তানবীরা তালুকদার

২০০০ সালে নতুন দশকের সাথে সূচনা হয় নতুন সহস্রাবব্দের। সারা পৃথিবীজুড়ে এ নিয়ে হই চই শুরু হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। নিরানব্বই থেকে দুই হাজার পর্যন্ত বাংলাদেশের অনেক দোকানপাটের নাম হয় এটা  অনুসরণ করে। ঢাকার নিউমার্কেটে চলে আসে ‘মিলিনিয়াম বিরানী হাউজ। নামকরণের এই ব্যাপারটি বাংলাদেশে ইউনিক। চায়নিজ রেস্টুরেন্টের নাম ম্যাকডোনাল্ডস;, চুল কাটার দোকানের নাম কাসাব্লাংকা হেয়ার কাটিং, জিগাতলায় আছে সুনামী রেস্টুরেন্ট

 

যে কোন জিনিশ যে কোন কারণেই আলোচিত তার দ্বারাই কিছু না কিছু দেশে নামাংকিত। বুশ আর সাদ্দামের যুদ্ধের কারণে সেসময়কার জন্মানো প্রচুর ছেলে শিশুর নাম সাদ্দাম। বাংলাদেশের আরেকটি ব্যাপার আমার খুব মনে ধরে, রাস্তার দুপাশে মনোরম সব বিলবোর্ড। দক্ষিণ এশিয়া বাদে এ বিষয়টি আমি অন্য কোন দেশে খুব একটা দেখতে পাই নি। পশ্চিমে থাকে খুবই ছোট সাইজের সামান্য বিজ্ঞাপন, কিন্তু প্রকট রঙ ব্যবহার করে, পেল্লায় সাইজের এই বিলবোর্ড একান্তই দক্ষিণ এশিয়ার গৌরব বলা চলে!

 

এই গৌরবোজ্জ্বল সহস্রাব্দের সূচনা হয়েছে বাংলাদেশে খুবই কলঙ্কজনকভাবে। থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে অনেক ছেলেদের পাশাপাশি কিছু মেয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বের হয়েছিল। সেখানে বাঁধন নামে এক তরুণীকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা হয়। যার কারণে তাঁর ব্যক্তিগতজীবন প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, তার সেই সময়ের বাগদত্তা তাদের বাগদান ভেঙ্গে দেন। ২০১০ সালে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় সেদিনের সব অপরাধীকে আদালত মুক্তি দেন। সমন জারী করা সত্বেও একদিনও বাঁধন আদালতে আসেন নি, শুনানীতে কিংবা সাক্ষ্যগ্রহণে অংশগ্রহণ করেন নি। পৃথিবীজুড়ে যে সহস্রাব্দের সূচনা হয়েছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে, সেখানে বাঁধন নিজের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়টুকুর প্রতিবাদ করারও সাহস পাননি নিজ দেশে।

 

 

এই দশকে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে তার ডাবল হ্যাট্রিক অর্জন করে বিশ্ব জোড়া অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন থাকে। মধ্যবিত্তের জীবনধারায় প্রভূত পরিবর্তন ও উন্নতি দেখা যায়। প্রায় বাড়িতেই রঙিন টিভি, ডিপ ফ্রিজ, এসির মতো ইলেকট্রনিক সামগ্রী সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। প্রায় সবার হাতে হাতেই পৌঁছে যায় মোবাইল। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো, মোবাইল-টিভি এগুলো এতোদিনে কেবল মধ্যবিত্তই নয়, নিম্নবিত্তের হাতেও পৌঁছে গেছে। প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত ঘরেই কম্পিউটার বর্তমান। এবং আধুনিক জেনারেশন ব্যাপকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারও করছেন। আগেরমতো সিদ্ধ করে পানি ছেঁকে ঢালার পরিবর্তে বাড়িতে বাড়িতে ফিল্টার মেশিনের প্রচলন হয়। ঢাকায় বসুন্ধরা, শর্পাস ওয়ার্ল্ড-এর মতো শপিং মল এসেছে মধ্যবিত্তের জীবনে। সারা গুলশান-ধানমণ্ডি ভরে গেছে বাহারী ইংরেজি, বাংলা নামের আধুনিক ও অভিজাত রেস্টুরেন্টে। বিশ্ববিখ্যাত ফার্স্টফুড চেইন কেন্টোকি ফ্রাইড চিকেন, পিজা হাট বাংলাদেশে তাদের প্রথম দোকান খোলে গুলশানে।

