শ্রীশুভ্র

অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুতে উল্লসিত চাপাতির কারবারীরা আজ শান্তিতে আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু জনমানসে অভিজিতের অভিঘাত কি সত্যইই ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে পেরেছে? যদি পারতোই তবে আজ অভিজিতের জন্মদিন পালন হতো না নিশ্চয়ই। যে মানুষকে শেষ করে দেওয়া হলো, তাঁর জন্মদিন পালন এই কথাই প্রমাণ করে মানুষটিকে শেষ করে দেওয়া গেলেও তাঁর চেতনাকে শেষ করে দেওয়া যায়নি। মানুষটিকেই খুন করা যায়। কিন্তু খুন করা যায় না তাঁর চেতনাকে। মানুষটি বেঁচে থাকলে যতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন আজ মৃত্যুর অভিঘাতে তার থেকে অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে থাকবেন আগামী দশকগুলিতে। এটাই মানুষের ইতিহাস। জীবিত অভিজিৎকে কজনই বা চিনতেন? জানতেন তাঁর কাজকর্ম? পড়তেন তাঁর লেখা? কিন্তু অভিজিৎ খুনের পর আবিশ্ব সুস্থচিন্তার মানুষের চেতনায় অভিজিৎ পরিচিত হয়ে উঠলেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসাবে। এইখানেই তিনি অমর হয়ে গেলেন। ভোঁতা করে দিলেন চাপাতির যাবতীয় ধার। হারিয়ে দিলেন চাপাতির কারবারীদের। হারিয়ে দিলেন তাঁর চেতনার অমেয় অভিঘাতে।

তবে কী চাপাতির কারবারীদের হিসাব নিকাশেই ছিল ভুল? এমনটাই যে হবে, হতে পারে ভাবতে পারেনি তারা? না বিষয়টি আদৌ নয় সেরকম। চাপাতির কারবারীরা অতশত ভাবাভাবির মধ্যেই থাকে না। তাদের এতসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারই পড়ে না। মাথা থাকলে তো মাথা ঘামানো! তারা শুধু জানে চাপাতি চালাতে। সেখানেই তাদের যাবতীয় দক্ষতা। কার ওপর চালাতে হবে, কখন কোথায় চালাতে হবে সেটা ঠিক করে দেওয়ার লোক আলাদা। চাপাতির কারবারীদের শুধু হুকুম পালন করতে হয় নিখুঁতভাবে। একটার পর আরেকটা। তাই অভিজিতের পর একে একে ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত,  নিলয়। তাদের কাজ সেখানেই শেষ। কিন্তু এই হত্যাযজ্ঞের মূল পুরোহিত যারা, তারা ঠিকই হিসাব রাখেন সবকিছুর। সবকিছুই তাদেরই নখদর্পণে। তারা জানেন শাহবাগ আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়ার সহজতম রাস্তাই ছিল ব্লগার হত্যা। তাই রাজীব হায়দারের মাথাতেই চাপাতির শান দেওয়া শুরু হয়েছিল ঠিক মোক্ষম সময়ে। তারা জানেন ব্লগার হত্যাযজ্ঞ সংঘঠিত না করলে ধর্মীয় মৌলবাদের চারাগুলিকে ঠিকমতো লালন পালন করে বড়ো করে তোলা যেত না। তারা জানেন সারাদেশকে হেফাজতের হেফাজতে নিয়ে আসার কাজে বড়ো বাধা হয়ে উঠতে পারত শাহবাগ আন্দোলন থেকে শুরু করে ব্লগার আন্দোলনের ধারাবাহিকতাই। তাই ধারাবাহিক ব্লগার হত্যা। অভিজিৎ তাদের কাছে সেই ধারাবাহিকতার একটি গ্রন্থী মাত্র। তার বেশি কিছু নন। তাঁকে তার বেশি গুরুত্ব দিতেও নারাজ ব্লগার হত্যাযজ্ঞের এই পুরোহিতকুল। তাই অভিজিৎ নন, তাদের লক্ষ্য আপামর জনসাধারণ। সেই জনসাধারণের কাছে সঠিক সময়ে সঠিক বার্তাটি ঠিকমতো পৌঁছিয়ে দিতেই খুন হতে হয়েছিল অভিজিৎ রায়দের।

