জাবালি
In this close-up image you can see the use of a dot as a placeholder in the bottom line. This dot evolved into the use of zero as a number in its own right. Photo: Bodleian Libraries, University of Oxford
The ‘front’ page (recto) of folio 16 which dates to 224-383 AD. Photo: Bodleian Libraries, University of Oxford

 

গতকালের একটি খবরে চোখ আটকে গেল। খবরটি পেয়েছিলাম সহি দৈনিক এবং পুত্তুম আলুর বড় ভাই পাকিস্তানের ডন এ। বড় ভালো লাগলো ,তাই পারসিক সভ্যতা আর জেন্দা বেস্তা ছেড়ে এইটা একটু বিস্তারিত বলতে চলে এলাম।

আমরা প্রায় প্রত্যেকেই জানি যে ভারত প্রথম গণিতে শূন্য ডিজিট টি নিয়ে আসে। এটি না এলে ওই প্রাচীন রোমান হিসেবে আর আজকে মহাকাশ বা অন্য বিদ্যা এগোতো না। আর এগোলে ও হয়তো অনেক পরে ওটার উৎকর্ষতা আসতো। যাক কি হলে কি হতো ওটা না হয় নাই ভাবলাম। কথা হলো ওই ‘শূন্য’ র আবিষ্কার এর আগে ধরা হতো নবম শতাব্দীতে হয়েছে। কারণ সর্বপ্রাচীন যে উদাহরণ পাই তাতে দেখি এই শূন্য ব্যবহার করেছিল ওটা পাওয়া গিয়েছিল গোয়ালিয়র এর একটি মন্দিরের ভাস্কর্যে। না, আজ প্রমাণিত যে এই আবিষ্কার হয়েছিল আরো অন্তত পাঁচশো বছর আগে।

 

 

সেইসময়ের প্রাচীন ভারতের সভ্যতার এক অংশ ছিল আফগানিস্তান থেকে একদম কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত। সেইদিকের কাছাকাছি, পেশোয়ার এর কাছে বাকশালী (হে হে , বাংলাদেশের জামাত বা প্রবল ভারত বিরোধীরা ওটা সেই বাকশালী নহে, লাফাবেন না!) বলে একটি গ্রামে ১৮৮১ সালে একটি পুঁথি পাওয়া যায়, পায় এক স্থানীয় চাষি যার থেকে ওটা কিনে নেন ভারত তত্ববিদ হর্নলি। এই জায়গাটির নামে ওই পাণ্ডুলিপিকে বাকশালী পাণ্ডুলিপি বলা হয়। এই পাণ্ডুলিপি ১৯০২ সাল থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত বডলিয়ান লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

 

 

পাঠক, ওই ছবির সংস্কৃত লেখার সাথে লাল রং দিয়ে মার্ক করা ডটগুলো খেয়াল করুন। ওইগুলোই সেই আমাদের গর্বের শূন্য।

অতঃপর এই শূন্যের উল্লেখিত পুঁথির রেডিও কার্বন টেস্টিং প্রমাণ করেছে, এই আবিষ্কার হয়েছে অন্ততঃ তৃতীয় বা চতুর্থ শতকে। এই শূন্যকে বোঝানো হতো ডট চিহ্নের সাহায্যে। এর প্রয়োগ ওই ডেসিমেল এর ওপর ছিল অর্থাৎ দশক, শতক, সহস্র, হাজার ইত্যাদি। মানে ওই রোমান বিটকেল X ইত্যাদির মাধ্যমে সংখ্যার জটিলতার নিরসন হয়ে গিয়েছিল আগেই। প্রসঙ্গত ভারতীয় এই শূন্য সর্বপ্রথম গাণিতিকভাবে এর সংজ্ঞায়িত করে সঠিক ব্যবহার করে। আমরা এর ওপর প্রথম কাজ করতে দেখি প্রাচীন জ্যোতির্বিদ এবং অংক শাস্ত্রের বিজ্ঞানী ব্রহ্মদেব এর রচনা ব্রহ্মসিদ্ধান্তে।

 

 

এই ‘শূন্য ‘ র মতো কী কিছু আগে বা ওইসময়ে কোথাও ছিল না?

হ্যাঁ, ছিল; কিন্তু ভাবনাটা মায়া সভ্যতার মানুষরা অংকের হিসেবে আনতে পারেন নি। অর্থাৎ শূন্যের জায়গায় ঝিনুকের মতো কিছু ব্যবহার করার কথা ভেবেছে কিন্তু ওই স্থান নির্ণয় বা য্থায্থ ব্যবহার আর কেউ করতে পারে নি, ফলে সংখ্যার সরলীকরণ বা সঠিক ভাবনায় ভাবার কাজ আর কারোর দ্বারা হয় নি। ব্যাবিলনিয় সভ্যতা এর নির্ণয় না করতে পেরে ওই জায়গাটা গ্যাপ মানে লাফিয়ে পরের ধাপে গিয়েছে। একইকথা বলেন অক্সফোর্ডের গণিতবিদ Marcus du Sautoy, এর ভিডিওটি দেখলে আরো পরিষ্কার ধারণা পাবেন।

তা এই পুঁথিটি ঠিক কীসের উপর লেখা?