 

বুমারস এর মতো রেস্টুরেন্ট ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিংস বেকারি ব্রাউন ব্রেড নিয়ে আসেন ঢাকার বাজারে। আগে মাছওয়ালা, মুরগীওয়ালারা শুধু তাদের পণ্য বিক্রি করেই চলে যেতেন। এখন তারাও বাড়তি সেবা প্রদানে মনোযোগী হয়েছেন। বিক্রির পর মাছ-মুরগী কেটে দিয়ে যান। সারাদেশ জুড়েই দেশি মুরগীর পাশাপাশি ফার্মের মুরগী খাওয়ার প্রচলন হয়।

 

এই দশকে আবারো জলপাই রঙধারীরা প্রায় দুবছর দেশশাসন করেন। বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকটআকার ধারণ করে এই দশকে। বিদ্যুৎ সমস্যা, পানির সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অসহ্য যানজট নিয়ে চলেছে এই দশকের মধ্যবিত্তের জীবন। বিদ্যুৎ সমস্যার আপাত সমাধান বের করেন মধ্যবিত্তরা আইপিএস ব্যবহারের মাধ্যমে।

 

 

শনির আখড়ায় ২০০৬ সালে অতিষ্ঠ এলাকাবাসি তাদের জনপ্রতিনিধিকে ধাওয়া করেন এক পর্যায়ে। বাংলা ভাই নামের এক সন্ত্রাসীর উত্থান ঘটে এবং হাজার নাটকের মাধ্যমে তাকে সরকার গ্রেফতার ও কাউন্টার এটাকের আইওয়াশ করে এই নাটকের সমাপ্তি ঘটান। ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও এদশকেই ঘটে। ২১শে আগস্ট ২০০৪ সালে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত এই ঘটনার তদন্তকাজ চলছিল। তবে এই দশকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামীদের সাজা হয়, আর জাতি খুনের দায় থেকে কলঙ্কমুক্ত হয়। রমনা বটমূলে নতুনবছরের প্রথম প্রহরে সন্ত্রাসীরা বোমা হামলা করে। বোমা বিষ্ফোরণ, বিল্ডিং ধ্বসে মৃত্যু, অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু, হত্যা, সর্বোপরি অপমৃত্যুর হার এই দশকে সর্বকালের রেকর্ড ছাড়ায়। যারই অপমৃত্যু হোক না কেনো, যেকোন কারণে তার সুবিচার পাওয়া বাংলাদেশে অসম্ভব এটাও এই দশকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

 

 

আনিসুল হকের লেখা আর মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর পরিচালনায় ব্যাচেলর নামক ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয় মধ্যবিত্ত দর্শকদের কাছে। ব্যাচেলর সিনেমার ভাষারীতির দ্বারা তরুণ সমাজ ব্যাপক প্রভাবিত হন। প্রমিত ভাষার পরিবর্তে উঠতি লেখকরাও ফারুকী ভাষা ব্যবহারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। নগরজীবনে, স্কুল-কলেজে, নাটকে-সিনেমায় এই ভাষাটির প্রচলন শুরু হয়। সুশীল সমাজে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্তের জীবনের কোথাও এই ভাষারীতিটি রয়ে যায়। এসময় ঢাকাই বাণিজ্যিক ছবি কাজী হায়াৎ এর আম্মাজানও বেশ সাড়া তোলে।

 

