নাজিম উদ্দিন

টেনালি রামঃ ভারতীয় রাজসভার ভাঁড়দের মধ্যে সর্বপ্রথম যার নাম শোনা যায় সে হলো টেনালি রাম। সে তামিল রাজা কৃষ্ণ দেবরায়ের সভার ‘বিকট কবি’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কৃষ্ণদেবরায়ের রাজত্বকালে (১৫০৯-১৫২৯) টেনালি রাম খুব জনপ্রিয় সভাকবির খ্যাতি অর্জন করেন। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে টেনালি রাম কিংবদন্তীতে পরিণত হন। ভারতের গ্রামে গঞ্জে টেনালি রামের কাহিনী লোকের মুখে মুখে প্রচলিত । টেনালি এত জনপ্রিয় যে কমিক বই, গল্প এবং নাটকে তার চরিত্র একটা বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। টেনালি রামের গল্পে গ্রামের কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী ফুটে ওঠে, রাজসভায় কাজ করলেও বেশির ভাগ গল্প গ্রাম্য লোকেদের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বর্ণিত, গ্রামের লোকেরা তাই তাকে তাদের নায়ক মনে করত। সে তার কৌশল দিয়ে, মর্মান্তিক গল্প দিয়ে রাজাকে বাস্তব জগতে টেনে নামাত। টেনালি রাম স্মরণ করিয়ে দিত রাজা এখনকার মত শাসক হতে পারে, কিন্তু তার রাজত্ব চিরস্থায়ী নয় এবং প্রতি মোড়ে মোড়ে বিপদ প্রতীক্ষা করছে।

চিত্রঃ টেনালি রাম ও  রাজা কৃষ্ণ দেবরায় ।

 

বিকট কবি হবার পূর্বে টেনালি ছিল ব্রাক্ষ্মণ, তার সর্বজনীন আবেদনের পেছনে এটাও একটা বিশাল কারণ। সাধারণত ব্রাক্ষ্মণের ঔরসে জন্ম না হলে সর্বোচ্চ বর্ণের ধর্মীয় বিষয়ে ক্ষমতাবান ব্রাক্ষ্মণ হওয়া যায় না। কিন্তু টেনালি তার বর্ণ মর্যাদা ত্যাগ করে ভাঁড়ের কাজ নেন, যেটা তখন ছিল অচিন্তনীয়। এর দ্বারা সে বর্ণপ্রথার অযৌক্তিকতা প্রমাণ করেন।

বালক বয়সে টেনালি রাম তার উচ্চ গোত্রের সকল সুবিধা ভোগ করেন। পরিবার থেকে তাকে উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা হয় যাতে সে পরিবারের মান-সম্মান বাড়াতে পারে। কিন্তু টেনালি সবসময় ছিল অবাধ্য, সে গুরুজন এবং ধর্মীয় পন্ডিতদের অনবরত প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে তার পরিবারের জন্য উপযুক্ত  সীমা লংঘন করতে চাইত। একদিন সে হাঁটতে বেরোল, পথে এক সন্ন্যাসীর সাথে দেখা। সন্ন্যাসী তাকে একটা মন্ত্র দিয়ে বলল, মন্দিরে বশে সে এ মন্ত্র ৩ কোটি বার জপ করলে কালী তাকে সাক্ষাৎ দিবে। টেনালি তার মন্ত্রের শক্তি পরীক্ষা করতে চাইল। সে রাতে সে ৩ কোটিবার ঐ মন্ত্র জপ করলে পরে কালী তার ভয়ংকর মূর্তিতে তার সামনে হাজির হলো। কালী দেবীর দুহাতে দুটি পানীয়, একহাতে জ্ঞানের পানীয়, অপর হাতে ধনের। কালী তাকে যেকোন একটা গ্রহণ করতে বলল, কিন্তু অবাধ্য টেনালি দুটোই নিল এবং কোনরকম ইতস্তত না করে দুটো পানীয় পান করে ফেলল। এতে কালী দেবী প্রচন্ড রাগে তাকে বকাবকি শুরু করল, কিন্তু টেনালি তার রাগ দেখে হাসতে লাগল। কালী দেবীর সামনে এর আগে কেউ হাসার সাহস পায়নি, তাই হতভম্ব হয়ে দেবী তাকে জিজ্ঞেস করল, কোন সাহসে তুই আমায় নিয়ে হাসতেছিস? টেনালি তাকে বলল, তার এতগুলো মাথা, সর্দি হলে সে কিভাবে এতগুলো নাক মুছে তা ভেবে তার হাসি আসছে। কালীর এতে প্রচন্ড ক্রোধ হয়, চিৎকার করে তাকে বলে চিরকালের জন্যে সে বিকট কবি হিসেবে পরিচিতি পাবে। টেনালি এতে বরং খুশি হয় এবং বরদানের জন্য দেবীকে কৃতজ্ঞতা জানায়। বালকের চাতুর্য এবং রসিকতায় কালী শান্ত হয় এবং বলে যদিও সে একজন বিকট কবি হিসেবে পরিচিত হবে কিন্তু রাজসভায় তার কবিত্বের জন্য রাজা থেকে কৃষক সবাই তার গুনমুগ্ধ হবে।

