Avatar

(কায়রো; লেখকঃ হোদা বদ্রান) — ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের ধুলিকা বিদূরিত হওয়া শুরু হতে-না-হতেই নারী সমাজ – যারা পুরুষদের পাশে কাধে কাধ মিলিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়েছে – তারা ক্রমেই কোণঠাসা ও জাতীয় সিদ্ধান্ত নিরূপণ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। বিপ্লবীদের আনীত নতুন স্বাধীনতা সত্ত্বেও নারী সমাজ আজও পুরুষের অধীন বিবেচিত হচ্ছে।

তিউনিসিয়াতে নারীদেরকে বোরকা পড়ানোর দাবীতে এক গণ-বিক্ষোভ মহিলা শিক্ষকদেরকে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গন থেকে তাড়িয়ে বের করে দিয়েছে। প্রতিবাদকারী মহিলাদেরকে লক্ষ্য করে জনতা চিল্লাচিল্লি করেছে তাদেরকে রান্নাঘরে ফিরে যাবার জন্য, যা নাকি তাদের আসল জায়গা। মিশরেও রক্ষণশীল জনতার বাড়াবাড়ি চলছে, যারা নতুন নীতি প্রনয়ণ চাচ্ছে, যা নারী সমাজকে এক ধাপ পীছনে নিয়ে যাবে।

এরূপ ঘটনায় শংকিত ও বিক্ষুদ্ধ হয়ে আরব নারী সমাজ তাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়েছে। এপ্রিল ২০১১, তিউনিসিয়ার নারী সমাজ এক নির্বাচনী-সমতা আইন প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়, যার ফলে তারা ২১৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৪৯টিতে জয় লাভে সক্ষম হয়।

তবে মিশরে নারী সমাজের ভবিষ্যত অধিক অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। হোসনী মোবারক অধীন প্রাক-বিপ্লব কোটা ব্যবস্থায় মহিলাদের জন্য ৬৪টি সংসদীয় আসন বরাদ্দ ছিল। তার পরিবর্তে এক নতুন নির্বাচনী আইন চালু করা হয়েছে যে, সংসদ নির্বাচনে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে অন্তত একজন করে মহিলা প্রার্থী রাখতে হবে। কিন্তু প্রায় সব দলগুলোই তাদের নারী প্রার্থীদেরকে সবচেয়ে কম জোরদার আসনে রাখায় মাত্র নয় জন মহিলা প্রার্থী সংসদীয় নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। সিনিয়র কাউন্সিল অব দ্যা আর্মড ফোর্সেস তথা সামরিক শাসকগণ আরও দু’জন মহিলা সদস্য চয়ণ করে সংসদে মহিলা আসন-সংখ্যার হিস্যা ২%-এ উন্নীত করে।

ইসলামপন্থী দলগুলো তিউনিসিয়া ও মিশর সংসদ নির্বাচনে দুই জায়গাতেই সংখ্যা-গরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তিউনিসিয়াতে নতুন সংসদ বিশেষ করে নারীদের প্রতি নিষ্পেষণমূলক শরীয়ত-ভিত্তিক এক খসরা আইনের প্রস্তাব করেছে, যার উপর তর্ক-বিতর্ক চলছে সংসদে। এবং বুঝা যাচ্ছে যে, অনেক আরব দেশই, যেখানে প্রাক-বিপ্লব আমলে বহু-বিবাহ চর্চা নিষিদ্ধ ছিল, তা অবারিত বহু-বিবাহ চর্চার বিধি-ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে।

মিশরে অবস্থা আরও জটিল। ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা দখলের ভয়ে সামরিক শাসকগণ জুন মাসের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পূর্বে এক আদালতী রায়ের ভিত্তিতে ইসলামপন্থী-প্রাধান্যের সংসদ ভেঙ্গে দেয়। এবং সামরিক গোষ্ঠি ও আদালতের নিষেধ সত্ত্বেও নতুন রাষ্ট্রপতি, ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাডারহুড দলের মোহাম্মদ মরসি, ভেঙ্গে দেওয়া সংসদ পুনর্বহালের আদেশ জারি করেছে।

এর আগে সংসদের আইন-বিষয়ক কমিটির কাছে এক প্রস্তাব পেশ করা হয় মেয়েদের বিবাহের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ থেকে ১২ বছরে নামিয়ে আনার জন্য। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এর ফলে নারী সমাজের শিক্ষার অকাল সমাপ্তি ঘটবে, অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাবের কথা না-হয় নাই বলি।

মিশরীয় ‘আরব বসন্ত’ বিপ্লবের এক শক্তিশালী দিক ছিল আন্দোলনের সূচণাকারী সকল শ্রেণীর মাঝে সমতা। তাদের কেউই এককভাবে ক্ষমতা ও নেতৃত্ব হস্তগত করার চেষ্টা করে নি। নারী সমাজ সহ মিশরীয় জনতা হোসনী মুবারক সরকারের শক্তির বিরুদ্ধে রাজপথে ও প্রাঙ্গনে একতাবদ্ধ হয়েছিল স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের দাবীতে।

