অর্পিতা রায়চৌধুরী

বাংলায় ইসলামের প্রথম গোড়াপত্তন হয়েছিল পীর-দরবেশদের হাতেই। তাঁদের অনেকেরই আবার ইসলাম সম্পর্কে নিজস্ব মতামত ছিল যা তাঁরা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করে গেছেন। সেই সূত্রে সহি ইসলাম কোনোকালেই বাংলার মানুষের মনে প্রভাব ফেলতে পারে নি। এমনকি সরকারিভাবেও আরবীয় ইসলামের ধারণাকে বাংলায় প্রমোট করা হত না। বাংলার মানুষ সে সময়ে ইসলাম বলতে বুঝত এক আল্লাকে স্বীকার করা, মূর্তিপূজা না করা, নিয়মিত নামাজ পড়া ইত্যাদি কিছু বেসিক নিয়ম। ভারতের মুসলমান শাসকেরা রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামের প্রসারে সাহায্য করতেন নানাভাবেই, কিন্তু সেটা কোরান-হাদিসের মতে নিখুঁত ইসলাম না হলেও তাঁদের কোনও সমস্যা হত না। মুসলমানের সংখ্যা বাড়ানোতেই আর রাজত্ব টিকে থাকলেই তাঁরা খুশী ছিলেন। অতিরিক্ত পারফেক্ট ইসলাম শিখিয়ে প্রজাদের জঙ্গী করে তুললে দেশ জুড়ে দাঙ্গার আশঙ্কা ছিল। বাদশাহরা হিন্দুস্তানে এসেছিলেন রাজত্ব করতে। হারেম ভর্তি বিবি আর দাসী ফেলে আল্লার নামে শহীদ হতে নয়। তাছাড়া দেশে কাফের না থাকলে গণিমতের মাল এবং আরবে দাসদাসী পাচারের ব্যবসাটাও নিভে যাবার কথা। মোটা লাভের জিজিয়া আদায়েও টান পড়ে যায়। অতএব তাঁরা ইসলাম প্রচারের দায়িত্বটা পীর-দরবেশদের উপরে ছেড়ে দিয়ে শান্তিতে ছিলেন। তবে মাঝেমধ্যে এইসব পীরেরা ‘ইসলাম বিপন্ন’ টাইপের আবেদন নিয়ে বাদশাহ-সুলতানদের সাহায্য চাইতেন। সেরকম ক্ষেত্রে সরকারি সেনা পাঠিয়ে কাফের খতম করে তখন ইসলাম রক্ষা করা হত।

মূল আরবীয় ভাষায় সেভাবে বাংলায় ইসলাম প্রচারিত হয় নি, তার চেয়ে ফারসীর গুরুত্ব ছিল অনেক বেশী। এমনকি শাহজাহানের পুত্র দারাশিকো হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ফারসীতে অনুবাদও করিয়েছিলেন। সরল কথায়, ভারত ও বাংলার মানুষের কাছে যে ইসলাম প্রচারিত হত তার উৎস আরব ছিল না। বিভিন্ন প্রচারক বিভিন্নভাবে মডিফায়েড ইসলাম প্রচার করতেন। এই মডিফায়েড ইসলামের মধ্যে মূল আরবীয় ইসলামের উগ্রতা আপোষহীনতার পরিমাণ অনেক কম ছিল। যদিও সব ইসলামেরই মূল কথা একই তবে মুহম্মদের সুন্নত যেভাবে “ইসলাম অথবা মৃত্যু” শর্তে তলোয়ারের ব্যবহার উৎসাহিত করে এবং অন্যদের ইতিহাস ধ্বংস করে ফেলে সেই সুন্নতী কারবার এই মডিফায়েড ইসলামে অনেকটাই কম ছিল। ভারত তথা বাংলার শাসকরা কেউওই আরবীয় ইসলামের অনুসারী ছিলেন না, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের প্রাচীন সংস্কৃতি মিশ্রিত ইসলাম মেনে চলতেন। সেই কারণেই বাংলার প্রাক্তন জীবন বিধানকে ইসলামের সঙ্গে মিশ্রিত হতে তাঁরা কোনও বাধার সৃষ্টি করেন নি; বরং নিজেরাও সহযোগিতা করেছেন। বাংলার সুলতান সিকন্দর শাহ তাঁর নির্মিত পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ নির্মাণে যে স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার করেছিলেন তাতে পারস্য এবং বাংলার ছাপ আরবীয় শৈলীর চেয়ে অনেক বেশি। এই মসজিদে আবার সুলতানের জন্য আলাদা উচ্চাসন রাখা হয়েছে যা খাঁটি ইসলামে অনুমোদিত নয়।

