দু পেয়ে গাধ

ব্রহ্মজ্ঞান মায়ার আবরণ অপসারিত করে জগতের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ করে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে শব্দই ব্রহ্ম। শব্দজ্ঞান লাভ করলে অর্থাৎ শব্দের প্রকৃত অর্থ জানলে বর্তমানের সঙ্গে ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের যোগ স্থাপিত হয়। ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছে অতীত এবং ভবিষ্যৎ বর্তমানের মতোই সমভাবে প্রকাশিত।

ব্রহ্মজ্ঞান তথা শব্দজ্ঞানের আলোয় একটি অতিপ্রাচীন কল্পকাহিনীর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা হচ্ছে। এই কাহিনী অতিপ্রাচীন যুগের প্রমাণহীন গল্পমাত্র। অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের সঙ্গে একে মিলিয়ে দেওয়া সহজ হলেও সেজন্য লেখক দায়ী থাকছেন না।

————————

গৌতম মাস্টারের জমিটির উপর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাহেবের বহুদিন থেকে নজর। এমন নিখুঁত জমি আর একটিও নেই। গৌতম মাস্টার যত্নও করে সেইরকম। ফসলও যা হয় তাতে লোকের চোখ গোল হয়ে যায়। এমন জমি দেখে যার লোভ না হবে সে সংসারী মানুষই নয়।

সভাপতির হাতে গুন্ডা কিছু কম নেই। কিন্তু তাদের দিয়ে কাজ করানোয় বিপদ আছে। প্রথমত সভাপতি এই গৌতম মাস্টারের কাছে একদা পড়াশুনা করেছিলেন। মাস্টারকে যতটা চিনেছেন তাতে সে ভয় পেয়ে পালানোর মানুষ নয়। তাছাড়া গুরুকে গুন্ডা দিয়ে পেটানোর কথা জানাজানি হলে মানসম্মান বলে কিছু থাকবেনা। এর আগে একবার বহুকষ্টে জেলের ভাত খাওয়া থেকে বেঁচেছেন সভাপতি ইন্দ্র।

অত্রি মুনির পুত্র ত্রিশিরা সেবার ইন্দ্রের পদটি দখল করার জন্য আদানুন খেয়ে লেগেছিল। সোজাপথে তাকে আটকানো যাবেনা সে কথা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। খবর ছিল ত্রিশিরার জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করার বাতিক আছে। ইন্দ্র একদিন এক কাঠুরিয়াকে গিয়ে ধরলেন। নানারকম লোভ দেখিয়ে তাকে রাজী করানো তেমন কঠিন কাজ ছিলনা। কুড়ুল নিয়ে কাঠুরিয়া জঙ্গলে কাঠ কাটছে দেখে ত্রিশিরা একটুও সন্দেহ করেনি। সুযোগ পেয়েই কুড়ুলের এক কোপে তার মাথাটি নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারা গেলনা। ঘটনা প্রকাশ হয়ে গেল।

সেবার শাস্তি এড়াতে দশটি বছর বৌ, ছেলে, বাড়িঘর ফেলে মানস সরোবরের এলাকায় বরফের মধ্যে কাটাতে হয়েছিল ইন্দ্রকে। বহুকষ্টে সে মামলা ধামাচাপা দিয়ে ফিরে এসে আবার স্বমহিমায় রাজত্ব দখল করতে পারা গেছে। কিন্তু গৌতমের উপর হামলা করার মতো সাহস আর নেই। ত্রিশিরা ছিল রাক্ষসদের দলের সমরথক, তাই ব্যাপারটা সহজে চাপা দেওয়া গেছিল। কিন্তু গৌতম মাস্টার ব্রহ্মাবুড়োর পেয়ারা লোক। তার গায়ে হাত দিয়ে ধরা পড়লে চিরকালের মতো রাজ্যপাট ছেড়ে ডুব দিতে হবে।

জমিটাও প্রথমে ঐ ব্রহ্মাবুড়োরই ছিল। তারপর গৌতম মাস্টারকে কিছুদিন সেটার দেখাশোনা করার কাজে রেখেছিল। কাজে খুশি হয়েই পরে সেই জমি গৌতমকে দান করে দেয়। সে সময়ে অনেকেই ঐ জমিটি বাগানোর জন্য বুড়োর কাছে দরবার করেছিল, কিন্তু কোনও ফল হয়নি। সেইসব ধান্দাবাজেরা এখনও যদি জানতে পারে জমিটা ইন্দ্র জোর করে দখল করতে চাইছে, তাহলে ঠিকই এসে বাগড়া দেবে। তাই কৌশলে কাজ সারাই ভাল। নতুন করে কোনো মামলায় ফেঁসে যাওয়া বোকামি হবে।

এইসব চিন্তায় দিন কাটছিল। গৌতমের উপর নজর রাখার জন্য লোক থাকে সবসময়। একদিন খবর পাওয়া গেল গৌতম বেরুচ্ছেন তীর্থ করতে। ইন্দ্র খবর পেয়ে নেচে উঠলেন। একটা বুদ্ধি মাথায় এসেছে, সেটা গৌতম হাজির না থাকলে সেরে ফেলতে হবে।

