Avatar

গত কয়েকদিন হুমায়ূন আহমদের মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন ছিলাম। তিনি কি সত্যই চলে গেলেন! বিশ্বাস করা শক্ত। উনার নাটকে আমি বিভোর (Obsessed) ছিলাম প্রায় তিন দশক। তিনি চরিত্রের মুখে ডায়লগ ঢেলে দিতেন না। ফল্গুধারার মত চরিত্ররা নিজেরাই নিজেদের কথা বলত। তাঁর নাটকে প্রতিটা চরিত্রই মূখ্য থাকত।

গতানুগতিক নাটক-সিনেমায় কাজের লোকদের আবির্ভাব ঘটে অতিথিদের চা-নাস্তা দেওয়া এবং গামছা দিয়ে টেবিল পরিষ্কার করার জন্য। তাঁর নাটকে এরাও মানুষ হয়ে উঠত। এদেরও প্রেম-প্রীতি ভালবাসা থাকত। তিনি ছিলেন কথা শিল্পী। তাঁর মৃত্যুর পরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন – কথাশিল্পী হিসেবে তিনি শরৎ চট্টোপাধ্যায়কে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। আমি অনেক আগেই তা বলেছি। কিন্তু আমি লেখক নই, তাই কেউ জানতে পারেনি আমার মূল্যায়ন। আমি তাঁকে কবে প্রথম আবিষ্কার করি তা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। তাঁর প্রথম দেখা নাটকের দৃশ্যটি ছিল এরকম –

সংসার থেকে পিতামাতারা অবসর নিয়ে ছেলেমেয়েদের সাথে একই বাড়িতে আছেন। সমস্ত দায়িত্ব বড় ছেলে বুলবুলের উপর। ছোট ছেলে আসাদুজ্জামান নুরের চাকুরী নেই। নুন আনতে পান্তা ফুড়োনো সংসার। ছোট বোনটাকে বিট্রে করল পাশের বাড়ীর সবুজ নামের ছেলেটি। চারিদিকে বুকফাটা যন্ত্রনা। গতানুগতিক নাটকে এই দৃশ্যটি ফুটিয়ে তুলার জন্য থাকে বাড়িময় কান্নার রোল। হুমায়ূন আহমদের সৃষ্টি ভিন্ন অবয়বে। বড়ভাই হয়েও বুলবুল কিছুই করতে পারছে না। নাটকে দুঃসহ নীরবতা। নীরবতা বড়ই কষ্টকর। কারও মুখে কথা নেই। সবাই তাকিয়ে আছে বুলবুলের মুখপানে। সবাইকে তার ভরশা দেওয়া দরকার। বুলবুল সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব হাতে নিল। তার একটা কিছু বলা দরকার। কিন্তু নীরবতা ভাংগতে মুখ থেকে যে অপ্রাসংগিক সংলাপ বেরিয়ে এল, তা দর্শকের জন্য আরও যন্ত্রনাদায়ক।

বুলবুল – এটা কী মাস?

নুর – সেপ্টেম্বর।

বুলবুল – বাংলায় কী মাস?

নুর – চৈত্র।

ঐ বিশেষ দৃশ্যে মাসের নাম জিজ্ঞাসা করার কোন কারণ ছিল না। বুলবুলের মুখে ভাষা ছিল না। তাই মাসের কথা মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে। নুরও কষ্টে মুহ্যমান। তাই সেপ্টেম্বর আর চৈত্র মাস গুলিয়ে ফেলেছে।

এই হল আমার নাট্যকার আবিষ্কার। বছর তিরিশেক হবে। সেই থেকেই আমি হুমায়ুন আহমদের নাটকের উপর অনুরক্ত – মোহাচ্ছন্ন। ভিডিওর দোকান থেকে আমি কোনদিন অন্যের নাটক আনিনি। দোকানী বলত – আনিসুল হকের একান্নবর্তী আছে, ৬৯ আছে, এবং মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর ভাল নাটক আছে। আমি শুনতাম না। এরপর সে আমাকে চিনে গিয়েছিল। হুমায়ুনের নাটক না থাকলে বলত – “না, নতুন কিছু আর আসেনি।” থাকলে বলত – “হ্যা, আছে। আপনার জন্য রেখে দিয়েছি।”

আমার বিবেচনায় “অয়োময়” হুমায়ুন আহমদের শ্রেষ্ঠ শিল্প কর্ম। সারা বিশ্বে এর উপর নাটক হতে পারেনা। ইন্ডিয়ানাপোলিসে আমার ডঃ আরশাদ আলীর বাসায় বেড়াতে গিয়ে উচুগলায় বলেছিলাম – আমি এপর্যন্ত পঞ্চাশবার দেখেছি। আমি তাঁর মুগ্ধ মুখখানি দেখার জন্য অপেক্ষায় আছি। আমাকে তুচ্ছ করে দিয়ে বললেন – দেখ তো ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে কী বেরিয়ে আছে? অবাক বিস্ময়ে দেখলাম – “অয়োময়। তাঁর স্ত্রী বললেন – “ওটা ওখানেই থাকে। দৈনিক ওটাই দেখে। কোন কোন দৃশ্যে চোখের পানি পর্যন্ত ফেলে।”

