শান্তা মারিয়া

 

নারীর ওপর পারিবারিক নির্যাতন নতুন কোনও বিষয় নয়। শত শত বছর ধরে আমাদের সমাজে নারীর ওপরে চলছে পারিবারিক নির্যাতন। আদিম সাম্যবাদী সমাজে নারী ছিল স্বাধীন। সে সময় সামাজিক ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল মায়ের হাতে। ছোট ছোট দলে বিভক্ত মানব সমাজে মায়ের কর্তৃত্ব ছিল প্রধান এবং মায়ের ক্ষমতা ছিল নিরঙ্কুশ। প্রকৃতি প্রদত্ত যে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী নারী অর্থাৎ সে সন্তান জন্মদানে সক্ষম সেই বিশেষ ক্ষমতাই ছিল নারীর শক্তির উৎস। তখন সম্পত্তির ধারণা বিকশিত হয়নি।

 

সমাজ বিকাশের ধারায় সম্পত্তির ধারণার বিকাশের পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে পিতৃতন্ত্র। পিতৃতন্ত্র যতই শক্তি অর্জন করেছে ততোই নারীর ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। নারী পরিণত হয়েছে পুরুষের জঙ্গম সম্পত্তিতে।

 

ইতিহাসের আলোচনা ছেড়ে, আমরা যদি বর্তমানের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, বাংলাদেশে ৮০ দশমিক ২ ভাগ নারী বিবাহিত জীবনে কোন না কোন সময়ে আর্থিক, শারীরিক, কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান হলো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০১৫ এর। ২০১১ সালে এই হার ছিল ৮৭ ভাগ। আমাদের দেশে নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধে ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইন, ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত ২০০৩) এবং ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা ও সুরক্ষা আইন রয়েছে। কিন্তু তারপরও ৮০ ভাগ নারী নির্যাতনের শিকার। আর যদি ধরা যায় মানসিক নির্যাতনের কথা তাহলে হয়তো দেখা যাবে ৯৫ শতাংশ নারীই পারিবারিক নির্যাতনের শিকার।

 

পারিবারিক নির্যাতনের মূল কারণগুলোকে দূর করা না গেলে এই নির্যাতনের অবসান হবে না। পারিবারিক নির্যাতনের মূল কারণ হলো পরিবারের ভিতরে নারী-পুরুষের অসম ক্ষমতা সম্পর্ক। বর্তমান পারিবারিক কাঠামোতে পুরুষ হলো শোষক এবং নারী শোষিত শ্রেণি। কথাটি ব্যাখ্যা করছি।

 

প্রথমে তাকানো যাক স্বামী শব্দটির উপর। স্বামী মানে প্রভু। স্বামী মানে অধিকারী বা মালিক। স্বামী কার মালিক? অবশ্যই গৃহের এবং গৃহে অবস্থিত নারীর। ইংরেজিতে হাসবেন্ড প্রাচীন নর্স শব্দ হাস এবং বন্ডি থেকে এসেছে। হাস শব্দের মানে বাড়ি আর বন্ডি হচ্ছে মাস্টার অফ দ্য হাউজ বা বাড়ির মালিক। প্রাচীন ইংরেজিতেও হাসবেন্ড শব্দটির মানে হলো মাস্টার অফ দ্য হাউজ।

 

মধ্যযুগীয় ইংরেজি সাহিত্যেও আমরা দেখি নারী তার স্বামীকে মি লর্ড বলে সম্বোধন করছে। বাংলাতেও স্বামীকে প্রভু বলা হচ্ছে মধ্যযুগীয় সাহিত্যে। তার মানে নারীর শ্রমশক্তি, যৌনতা ও উৎপাদিত সন্তানের মালিক হচ্ছে তার স্বামী। একজন যদি মালিক হয় তাহলে অবধারিতভাবে অন্যজন দাস, শ্রমিক বা তার কর্মচারী হতে বাধ্য। এই মালিকানা পুরুষ ফলায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার জেরে।

 

কৃষিপ্রধান দেশ আমাদের। এখানে কৃষিক্ষেত্রে নারী ফসল মাড়াই, বীজ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে শ্রম দিলেও ফসল কিন্তু বিক্রি করে পুরুষ। তাই অর্থনৈতিক ক্ষমতাটি থাকে পুরুষের হাতে। গ্রাম ও শহরের সাধারণ পারিবারিক কাঠামোর দিকে তাকানো যাক। সাধারণত ধরে নেওয়া হয় পুরুষ অর্থ উপার্জন করবে আর নারী সন্তান পালন ও গৃহে শ্রম দিবে। অর্থ উপার্জনকারী পুরুষ মনে করছে যেহেতু আর্থিক ক্ষমতা তার হাতে তাই নারীর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। সে চাইলে নারীকে শারিরীকভাবে নির্যাতন করতে পারে, করতে পারে অন্যান্য নির্যাতনও। গৃহের মালিক পুরুষ আর নারী তার অধীনস্ত শ্রমিক। ভাত-কাপড় দেওয়ার বিনিময়ে সে নারীর শ্রম ও যৌনতার উপর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। তার এই ক্ষমতাকে সমর্থন জোগায় ধর্মীয় সংস্কার। ধর্মীয় সংস্কার নারীকে শিক্ষা দেয় স্বামীকে মেনে চলতে।

