শান্তনু আদিব

১) খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ:

খাদিজা ছিলেন মুহাম্মদের ১ম স্ত্রী। বলা যায়, তিনি ছিলেন আইয়ামে জাহেলিয়া যুগের এক অন্যতম নক্ষত্র এবং প্রথম মুসলমান ও নবীর প্রথম স্ত্রী। সম্পর্কে তিনি ছিলেন মুহাম্মদের ফুফু। মক্কার খ্রিস্টান ধর্ম-যাজক ওয়ারাকা ইবন নাওফেল ছিলেন খাদিজার চাচাত ভাই। জন্ম ৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে। আইয়ামে জাহেলিয়া যুগে আরব দেশের মেয়েদের উপর অনেক অত্যাচারের ইসলামী প্রচারণা ও গল্প শোনা যায়। অথচ এই মহীয়সী রমণী নিজেকে মক্কায় একজন ধনী ও ক্ষমতাশালী ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। মুহাম্মদের আগেও উনার দুবার বিবাহ হয়েছিল। খাদিজা জীবিত থাকাকালীন ইসলামের নবী অন্য কোন রমণীকে বিয়ে করার মতো দুঃসাহস দেখান নি।

 

কথায় আছে, প্রেমে যেথা মজে মন, কিবা হাড়ি কিবা ডোম। সেই কথা একরকমের সত্য প্রমাণ করেন উনি। ৪০ বছর বয়সী খাদিজা ২৫ বছর বয়সী তরুণ ভাতিজা মুহাম্মদের সৌন্দর্য ও গুণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব করেন। যদিও শোনা যায়, আইয়ামে জাহেলিয়াতের মত অন্ধাকারচ্ছন্ন যুগে নাকি নারীদের কোন দামই ছিল না। অল্প বয়সী ছেলেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়াকে ঘিরে মক্কায় কোন কানাঘুষা বা মুখরোচক গল্পও শোনা যায় না। এর অর্থ বেশী বয়সী ধর্নাঢ্য মহিলাদের অল্প-বয়সী পুরুষের প্রতি আসক্তি সম্ভবত আরব সমাজে খুব সাধারণ ঘটনা ছিল সেসময়। এদিকে সম্বলহীন এতিম মুহাম্মদ পঁচিশ বছর বয়সেও কোন যুবতী মেয়ের মন জয় করতে পারেন নি। খাদিজার বয়স যাই হোক, দরিদ্র মুহাম্মদের জন্য এ ছিল বিয়ের প্রথম সুযোগ। সেই সাথে খাদিজার অর্থ-সম্পদে দারিদ্র্য ঘুচানোর সু্যোগ। শুরু হলো নবীর দাম্পত্য জীবন, তখন ৬৯৫ সাল।

 

২) সাওদা বিনতে জোমআ:

ছিলেন হজরত মুহম্মদ (সঃ)-এর দ্বিতীয় স্ত্রী। ৬১৯ সালে খাদিজার মৃত্যুর কিছুদিন পর তাঁর সাথে নবীর বিবাহ হয়। নবীর এক শিষ্যের অকাল মৃত্যুর সূত্রে সাওদা সবেমাত্র বিধবা হয়েছিলেন। খাদিজার রেখে যাওয়া বেশ কয়েকজন মেয়ে সন্তানের দেখভালের জন্য ২৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সাওদা ৫০ বছর বয়সী নবীর জন্য খুবই উপযুক্ত পাত্রী ছিলেন।

 

৩) আয়শা বিনতে আবু বক্কর:

ছিলেন মুহাম্মদের বন্ধু, সার্বক্ষণিক সহচর আবু বকর-এর কন্যা। ৬১৩ বা ৬১৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম। সাওদাকে বিবাহের অল্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নবী মাত্র ৬ বছর বয়সী আয়শাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। পিতা আবু বকর নানান অজুহাত দেখালেও নবী বলেন স্বয়ং আল্লাহ আয়েশাকে তাঁর স্ত্রী হিসেবে চয়ন করেছেন বলে দাবী করেন। ফলে ৫০ বছর বয়সী নবী ৬ বছর বয়সী আয়েশাকে বিবাহ করেন এবং ৯ বছর বয়সে আয়েশাকে ঘরে তুলে এনে তাঁর শয্যায় নেন এবং বাসর করেন। নবীর সবচেয়ে কম বয়সী স্ত্রী আয়েশার কাছ থেকে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাদিস জানতে পারি, বিশেষত নবীর যৌন জীবন ও পৌরুষত্ব সম্পর্কিত হাদিসগুলো থেকে। মুহাম্মদের মৃত্যুর সময় আয়েশার বয়স ছিল মাত্র ১৮।