বাংলার সুলতানেরা উচ্চ রাজপদে হিন্দুদের যথেষ্টই গুরুত্ব দিয়ে নিযুক্ত করতেন। ১৪১০ সালে সুলতান গিয়াসুদ্দীন মারা গেলে তাঁর পুত্র সাঈফ-উদ্দীন সুলতান হলেও মূল ক্ষমতা আসে গণেশ এর হাতে। যদিও তিনি কোনোদিন সিংহাসনে বসেন নি তবুও দেশে তিনি রাজা গণেশ নামেই বিখ্যাত ছিলেন। গিয়াস-উদ্দীনের পুত্রদের অযোগ্যতার কারণে গণেশ তাঁর নিজের পুত্র যদুকে সুলতানী আসনে বসানোর চেষ্টা করলে মুসলমান আমীর-ওমরাহ এবং পীর-দরবেশরা ‘ইসলাম বিপন্ন’ স্লোগান দিয়ে মারাত্মক আপত্তি জানাতে শুরু করেন। তাঁরা বিহারের সুলতানকে বাংলা দখল করে কুফরী আধিপত্য থেকে ইসলামকে রক্ষার আবেদনও জানাতে শুরু করে দেন। ঠেকায় পড়ে গণেশ তাঁর পুত্রকে ইসলামে দীক্ষিত করে নাম দেন জালাল-উদ্দীন। যদু থেকে জালাল-উদ্দীন হবার পর আর তাঁর অধীনে বাস করতে মুসলমানদের কোনও আপত্তি হয়নি।

বাংলার সমাজে সাধারণ মুসলমানরা যে কাজেকর্মে হিন্দুদের চেয়ে খুব বেশি আলাদা হয়ে যায় নি তারও উদাহরণ পাওয়া যায় বিজয়গুপ্তের লেখায় তকাই-মোল্লার উদাহরণে।

 তকাই নামেতে মোল্লা কেতাব ভাল জানে।

কাজীর মেজবান হইলে তারে আগে আনে।।

তকাই মোল্লা কেতাব অর্থাৎ ইসলামি শাস্ত্র ভাল জানলেও একমাত্র নামাজ-সালাতের সময় কাছা খুলে বসত, অর্থাৎ কীনা অন্যসময় কাছা দিয়ে ধুতি পরত। তাবিজ-কবচও বিতরণ করত।

অন্যদিকে অভিজাত মুসলমানরা, যাঁরা একটু খরচ করে টিউটর রেখে সহি ইসলাম শিখতেন তাঁদের আচার ছিল অন্যরকম। মুকুন্দরামের লেখায়ও তার বর্ণনা আছে এইরকমঃ

বড়ই দানীশবন্দ না জানে কপট ছন্দ

প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ি।

যার দেখে খালি মাথা তার সনে নাহি কথা

সারিয়া চেলার মারে বাড়ি।

কপট ছন্দ অর্থাৎ অশুদ্ধ উচ্চারণে কোরান পাঠের বিরোধী এই জাতীয় সহি মুসলমানরা আবার তকাই মোল্লার মত দেশি আধা-মুসলমানদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন না। বরং তাঁরা সে সময়ের অভিজাত হিন্দুদের সঙ্গেই মেলামেশা করতেন, এমনকি কুটুম্বিতাও করতেন। এ ব্যাপারে হিন্দুসমাজেরও খুব বেশি আপত্তি ছিলনা। সেসময়ের অভিজাত হিন্দুরা ধর্মপালন করে স্বর্গে আনন্দ-ফূর্তি করার চাইতে রাজার-জাত মুসলমানের সঙ্গে মিশে দুনিয়াতেই আনন্দ-ফূর্তি করতে শিখে গিয়েছিলেন। যেসব ধার্মিক ব্যক্তি এইসব কথা শুনে অবিশ্বাস করবেন তাঁরা আরেকটু আধুনিক কালের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস পড়ে দেখতে পারেন। রাজার-জাত ফিরিঙ্গী-সাহেবদের সঙ্গে মিশে ফুর্তি করার সময়েও বাঙালির চরিত্র একইরকম ছিল। যেহেতু অভিজাত মুসলমান সমাজ অভিজাত হিন্দুদের কাছ থেকে কোনও বিরোধীতার সম্মুখীন হয় নি, তাই সংঘাতের সম্ভাবনাও তেমন ছিল না।

