না। অথচ ইহাই সকল নষ্টের মূল।

যুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধ খুবই হাস্যকর চাতুরতা ব্যতীত আর কিছুই না। এটা আসলে বিজয়ী পক্ষের “জোড় যার, মুল্লুক তার” নীতি। এদের বিচার হবে এই ভিত্তিতে যে তারা দেশদ্রোহীতা করেছে। এই যুক্তি আমি এই কারণে দিচ্ছি কারণ যুদ্ধাপরাধীর বিচার করতে হলে সবার প্রথম যাকে কাটগড়ায় দ্বাড় করাতে হবে সে হলো ইয়াহিয়া খান। তার নেতৃত্বেই ২৫ শে মার্চ রাতে গনহত্যা শুরু হয়েছিল। যেহেতু তা আমরা পারব না সেহেতু এইসব চুনোপুটি রাজাকারদের বিচার করলে কি ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে? একাত্তরের রাজাকাররা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায় নাই তাই দেশদ্রোহীতার অভিযোগে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং নিষিদ্ধ করাটাই হবে ন্যায়বিচার, মানবতাবিরোধী অভিযোগ দিয়ে নয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকে রাজাকারের বাড়িতেও আগুন ও তাদের উপর নৃশংস আক্রমন করেছে মুক্তিযোদ্ধারা এবং দেশপ্রেমিক জনতা। এতে আমি খারাপ কিছু দেখি না, কারণ নিউটনের তৃতীয় সূত্র দ্রষ্টব্য। যুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে হলে এই দেশপ্রেমিক জনতাকেও কাটগড়ায় দ্বাড় করাতে হবে, যা অযৌক্তিক।

জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা আর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এক জিনিস না। অনেকে বলে থাকে যে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হোক যুদ্ধে মানবতাবিরোধী কর্মকান্ড সংগঠিত করার জন্য; এক্ষেত্রে তারা যুক্তি দেখায় জার্মান নাৎসি পার্টির। যৌক্তিক কারণ বশতই আমি তাদের সাথে একমত নই, কারণ যুদ্ধ হলো সেই প্রক্রিয়া যেখানে বিপক্ষকে পরাস্ত করার জন্য সবচেয়ে চরমপন্থা অবলম্বন করা হয়। নাচতে নেমে ঘোমটা দেওয়া যেমন হাস্যকর তেমনি যুদ্ধে নেমে বিপক্ষের বিরুদ্ধে মানবিক আচরণ করারও সমান হাস্যকর। জার্মান নাৎসি পার্টিকে যদি নিরাপরাধ মানুষ মারার জন্য নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে আমেরিকার রিপাবলিকান দলকেও নিষিদ্ধ করতে হবে জাপানে এটমবোমা ফেলে মানুষ মারার জন্য। আমি মানবতাবিরোধী নামক তথাকথিত অপরাধের কারণে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে রাজি না। আমি তাদেরকে নিষিদ্ধ করতে চাই সংবিধানের সাথে তাদের সাংঘর্ষিক আদর্শের কারণে। আমেরিকাতে যেমন স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে তৎকালীন আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েতপন্থীতার কারণে নিষিদ্ধ হয়েছিল ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও জামায়াতে ইসলামকে পাকিস্তানপন্থীতার কারণে নিষিদ্ধ করতে হবে। যাদের মূল আদর্শ (জামায়াত ও কমিউনিস্ট) থেকে সংবিধানের মূলভিত্তি গণতন্ত্রকে স্বীকার করা হয় না, তাদের এইদেশে রাজনীতি করা নিতান্তই ভন্ডামী।

0 Shares

শোভন এর ব্লগ   ২৩ বার পঠিত