 

বাংলাদেশের গৃহবধূরা যে স্বামীর নির্যাতনের শিকার তার একটি মূল কারণ হলো অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। তিনি পদে পদে স্বামীর উপার্জনের উপর নির্ভরশীল। তার শ্রম তিনি দিচ্ছেন কিন্তু তার উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না। তবে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক যে নারী অর্থ উপার্জনের সঙ্গে জড়িত, যারা কাজ করছেন কলে কারখানায়, অফিসে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, হাসপাতালে ও অন্যান্য স্থানে, যারা যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন পেশায় তারা কি পারিবারিক নির্যাতন থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন? না তা পারেননি। পারেননি কারণ তারাও অসম সামাজিক অবস্থানের শিকার।

 

দুটি বহুল আলোচিত ঘটনা বিশ্লেষণ করা যাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুর ছিলেন উপার্জনকারী। তার স্বামী কিছুই করতেন না। অথচ সেই স্বামীর নির্যাতন তিনি দিনের পর দিন সহ্য করেন। শেষ পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তিও হারান স্বামীর হাতে। কেন? তিনি কি পারতেন না স্বামীকে তালাক দিতে? সাংবাদিক নাজনীন তন্বী। তিনি উপার্জনশীল নারী। সামাজিক মর্যাদাও ছিল। তিনিও দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করেছেন। অবশেষে যখন আহত হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে তখন তিনি স্বামীর ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছেন।

 

দুটি ঘটনাতেই দেখা যাচ্ছে একজন শিক্ষিত উপার্জনশীল নারীও স্বামীর নির্যাতনকে দিনের পর দিন সহ্য করছেন অথচ বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। কেন? কারণ যুগ যুগের পুরুষতান্ত্রিক সংস্কার তাকে শিখাচ্ছে যে, পুরুষকে মেনে চলতে হবে। কিংবা সে সংস্কার যদি সে ত্যাগ করতে সাহসীও হয়, তাহলেও সমাজে ডিভোর্সড নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী তাকে বাধ্য করে সব নির্যাতন সয়ে বিবাহিত নারীর তকমা ধরে রাখতে। কারণ এখনও সমাজে বিবাহিত নারী মানে সে স্ত্রীর পেশায় আছে এবং সেই মর্যাদা ভোগ করার অধিকারী। একজন কর্মহীন পুরুষ যেমন তার মর্যাদা হারিয়ে ফেলে তেমনি ডিভোর্সড নারীও সমাজের চোখে মর্যাদাহীন হয়ে পড়ে। এই মিথ্যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় নারীকে নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে বাধা দেয়।

 

পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে প্রথম যেটা দরকার তা হলো পরিবারে ও সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য বিলোপ করা। যখন ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে সব পরিবারে তখন মনোজাগতিক বৈষম্যও ধীরে ধীরে লোপ পাবে বৈকি। প্রতিটি পরিবারে নারী যদি অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হয় তাহলে বৈষম্য কিছুটা কমবে অবশ্যই। এখনও অনেক নারী আছেন যারা নিজে উপার্জন করলেও টাকাটা তুলে দিতে বাধ্য হন স্বামী বা শাশুড়ির হাতে। মনে রাখতে হবে শাশুড়ি কিন্তু এখানে নারীর ক্ষমতার প্রতীক নন। বরং তিনি একজন পুরুষের মা হিসেবে ক্ষমতা ভোগ করেন। নারী যখন নিজের উপার্জনের উপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন তখন কিন্তু তিনি ক্ষমতায়িত হবেন। আর এটা তখনি সম্ভব হবে যখন নারীর মনোজগতে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার মতো সাহসী অবস্থান তৈরি হবে। পুরুষ শ্রেষ্ঠ এই ভ্রান্ত ধারণাটিকে ত্যাগ করতে হবে সবচেয়ে আগে।

 

পারিবারিক নির্যাতন শত শত বছর ধরে চলেছে বলেই আর শত বছর সেটাকে চলতে দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং পারিবারিক নির্যাতনকে রোধ করতে হবে। নারী-পুরুষের বৈষম্য থেকে মুক্ত করতে হবে পরিবারকে। পরিবার ও সমাজ যখন হবে বৈষম্যমুক্ত তখনই সম্ভব হবে নির্যাতনমুক্ত পরিবার ও সমাজ নির্মাণ।