জাবালি
Modern Meadow এর তেরি জ্যাকেট

 

এসে গেল চামড়ার প্রকৃত বিকল্প! স্বপ্ন দেখি গণ পশুনিধন অবসানের…

আচ্ছা , এই চামড়ার জন্য কী দরকার হয় ? একটা পশুর , তা সে গরু/মোষ /ছাগল ইত্যাদি যাই হোক। তা পশুর চামড়া তো আর উল না যে আপনি কাটলেন আর আবার গজিয়ে যাবে। সুতরাং পশুটার মৃত্যু দরকার। আপনি বলবেন প্রোটিন ইত্যাদি , হ্যা ওটার দরকার আছে , কিন্তু তার সাথে তো আর প্রোডাকশন মানে উৎপাদনের যোগান এর গ্যারান্টি হয় না। এ ছাড়া আরো সমস্যা আছে ,ওই চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়ার পরেই কিন্তু সরাসরি ওটার মাধ্যমে আপনি চামড়ার জুতো ,ব্যাগ বা অন্য কিছু পেয়ে যাবেন না। এর থেকে এর গায়ে লাগা চর্বি এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসের আলাদা করার একটা প্রক্রিয়া চলে। এই কারণে ট্যানারি মানেই কিন্তু প্রচুর দূষণ। অথচ এর ব্যবসা তো বেশ লোভের, বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার এর কারবার হয়। অনেক কর্মসংস্থান তারপর ধরুন ধর্মীয় ক্যাচাল। কী নেই! একদম ফিল্মি কাঠামো। আর এর শুরু তো সেই মানুষের সভ্যতার শুরু থেকে। তবে?

এ তো জানা কথা, এর বিকল্পই বা কী?

আছে, আছে, এর বিকল্প এসে গেছে। Modern Meadow বলে একটি প্রতিষ্ঠান যারা সাফল্যের সঙ্গে ইস্ট এর ব্যবহার করে উৎপাদন করছে বায়োফেব্রিক চামড়া, যার জন্য আপনি পাচ্ছেন ওই চামড়ার জিনিশটি; অথচ এরজন্য কোনো প্রাণী নিধনের দরকার হচ্ছে না। এই ইস্টকে ব্যবহার করে তৈরি করছে কোলাজেন বলে একটি বস্তু। সোজাকথায় এক প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি হয়েছে যা চামড়ার গুণাবলী নিয়ে তো আছেই, এছাড়া চামড়ার প্রসারণশীলতা এবং শক্তি, দু’টোই আছে এর মধ্যে। বস্তুতঃ সোজা কথায়, ওই কোলাজেন হলো এমন একটি প্রোটিন যা আমাদের ওই চামড়ার (সকল প্রাণীর) তৈরির মূল কাঠামো।

প্রচলিত ধারায় চামড়া আহরণ করতে উপরে যেমন বলেছি, আমাদের ওই চামড়ার সাথে লেগে থাকা চর্বি বা চুল ইত্যাদির বাদ দেওয়ার দরকার হয়। আর এই নতুন পদ্ধতিতে কোলাজেন তৈরি করার পর তার পরিস্রুত করা হয় সরাসরি। ট্যানিং হয় আর তৈরি হয় বিনা রক্তপাতে চামড়া। মনে রাখবেন এই পরিশ্রুত করা বা ট্যানিং করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আগের মতো কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া অথবা দূষণ এর কোনো অবকাশ থাকে না।

তা, এই জিনিশ এলো কীভাবে?

এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ এসেছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রয়োগে। আগে এর প্রয়োগ ছিল ইনসুলিন এর ওপর, এখন ওটা এসে গেছে সিল্ক , সুগন্ধি থেকে চামড়া অনেক কিছুর ওপর। বিস্তারিত জানতে এর কিছু সূত্র সঙ্গে দেওয়া হলো।

Modern Meadow এই বছরের জুলাই ২০ তারিখে পুরোদস্তুর এর ওপর মানে প্রস্তুতজাত পণ্যের ওপর প্রদর্শনী করে নিউইয়র্কে। কোম্পানিটির দাবি তারা চামড়ার নকল করছে না, বরং চামড়ার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করছে। এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও গেবোর ফরগাস এর আগে মানুষের টিস্যু তৈরির অভিজ্ঞতা নিয়েই এই নতুন কারবার শুরু করেছেন। মনে রাখবেন, এই কোম্পানি শুরু করেছে ২০১১ তে তাদের যাত্রা। যাদের পরবর্তী উদ্যোগ বিনা পশু বধে মাংস তৈরি। আপাততঃ এই কাজ করতে গিয়ে মানে, মাংস তৈরি করতে গিয়ে ওটার খরচ আর বাজারের মাংসের খরচের হিসেবে ওই উদ্যোগ লাভদায়ক না হওয়ায় আপাতত মূল লক্ষ্য চামড়ার ওপর রেখেছেন।