 

বনী মুস্তালিক আক্রমণ থেকে ফেরার পথে আয়েশাকে ঘটনাবশতঃ এক রাত্রি নবী তরুণ শিষ্য সাফওয়ানের সাথে থাকতে হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আয়েশার চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা করেন নবীর কিছু দুষ্ট সাহাবী। ফলে নবী অনেকদিন আয়েশাকে তাঁর বাবার বাড়িতে রাখেন এবং তাঁকে বর্জন করে চলেন। অবশেষে মুখরোচক কানাঘুষার অবসান ঘটাতে নবী মুহাম্মদ আল্লার লেখা কোরান থেকে একটা আয়াত ডাউনলোড করে আয়েশার কলঙ্কমোচন করেন। উল্লেখ্য, নবীর ঘরে আয়েশা, নবীর মেয়ে-জামাতা ফাতেমা-আলীর প্রতিদ্বন্দী ছিলেন এবং আলী ৪র্থ খলিফা নির্বাচিত হলে আয়েশা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন এবং যুদ্ধেও অবতীর্ণ হন।

 

ইবনে কাথিরের তথ্যমতে, আয়েশাকে ঘরে তোলার পর নবী দেখতে অসুন্দর সাওদাকে তালাক দিতে চাইলে সাওদা মুহাম্মদের হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি করেন। এরপর আল্লাহ কোরানে একটা আয়াত আপলোড করেন, যা সাওদাকে নবীর স্ত্রী হিসেবে থাকার অনুমতি দেয় এ শর্তে যে, সাওদা নবীকে তাঁর সাথে রাত্রিযাপনের জন্য পীড়াপীড়ি করতে পারবেন না। এবং সাওদার জন্য বরাদ্দ রাত্রি নাবালিকা আয়েশাকে দেওয়া হয়।

 

৪) হাফসা বিনতে ওমর:

ছিলেন মুহাম্মদের ৪ নম্বর স্ত্রী। হাফসার জন্ম ৬০৫ খ্রিস্টাব্দে। ইতিহাস থেকে জানা যায়- হাফসা বাবা ওমরের মত খুব বদরাগী এবং দজ্জাল প্রকৃতির ছিলেন। যার কারণে তিনি বিধবা হবার পরে উসমান ও আবু বকর কেউই তাঁকে বিবাহ করতে রাজি হন নি। এরপর নবী মুহাম্মদের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং ১৯ বছরের এই কিশোরীর সাথে ৫৪ বছর বয়সী বৃদ্ধ মুহাম্মদের বিয়ে হয়। হাফসাকে বিয়ের কারণে নবীকে নানান ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়। হাফসা মুহাম্মদের মুখের উপর কথা বলতেন বলে তাঁর পিতা হযরত ওমর তাঁকে ধমক দিতেন। এমনকি একবার হাফসাকে এ নিয়ে থাপ্পরও দিয়েছিলেন, যা হাদিসে পাওয়া যায়। এছাড়া হাফসা মুহাম্মদের অন্য স্ত্রীদের সাথে বেশী মেলামেশা নিয়ে হিংসা করতেন। মুহাম্মদ তাঁর সুন্দরী স্ত্রী জয়নবের ঘরে বেশী সময় কাটাতে গেলে হাফসা হিংসায় আয়েশার সাথে মিলে ষড়যন্ত্রও করেন এবং নবীকে বলেন যে, জয়নবের ঘর থেকে বের হলে নবীর শরীর থেকে দূর্গন্ধ বেরোয়। নবী পরে যখন এ ষড়যন্ত্র বুঝতে পারেন, তখন মনের দুঃখে এক মাস স্ত্রীদের সঙ্গ থেকে দূরে থাকেন।

 

আরেকবার নবী হাফসাকে বাবা ওমর ডেকেছেন বলে তাঁর বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেন। বাবার বাড়ি পৌছে হাফসা যখন জানতে পারেন বাবা তাঁকে ডাকেন নি, তখন তিনি দ্রুতগতিতে বাড়ি ফিরে এসে দেখেন নবী হাফসার সুন্দরী মিশরীয় দাসী মারিয়ার সাথে হাফসার বিছানাতেই সংগমে লিপ্ত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাফসা হই-চই শুরু করে দেন এবং তখন বাইরে নবীর মুখ দেখানোই দায় হয়ে পড়ে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে আল্লাহ কোরানে এক নতুন আয়াত আপলোড দিয়ে আল্লাহ তার নবীকে রক্ষা করেন।

 

৫) জয়নব বিনতে খুজায়মা:

