সেজান মাহমুদ

 

সাহিত্যে নৈতিকতা বিষয়ে আগের একটি লেখায় ‘আমার নাস্তিকানুভূতিতে আঘাত লাগিয়াছে’ বাক্যটি সৃষ্টির জন্য অনেক পাঠক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন আমরা কথায় কথায় ‘আমার ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগিয়াছে’ বলি। একথার বিপরীতে এই বাক্যটি অন্য অনুভূতির প্রতি আমাদের মর্যাদাশীল হতে শেখাবে। একদম ঠিক কথা। আমি পাঠকের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু একটা বিনীত অনুরোধ, আমার আলোচনাকে দয়া করে ধর্মের বিরুদ্ধে বা নাস্তিকতার পক্ষে এরকম কোন ছাপ দেয়ার চেষ্টা করবেন না। আমার মূল বক্তব্য হলো প্রতিটি মানুষেরই অধিকার তার পছন্দমতো বিশ্বাসকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার, বা বিশ্বাস না করার। এ দুটোই গ্রহণযোগ্য অবস্থান যতক্ষণ না তা মনুষ্যত্ব বা মানবিকতার বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

প্রাবন্ধিক নীরোদচন্দ্র বলেছিলেন আত্নঘাতী বাঙালি। এতে আমরা ক্ষুদ্ধ হয়েছিলাম অনেকেই। কিন্তু একটু গভীরে ভেবে দেখলে আমরা কি অস্বীকার করতে পারি আমরা আত্নঘাতী নই? এই ব্যাপারটিকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি। মনোবিজ্ঞানীদের মতে অনেক মানুষের মধ্যে ‘সেলফ মিউটিলেটিং বিহেভিয়র‘ বা নিজেকে শারীরিকভাবে আহত করার প্রবণতা থাকে। এরা নিজেদের শরীর কেটে, বা ক্ষত সৃষ্টি করে আনন্দ পায়, অথবা বুঝতেও পারে না যে কী ক্ষতি করছে নিজের। একজন ব্যক্তির এই বৈশিষ্ট্য কী জাতিগত কোন বৈশিষ্ঠ্য হতে পারে? হয়তো পারে না। বা এভাবে কেউ ব্যাখ্যাও করতে চাইবেন না। কিন্তু একটা উদাহরণ ধরে নিই। ধরা যাক সরকার দশ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন কোন একটি সেতু বানানোর জন্য। সেখানে যিনি ঠিকাদার তিনি তিন থেকে পাচ শতাংশ লাভ করবেন ধরে নিয়েই বাজেট করা হয়। তারপরও ইঞ্জিনিয়ার, চাঁদাবাজ, এবং অন্যান্য বখরাবাজদের শেয়ার দিয়ে, ঘুষ, দুর্নীতির গলি-ঘুপচি পার হয়ে নিজের লাভের জন্য ঠিকাদার সাহেব তিনটার বদলে পাচটা বালি মেশাবেন সিমেন্টের সাথে। যে ব্রিজের আয়ু হবার কথা ছিল পনেরো বছর তা হয়তোবা পাঁচ বছরের মাথায় ভেঙ্গে পরবে। যেমন ভেঙ্গে পরলো সায়দাবাদের ব্রিজ। এভাবে যেদিন ব্রিজটি ভেঙ্গে পরলো, সেদিন হয়তো মারা যাবে নিজের কোন আত্নীয়, ভাই, বোন, শিশু বা অন্য কারো আত্নীয় পরিজন। তাহলে কী নিজেদের তাৎক্ষণিক লাভের জন্য নিজেদেরই বড় ক্ষতি করছি না আমরা? গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে যাদের মধে এই সেলফ মিউটিলেটিং বিহেভিয়র থাকে তাদের মধ্য আত্নহননের বা আত্নঘাতী হবার প্রবনতা বেশি থাকে। তাহলে এই তাৎক্ষণিক লাভ বা ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া কী ওই সেলফ মিউটিলেটিং বিহেভিয়র-এর সাথে তুলনীয় নয়? এটাই কী আত্নঘাতী রূপ নয়?

