কাকন রেজা

মাঝেমধ্যেই বিভ্রান্ত হই, কোনটা লেখার বিষয় কোনটা নয়, তা নিয়ে। প্রায়োরিটি নির্ধারণ করতে গিয়ে পড়ি বিপাকে। ‘ফিনল্যান্ড কেন বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ এবং আমাদের সমস্যা’ এটা বেশি জরুরি; না, জামালপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ কবীরের ‘সেক্স স্ক্যান্ডালে’র আলোচনা বেশি প্রয়োজনীয়, সেই প্রশ্নে রীতিমত বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি।

দু’দিন ধরে মাধ্যমে, গন ও সামাজিক উভয়েই চলছে জামালপুরের ডিসি’র যৌনতা বিষয়ে প্রামাণ্য চর্চা। এমন চর্চা নিয়েই বিভ্রান্ত হই। কারণ আমার পাশের জেলা হওয়ায় ওই ডিসি সম্পর্কে যতটা জেনেছি, তাতে যৌনতায় তেমন পারঙ্গম না হলেও দুর্নীতিতে তিনি পারঙ্গম।

জামালপুরের ওএসডি জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ কবীর

দুর্নীতির অনেক অভিযোগ ও কেচ্ছাকাহিনী রয়েছে তার বিপরীতে। অথচ যৌনতার বিষয়টি যতটা প্রাধান্য পেয়েছে ততটা প্রাধান্য পায়নি সে সব অভিযোগ প্রমাণের প্রচেষ্টা। অথচ অমনসব অভিযোগের সঙ্গে জেলাটির উন্নয়নের প্রশ্ন অনেকটাই জড়িত।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এমনই দুই সরকারি কর্মচারীর মামলার বিষয়ে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে মামলাটি খারিজ করে দিয়েছিলেন। এক মহিলা আধিকারিক তার ঊর্ধ্বতনের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছিলেন। তখন সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছেন, বিয়ে হবে কিনা, যেখানে এমন প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে ওই মহিলাটি নিজ ইচ্ছায় দৈহিক সম্পর্ক করেছেন।

আর নিজ ইচ্ছার এই সম্পর্ক ধর্ষণের মধ্যে পড়ে না। তাই কোর্ট মামলাটিকে খারিজ করে দিয়েছেন। সেই দৃষ্টিতে জামালপুরের ডিসি’র সেই যৌনসঙ্গী যদি ধর্ষণের মামলাও করেন, তাও নৈতিকতার সঙ্গে যায় না। অথচ এখানে বিষয়টি ঘটেছে দুজনের সম্মতিতে। যতটুকু ভিডিও প্রচার করেছে মাধ্যমগুলো, ততটুকুতে ওই মহিলার আগ্রহের কোন কমতি দেখা যায়নি। সুতরাং দুজন নর-নারী স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্কে মিলিত হলে তা কতটা দোষের তাও ভেবে দেখার বিষয়।

বিশেষ করে যারা নারীবাদের কথা বলেন, যারা তাসলিমা নাসরিনের অবাধ যৌনতার অনুসারী, তাদের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা দরকার। আমাদের দেশের নারীবাদীরা বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে কেন যেন চুপ মেরে যান। তাদের এই নীরবতার হেতু বোঝা যদিও খুব একটা মুশকিলের কাজ নয়, তবুও এই নীরবতা তাদের অন্য সময়ের সরবতাকে সাধারণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

যাক গে, কেউ হয়তো ভাববেন জামালপুরে প্রেম রসিক ডিসি’র পক্ষে আমি যুক্তি উপস্থাপনে বসেছি। এই ভুলটা করবেন না। যেভাবে করেছেন ডিসি’র দুর্নীতির বিষয়টিকে প্রায়োরিটি না দিয়ে যৌনতাকে অগ্রগামী করায়। এতে হয়তো কিছুটা সাময়িক আনন্দ পাওয়া যাবে, কিন্তু লাভ হবে না কিছুই। যতটা হতো ডিসি’র কোন দুর্নীতি ঠেকানো গেলে। যার সঙ্গে জেলার মানুষের প্রয়োজন জড়িত ছিল।

