শুভাশিস চিরকল্যাণ পাত্র

পুঁজির কথা বলি তখন কোনো কোনো পাঠক ইউরোপের শিল্পবিপ্লব এবং আধুনিক শিল্পপতিদের পুঁজির কথা ভেবে বসেন এবং তার ফলে আমার বক্তব্য বুঝতে তাদের অসুবিধা হয়। ইউরোপ যখন পুঁজিকে দেখছে এবং কার্ল মার্কস যখন ‘পুঁজি’ গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন তখন পুঁজি অনেক বড় হয়ে গেছে। প্রশ্ন : পুঁজির আদিম উদ্ভব কোথায় হয়েছিল? এই বিষয়ে কোনো লিখিত ইতিহাস আছে কি? উত্তরে কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী বলেন যে, হ্যাঁ তা আছে। আমাদের পুরাণাদি গ্রন্থে ক্রিয়াভিত্তিক ভাষায় সেসব লেখা আছে, যা এতদিন বুঝা যায়নি। তবে সে পুঁজি আধুনিক শিল্পপুঁজির মতো বৃহৎ নয়, এই কথা মনে রাখতে হবে। বর্ত্তমান নিবন্ধে ভারতবর্ষে সেই তরুণ পুঁজি বা ‘কচি ক্যাপিট্যাল’-এর উদ্ভব বিষয়ে খুব সংক্ষেপে কিছু কথা বলব।

পুঁজের মতোই পুঁজি নাহি রয় সুস্থির,
করে এ সমাজদেহ ফুটিফাটা চৌচির।

–  ‘বর্ণসঙ্গীত’

মহাভারতে দেখা যায় কার্ত্যবীর্জ্জের বংশের লোকেরা তাদের পুরোহিত ভৃগু বংশের ব্রাহ্মণদের ধনসম্পদ দান করছেন। এইভাবে ব্রাহ্মণরা প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হচ্ছেন। এমনকি ভার্গবরা সে সব টাকা লুকিয়ে রাখতেন ও বৈশ্যদের মধ্যে (উরু দেশে, উরু মানে বৈশ্য় বুঝতে হবে) সুদে খাটাতেন। এই প্রসঙ্গে মহাভারতে ঔর্ব্ব ঋষির কাহিনী দ্রষ্টব্য। আরুষির উরু ভেদ করে মহাতেজা ঔর্ব্বের জন্মের অর্থ হল বৈশ্য়দের মধ্যে ধনসম্পদ লালিত হয়ে বৃদ্ধি পাওয়া। এ স্পষ্টতই পুঁজি। এছাডা় কশ্যপ নামক ব্রাহ্মণেরা প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন, এও পুঁজি।

বিষ্ণুর দশাবতার পুঁজির দশবিধ রূপ, এ কথা আগেই বলেছি। মৎস্য অবতারে পুঁজি প্রথম আসছে। মৎ মানে আমি, মৎস্য মানে আমার (যেমন নর মানে মানুষ, নরস্য মানে মানুষের)। মৎস্য অবতারে বিষ্ণু একটি বৃহৎ মৎস্যের রূপ ধরে বৈবস্বৎ মনুকে রক্ষা করেছিল, এর মানে হল সেদিন ব্যক্তিমালিকানা এসে টালমাটাল যৌথসমাজকে রক্ষা করেছিল। তবে এই আদিম পুঁজি প্রচুর টাকাকড়ি বা ধনদৌলত নয়, বরং তাকে জ্ঞানের উপর ব্যক্তিমালিকানা বলে বুঝলেই সুবিধা হয়ে। জ্ঞানের ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠার পর ”এটা আমি করেছি, অতএব ইহা আমার”, এমনটা বলা আর নিন্দনীয় থাকে না।