এই পুঁথি আরো রহস্য তৈরি করছে, কারণ এটি এক ধরনের ব্যবসা করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর বই, আপনি এতে আলজেব্রার ব্যবহার পাবেন, খেয়াল করে! আগে আমরা জানতাম ওটা আরব থেকে এসেছে মানে আলজেব্রা, এই বই কিন্তু ওটার ধারণাও পাল্টাচ্ছে! বইটি আপনাকে শিখাচ্ছে এই সিল্করুটে বাণিজ্যিক পন্থা, অঙ্ক ব্যবহার করে কত জিনিশ কতো দামে বেচলে আপনি কতো লাভ করবেন। অনেকগুলো যদির ওপর কাজ আছে, আর যদির ওপর কাজ হয় ওই আলজেব্রার প্রয়োগে।

 

Prof. Marcus du Sautoy

 

কী বুঝলেন? উহু, আমি বলছি না, বলেছেন Du Sautoy, ছবিও দিলাম।

তাহলে তো আরো প্যাচ বাড়লো! কেন?

কারণ যদি ব্যবহারের জন্য একটা বই সেইসময়ে কেউ লিখে থাকে তা হলে এর আবিষ্কার তো আরো আগের হয়। কী বলেন?

কথা হলো এই পুঁথির সময় বের করতে এতো সময় লাগলো কেন?

আগে এই পুঁথি নিয়ে নানান পণ্ডিতের নানান মত ছিল। সর্বপ্রথম এর সময় নিয়ে একটা যুক্তিনির্ভর ধারণা দিয়েছিলেন জাপানি পণ্ডিত হায়াশি তাকাও। তিনি এই পুঁথির সময় অষ্ঠম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে ভাবেন। এই ভাবনার কারণ ছিল ওই লেখার ধরন তার সাহিত্য আর তার গাণিতিক গবেষণার ধাঁচ অনেক আধুনিক মনে হয়েছিল। সমস্যা ছিল এই পুঁথি লিখিত ছিল বার্চ গাছের পাতায় আর পাতাগুলো ছিল ভীষণ ভঙ্গুর। অতঃপর এর রেডিও কার্বন ডেটিং আমাদের সঠিক সময়ের নির্ণয় করতে সাহায্য করে। সকল সন্দেহের নিরসন হয়।

 

 

আজকের এই বাইনারি কনসেপ্ট বা ডিজিটাল যুগের মূল কিন্তু ওই শূন্যের সঠিক ব্যবহারের পথ যা দেখিয়েছে ভারত। আরো গর্বিত বোধ করি এর আবিষ্কার এতো আগে হয়েছে বলে যখন গোটা পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ জায়গায় বিজ্ঞানের চর্চা ছিল না। গর্বিত বোধ করছি বডলিয়ান গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক যখন বলেন এই প্রমাণ এটাই দেখিয়েছে যে এই উপমহাদেশ জ্ঞান বিজ্ঞানে কতো আগের থেকে কী উচ্চ জায়গায় আসীন ছিল।

এই বিষয়ে একটি ইউটিউব ভিডিও সংযুক্ত করেছি আপনাদের আরো বিশদে জানার জন্য। আরো বলি, এই পুঁথিটি সর্বসাধারণের কাছে প্রদর্শন করা হবে ৪ই অক্টোবর (৪/১০/২০১৭) এ লন্ডন সায়েন্স মিউজিয়ামে। অসাধারণ নাম দেওয়া হয়েছে এই প্রদর্শনীর, ইচ্ছা করে ওটার ইংরেজি নামটা আগে দিলাম: Illuminating India, আমার ভাষায় উদ্ভাসক ভারত! এতে ভারতের যুগে যুগে অগ্রগতির প্রতীক আর ছবি ইত্যাদি নিয়ে সাজানো হবে পুরো প্রদর্শনীটি।

লেখাটি পড়ে আপনাদের কী মনে হলো একটু জানাবেন, যদি এর ওপর আরো কিছু আলোকপাত করতে পারেন তবে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। ধৈর্যধরে পড়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।

ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই বডলিয়ান গ্রন্থাগার এবং তাদের তথ্যসূত্রকে। আর খবরের জন্য নিম্নলিখিত সূত্র’কে।

 

রেফারেন্স: 

১) DAWN: 1,800-year-old dot is first ‘zero’, say researchers

২) Youtube video: Revealing Bakhshali manuscript

৩) Youtube video: A Big Zero: Research uncovers the date of the Bakhshali manuscript

৩) Wiki: Marcus du Sautoy

৪) Science Museum: Illuminating India

৫) The Guardian: Much ado about nothing: ancient Indian text contains earliest zero symbol

৬) The Guardian: Mathematical secrets of ancient tablet unlocked after nearly a century of study

 

জাবালি এর ব্লগ   ১০৯ বার পঠিত