ধরুন, একটা গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প। যেখানে অনেক ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয়ণ হবার কথা, অথচ একজন জেলা প্রশাসক বা ওই লেভেলের কারো দুর্নীতির কারণে সেই গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় পেলো প্রভাবশালীদের আশ্রয়পুষ্টরা, যারা সামর্থ্যবান। এটার বিরুদ্ধে কথা বলা বেশি প্রয়োজন; না, ওই জেলা প্রশাসক বা ওই লেভেলে কেউ কার সঙ্গে বিছানাবদ্ধ হলেন সেটা বেশি প্রয়োজন।

যদি মনে করেন, জেলা প্রশাসকের বিছানাবদ্ধের কাহিনীর বেশি প্রয়োজন, তবে নিশ্চিত ধরে নিন মানসিকভাবে আপনিও মর্ষকামী এবং বিকৃতমনা। জামালপুরের ডিসি প্রকল্পের নামে বা অন্য কোন কাজে কারো কাছ থেকে ঘুষ নিচ্ছেন এমন ভিডিও যদি প্রচারিত হলে সেটা হত কাজের কাজ। দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতো তা।

এমন কাজতো বিভিন্ন সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রতিদিন চলছে। ঘুষ লেনদেন হচ্ছে, মানুষকে হয়রানীর প্ল্যান করা হচ্ছে। মামলা-হামলায় মদদ দেয়া হচ্ছে। জোর করে অন্যের সম্পত্তি লিখে নেয়া হচ্ছে। আরও কত কিছু হচ্ছে। আর এসবে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্র।

বিপরীতে জামালপুরের ডিসি নয় অফিসে তার মহিলা সহায়কের একটু ব্যক্তিগত সহায়তা নিয়েছেন। এতে তো কারো কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয়নি, রাষ্ট্রও বড় কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। যা হয়েছে তা হলো দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বিষয়ে। মূলত জামালপুরের ডিসি’র অপরাধ হচ্ছে তার স্ত্রীর কাছে, পরিবারের কাছে। বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ। মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তার স্ত্রী ও স্বজনরা। ডিসি’র কথা বাদ দিলাম। এমন ভিডিও প্রকাশের কারণে তার স্ত্রী সন্তানের মানসিক অবস্থাটা কী, চিন্তা করে দেখেছেন কেউ!

বলতে পারেন, তাদের দোষ কী? যারা ডিসি’র ভিডিওটি পুরোটা খুঁজে বের করে দেখেছেন এবং মজা নিয়েছেন তারাই তো প্রশ্ন করে বিব্রত করবেন ডিসি’র স্বজনদের। সেই স্বজনরা মরমে মরে যাবেন। তাদের সারা জীবনে আর মাথা তুলে দাঁড়ানো হবে না। যেহেতু সমাজটা আপনাদের মতন মর্ষকামীদের, বিকৃতমনাদের। যারা অন্যের যৌনতার কথা বলে নিজের মনের মর্ষকামটাকে আরেকবার ঝালিয়ে নেয়। এই ডিসিকেই নাকি শুদ্ধাচারের সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছিল বিভাগীয়ভাবে। একজন দুর্নীতির অভিযোগগ্রস্ত, নানা অপকর্মের সহায়ক এবং কারিগর। তাদের যেসব কাজ রাষ্ট্রের বুনিয়াদটাই নষ্ট করে দিয়েছে, তাদেরকেই দেয়া হয় শুদ্ধাচারের সার্টিফিকেট।

বলিহারি যাই! আর আমরা সে সব না দেখে, দেখি তার যৌনতাকে। যে যৌনতা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিতে হয়েছে। একটু পড়ে দেখবেন, আইন উভয়ের সম্মতির ব্যাপারে কী বলে। আরে ভাই, এরা তো দেশটাকেই ধর্ষণ করছে প্রতিনিয়ত। সেটা না দেখে আপনি দেখছেন দুজনের সম্মতিতে যৌনতার ব্যাপারটিকে! আলেকজান্ডার থাকলে সেলুকাসকে ডেকে সত্যিই বলতেন, ‘সেলুকাস, বড় বিচিত্র এই দেশ।’

0 Shares
কাকন রেজা এর ব্লগ   ২৬৪ বার পঠিত