নিচুজাতের হিন্দুদের অবশ্য পীর-দরবেশরা নানাভাবেই মুসলমান বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যেত। অনেক সময়ে জবরদস্তিও চলত। কিন্তু সে ব্যাপারে অভিজাত হিন্দুদের তেমন মাথাব্যথা ছিল না। এমনিতেই সেসময় নিচুজাতের লোকদের মন্দিরে প্রবেশ করার অধিকার ছিল না, কাজেই তারা হিন্দু রইল কিনা তার চেয়ে রাজার জাতের সাপোর্ট রইল কিনা তা নিয়েই অভিজাত হিন্দুরা বেশি চিন্তিত ছিল। বাঙালির এই চরিত্রই আমরা ইংরেজ রাজত্বের জমিদার, রায়বাহাদুর, রায়সাহেব, রাজাসাহেবদের মধ্যেও অপরিবর্তিত অবস্থায় দেখেছি। গরীব বাঙালি খেতে না পেলেও তাঁরা সাহেবদের নিয়ে পার্টি দিতেন। এই জাতীয় ধর্মান্তরণে সরকারী সহযোগিতা না থাকলেও পীরের দরগায় নব্য মুসলমানদের খানাপিনার জন্য সরকারী সাহায্য দেওয়া হয়। দরগা-খানকা ইত্যাদি বানাতে জমি-জায়গাও পেতেন পীরেরা।

মহারাজ যদু ওরফে সুলতান জালালুদ্দীনের সময় থেকেই হিন্দু-মুসলিম মিলিত সংস্কৃতি বাংলায় আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৪৩৩ সালে জালালুদ্দীনের মৃত্যুর পর ইলিয়াস শাহের বংশ আবার বাংলার মসনদে ফিরে আসে। এই সুলতানেরা বাংলা ভাষার অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। সরকারি কাজে ফারসী ব্যবহার হলেও অন্য কাজে বাংলার ব্যবহার ছিল লক্ষ্যণীয়। সুলতান বারবাক শাহের আমলে মালাধর বসু রচনা করেন কৃষ্ণবিজয় কাব্য। এখান থেকেই বাংলার মানুষের কাছে কৃষ্ণের পরিচিতি বেড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে বৈষ্ণব ধর্মের কাজে এসেছিল। ইলিয়াস শাহি বংশের রাজত্বে স্থানীয় শিক্ষিত হিন্দুরাই বাইরে থেকে আসা মুসলমানদের তুলনায় অগ্রাধিকার পেতেন। সুলতান হুসেন শাহের মন্ত্রী সনাতন (পরবর্তীকালে সনাতন গোস্বামী) এবং সচিব রূপ (পরবর্তীকালের রূপ গোস্বামী) ছাড়াও রাজচিকিৎসক, এমনকি প্রধান রক্ষী (অর্থাৎ রাজভবনের চিফ সিকিউরিটি অফিসার) পর্যন্ত ছিলেন হিন্দু। হুসেন শাহের আমলে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করার কাজ শুরু হয়, যেগুলি আগে সংস্কৃত ভাষায় থাকার কারণে সাধারণ বাঙালিদের নাগালের বাইরে ছিল। এর ফলে হিন্দু-মুসলমান ধর্ম এবং বহুদেশিয় চিন্তাভাবনার সঙ্গে বাঙালির মানসিক পরিচয় ঘটে। সেযুগের সমস্ত লেখক, কবি, ঐতিহাসিকরাই এজন্য একবাক্যে হুসেন শাহের প্রশংসা করে গেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রও নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে, হুসেন শাহের রাজত্বের বাংলায় রেনেসাঁর সূচনা হয়েছিল।

