শ্রীশুভ্র

ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ বিচার ব্যবস্থাই আজ প্রশ্নের মুখে। প্রশ্ন তুলেছেন আর কেউ নন, খোদ বিচারপতিরাই। না সব বিচারপতিই নন। বিশেষ কয়েকজন। হাতে গোনা মাত্র। কিন্তু যাঁরা ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে সর্বসমক্ষে এমন এক গভীরতর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন নজিরবিহীন ভাবে, তাঁরা কেউই আবার যে সে বিচারপতি নন। খোদ সুপ্রীম কোর্টের অভিজ্ঞতম বরিষ্ঠ সব বিচারপতি। তাঁদের কথা এড়িয়ে যাওয়া মানে ঘরে আগুন লাগলে চোখ বুঁজে বসে থাকার সামিল। কিন্তু কি তাঁদের মূল অভিযোগ? অভিযোগ সত্যই গুরুতর। অভিযোগ ভারতীয় সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধেই। অভিযোগ নানাবিধ নিয়ম বহির্ভূত কাজকর্মের। ভারতের মত বৃহত্তম গণতান্ত্রিক একটি দেশের সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধেই অন্যান্য সহ বিচারপতিদের এহন অভিযোগের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। বস্তুত স্বাধীনতার সাত দশকে এহন নজির এই প্রথম। আর সেই কারণেই আলোড়ন উঠেছে দেশের সর্বত্র।

ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ আজও বসে থাকে সুপ্রীম কোর্টের ভরসায়। আজও অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করে সুপ্রীম কোর্টের বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতায়। আজও সুপ্রীম কোর্টের আইনি দিকনির্দেশকে চুড়ান্ত বলেই স্বীকার করে নিতে অভ্যস্থ সকলেই। কিন্তু সেই সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নিরপেক্ষতার বিষয়েই যদি প্রশ্ন উঠে যায়, তবে অবস্থা যে কতটা ভয়ানক সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অভিযোগকারী বিচারপতিদের কথায় এটা সুস্পষ্ট যে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার দূর্বলতার বাস্তবিক পরিস্থিতির হিমশৈলীর চূড়া মাত্র। ভারতবর্ষের বিচারব্যবস্থা মূলত ঔপনিবেশিক ঘরাণার। ব্রিটিশের তৈরী করে দিয়ে যাওয়া পরিকাঠামোর উপরেই নির্ভরশীল। এই বিচার ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্টই হলো দীর্ঘসূত্রিতা। কিন্তু বিচারপতিদের নিরপেক্ষতার বিষয়ে জনসাধারণের বিস্তর অভিযোগ থাকলেও খোদ সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতিরাই যখন একই অভিযোগ তোলেন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে, তখন গোটা দেশের ভিতটাই টলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরী হয়। ব্রিটিশের ফেলে যাওয়া রাজ্যপাটের মূল বৈশিষ্টই হলো ফেল কড়ি মাখো তেল। সকলেই জানে যার অর্থের জোর যত বেশি তার পক্ষেই আইনি সহায়তা পাওয়া তত বেশি সহজ। আর ক্ষমতার গদীতে বসে গেলে সেই আইনকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগানো এদেশে নতুন কোন ঘটনা নয়। কিন্তু তবুও গণতন্ত্রের শেষ রক্ষাকবচ ভারতীয় সুপ্রীমকোর্টের নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিশেষ কোন সংশয় ছিল না। সকলেরই ধারণা ছিল, অন্যান্য আদালত যে রায়ই দিক, শেষ অব্দি সুপ্রীমকোর্টে পৌঁছাতে পারলে সঠিক বিচারটুকু অন্তত পাওয়া যাবে।

আর সাম্প্রতিক এই ঘটনা সুপ্ত লালিত সেই বাসনাতেই জল ঢেলে দিল একেবারে। অভিযোগকারী বিচারপতিদের কথায় এটা সুস্পষ্ট যে প্রধান বিচারপতির কর্মপদ্ধতি সুপ্রীমকোর্টের রীতিনীতিকে লঙ্ঘন করে চলেছে। এবং এর ফলে বিচারব্যবস্থার আইনী স্বচ্ছতা নিয়ে ও প্রধান বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়েই সংশয় তৈরী হয়েছে। বস্তুত ভারতীয় গণতন্ত্রের উপর এটি একটি প্রবল আঘাত। এখন সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে কোন কোন বিচারপতির নির্দিষ্ট কি কি অভিযোগ, সেই সকল তথ্য সংবাদ মাধ্যম মারফত সর্বত্রই ছড়িয়ে গিয়েছে। আগ্রহী ব্যাক্তিরা খুব সহজেই সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পেয়ে যাবেন। বর্তমান প্রবন্ধের বিষয় সেই সকল তথ্যের নির্ঘন্ট নির্মাণ নয়। আমরা বুঝে নিতে চাইছি, এই ঘটনার মূল প্রক্ষিতটুকু ও এর অভিঘাত ঠিক কিরকম হতে পারে।

ব্রিটিশের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এদেশের শাসনকার্য মূলত এদেশীয় শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার কাজই করে এসেছে বরাবর। আর সেই কাজে সমগ্র বিচারব্যবস্থাকেই শাসক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষায় ব্যবহার করাটাই ভারতীয় গণতন্ত্রের রীতিরেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে বিগত সাত দশক ব্যাপি সময় সীমায়। ফলে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন নতুন কোন বিষয় নয়। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতিদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু এই প্রথম। এবং অভিযোগ উঠেছে একেবারে অভ্যন্তর থেকেই। ভারতীয় রাজনীতিতে শাসক শ্রেণী তার ক্ষমতাবলে আইনকে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নিজের দিকে টেনে নেবে, এ আর নতুন কথা কি। ভারতীয় জনগণ এতেই অভ্যস্থ। কিন্তু তার পরেও জনমানসে এতদিন একটি দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, শেষ পর্য্যন্ত সুপ্রীমকোর্ট অব্দি যেতে পারলে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এবং সেরকম বিশ্বাস করার যথেষ্ঠ কারণও ছিল। সেরকম দৃষ্টান্তের অভাব নেই মোটেও। কিন্তু খোদ প্রধান বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়েই যদি প্রশ্ন উঠে যায়, তবে জনমানসের প্রতিক্রিয়া যে মোটেই সুখকর হয় না, সে কথা বলাই বাহুল্য।