সহনশীলতা বা টলারেনস এমন একটা বৈশিষ্ট্য যা না থাকলে মানুষকে আর সভ্য বলা যায় না। কোন একটা কিছু নিজের মতের বিরুদ্ধে বা স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই ধর ধর মার মার শব্দে তেড়ে আসেন সবাই। সেই ছাত্রাবস্থায় যখন রাস্তায় শ্লোগান দিতাম ‘সন্ত্রাসের কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও’, তখনই ঘোর আপত্তি করতাম। ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও বলাটাই তো আরেকটা সন্ত্রাস। একটা সন্ত্রাস দিয়ে কী আরেকটা দূর করা যায়? তাছাড়া সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজেদের নিয়ে ভয়াবহ হীনমন্যতাবোধ বা ইনসিকিউরিটি। কোন একটা নাটকে হয়তো একজন খারাপ আইনজীবিকে দেখানো হলো, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত আইনজীবি সমাজ ক্ষেপে গেলেন, নাট্যকারের ফাঁসি চাই। কিম্বা কোন একটা খারাপ ডাক্তারকে দেখানো হলো, ব্যস, চালাও ধর্মঘট, করো লেখকের মণ্ডুপাত। মনিকা আলী ইমিগ্রান্ট বাঙালি স্বামীর এবং অন্যান্যদের অশিক্ষা আর সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরলেন, ক্ষেপে যাও সিলেটবাসী। আমাদের আত্নসম্মানবোধ এতো ঠুনকো কেন? এতো সহজেই টলে যায় কেন সম্মানের হাড়ি?

এই সহনশীলতা বোধকরি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌছে গেছে ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে, বিশেষ করে সারা পৃথিবীর মুসলমানদের মধ্যে। এখানে অবশ্য বলে রাখছি যে আমি সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বোঝাচ্ছি না। কোন কিছু হলেই অমুকের ফাসি, অমুকের মুখে চুনকালী মাখাতে পারলে পুরস্কার। অমুককে ঘোষণা করো মুরতাদ, অমুসলিম, নিষিদ্ধ করো তাদের প্রকাশনা, রোধ করে দাও বাক স্বাধীনতা। কেউ কেউ যেমন প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অতিরিক্ত ভালোবাসায় মনে করে আমি যখন পেলাম না আর কাউকেই পেতে দেবো না তোমাকে, তাই মুখে ছুড়ে মারে এসিড, তাদের মানসিকতার সাথে এই অতিরিক্ত ধর্মপ্রেমের কোন তফাৎ নেই। এই সকল কর্মকাণ্ডই আত্নঘাতী উগ্রতার সামিল। অথচ ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব, মানবিকতা ইত্যাদি জাগানোর জন্য।

আমরা পাশ্চাত্যকে যতই দোষারোপ করি না কেন তাদের কাছে থেকে বহু বিষয়ে আমাদের শেখার আছে। তার মধ্যে একটি হলো সহনশীলতা বা টলারেনস। কয়েকটি উদাহরণ দেবো যা আমাদেরকে অনেক কিছু শেখাতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব কুইনসল্যান্ডের একজন গবেষক ড. রল্যান ম্যাকক্লারি তার থিসিস লিখেছেন যিশু খ্রিস্টের সেক্সুয়ালিটি নিয়ে। তার গবেষণমতে যিশু যেহেতু কখনও বিয়ে করেন নি এবং কোথাও তার কোন নারীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা জানা যায় না, নিশ্চয়ই এর বাইরেও অন্য কিছু ছিল। কারণ মানুষ যৌনজীবন বির্বজিত নয়। যদিও কেউ কেউ হয়তো বা পুরোপুরি না হলেও আংশিক যৌনবির্বজিত থাকতে পারেন। ড. রল্যান ম্যাকক্লারি তিন বছর ধরে গবেষণার পর বের করেছেন যে যিশু স্বয়ং এবং ন্যুনতমপক্ষে তার তিন জন অনুসারী সমকামী ছিলেন। তার এই গবেষণা বই আকারেও বেরুচ্ছে। এখানে লক্ষণীয় হলো অনেকেই বিশেষ করে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা তার এই দাবীতে আহত এবং ক্ষুব্ধ, কিন্তু কেউই তাকে মৃত্যু দণ্ডাদেশ দেয়নি বা তার মুখে চুনকালি দিতে বলে নি বা তাকে অখ্রিস্টান ঘোষণার দাবি জানায় নি। বরং কেউ কেউ শুধু মন্তব্য করেছেন এই বলে,

“What a joke! Tell the guy to go on big brother, if he wants attention that bad!”