এই যাত্রাপথ এর কিঞ্চিৎ বর্ননা

প্রথমে এরা আগের অভিজ্ঞতা থেকে মূলত গরুর চামড়ার প্যাটার্ন এর ধাঁচে প্রাণীজ চামড়ার ল্যাবরেটরিতে প্রস্তুত করতে গিয়েছিল। এতে সমস্যা হয়েছিল অনেকগুলো। একে তো এতে দরকার হচ্ছিল সিরাম, মানে রক্তরস যা আহরণ করার দরকার ছিল গর্ভস্থ বাছুরের থেকে আর ওই পদার্থ থেকে প্রাথমিক বস্তুর পচনশীলতায় সমস্যা হচ্ছিল। আরো একটা বিষয় ছিল এই যে, বিকল্প ব্যবস্থা সেই প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল।

এর সমাধান দেন উইলিয়ামসন যিনি দুঁ পোঃ নামের (DuPont) বহুজাতিক সংস্থা থেকে এই প্রতিষ্ঠানে আসেন ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে। তিনি বুঝতে পারেন এই প্রাণীর নির্ভরশীলতা আগে দূর করতে হবে। যে ইস্ট এর কারণে ওই প্রাণীজ বস্তু পচে যাচ্ছিল সেই ইস্টকে তিনি করে তোলেন মূল হাতিয়ার। এখন মূল চ্যালেঞ্জ তার কাছে ছিল ওই ইস্টকে প্রাণীজ কোলাজেন তৈরির কাজে লাগানো। এমনিতে বর্তমানে ওই ইস্ট এর ওপর জিন টেকনোলজি দিয়ে কাঁচি চালানোর মতো করে একে দিয়ে প্রাণীজ ইনসুলিন এর মতো জিনিশ তো তৈরি করছিল ওষুধ কোম্পানিগুলো কিন্তু এই প্রাণীর চামড়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রোটিনের জন্য উইলিয়ামসন আর একটু কাঁচি চালান, আরো দুটো জিন এর মিশ্রণ করেন। মজার কথা হলো- এর ওপর বিশদে এখনো বলেন নি। কারণ স্বাভাবিক, তিনি তার মূল জিনিশ অন্যের হাতে দিয়ে দেবেন ওটা কী হয়? ট্যাকাটুকা তো মূল বিষয়। তাই ওটা এখনো নিজের মন্ত্রগুপ্তি করে রেখেছেন।

অতঃপর তিনি ওই ইস্ট দিয়েই প্রাণীজ চামড়ার মতো মূল পদার্থ তৈরি করে ফেলেছেন। এই চামড়ার ‘মতো‘ বস্তুটি ট্যানিং করে তৈরি করা যাচ্ছে একদম চামড়ার বিকল্প! বস্তুতঃ প্রচলিত পদ্ধতিতে আমরা মূল প্রাণীর ওপর নির্ভর করি চামড়ার গুণাগুণ ,তার আকার এবং তার শক্তির জন্য আর চাইলেই আমরা যতটা ইচ্ছে চামড়া এক কাট এ পেতে পারি না। এক্ষেত্রে আমরা চাইলেই গুণমান এর আগের থেকে পরিবর্তন করতে পারি না। অথচ, বিকল্প জেনেটিকাল ব্যবস্থায় আমরা যতটা খুশি চামড়ার মতো বস্তু এবং এর পাতলা বা মোটা অথবা শক্ত বা প্রসারণশীলতার ওপর মাপকাঠি আগেই চাপিয়ে দিতে পারি। মনে রাখবেন, যত খুশি চামড়াজাতীয় পণ্যের উৎপাদন করাও কোনো কঠিন ব্যাপার না! এর কারণ ওই বস্তুর আণবিক কাঠামো মানে মলিকিউলার স্ট্রাকচার এর ওপর নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষ।

 

Modern Meadow এর গবেষণাগার
Modern Meadow এর গবেষণাগার

 

এতেই Modern Meadow থেমে নেই। তারা চুক্তি করেছে বেশ কিছু ফ্যাশন ডিজাইনারের সাথে, যাতে এর ব্র্যান্ডিং করা যায় সরাসরি উপভোক্তার সাথে। প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার সুজান লি কে দিয়ে এর ওপর প্রচার করছে বেশ জোরে। একটি সম্পৃক্ত লিংক দিলাম। গুতো দিয়ে একটু দেখে নিন। থিমটা বেশ আকর্ষক, নিজের কাপড় নিজেই তৈরি করুন, অনেকটা ওই নিজের ফসল নিজেই ফলান এর মতো।