চিত্রঃ টেনালি রাম ও দেবী কালী ।

টেনালির জীবনে কালীর আশীর্বাদ পরিপূর্ণ হয়, গল্পের পর গল্পে সে তার রসিকতা এবং সাহসের জন্য মানুষের প্রশংসার পাত্রে পরিণত হয়। চরম বিপদের মুখে হাস্যরস করার ক্ষমতা তার অন্যতম গুন, যেটা কালীর সাথে তার প্রথম সাক্ষাতের সময় দেখা গিয়েছিল। দেব, দেবী, মানুষ কাউকে সে ভয় পেত না। এক গল্পের মাধ্যমে টেনালি এক প্রভাবশালী রাজার বিরাগভাজন হয় এবং রাজা তাকে মৃত্যুদন্ড দেন। রাজা তার কাছে জানতে চান সে কিভাবে মরতে চায়, সে হেসে জবাব দেয় ‘বৃদ্ধ বয়সে’। টেনালির চাতুর্যপূর্ণ রসিকতায় রাজা মুগ্ধ হন এবং তার মৃত্যুদন্ড মওকুফ করে দেন।

টেনালি রামের কাজ কর্ম ছিল উদ্ভট রকমের, মল নিয়ে তার একটা বিশ্রি রকমের আগ্রহ ছিল। সাধারণত রসিকতা এবং কৌতুকের মধ্যে একটা অংশ থাকে মল নিয়ে কৌতুক ( scatological), এসব কৌতুক বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। টেনালি রামের কৌতুকের মধ্যে মল, মলত্যাগ ইত্যাদি নিয়ে কিছু কৌতুক আছে যেটা অন্যান্য ভাঁড়দের মধ্যে দেখা যায় না, এখানে তার বিশেষত্ব লক্ষ্যনীয়।  সে যখন যেখানে খুশী মলত্যাগ করত, তার মতে মলত্যাগ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সুখ, মানুষকে সে এটা বলেও বেড়াত। এক গল্পে আছে, টেনালি রাজা এবং সাধুদের সমাবেশে বলে জীবনের সেরা সুখ খাবার বা কামে নয় বরং মলত্যাগে। তার কথায় ভোজনরত সুধীজনেরা চরম বিরক্ত হয়ে তাকে বের করে দেন। টেনালি সেখান থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দেন। ভূরিভোজের পর সবাই যখন নিজেদের ভার লাঘব করতে বেরোতে গেল, তখন টেনালি তাদের কাছে জানতে চাইল তারা এখন কি ভাবে, জীবনে সেরা সুখ কোনটা। পেটে নিম্নচাপ অনুভব করায় উপস্থিত সবাই টেনালির কথা মেনে নিল।

আরেক গল্পে টেনালিকে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে নিয়ে যাওয়া হল। টেনালি উপস্থিত দুই জল্লাদের কাছে শেষবারের মত গোসল করার অনুমতি চাইল। ঘাতকেরা রাজি হল, তারা ফন্দি করল টেনালি ডুব দিয়ে উঠামাত্র তারা দুজন দুদিক থেকে তরবারি দিয়ে তাকে কতল করবে। দুই ঘাতক দুইপাশে অপেক্ষা করছিল, টেনালি ভেসে উঠলেই তাকে ফালি করে কাটবে। টেনালি ভেসে উঠেই আবার ডুব দিল, ফলে দুই ঘাতক তাদের নিজেদের তরবারির আঘাতে মারা পড়ল এবং টেনালি অক্ষত অবস্থায় পালিয়ে বাঁচল।

মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার ব্যাপারে টেনালির অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল, এমনকি যখন মনে হত কোন আশা নেই তখনও সে কোন একটা কৌশল করে মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হত। আরেক গল্পে আছে, টেনালি এক রাজাকে ক্ষ্যাপায়, ফলে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এবার রাজার হাতী দিয়ে তাকে পিষ্ট করে মারার ব্যবস্থা করা হয়। রাজ কর্মচারী এসে তাকে এমনভাবে মাটিতে পুঁতে রাখে যাতে শুধু তার মাথা মাটির উপরে দেখা যায়। তাকে সেখানে রেখে তারা রাজার হাতীকে আনতে যায়। টেনালি তখন এক কুঁজোকে দেখতে পেয়ে তাকে কাছে ডাকে তারপর তাকে বলে মাটির চিকিৎসায় তার কুঁজো সেরে গেছে, সেও একইরকম চিকিৎসা করে দেখতে পারে। কুঁজো তার কথা বিশ্বাস করে টেনালিকে খুঁড়ে বের করে এবং নিজেকে সেখানে পুঁতে রাখে। হাতী যখন তাকে পিষ্ট করতে আসে, তখন সে টেনালি নয় এটা বলার অবসরও পায় না।

টেনালি রাম ও সোনালী আমের গল্প।

টেনালি তার চালাকির জন্য পরিচিত ছিল, কিন্তু রাজা এবং রাজদরবারকে অবমাননা করার পারদর্শিতার জন্য সে আরো বেশি পরিচিত ছিল। এক গল্পে রাজমাতা মৃত্যুশয্যায় ছেলের কাছে মৃত্যুর পূর্বে পাকা সোনালি আম খেতে চাইল। রাজা তার কর্মচারীদের চারিদিকে মা আনতে পাঠাল, কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পূর্বে তারা আম নিয়ে হাজির হতে পারল না। মায়ের অতৃপ্ত আত্মা তাকে তাড়া করে ফিরবে এ ভয়ে রাজা ব্রাক্ষ্মণ পন্ডিতদের কাছে এর বিহিত জানতে চাইল। ব্রাক্ষ্মণরা বলল, রাজা যদি একশত ব্রাক্ষ্মণের প্রত্যেককে একটা করে সোনার আম দক্ষিণা দেয় তাহলে তার মায়ের আত্মার সদগতি হবে এবং সে পরবর্তী স্তরে প্রবেশ করতে পারবে। রাজা তাতে রাজী হয়ে ব্রাক্ষ্মণ ভোজনের ব্যবস্থা করে পাশ্ববর্তী এলাকায় শত ব্রাক্ষ্মণকে নিমন্ত্রণ করেন। তারা রাজদরবারে এসে উপস্থিত হলে প্রবেশদ্বারে টেনালি রামের দ্বারা স্বাগত হন। টেনালির হাতে গরম লোহার সীল, সে ব্রাক্ষনদের জানায় যারা সীল নিয়ে যাবে তারা দুটো এমনকি তিনটে সোনার আম পেতে পারে। অনেক ব্রাক্ষ্মণ এতে রাজী হয়, কিন্তু যখন তারা রাজাকে তাদের অতিরিক্ত আমের কথা জানায়, রাজা অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন। রাজা টেনালির কাছে এর ব্যাখ্যা চান। টেনালি শান্তভাবে বলে, তার নিজের মা বাতের ব্যাথায় মারা যান, ডাক্তার তার গাঁটে গরম লোহার সেঁক দিতে বলেছিলেন, কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে সে সেটা করতে ব্যর্থ হয়। তাই সে কেবল রাজাকে অনুসরণ করে তার মায়ের শান্তি স্বস্ত্যয়নের ব্যবস্থা করছে মাত্র। রাজা তার বোকামি বুঝতে পেরে টেনালিকে তার অকপটতার জন্য প্রশংসা করল।

টেনালি রামের গল্পগুলোর আবেদনের একটা প্রধান কারণ তার কাজের সামাজিক প্রভাব। সে রাজা, ব্রাক্ষ্মণ ইত্যাদি প্রভাবশালী লোকেদের সাথে হাসি, ঠাট্টা, কৌশল ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের অবমাননা করে, কিন্তু তার জন্য সে কখনো শাস্তি ভোগ করে না। সে ব্রাক্ষ্মণের ক্ষমতা, চিরাচরিত বর্ণপ্রথা নিয়ে মশকরা করে কিন্তু কেউ তাকে ছুঁতে পারে না। ভারতীয় সমাজকে সে স্মরণ করিয়ে দেয়  চাইলে  তারাও সেটা করতে পারে।