ইসলামের সঙ্গে প্রবল গতিতে মিশ্রণ, নিচুতলার হিন্দুদের নানা কায়দায় ধর্মান্তর ও অভিজাত ধনী হিন্দুদের এই ব্যাপারে উদাসীনতা হিন্দু ধর্মগুরুদের ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষার সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ এনে দেয়। পণ্ডিত রঘুনন্দন ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষা করে হিন্দুদের সহি হিন্দু রাখার জন্য নানারকমের কঠিন আচার প্রবর্তন করেন। কিন্তু এসব চেষ্টা একেবারেই সমাজের উপরতলায় সীমাবদ্ধ ছিল। নিচুতলার হিন্দুরা সংস্কৃত শাস্ত্রও জানত না, এমনকি অভিজাত দেবতাদের মন্দিরে তাদের প্রবেশের কোন অধিকারও ছিলনা। অভিজাত দেবতাদের ভক্ত অভিজাত হিন্দুরাও তাদের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে আসত  না। ফলে এইসব খেঁটে খাওয়া হিন্দুদের নির্ভরতা বাড়তে শুরু করে লৌকিক দেবদেবীদের উপর। মনসা, ষষ্ঠী, ধর্মঠাকুর ইত্যাদি দেবদেবীরা মন্দিরে থাকতেন না। তাঁদের বাস ছিল গাছতলা, বটতলা, বেলতলায়; বড়জোর চালাঘরে। যেখানে সমস্ত মানুষের যাতায়াতের অবাধ অধিকার ছিল। বিশুদ্ধ হিন্দুশাস্ত্র অথবা শুদ্ধ উচ্চারণে কোরান না জেনেও তাঁদের পুজা করে তুষ্ট করা সম্ভব ছিল। পরকালে হূর-পরী-মদ পাওয়ার চাইতে তাঁদের পূজায় ইহকালেরই নানা বাস্তব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস ছিল। এইসব দেবদেবীরা খ্যাতি পাওয়ার জন্য সংস্কৃত জানা পুরোহিতের উপর নির্ভর করতেন না। তৎকালীন সমাজের প্রতিভাবান কবিদের মঙ্গলকাব্যে তাঁদের গুণগান করা হত। হিন্দুসমাজ এইভাবেই নিজেদের দেবদেবীদের নিয়ে অভিজাত হিন্দুদের উপর নির্ভরতা কাটিয়ে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এর ফলে অভিজাত হিন্দুরা আরও বেশি করে মুসলমান শাসকদের উপর নির্ভর করতে শুরু করেন। এইরকম এক সামাজিক পরিস্থিতিতে বাংলায় চৈতন্যদেবের আবির্ভাব হয়।

আলাউদ্দীন হুসেন শাহের আমলে চৈতন্যদেবের আবির্ভাব বাংলার হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে এক টার্নিং পয়েন্ট। শত শত দেবতা এবং গোত্রের কারণে বিভক্ত হিন্দুসমাজের কাছে তিনি “এক কৃষ্ণই প্রভু” তত্ব তুলে ধরে এমনই এক ভক্তি আন্দোলন শুরু করেন যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল জাতিভেদ প্রথার বিলোপ। সবচেয়ে বড় কথা হল তিনি এই আন্দোলন করেছিলেন বাংলাভাষায় এবং সম্পূর্ণ অহিংস উপায়ে এবং এর একমাত্র আচার ছিল কৃষ্ণনাম। এর ফলে জটিল ভাষার হিন্দু এবং মুসলিম শাস্ত্রের চেয়ে এটি সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়। তবে জন্মগত জাতিশ্রেষ্ঠতার বিরুদ্ধে তিনি যখন কৃষ্ণভক্তির জন্য যবন হরিদাসকে ব্রাহ্মণদের চেয়েও বড় বলে ঘোষণা করেন তখন জাতিভেদ প্রথার সমর্থক ব্রাহ্মণেরা এবং জাতিবিদ্বেষী মোল্লারাও তাঁর উপর খেপে ওঠে। কিছুকালের মধ্যেই চৈতন্যদেব হঠাতই মিসিং হয়ে যান। পুরোহিতেরা প্রচার করে মন্দিরের দেবতার মধ্যে তিনি বিলীন হয়ে গেছেন। সম্ভবত তাঁকে খুন করে মন্দিরের মধ্যেই পুঁতে ফেলা হয়েছিল। ভক্তিবাদ প্রচারের মাধ্যমে হিন্দুধর্মকে সেকালের ইসলামের তুলনায় উপরে তুলে দিতে পারলেও একই সঙ্গে চৈতন্য সাধারণ মানুষের বাস্তব চিন্তাকে অবরুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর রহস্যময় অন্তর্ধানের পরেই তাঁর অধিকাংশ চেলা বাংলা ছেড়ে বৃন্দাবনে চলে যান এবং বাংলাভাষার পরিবর্তে সংস্কৃততে তাঁদের ধর্মীয় তত্ব লেখালেখি করতে থাকেন। কয়েক বছরের মধ্যেই বৈষ্ণব ধর্মও হিন্দুধর্মের একটি শাখা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং সেখানেও জাতিভেদ প্রথা ঢুকে পড়ে ও গুরুগিরির বাড়াবাড়ি শুরু হয়।