মজার কথা হলো এই কোম্পানি আর এদের কার্যবিধি বেশ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে মূল চামড়ার কারবারিরা। এর এক মধ্যমনি লেদার রিসার্চ ল্যাবরেটরির স্টিফেন ল্যাং এক নতুন যুক্তি তুলে ধরেছেন, তারা মানুষের ফেলে দেওয়া জিনিশ দিয়ে মানুষের সেবা করছেন। অর্থাৎ তারা তো কোনো ক্ষতি করছেন না, মানুষের উপকার করছেন। কী বুঝলেন? হে হে, বিকল্প রাস্তা কিছু পাচ্ছেন না উনারা!

Modern Meadow তার ৬০ জন কর্মীকে নিয়ে নাটলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নীরবে তাদের কাজ করে যাচ্ছে। মনে রাখবেন ইতোমধ্যেই তারা বাজার থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার তুলেছে বিনিয়োগকারীদের থেকে। এই ফ্যাক্টরির তৈরি ‘চামড়া‘ কিন্তু কোনো প্রাণীর ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করে দিল। আরো মনে রাখবেন, স্রেফ মাংস খাওয়ার জন্য প্রাণী বধ হয় না। এই চাহিদার কারণে খামার এর তৈরি এবং আজকের গ্রিনহাউস দূষণ, এর অন্যতম কারণ কিন্তু এই খামারজাত প্রাণীর বৃদ্ধি।   

সুজানে লি
সুজানে লি

 

কোম্পানির চিফ টেকনিক্যাল অফিসার উইলিয়ামসন এর এই প্রাথমিক চামড়ার মতো বস্তুটি একদম চামড়ার ট্যানিং এর আগের পদার্থের মতোই বরং আরো উৎকৃষ্ট। হ্যা, ওটা আমি বলছি না, বলছে এর ওপর পরীক্ষা করা ল্যাবরেটরিগুলো। আরো মজার হলো এই বস্তুটির একটি বড় অংশতে আপনি বিবিধ গুণাবলীর নানান ভাগ করতে পারেন অর্থাৎ কোথাও গরুর চামড়ার টেকসই ভাব, কোথাও ছাগলের চামড়ার নরমভাব অথবা লোভনীয় অথচ দূর্লভ প্রাণীর চামড়ার গুণগতমান আনতে পারেন ইচ্ছা করলেই! আপাততঃ তারা গরুর চামড়ার বিকল্প এনেছেন। অন্যক্ষেত্রে কাজ চলছে উটপাখির এবং কুমিরের চামড়ার বিকল্প আনার জন্য।  

ডিএনএ’র কারিকুরি দিয়ে ক্যাঙ্গারুর চামড়ার শক্তি, ছাগলের চামড়ার পেলবতা, অধুনা বিলুপ্ত (আবার ফিরে আসছে!) ম্যামথ এর চামড়ার উষ্ণতা অথবা সাপের মসৃণতা নিয়ে কোন চামড়ার গুণমান এর প্রোডাক্ট পেলে কী বলবেন?

পাবেন, খুব শিগিগিরই পাবেন!

বড় ভালো লাগলো খবরটা দিতে পেরে। অনেক অবোধ প্রাণী বেঁচে যাবে আমাদের লোভ আর লালসার হাত থেকে। আবার বলছি, এই বিকল্প কিন্তু কোনো আগের ওই সিনথেটিক বস্তু না! চামড়ার বাবা এসে গেছে!

লেখার ওপর আপনাদের সুচিন্তিত মতামত আশা করি। কোথাও ভুল থাকলে ধরিয়ে দিন, নিজেকে সংশোধন করবো।

সবাইকে ধন্যবাদ ধৈর্য ধরে লেখাটা পড়ার জন্য।

জয়তু বিজ্ঞান! জয়তু মানুষ!

 

তথ্যসূত্র: 

১) The Economist: More skin in the game: Leather grown using biotechnology is about to hit the catwalk

২) Biofuels DigestLeather fabric made from bacteria, green tea, sugar and yeast

৩) ForbesIn-Depth With Modern Meadow: The Bioengineering Start-Up Growing Leather In A Lab

৪) TED: Grow your own cloths

৫) Tech Crunch: Modern Meadow raises $40 million to grow leather without livestock

৬) Ecouterre: Grow Your Own Microbial “Leather” in Your Kitchen (DIY Tutorial)

0 Shares

জাবালি এর ব্লগ   ৫২ বার পঠিত