অর্থাৎ কী তামাশা! লোকটাকে বলো চালিয়ে যেতে ওর যদি এতই মনোযোগ পাওয়ার খায়েস! পাশাপাশি ড্যান ব্রাউন বই লিখেছেন রহস্য উদঘাটনের আঙ্গিকে ‘দা দ্য ভিঞ্চি কোড‘ নামে যেখানে যিশুকে তারই একজন অনুসারী মেরি ম্যাগডালেনের সঙ্গে বিবাহিত দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানে দ্য ভিঞ্চির আকা ছবিকে একটা ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ যিশুর সমকামিতার দাবীকে ঠেকানোর জন্য ইতিহাসের ভাণ্ডার থেকে উপাদান নিয়ে পাল্টা লিখে তার জবাব প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস। প্রিয় পাঠক আপনারাই অনুমান করুন, এই ঘটনা যদি আজকে হিন্দু বা ইসলাম ধর্মের কোন ধর্মগুরুকে নিয়ে হতো তাহলে কী ঘটতো! আমাকে তা পুনরুল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।এখানেই শেষ নয়। যে খ্রিস্টান ধর্মে সমকামিতাকে একেবারে গ্রহণ করা হয়না। এই প্রথমবারের মতো জেন রবিনসন যিনি একজন প্রকাশ্য সমকামী তাকে নিউ হ্যাম্পসায়ার-এর একটি গির্জায় ধর্ম যাজকের পদে নিয়োগ করা হয়েছে। এই উদাহরণগুলো এ কারণে দিচ্ছি না যে আমি খ্রিস্টান ধর্মের বা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের গুণগ্রাহী। এই উদাহরণগুলো দেয়ার উদ্দেশ্য হলো অন্যদের কাছে থেকে যে আমাদের সহনশীলতা শেখা উচিত তা অনুধাবনের জন্য।

 

The Da Vinci Code

 

আমরা যদি পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে ভুরি ভুরি ঘটনা দেখতে পাবো যেখানে সত্য আবিস্কারের জন্য বা সত্য কথা বলার জন্য অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিগৃহীত করা হয়েছে, এমনকী হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। যেমন, যখন চিকিৎসক ইবনে সিনা মানুষের শরীর কেটে হার্টের সার্জারি করতে চেষ্টা করেছিলেন তখন তার শহরের লোকেরাই তাকে বিতারিত করেছিল নিজ এলাকা থেকে ধর্মের অজুহাতে। যখন আন্দ্রিয়াস ভিসালিয়াস মানব শরীরের ওপর প্রথম বই ‘দ্য হিউমানি করপোরি ফেব্রিকা‘ লেখার জন্য মানুষের মৃতদেহ জোগার করতে গিয়েছিলেন তখন ধর্মগুরুরা তাকে হত্যার জন্য ধাওয়া করে এবং তিনি পালিয়ে প্রাণে না বাচলে আজকের এই আধুনিক শরীরবিদ্যার হয়তো জন্মই হতো না। রসায়নবিদ লাভয়সিয়ে যখন বাতাসে অক্সিজেনের উপস্থিতি এবং এটার গুনাগুন আবিস্কার করেন এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রভাবের পক্ষে কথা বলেছিলেন তখন গির্জার ধর্ম পণ্ডিতেরা, ধর্মান্দ্ধ রাজনীতিকেরা তাকে ধর্মের বিরুদ্ধাচারণের অজুহাতে গিলোটিনে (গলা কেটে) হত্যা করেছিল। তার হত্যা দেখে আরেকজন পণ্ডিত জোসেফ লুই ল্যাগ্রাঞ্জে বলেছিলেন,

“It took them only an instant to cut off that head, and a hundred years may not produce another like it.”

অর্থাৎ এই মাথাটি কাটতে ওদের মাত্র এক পলক লেগেছে, অথচ একশ বছরেও হয়তো এমন একটি মাথার জন্ম হবে না।

শুরুতেই সহনশীলতা এবং আত্নঘাতী উগ্রতার কথা বলেছিলাম। আমাদের দেশের ধর্মান্দ্ধ, ফতোয়াবাজদের ইতিহাসের এইসব ঘটনার দিকে তাকাতে বলি। এই উগ্রতা আত্নঘাতী তার কারণ পৃথিবীর ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর। যা কিছু সভ্যতার সামনে নিয়ে এসেছে পশ্চাদপদতার অন্দ্ধগলি, সেসব কিছুই নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। এখানেই মানুষের ঐতিহাসিক জয়। এই আত্নঘাতী পথের তখনই শেষ হবে যখন সহনশীলতার মতো মানবিক গুণ অর্জিত হবে, অর্জিত হবে সত্যিকারের মুক্তমন। একারণেই বুঝি দার্শিনিকেরা বলেছিলেন, মুক্তমনের চেয়ে বড় কোন সম্পদ নেই!

 

নোট: এই লেখাটি  ২০০৯ সালে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও লেখাটির গুরুত্ব থাকায় আংশিক সম্পাদনা করে নবযুগ ব্লগে পূন:প্রকাশ করা হলো। 

0 Shares