এখন, বিষয়টা হচ্ছে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত নিয়েই। আজকের অভিযুক্ত প্রধান বিচারপতির অবসরের পর নতুন যাঁরা প্রধান বিচারপতি হবেন ভবিষ্যতে, তাঁরাও যে সব ধোয়া তুলসীপাতা হবেন, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা কে দেবে? এবং যেখানে সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গেল, সেখানে দেশের অন্যান্য আদালতের বিচারপতিদের নিরপেক্ষতা নিয়ে তো আর দায়বদ্ধতার জায়গাই রইল না। কি ভয়ানক এক পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় গণতন্ত্র! আজকে এটা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে, প্রয়োজনে শাসক শ্রেণীর ক্ষমতার কাছে বিচারকও নতজানু হতে বাধ্য। আর তা না হলে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও আর সুনিশ্চিত নয়। এবং শাসকদলও সবসময় চাইবে তাদের বশংবদ বিচারপতিরাই সর্বোচ্চ আদালতের দায়িত্বও সমালাক। এবং এটাই যদি ভারতীয় গণতন্ত্রের রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তবে এই গণতন্ত্রের ভিতর দিয়েই স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির উত্থান অবশ্যাম্ভাবি কিন্তু। তখন সুপ্রীমকোর্টও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির হাতের পুতুলেই পরিণত হবে। ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে সেটা আদৌ সুখকর হবে না।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, আজকের ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের সমাজজীবনেই ক্ষমতাসীন শাসকদলের নিরঙ্কুশ দাপট। এই যে নিরঙ্কুশ দাপট, এটাই কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের আগাম পূর্বাভাস। এবং অধিকাংশ সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলেরই মূল কার্যক্রম সারা ভারতের সর্বত্র একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা। তাদের সকল রাজনৈতিক কর্মসূচীই সেই লক্ষ্যেই পরিচালিত হতে থাকে। এবং যে দল যে অঞ্চলেই প্রশাসনিক ক্ষমতার গদী দখল করে নেয়, তার প্রথম কাজই হয় আইনকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা। এর থেকে ভয়াবহ ব্যাপার গণতন্ত্রে আর কি হতে পারে? অথচ ভারতীয় গণতন্ত্রে এটাই প্রচলিত রেওয়াজ। ফলে আজকে সর্বোচ্চো আদলতের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খুব একটা বিস্ময়কর ব্যাপারও নয়। এটাই তো হওয়ার কথাই ছিল। এবং সেটাই হয়েছে। শাসক শ্রেণী তার স্বার্থেই সমাজকে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। আর সেই কাজে আইন আদালত বিচার ব্যবস্থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সবসময় তৎপার থাকে। সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে এর থেকে বড়ো অভিশাপ আর কি হতে পারে? দুঃখের বিষয়, স্বাধীন ভারতের সূচনালগ্ন থেকেই এই অভিশাপই এই দেশের গণতন্ত্রের মূল পরিচয় হয়ে উঠেছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই এই অভিশাপটিকেই পাখির চোখ করে নিয়ে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে অগ্রসর হয়েছে। আর জনগণ নিরব দর্শক হয়ে থেকেছে। কিন্তু এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো এই যে, এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে কোন একটি স্বৈরাচারী শক্তি যদি একবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, তবে ভারতীয় গণতন্ত্রের এই দুর্বলতম দিকটি দিয়েই সেই শক্তি গোটা ভারতটাকেই একদিন নিজেদের কুক্ষিগত করে নেবে। আর সেই কুক্ষিগত করে নেওয়ার পথে সর্বোচ্চ আদালতেই যদি নিজেদের বশংবদ বিচারপতিদের বসিয়ে দেওয়া যায়, তবে তো সোনায় সোহাগা। তার থেকে সহজ পথ আর কি হতে পারে? সুপ্রীমকোর্টের চার বিচারপতির সাম্প্রতিক বিদ্রোহ ঠিক এই কারণেই এতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে বিচারপতিদের এই অভিযোগ নির্দিষ্ট একজন প্রধান বিচারপতিকে কেন্দ্র করেই ধরে নিলে কিন্তু মস্ত বড়ো ভুল হবে। তাদের অভিযোগের মূল গুরুত্ব অনুধাবন না করতে পারলে ভবিষ্যত খুব একটা আশাপ্রদ নয়। আজকের ভারতবর্ষের সমাজ ও রাজনীতিতে স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিগুলির বাড়বাড়ন্ত লক্ষ্য করলেই প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মূলে প্রবেশ করা যাবে। তখন বোঝা যাবে মূল বিষয়টি আদৌ কোন ব্যক্তি মানুষের নৈতিকতার অবক্ষয়ের বিষয় নয়। মূল বিষয়টি ভারতীয় গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার। মূল বিষয়টি ভারতবর্ষের মধ্যে পুষ্ট হতে থাকা স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে চিহ্নিতকরণের। মূল বিষয়টি ভারতীয় জনগণের সচেতন হয়ে ওঠার। মূল বিষয়টি ভারতের ভবিষ্যতের।

শ্রীশুভ্র এর ব্লগ   ৪২২ বার পঠিত