তারপরে এসেছে কূর্ম্ম অবতার। এ হল গ্রামসমাজব্যবস্থার প্রতীক। কচ্ছপ যেমন খোলার ভিতর থাকে, গ্রামগুলিকেও তেমনি স্বয়ংসম্পূর্ণ একক হিসাবে বুঝতে হবে। এই সময় বর্ণাশ্রম প্রথার প্রবর্ত্তনের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। তারপর এই ব্যবস্থাকে মডেল করেই সমুদ্রমন্থন সম্ভব হয়। এখানে সমুদ্রমন্থন মানে জনসমুদ্র মন্থন করে সম্পদ আহরণ করাকেই বুঝতে হবে। দেবতারা সেই সম্পদ (অমৃত) গ্রহণ করেন, এবং অসুরেরা বঞ্চিত হয়।

রামচন্দ্র অবতারে রামচাঁদি বা ক্রীড়াকারী লক্ষ্মীপুঁজির কথা। রম্ মানে ক্রীড়া করা এবং চন্দ্র মানে চাঁদি; যে টাকা বাজারে খেলা ক’রে সকলকে চনমনে বা আহ্লাদিত করে তাকেই রামচন্দ্র বলে বুঝতে হবে (তার ব্যক্তিরূপটি কাব্যভাবনা)। এ হল বৌদ্ধযুগের কাহিনী। তখন দেশে কুটির শিল্প এসে গেছে এবং ব্যবসাবাণিজ্য শুরু হয়ে গেছে। রামচন্দ্রের রাবণবধ অধঃপতিতত ব্রাহ্মণ্যবাদী রাষ্ট্রের (রাবণ পুরোহিত শ্রেষ্ঠ বলে প্রসিদ্ধ আছেন) পরাজয়ের প্রতীক। রামচন্দ্রের কাহিনী যখন বৌদ্ধযুগের তখন বুদ্ধকে আর আলাদা করে অবতার বানানোর দরকার নাই, এইজন্য ‘বর্ণসঙ্গীত’ গ্রন্থে তাকে দশাবতারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষ্ণুর সবকটি অবতারের তাৎপর্য্য এখানে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, আমি অন্যত্র তা বলেছি।

আমাদের লক্ষ্মীর পাঁচালিতে আছে যে লক্ষ্মী আগে অসুরদের ঘরেই ছিলেন। পরে অসুরেরা নীতিহীন হলে তিনি দেবতাদের কাছে উড়ে যান। এর তাৎপর্য্য হল সৌভাগ্যলক্ষ্মী সমাজতান্ত্রিকদের ছেড়ে ধনতান্ত্রিকদের বরণ করেন, যেমনটা ঘটেছিল প্রায় তিন দশক আগে পূর্ব্বতন সোভিয়েত রাশিয়ায়। আমাদের লক্ষ্মী কিন্তু লক্ষ্মীপুঁজির প্রতীক। আরও একটা কথা এখানে বলি। পুঁজি মানে শুধু ধনপুঁজি নয়, জ্ঞানপুঁজিকেও পুঁজি বলা যেতে পারে। এমনকি নিজের সততাকেও কেউ পুঁজি বলতে পারেন। কোনো কোনো ব্যবসায়ীরা বলেন যে সততাই তাঁদের একমাত্র মূলধন।

ভারতে পুঁজির উদ্ভব ও বিকাশ বিষয়ে সামগ্রিক আলোচনার অবকাশ এখানে নাই। তবে পুঁজি বলতে যে শুধু বৃহৎপুঁজি নয় এবং আধুনিক ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের আগে পৃথিবীতে পুঁজি ছিল না, এমনটা ভাবলে মানবসভ্যতার ইতিহাসকে বুঝতে অসুবিধা হবে — এই কথা এখানে বলে রাখলাম। কার্ল মার্কস পুরাণাদিতে ক্রিয়াভিত্তিক ভাষায় লিখিত ভারতে পুঁজির উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস জানতে পারেননি। যদি তিনি তা জানতে পারতেন তাহলে তাঁর পুঁজি বইটি অন্যভাবে লেখা হত বলে খান-চক্রবর্তী মনে করেন।