পোস্ট অতিরিক্ত বড় না করে সংক্ষেপে এটাই বলা যায় যে বিজয়ী মুসলমানের এই মানসিকতা বাংলায় বহুকাল ধরেই চলেছিল। যেহেতু সহি ইসলামে রাজতন্ত্রের সমর্থন নেই কাজেই শাসকেরা সহি ইসলামের ব্যাপক প্রচারে উৎসাহী ছিলেন না। সামান্য কিছু পীর-দরবেশই সহি ইসলাম নিয়ে মাথা ঘামাতেন। যার ফলে বাংলার মানুষ সহি ইসলামের অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত ছিল। ভারতে ঔরঙ্গজেব সহি ইসলাম প্রতিষ্ঠার কিছুটা চেষ্টা করলেও বাংলায় তাতে সফলতা মেলেনি। ইংরেজ আমলেও সহি ইসলামের তেমন কোনও প্রভাব বাংলার মানুষের উপরে ছিল না।

বাংলায় যাকে ইসলামের সুবর্ণযুগ বলা হয় সে সময়ে যে জিনিসটা একেবারেই অনুপস্থিত ছিল তা হল সহি ইসলাম, মহম্মদী সুন্নত এবং পিছিয়ে যাওয়ার প্রবণতা। সত্যকথা বলতে গেলে সে সময়ের বাংলার মুসলমানেরা বেশিরভাগই আল্লার উপাসক হলেও আরবে উৎপাদিত সহি ইসলামের অনুসারী ছিলেন না। বাংলাকে কাফেরশুন্য ইসলামী দেশে পরিণত করার কোনো পরিকল্পনাও তাঁদের ছিলনা। তাঁদের সর্বময় নেতা খলিফাও আরবের ছিলেন না। আরব সেকালে কোনও স্বাধীন দেশ ছিল না। তাই ইসলামি শাসনব্যবস্থার পলিসিমেকার হিসাবে তাদের ক্ষমতাও ছিল অতি সামান্য। মক্কা-মদীনার ধর্মীয় গুরুত্ব থাকলেও রাজনৈতিক গুরুত্ব একেবারেই নগণ্য ছিল। ইংরেজ রাজত্বেও হিন্দু-মুসলমান বিরোধ বলতে এটুকুই ছিল যে, অভিজাত মুসলমানেরা কখনও হিন্দুদের উন্নতি এবং প্রাধান্য মেনে নিতে পারত না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর খলিফার ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের সাহায্য নিয়ে আরবের স্বাধীন রাজা হিসাবে শাসনভার গ্রহণ করেন আব্দুল আজিজ ১৯২৬ সালে। এসময় তিনি নিজেকে কিং অফ হেজ্জাজ ঘোষণা করেন। ১৯২৭ এর ২০ মার্চ ব্রিটেন এই রাজ্যকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ১৯৩২ সালে কিং অফ হেজ্জাজ তাঁর প্রতিবেশি নাজ রাজ্য দখল করেন এবং এই মিলিত রাজ্যের নাম হয় কিংডম অফ সৌদী আরব। এভাবেই মক্কা-মদীনার মতো ধর্মীয় স্থান দুটির উপর আরবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেইসঙ্গে ইসলামী জগৎকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও তাদেরই হাতে এসে যায়।