এবং বার্তাটি যে কতোটা কার্যকরি হয়েছিল সেটা বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিক চোখ রাখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। দেশের জনসাধারণকে নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে পারলেই এক ঢিলে দুই পাখি মারাও হয়ে যায়। পরবর্তী সুস্থচিন্তার মানুষদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করে দিয়ে তাদের শক্তিশালী কলমের গতিকে রুদ্ধ করে দেওয়া এবং আপামর জনসাধারণকে ধর্মীয় মৌলবাদের বলয়ে টেনে নিয়ে আসা। তাহলেই গোটা সমাজকেই মৌলবাদী সংস্কৃতির ঘেরাটপে বন্দী করে ফেলে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত করা অনেক সহজ হয়ে ওঠে। ঠিক যেমনটি ঘটানো সম্ভব হয়েছিল এই সেদিন আফগানিস্তানে। হ্যাঁ অভিজিৎ রায়দের হত্যার উদ্দেশ্য এইভাবে একটার পর একটা সাফল্যের সিঁড়ি টপকে টপকে চলেছে। বাংলাদেশের সমাজকে ধর্মীয় মৌলবাদী উন্মাদনায় বন্দী করে ফেলতে পারলেই উপমহাদেশে অস্ত্র ব্যাবসাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক সমীকরণগুলিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থের অধীনে রাখা অধিকতর সহজ হয়ে উঠবে। লক্ষ্য করে দেখলে দেখা যাবে এই একইসময় সীমায় ভারতবর্ষেও হিন্দু মৌলবাদী শক্তির অভুতপূর্ব উত্থান ঘটতে শুরু করেছে। এবং ভারতবর্ষেও এরই মধ্যে সুস্থচেতনার একাধিক প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব খুন হয়ে গিয়েছেন। কালবর্গী দাভেলকর পানসের ও অতিসাম্প্রতিক গৌরী লাংকেশ। ফলে বাংলাদেশের ব্লগার খুন ও ভারতে প্রতিবাদী মুখগুলির হত্যা সবকিছুই একইসূত্রে বাঁধা। কেউ আগে কেউ পরে। কেউ ইসলামি মৌলবাদের চাপাতিতে কেউ হিন্দু মৌলবাদের বুলেটে।

অর্থাৎ দেওয়াল লিখনটি কিন্তু পরিস্কার। ভারতীয় উপমহাদেশে এখন মৌলবাদের প্রহর শুরু হয়ে গেল। পাকিস্তানতো তৈরিই ছিল। বাকি ছিল ভারত ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশেও মৌলবাদী রাজনীতির জমি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে উঠেছে দীর্ঘ চার দশকের নিপুণ অধ্যাবসায়ে। এবার লক্ষ্য ভারতবর্ষ। দুই দিকে ইসলামি মৌলবাদ আর মাঝখানে হিন্দু মৌলবাদ। বিশ্বরাজনীতির এবারের রঙ্গমঞ্চ তাই ভারতীয় উপমহাদেশ। বাংলাদেশ সেই রঙ্গমঞ্চেরই একটি অংশ। ব্লগার হত্যা সেই রঙ্গমঞ্চের প্রস্তুতিরই একটি অঙ্গ। অভিজিতের মৃত্যু সেই অঙ্গেরই একটি ধাপ মাত্র। তার বেশি কিছু নয়। তাই অভিজিতের জন্মদিন নিয়ে কজন বাঙালি কোলাহলে মেতে উঠল কী উঠল না, সেটা যেমন চাপাতির কারবারিদের মাথা ব্যাথার বিষয়ও নয়, তেমনই চাপাতিবাজদের প্রভুদেরও চিন্তার বিষয় নয়। কারণ তারা জানে কখন কোথায় কোন স্ক্রুটি কতটা টাইট দিতে হবে। কীভাবে দিতে হবে। সেসবই তাদের নখদর্পণে।

আজ অভিজিতের জন্মদিন তাই কেবলমাত্র ব্যক্তি অভিজিতকে স্মরণের দিন নয়। অভিজিতদের দর্পণে আজকের পরিস্থিতি স্পষ্ট বুঝে নেওয়ারও দিন। অভিজিতরা আসবে যাবে। জনসাধারণকেই ঠিক করতে হবে অভিজিতদের রক্ষার দায় কাদের। একটি অভিজিতের হত্যা নাস্তিক হত্যার নৈতিক সমর্থনে যেদিন অভিষিক্ত হয়ে উঠলো, সেদিনই কিন্তু কপাল পুড়লো বাংলাদেশের। দেশের জনসাধারণ, আপামর জাতিসত্ত্বা যতদিন না এই মহাসত্য উপলব্ধি করতে সমর্থ হবে ততদিন অভিজিতদের হত্যা করা হবে প্রতিনিয়ত। বারবার। অভিজিৎ তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে যে চেতনার সম্প্রসারণ ঘটাতে চেয়েছিলেন, সেই চেতনার সম্প্রসারণকেই সবচেয়ে বেশি ভয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির। যে কোন দেশে যে কোন জাতিসত্ত্বায় সেই চেতনার সম্প্রসারণ ঘটে গেলে, সেই দেশ ও সেই জাতিকে আর কাঠপুতুলের মতো নিয়ন্ত্রণে রেখে সর্ববিষয়ে খর্ব করে রাখা যায় না। সম্ভব হয় নয় নানান ছলে সেই দেশের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ চালানো। সম্ভব হয় না রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখা। সেইখানেই সবচেয়ে বেশি ভয় এই অপশক্তির। তাই দুই একটি অভিজিতের মৃত্যু তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশায় এতটাই মহার্ঘ্য। এই হত্যাযজ্ঞের ধারালো হাতিয়ারেই জনগণকে মৌলবাদী চেতনায় আবদ্ধ করে রাখা ও সুস্থচেতনার পথে এগোতে ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলা সহজ হয়ে ওঠে।