একদিন লোটাকম্বল বেঁধে গৌতম ঋষি বেরিয়ে পড়লেন। তীর্থ সেরে যখন ফিরে এলেন তখন জমির অবস্থা দেখে মাথা ঘুরে গেল। তিনি যখন তীর্থ করছিলেন সেই সময়ে তিনিই নাকি জমিতেও হাজির ছিলেন। এতকাল যেসব লোক দিয়ে জমিতে চাষ করানো হত তারা ফসলের ভাগ নিয়ে কাজ করত। এই দ্বিতীয় গৌতম তাদের বুঝিয়েছে চাষ করে উন্নতির আশা নেই। এই জমিতে শিল্প-কারখানা গড়লে পুরো এলাকা উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাবে। যেহেতু সকলেই এই নকল গৌতমকে জমির মালিক বলেই ধরে নিয়েছিল তাই কেউ আপত্তি করেনি। সবাই মিলে বালি-পাথর ফেলে জমিটিতে কারখানা বানানোর কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে। সেখানে আর চাষ করা চলেনা। এই জমিকে আবার চাষের যোগ্য করে তুলতে যে খরচ হবে তা দেবার ক্ষমতা গৌতমের নেই। ইন্দ্রের উদ্দেশ্যও এটাই ছিল যাতে গৌতম বাধ্য হয় জমিটা বেচে দিতে। কিন্তু একরোখা গৌতম মাস্টার ঠিক করেই রেখেছে এ জমি কারো হাতে দেওয়া হবেনা। টাকাপয়সা জমিয়ে একদিন আবার ফিরে এসে এখানেই ফসল ফলাবে। এই প্রতিজ্ঞা করে সে সেই যে গেছে, এখনো টাকার যোগাড় করে ফিরে আসেনি।

এই পর্যন্ত কাহিনী বলে বিশ্বামিত্র থামলেন। তারপর বললেন, “আমরা এখন সেই জমির উপর দিয়েই চলেছি। এক সময়ে যেখানে সোনা ফলত তা আজ বালিপাথরের তলায় ঢেকে গেছে। সব ঐ ইন্দ্রের কুবুদ্ধির ফল।“

রাম মনযোগ দিয়ে গুরুদেবের মুখে কাহিনী শুনছিলেন, তিনি চুপ করেই রইলেন। একটু পরে বিশ্বামিত্র আবার শুরু করলেন গৌতমের গল্প।

 

জমি হারিয়ে গৌতম কিন্তু চুপ করে থাকেননি। তিনি নিজে যে ঘটনার সময় অন্যত্র তীর্থ করছিলেন সেটা রীতিমতো সাক্ষীপ্রমাণ হাজির করে সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ব্যাপারটা অনেকদূর গড়িয়েছিল। এই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ইন্দ্রের হাজারো কুকীর্তি প্রকাশ পেয়ে যায়। বেনামী জমি, বাড়ি, ব্যবসা, কারখানা, কালোটাকা একের পর এক প্রকাশ পেয়ে যেতে শুরু করে। জনগণের প্রবল গালাগালির মুখে অনেক চালু ব্যবসাতেও তালা লেগে যায়। সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু ইন্দ্র খুবই চালাক লোক। বিপদ দেখে সোজা গিয়ে বিষ্ণুর পায়ে ধরে পড়লেন। এতদিন যেসব ব্যবসা লুকিয়ে চালাতেন সেগুলোর জন্য মোটা জরিমানা দিয়ে সরকারী লাইসেন্স করিয়ে ফেলে খোলামেলা চালাতে লাগলেন। এখন বিষ্ণুর কৃপায় তিনি আবার স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বড়লোকেদের শাস্তি হয়না, টাকা খরচ করলে তাদের সব দোষ মানুষ ভুলে যায়। যারা একদিন ইন্দ্রের কারখানার মাল বয়কট করে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য করেছিল তারাও আজ সব ভুলে গেছে। জনগণের স্মৃতিশক্তি চিরকালই এইরকম।

রাম জানতে চাইলেন, “গৌতমের তাহলে আজও টাকা যোগাড় করা হয়ে ওঠেনি? কেউ তাঁকে টাকা দিয়ে সাহায্য করলে তো জমিটা উদ্ধার হতে পারত!”

মুনি বললেন, “যাদের এত টাকা আছে তারা গৌতমকে চাষ করার টাকা দিতে চায় না, জমিটাই কিনে নিতে চায়। কিন্তু গৌতম তো বেচতে রাজী নয়। সে বহুদিন থেকে পুঁজির সন্ধানে ঘুরছে।“

রাম বললেন, “আপনি গৌতম মাস্টারকে খবর পাঠান, টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

 

এইরূপে অহল্যা উদ্ধার সম্পন্ন হইল।

 

শব্দার্থঃ

অহল্যাঃ হল্য নাই যাহাতে। নিখুঁত, পারফেক্ট।

অহল্যাঃ যে জমিতে হল চলেনা। চাষের অযোগ্য জমি।

স্ত্রীঃ মূল ধাতু ‘স্ত্র’, যার অর্থ গঠন / নির্মান / উৎপাদন । যে জীবদেহের মধ্যে নূতন জীবদেহ গঠন হয় তাকে স্ত্রী-জীব বলে। ইংরাজী তুল্যশব্দ STRU, যেখান থেকে এসেছে  Structure (গঠন), Construction (নির্মাণ) ইত্যাদি। মিস্ত্রী শব্দেরও মূল উৎস একই।

মহাভারতে বলা হয়েছে অন্য পুরুষ যদি কারও বিবাহিত স্ত্রীতে সন্তান উৎপাদন করে তবে তাকে ক্ষেত্রজ সন্তান বলা হয়। এখানে স্ত্রী = ক্ষেত্র।

কোরানে আরও সহজ ভাষায় বলা হয়েছে তোমাদের স্ত্রী তোমাদের শষ্যক্ষেত্র।

একইভাবে গৌতমের স্ত্রী অহল্যা মানে গৌতমের শষ্যক্ষেত্র।

0 Shares

দু পেয়ে গাধ এর ব্লগ   ৮৪ বার পঠিত