ছিলেন মুহাম্মদের ৫ নম্বর স্ত্রী। হাফসাকে বিবাহ করার অল্পদিন পরই নবী জয়নবকে বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন কুরাইশ গোত্র বহির্ভূত মুহাম্মদের প্রথম স্ত্রী। গরীব-দুঃখীদের প্রতি দয়ালু জয়নব অল্প সময়ের মধ্যেই রহস্যময়ভাবে মারা যান এবং তাঁর ব্যাপারে ইসলামি ইতিহাসে তেমন কোন তথ্য জানা যায় না।

 

৬) উম্মে সালামা ওরফে হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়া:

ছিলেন মুহাম্মদের ৬ষ্ঠ স্ত্রী। বিয়ের সময় তিনি ছিলেন ২৭ বছর বয়সী বিধবা নারী। মুহাম্মদ তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে সরাসরি বিবাহের প্রস্তাব দিলে তিনি প্রথমে তাতে রাজী হন নি। কেননা প্রথম স্বামী আবু সালামার কাছে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তাঁর মৃত্যুর পরে তিনি আর বিবাহ করবেন না। তবে পরে তিনি নবীকে বিয়ে করতে রাজী হন।

 

৭) জয়নব বিনতে জাহস:

ছিলেন ইসলামের নবীর সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দরী স্ত্রী। তিনি ছিলেন মুহাম্মদের আপন খালাতো বোন এবং পালকপুত্র জায়েদ-এর স্ত্রী। সে সম্পর্কে তিনি স্বামী জায়েদের ফুফু ছিলেন। যেমন খাদিজা ছিলেন মুহাম্মদের ফুফু। একদিন কোন এক কাজে মুহাম্মদ পালিত পুত্র জায়েদের বাড়ি গিয়ে ঘরের ভিতরে উঁকি দিলে অর্ধনগ্ন জয়নবকে দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। জায়েদ বাড়ি ফিরলে জয়নবকে দেখে নবীর প্রতিক্রিয়া জানানো হলে জায়েদ বুঝে ফেলেন নবীর মনে কি আছে এবং দৌড়ে গিয়ে মুহাম্মদকে জানান যে তিনি জয়নবকে তালাক দিবেন যাতে নবী তাঁকে বিয়ে করতে পারেন।

 

মুহাম্মদ তাঁর পালকপুত্রের এহেন প্রস্তাবে আদৌ আশ্চর্য না হয়ে শুধুই বলেন, “নাহ, তোমার স্ত্রী তুমিই রাখ”। কিন্তু জায়েদ ঠিকই তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেন এবং নবী জয়নবকে বিয়ের পরিকল্পনা শুরু করেন। নিজ পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ের ব্যাপারে জনতার মাঝে কানাঘুষা শুরু হলে কোরানে একগুচ্ছ আয়াত আপলোড হয়, যা ইসলামে মহান দত্তক প্রথাকে বাতিল ঘোষণা করে এবং পালক পুত্রের স্ত্রীর সাথে শ্বশুর মুহাম্মদের বিয়ে হালাল করে দেয়। বেচারা জায়েদ তখন স্ত্রী ও পিতা দুজনকেই হারালেন। এর কয়েক বছর পর নবী জায়েদকে রোমান সৈন্যদের বিরুদ্ধে এক কঠিন যুদ্ধে সেনানায়ক হিসেবে পাঠালে তিনি সে যুদ্ধে মারা যান। সে সময়ের রোমানরা ছিল এক মহাশক্তিশালী জাতি। তাদের বিরুদ্ধে মাত্র হাজার কয়েক সৈন্যসহ যুদ্ধে যাওয়া আর মরতে যাওয়ার মধ্যে কোনও তফাতই ছিল না। সর্বজ্ঞানী আল্লার সঙ্গে মহম্মদের যোগাযোগ ছিল এটা স্বীকার করলে বলতে হয় সব জেনেই নবী তাঁর পুত্রকে মরতে পাঠিয়েছিলেন।  নিজের পত্নীর প্রাক্তন স্বামীকে নিজেরই ঘরে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখাটা মহামানবের পক্ষেও সহজ কাজ নয়। এ-ছাড়া এই মৃত্যুতে রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের উত্তেজিত করে তোলার কাজটাও সহজ হয়ে গেছিল।

 

উল্লেখ্য, আল্লাহ যখন নবীর জন্য পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করার পথ সুগম করতে আয়াত নিয়ে হাজির হলেন, তখন আয়েশা ঘটনার রহস্য বুঝতে পেরে নবীকে বলেছিলেন- “তোমার আল্লাহ মনে হচ্ছে তোমার মনের খায়েশ পূরণ করতে সদা উদগ্রীব থাকেন”

শান্তনু আদিব এর ব্লগ   ২৯৪ বার পঠিত