অভিজিতের জন্মদিন তাই সম্বিত ফেরানোর দিনও বটে। আমরা কী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে নিজেদের বলি দেব‌ কোরবানির পশুর মতো? না কী অভিজিতদের চেতনাকে আরও সম্প্রসারিত করতে থাকবো প্রত্যেকের নিজস্ব বলয়ে। ধর্মীয় মৌলবাদের শিকার হওয়া বা সেই মৌলবাদের ক্রীড়নক হয়ে ওঠা মনুষ্যত্বেরই চূড়ান্ত অপমান। একদিকে একুশ শতকের উন্নত প্রযুক্তির বাহবা দেবো তার সকল সুযোগ সুবিধে ভোগ করবো, আর একদিকে মধ্যযুগীয় মৌলবাদের অন্ধকার চর্চায় নাস্তিক হত্যার নৈতিক সমর্থনে বেশি করে হিন্দু কী মুসলিম হয়ে উঠবো- এই দ্বিচারীতা মানুষের পক্ষে শোভনীয় নয়। বাঙালির পক্ষে তা আত্মহত্যারই নামান্তর।

তাই অভিজিতের জন্মদিন নতুন করে ভাবা শুরু করার দিনও বটে। নতুন করে চেতনাতে শান দেওয়ার এই হলো উপযুক্ত সময়। আমাদের ঠিক করে নিতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ। আমাদের ঠিক করে নিতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ কী আমরাই রচনা করবো, না কী সেটার নীলনকশাও তৈরি হয়ে আসবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আঁতুড়ঘর থেকে। ধর্মীয় মৌলবাদের পারস্পরিক হানাহানির মধ্যেই আমাদের শান্তি না কী উন্নততর প্রযুক্তির হাত ধরে বিজ্ঞানসম্মত জীবনশৈলীর মধ্যেই আমাদের প্রকৃত উন্নতি। আমাদের ঠিক করে নিতে হবে ধর্ম আগে না দেশ আগে। আমাদের ঠিক করে নিতে হবে সাম্প্রদায়িকতার চেতনা বড়ো না স্বাদেশিকতার চেতনা বড়ো। আমাদের ঠিক করে নিতে হবে মানুষের সার্বিক উন্নতিই মূল লক্ষ্য না কী সাম্প্রদায়িক স্থবিরতরাই আসল কাম্য। আমাদের ঠিক করে নিতে হবে আমরা সভ্যতার সাধক না কী মধ্যযুগীয় বর্বরতার ধারক বাহক। আমাদের যাত্রা সামনের দিকে না কী পেছনের দিকে? দেখতে হবে এই সমস্ত সিদ্ধান্তগুলিই যেন আমরা নিজেরাই নিতে পারি। কোন বাইরের শক্তি ছলে বলে কৌশলে কোনভাবেই যেন এই সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি নেওয়ার থেকে আমাদেরকে বিরত করতে না পারে। কোনভাবেই যেন তাদের নীলনকশায় বন্দী করে ফেলতে না পারে আমাদেরকে। আমাদের চেতনার যাবতীয় স্বাধীনতাকে। মৌলবাদই হোল সেই হাতিয়ার, যা দিয়ে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয় চেতনার যাবতীয় স্বাধীনতা। আর না পারলেই তখন উস্কিয়ে দেওয়া হয় ধারালো চাপাতি। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যত ধারালোই হোক; চাপাতির সংখ্যা কিন্তু জনসংখ্যার থেকে অনেক অনেক কম। কোন হিসাবেই আসে না। তাই জনসংখ্যা যেদিন বিচ্ছিন্ন সংখ্যা গণনায় আবদ্ধ না থেকে জনসম্পদে রূপান্তরিত হয়ে একটি জাতি হিসাবে জমাট বাঁধতে পারবে, সেদিন কিন্তু চাপাতির ধার ভোঁতা হয়ে যেতে বাধ্য। ব্যর্থ হতে বাধ্য নীলনকশার যাবতীয় ষড়যন্ত্র। অভিজিতের জন্মদিন হয়ে উঠুক সেই লক্ষ্যে অবিচল থেকেই শপথ নেওয়ারও দিন।

শ্রীশুভ্র

কলকাতা, ভারত; ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

শ্রীশুভ্র এর ব্লগ   ৫৮ বার পঠিত