তিশা, শ্রাবন্তী, তিন্নি, প্রভা, অপূর্ব, শাহেদ, হাসান মাসুদ, অপি করিম এরা এসময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা অভিনেত্রী। আনিসুল হকের লেখা ধারাবাহিক ৬৯, ৫১, দৈনিক তোলপাড় মধ্যবিত্তের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পায়। সেইসময় নাটকেরও গ্রুপ তৈরি হয়। হুমায়ূন আহমদের গ্রুপ, সালাহউদ্দিন লাভলু গ্রুপ, আনিসুল হক গ্রুপ ইত্যাদি। প্রত্যেক গ্রুপের কিছু ফিক্সড অভিনেতা অভিনেত্রী ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদ মানেই শাওন, সালাহউদ্দিন লাভলু মানেই তানিয়া আর ফারুকী মানেই তিশা। এ সময়ের আরো কিছু উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিক ছিল ৪২০, লাবণ্যপ্রভা, রঙের মানুষ প্রভৃতি।

 

অনলাইনে লেখালেখির জন্য ব্লগ মাধ্যমটিও বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সামহোয়ারইন নামক বাংলা ব্লগটি প্রথম বাংলা ভাষাভাষীদের প্রতিষ্ঠিত ব্লগ। এরপর মুক্তমনা, সচলায়তন, নাগরিক, ধর্মকারী, নবযুগ নামের ব্লগও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ধর্মবিরোধী লেখালেখির অভিযোগে সরকার ২০১২ সালে ধর্মকারী এবং ২১০৩ সালে নবযুগ ব্লগ নিষিদ্ধ করে। অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক সাংবাদিক প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি অন্তর্জালেও লেখালেখি শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক, হাই ফাইভ, অর্কুট, টুইটার, গুগল বাজ এগুলোর বিশদ ব্যবহার ঢাকাবাসী শুরু করেন। মোবাইলের মাধ্যমে অন্তর্জাল ব্যবহার করাও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এসময়।

 

মিলা, তিশমা, আনুশেহ, শাহরিয়ার জয়, অর্নব, বাপ্পা, পার্থ, হাবিব, বালাম, তপু, তাহসান এরা সেসময়ের জনপ্রিয় গায়ক গায়িকা। দেশি কাপড় ব্যবহার করে দেশে তৈরি পোশাক তখন তারকাদের কাছেও বেশ জনপ্রিয়। ফ্যাশনহাউজ রঙ, ড্রেসিড্যাল, ইনফিনিটি, স্মার্টেক্স, বাংলার মেলা, মায়াসীর, দর্জি, মান্ত্রা এরা নিজেদের ডিজাইনের স্বাতন্ত্র্যের কারণে মধ্যবিত্তের মন কাড়েন। মধ্যবিত্তকে ভারত থেকে বাংলাদেশমুখী করে তোলেন এই ফ্যাশন হাউজগুলো। অনেকে বিয়ের উৎসবের জন্যেও দেশি ফ্যাশনহাউজের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন।

 

 

পাটিয়ালা সালোয়ার নামক অনেক কুচি দেয়া পাঞ্জাবী সালোয়ার ২০০৪-২০০৫ এর দিকে খুব জনপ্রিয় ছিল। আবার সেইসময় ওপরে কলার তোলা বাণ্টি বাবলী কামিজের ডিজাইনও হটকেক ছিল। যদিও বিভিন্নসময় ভীর জারা থ্রিপিস, লাক্ষৌ চিকেনের কাজ করা থ্রিপিস, চুন্দরী থ্রিপিস, কটকী থ্রিপিস ঘুরে ঘুরে ফ্যাশনে ছিল। এসময়ে কিশোরী-তরুণীদের কাছে জিন্স-ফতুয়া বেশ জনপ্রিয় ছিল। আধুনিক ছেলেরা অলঙ্কার পরা শুরু করেন এ দশকে। হাতে নানা ধরনের ব্রেসলেট, গলায় মালাসহ অনেককেই তখন দেখা যেতো। অনেক ছেলেই রঙিন পাঞ্জাবী ও ফতুয়া পরতেন।

 