সৌদি আরব দেশ হিসাবে নিতান্তই দরিদ্র দেশ। একমাত্র খনিজ তেল ছাড়া আর কিছুই নেই যা দিয়ে দুনিয়ায় তাদের আধিপত্য বাড়ানো যায়। এই খনিজ তেলও আবার ব্যবহার করার মত প্রযুক্তির অভাবে তাদের নিজেদের হাতের বাইরে। সামান্য কিছু রয়্যালিটির বিনিময়ে এই তেল বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতেই চলে গেছে। সেই তেলেরও পরিমাণ সীমিত। এর আগে ইসলামের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে ছিল সেই তুর্কী সাম্রাজ্যের বিশাল সম্পদের কারণে কখনো ইসলাম নিয়ে ব্যবসার প্রয়োজন পড়ে নি। কিন্তু সৌদী আরবের কাছে সামরিক, অর্থনৈতিক, খনিজ, প্রাকৃতিক এমনকি মেধাভিত্তিক সম্পদ একেবারেই শুন্য। মূলধন বলতে শুধুমাত্র ইসলামই আছে যা দিয়ে বিশ্বের দরবারে নিজের দর বাড়ানো যায়। তেলের পরেই রোজগার বলতে আছে হজ্বপ্রার্থী মুসলমানদের কাছ থেকে পাওয়া টাকা। অতএব খুবই স্বাভাবিকভাবেই সৌদী সরকারের কাছে প্রাইম টার্গেট হয়ে ওঠে দুনিয়া জুড়ে তাদের একমাত্র ব্যবসা ইসলামের প্রচার এবং প্রসার। এতদিন যে পালিশ করা মডিফায়েড ইসলাম বিখ্যাত ছিল তার পরিবর্তে খাস আরবে উৎপাদিত সহি মুহাম্মদী ইসলাম এসে যায় বিশ্ববাজারে। মডিফায়েড ইসলামের মধ্যে যে সততা, উদারতা, দেশপ্রেম এবং মানবতা ছিল তার বিন্দুমাত্রও সহি মুহাম্মদী ইসলামে ছিল না। মুহাম্মদী ইসলামের সাফল্যের মূলেই ছিল মিথ্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা, বিশ্বাসঘাতকতা, নিরীহ মানুষের গণহত্যা এবং বিধর্মীদের উপর বিনা কারণে অত্যাচার। ঠিক যেভাবে সব বিষয়ে অযোগ্য মুহাম্মদ কেবল ইসলামের ব্যবহার করে মহাশক্তিশালী নেতা হয়েছিলেন সেই একইভাবে আরবের কোনো যোগ্যতা না থাকলেও ইসলামের ব্যবহার দিয়েই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হতে চায়। যার পরিণাম আমরা সারা বিশ্বসহ বাংলাদেশের সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি। এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হতে পারে আরব দেশে রাজতন্ত্রের বিলোপ এবং ব্যাপক আধুনিকীকরণের মাধ্যমে, যেটা আদৌ সম্ভব বলে মনে হয়না। বিকল্প সমাধান হচ্ছে মুসলমানের মাথা থেকে আরবীয় আনুগত্য বিলোপ করা, যা কেবল লেখালেখির মাধ্যমেই সম্ভব। তাই সহি ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কোনও শর্টকাট পথ নেই। লাগাতার কলম চলেছে, চলবে।

———————————-

তথ্যসম্ভারঃ

১) গোলাম মুরশিদঃ হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি

২) চণ্ডীমঙ্গল

৩) মনসামঙ্গল

৪) চৈতন্যচরিতামৃত

৫) রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ বাঙ্গালার ইতিহাস

৬) আহমদ রফিকঃ দেশবিভাগ- ফিরে দেখা

৭) ডঃ আহমদ শরীফঃ দর্শনচিন্তা

৮) সৈয়দ রশীদ আহমদ জৌনপুরিঃ কোরান, হাদিস ও সুফীতত্ত্বের ভূমিকা

0 Shares