আমার অনেক দিনের স্বাধ ছিল। কোনদিন দেখা হলে হুমায়ুনকে প্রশ্ন করব, “কোন নাটকটি আপনার মতে শ্রেষ্ঠ?” উত্তরে অন্য নাটকের কথা বললে বলব, “সৃষ্টিই করেছেন। কিন্তু জানেন না পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাটক কোনটি।” আমার মনের প্রশ্ন মনেই থেকে গেল। তিনি চলে গেলেন চিরদিনের মত।

গল্প এবং নভেল পড়ার বয়স শেষ হয়েছিল ১৯৭০ এর গোড়ায়। তার পর ১৯৯০ এর দশকে এসে হুমায়ুনের নভেল পড়েছি, গল্প পড়েছি। এক নিশ্বাসে “তিথির নীল তোয়ালে” শেষ করেছি।

এতটাই মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম যে, “সবুজ সাথী”র মত ফরমায়েসী অখাদ্য নাটকও দেখেছি অনেকবার। নক্ষত্রের রাত এবং অয়োময়ের পরে তিনি আর ভাল কিছু লেখেননি। তাঁর অনেক নাটক শুরু করে শেষও করতে পারিনি। শেষের দিকে হুমায়ুনের দেওয়ার মত আর বুঝিবা কিছুই আর ছিল না। যাচ্ছেতাই লেখা শুরু করেছিলেন চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে এসে। অনেক আবর্জনাও লিখেছিলেন। প্রথম আলো সুউৎসাহে এগুলো পূনঃপ্রকাশ করে চলেছে। যেমন ৬ই ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে প্রথম আলোয় (পূনঃপ্রকাশিত ২১শে জুলাই ২০১২) লিখলেন “ব্ল্যাক ফ্রাইডে। বুঝাই গেল ব্ল্যাক ফ্রাইডে সমন্ধে তাঁর কোন ধারণাই ছিল না। ধারণা বিহীন আরও অনেক কিছু লিখে তিনি সমালোচনার পাত্র হয়েছেন। ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে একটি অত্যন্ত নিম্নস্তরের কটুক্তি কথনও করেছেন – “শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন বলেই কি আমেরিক্যানরা “কালো শুক্রবার” আবিস্কার করল?”

“ব্ল্যাক ফ্রাইডে” এর কিছু তথ্য এখানে পাওয়া যাবে। গোটাটা পড়ার সময় না থাকলে নীচের ছবির লেখাগুলো পড়লেও চলবে। লক্ষ্য করে ঘটনার বছরটি দেখুন। হুমায়ুন আহমদের মত একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব “ব্ল্যাক ফ্রাইডে” সমন্ধে এরকম একটি ভিত্তিহীন উস্কানীমূলক কথা কীভাবে লিখতে পারেন!

এই ভিডিও ক্লিপটি খুবই বেদনাদায়ক।

[[{“type”:”media”,”view_mode”:”media_large”,”fid”:”53″,”attributes”:{“alt”:””,”class”:”media-image”,”style”:”text-align: justify; float: left; margin: 3px 5px; height: 270px; width: 360px; “,”typeof”:”foaf:Image”}}]]

হুমায়ুন আহমদের চোখ ছলছল করছে। কষ্ট কিছুতেই চাপা দিয়ে রাখতে পারছেন না। তিনি যে মারা যাচ্ছেন ভিতরের সত্ত্বাটি যেন বার বার সেই সংবাদটিই দিয়ে যাচ্ছে তাঁকে। নতুবা চোখে জল আসবে কেন। কয়েকবার চোখ মুছলেন পর্যন্ত । কিন্তু গান শেষে যে কয়েকটি কথা বললেন তাতে হতাশ না হয়ে পারলাম না।

নেচার্যা ল সায়েন্সে পিএইডি করা একজন ব্যক্তি যখন ধর্ম-কর্মে বিশ্বাস করেন, তখন আমি হতাশ হই। সাধারণ পাবলিক ভূতে বিশ্বাস করলে তখন আর কিছু বলার থাকেনা। নোবেল প্রাইজ পাওয়া ডঃ সালামের কথাই ভাবুন।
Salam was a devout Qadyani and a member of the Ahmadiyya Muslim Community[98] who saw his religion as integral part of his scientific work. He once wrote:
“The Holy Quran enjoins us to reflect on the verities of Allah’s created laws of nature; however, that our generation has been privileged to glimpse a part of His design is a bounty and a grace for which I render thanks with a humble heart.”[30] Dr Salam did not find religion and science incompatible. For him his religious faith and his scientific work were inextricable intertwined.

পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পাওয়া ডঃ সালামের দশা যদি এরকম হয়, হুমায়ুন আহমদ তো নস্যি।

এদের মগজের একদিক কাজ করে ঠিক ঠাক। তাই পিএইডি ডিগ্রী হয়। রুটিরুজি হয়। বাড়ি গাড়ী সব হয়। বিখ্যাত হওয়া হয়। শৈশবে থেকে পরিবার এবং ধর্মীয় শিক্ষা মস্তিষ্কের একটা অংশ ভোঁতা করে মানসিক প্রতিবন্ধী সৃষ্টি করে। ফলে একজন জ্ঞানে-বিজ্ঞানে চৌকোষ মানুষও মানসিক প্রতিবন্ধীত্বের তিমির থেকে রক্ষা পায় না। আমার জন্ম হিন্দু পরিবারে হলে আমি হই গোঁড়া হিন্দু, আর মুসলিম পরিবারে জন্ম হলে আমি হয়ে যাই মুসলমান।

যে হিন্দু পদার্থ বিজ্ঞানী শিবলিঙ্গে দুধ ঢালে কিন্বা যে অশিক্ষিত হিন্দু ন্যাংটা সাধুর নোংড়া দুর্গন্ধযুক্ত পা চেটে পরিষ্কার করে পূন্য সঞ্চয় করে, তার সাথে পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ী সালামের তফাৎ কোথায়? উভয়েই মানসিক প্রতিবন্ধী। তফাৎ থাকার কথা নয়।


এই শিবলিংগটির জন্য আমি প্রয়াত আজাদ ভাইয়ের কাছে ঋণী।

বাবু পালের সৃষ্ট ভগবানের সাথে পরিচিত হোন এখানে অথবা এখানেও হতে পারেন।

মানসিক প্রতিবন্ধিকতা থেকে উদ্ধারের পথ আছে কি? অবশ্যই আছে। খোলা মন এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে নিজের ধর্ম গ্রন্থখানি পড়া দরকার। একজন হিন্দু নিজেকে একজন মুসলমান বা খ্রিষ্টান বা একজন ইহুদী মনে করে গীতা পড়তে হবে। গীতায় যদি কোথাও একজন মানুষ খুন করা বা তুচ্ছ করার মত সামান্য ইন্ধনও পাওয়া যায় তাহলেই যথেষ্ঠ। এবারে গীতাটিকে ট্র্যাশক্যানে ছুড়ে ফেলে দিয়ে শিরদাঁড়া এবং ঘাড়খানা খাড়া করে মাথা উচু করে দাঁড়ানোর যোগ্যতা হয়ে গেল। চিত্ত যেথা ভয় শূন্য উন্নত শির। যদি কোন ভাল কথা পাওয়া যায় এবং তা যদি গীতা না পড়েও আপনার জানা থাকে অথবা ভাল কথাটি মানুষের পক্ষে লেখা সম্ভব, তাহলে গীতা বা ভগবানের আশ্রয় নেওয়ার দরকার কী?

ভগবান, ঈশ্বর, গডের কোন অস্তিত্ব কোনদিন ছিল না। সব ধর্ম মাত্র একটা অতিকায় মিথ্যা দিয়ে সৃষ্ট। অতি চতুর মানুষেরাই ধর্ম সৃষ্টি করেছে। প্রচার করেছে। তিনি শুধু আমাকেই সাক্ষাৎ দেন। আমার মত করে “হরে কৃষ্ণ” বলতে হবে। না করলে ইত্যাদি ইত্যাদি বিপদ আছে। করলে ইত্যাদি ইত্যাদি সুফল আছে। এমন কি স্বর্গের অস্পরাও তোমার কোলে এসে বসে থাকবে।

স্বর্গ-নরক বলতে কিচ্ছু নেই। মানুষের আত্মাই নেই। একটা কম্পিউটারের দুটো জিনিষ থাকে – ১) হার্ডওয়্যার এবং ২) সফটওয়্যার। দুটো মিলে একাত্ন হয়ে কাজ করে। এর যেকোন একটি নষ্ট হলে দুটোই বিকল। আমাদের শরীর হল হার্ডওয়্যার। আর মস্তিষ্কের কোষগুলো সফটওয়্যারের মত কাজ করে। দিনে দিনে হার্ডওয়্যারটি নষ্ট হয়। মস্তিষ্ক স্তিমিত হয়ে আসে। আমরা মারা যাই। মরা গাছ-পাতা, পশুপাখির মত সবই তখন মাটিতে মিশে হারিয়ে যায়। কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। এটাই নিয়ম। এটাই প্রকৃতি।

স্বর্গ-নরক ভগবানাদি কিছুই নাই। আছে লোভ। তাই আছে ধর্ম। লোভের একখানি নমূনা দেখুন।

এরা কি এখনই হাতাহাতি শুরু করে দিয়েছে? অনেক আছে তো! হাতাহাতির কী দরকার!

0 Shares

এন সরকার এর ব্লগ   ৪০ বার পঠিত