কিন্তু আজ সবকিছুই চরম ভিন্ন। মুবারক সরকারের বিরুদ্ধে একদা একতাবদ্ধ জনতা এখন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, এবং প্রত্যেক দলই নিজ স্বার্থ উদ্ধারে ও বিপ্লবের নিজ-নিজ লক্ষ্যগত দৃষ্টিভঙ্গী উপস্থাপনে ও বাস্তবায়নে ব্যস্ত। ক্ষমতার নতুন বলয়ের দুই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি (এ্যাক্টর) – সামরিক শাসকবৃন্দ ও মুসলিম ব্রাদারহুড-সালাফি ইসলামপন্থীদের আশেপাশে আছে ছোট-মোট রাজনৈতিক দল, যুবক মোর্চা, ও অন্যান্য।

দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, মিশরে নারীদের রাজনৈতিক অবস্থান আজ অত্যন্ত দুর্বল। জাতীয় নারী পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে; আজ সেখানে নতুন ‘মিশরীয় নারীবাদী জোট’ গড়ে উঠেছে, এবং নারীবাদী এনজিও সমন্বিত বেশ কয়েকটি জোট গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তারা সংঘবদ্ধভাবে কার্যকর কর্ম-পরিকল্পনা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট সুসংগঠিত নয়।

আজ মিশরের নারীদের সামনে দু’টো ভবিষ্যত পরিস্থিতির সম্ভাব্য চিত্র দেখা যাচ্ছে, যার কোনটিই তাদের জন্য আশাপ্রদ নয়।

  • প্রথমঃ সামরিক গোষ্ঠি, যারা বিরোধী শক্তিকে দুর্বলকরণের লক্ষ্যে ইসলামপন্থী সংসদ ভেংগে দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অনেকাংশে ছিনিয়ে নিয়েছে। ১৯৫২ সালে জেনারেল মোহাম্মদ নাগিব ও পরে গামেল আব্দেল নাসের ক্ষমতা দখল করে যেভাবে দেশটিকে শাসন চালু করেছিল, তারা সেভাবেই দেশটিকে শাসন করে চলছে।

সামরিক ব্যবস্থা ও পুরুষতন্ত্র অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত। উভয়ই পৌরুষেয়তার ধারক, যা নারীবাদের পরিপন্থী। যদি সৈন্য, যারা মূলত পুরুষ, শক্তিশালী ও সাহসী, তাহলে নারী তার বিপরীত – নিষ্ক্রিয়, বাধিত এবং ভাল স্ত্রী, বোন বা মা হিসেবে পুরুষ-কর্তৃক প্রতিরক্ষার মুখাপেক্ষী।

  • দ্বিতীয় সম্ভাবনা হচ্ছে এক ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থা – যেখানে রাষ্ট্রপতি মরসি সামরিক গোষ্ঠির সাথে বোঝাপড়া করে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করবে; ইসলামপন্থীরা পুনর্বহালকৃত সংসদে প্রাধান্য চর্চা করতে থাকবে; এবং এক নতুন সংবিধানের মাধ্যমে ধর্মীয় রাষ্ট্র-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। মিশরের বেশীরভাগ ইসলামপন্থী, বিশেষত যারা সৌদি আরবে নির্বাসন থেকে ফিরেছে, তারা সবাই ওহাবী পন্থার অনুসারী, যা নারীদের উপর চরম নিষ্পেষণ চাপায়। তার মানে নারীদের অবস্থার চরম অবনতি ঘটবে বিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায়।

অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে নতুন সংবিধানে বহু-বিবাহ ব্যতিক্রম ঘটনার পরিবর্তে হবে আইনিভাবে রক্ষিত সচরাচর ঘটনা হয়ে উঠবে, নারীরা হবে বিবাহ-বিচ্ছেদের সম-অধিকার থেকে বঞ্চিত। ইসলামপন্থীরা নারীদের জন্য পর্দা এবং পুরো শরীর আবৃতকারী নিকাব চাপিয়ে দিতে পারে। নারী অধিকার কর্মিদেরকে এক সুবিশাল প্রচেষ্টা চালাতে হবে তাদের উপর অবিচার রোধ করতে।

দুঃখজনক যে, সামরিক গোষ্ঠি বা রাষ্ট্রপতি মরসির কেউই এমন উদার শাসনের ধারক নয়, যা নারী সমাজকে নেতৃত্বকারী ভূমিকার সুযোগ দেবে, গতানুগতিকভাবে যা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে। নারী সমাজের সমতা ও মর্যাদার একমাত্র আশার ঝলক হচ্ছে, যারা এমন শাসন-ব্যবস্থা চায়, তাদের সকলের মিশরীয় বিপ্লবের গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ হওয়া।


হোদা বদ্রান মিশরীয় নারীবাদী জোটের সভাপতি (© প্রজেক্ট সিন্ডিকেত/ইউরোপস উয়ার্ল্ড)। জাপান টাইমস-এ প্রকাশিত। ইংরেজী থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত।

0 Shares

অনুবাদক এর ব্লগ   ১৯ বার পঠিত