গয়নায়ও আসে যুগান্তকারী পরিবর্তন। হাল ফ্যাশনের গয়নার পরিবর্তে আগেরদিনের ভারী ভারী সেকেলে গয়নার ডিজাইন বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রুপোর গয়নায় সোনার জল দিয়ে তাতে নানা রঙের ম্যাচিং পাথর বসিয়ে মেয়েরা পরতে শুরু করল। সোনার বদলে রুপো হয়ে ওঠলো মধ্যবিত্তের অলংকার। বিয়ের সাজেও আগের মতো প্রচুর ফেস পেইন্টিং বাদ গেলো। হাত ভর্তি করে কনুই পর্যন্ত মেহেদী দেয়া হতো বিয়ের কণেদের, অনেকে পায়েও দিতেন। কনেরা লালের পাশাপাশি অন্য রঙের কাপড়ের ব্যবহার শুরু করলেন বিয়েতে। অনেক সময়ই দেখা যেতো বর-কনে রঙের সামঞ্জস্য করেই কাপড় পরছেন। বরদের শেরোয়ানি, পাগড়ী প্রভৃতিতে মুম্বাইয়ের লেটেস্ট মডেলের ছাপ দেখা যেতো। বিয়েতে আলাদা আলাদা কোণে ছেলে মেয়েকে আলাদা করে বসানোর পরিবর্তে, বর-কনেকে পাশাপাশি চেয়ারে বসানোর রেওয়াজ শুরু হলো। গায়ে হলুদে গান নাচের প্রচলন হয় ব্যাপকভাবে। মধ্যবিত্ত মেয়েরা প্রচণ্ড ত্বক, রূপ সচেতন হয়ে ওঠে সেসময়। প্রায় প্রতি পাড়ায় মোড়ে মোড়ে বিউটি পার্লার দেখা যেতো এসময়টায়। অনেক মধ্যবিত্ত মেয়েরা নিজেরাও এ ব্যবসার প্রশিক্ষণ নিয়ে বিউটি পার্লার চালাতে উদ্যোগী হন, তাতে করে বিউটি পার্লার মানেই চায়নিজ কিংবা হংকং; এ ধারনা পাল্টে যায়। ক্লান্তিময় নগরজীবন থেকে অব্যহতি পেতে অনেকেই ঈদের ছুটি কাটাতে সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা কিংবা সুন্দরবনে বেড়াতে যেতেন।

 

মোবাইলের সহজলভ্য ব্যবহার কিংবা অন্তর্জালের সহজলভ্যতার কারণেই হোক, আশঙ্কাজনকভাবে পরকীয়া প্রেম প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এজন্য অনেকে সন্তানের জীবন নিতেও পিছপা হন নি। সাহসী কিছু ছেলে, মেয়ে এসময় লিভ টুগেদার করতেন। ইভ টিজিং এর ঘটনায় মেয়েদের আত্মহত্যার হার যে কোনো দেশের যে কোনো কালের রেকর্ড ছাড়ায়। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এ নিয়ে সুশীলসমাজ বিশেষ করে মহিলা মহল একেবারেই চুপচাপ ছিলেন। তাদেরকে কোন ধরনের মানববন্ধন, প্রতিবাদসভা, নিদেনপক্ষে পত্রিকায় দুএকটা কলাম লিখতেও দেখা যায় নি।

 

 

২০১০ সালের ১৩ই নভেম্বর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টে পূর্ববর্তী সরকার থেকে পাওয়া ১৬৮ কাঠা আয়তনের সুরম্য প্রাসাদ থেকে সেনাবাহিনী বের করে দেন। জননেত্রী কেনো সেনাবাসে থাকবেন এবং বিরাট ধনী হওয়া সত্বেও কেনো তিনি সরকারী সম্পদ এখনো ভোগদখল করবেন এই ছিল তখনকার সবার যুক্তি। ২৯শে নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ে তিনি আইনি লড়াইয়েও হেরে যান এবং বাড়িটির দাবি তাঁকে আপাতত ছাড়তে হয়। সেসময় খালেদার কান্নাভেজা একটি ছবি ভাইরাল হয়। 

 

[নোট: সময়াভাবে অনেক কথাই লিখতে পারিনি। সময় পেলে পরে আরও লেখার ইচ্ছে আছে]