অভিজিৎ রায় একজন সুপারম্যান বলেই আমার ধারণা। নিজের কাজকর্ম সামলে এতরকম বিষয়ে লেখালেখি আর তার সঙ্গে অনলাইনের কাজকর্ম চালাতে গেলে আমার নিজের প্রতিদিন ৭২ ঘণ্টা সময় লাগার কথা। এই কারণেই তাঁর অভাবটা এত বেশি করে অনুভব করি। কাজকর্ম না করে সারাদিন ফেসবুক করা লোকেরা এইসব কোনোদিনও বুঝবেনা। অনেক মাথা ঘামিয়েও আমি বুঝে উঠতে পারিনি এই মানুষটা ব্লগ লেখার সময় পেতো কীভাবে। যেখানে আমি অনেক কম চাপের কাজ করেও ফেসবুক খোলার সময় পাইনা। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করায় তিনি একটি লম্বা উত্তর দেওয়া শুরু করেছিলেন বটে কিন্তু সেটা সাইকোলজি টপিকে আসামাত্রই বাধ্য হয়ে তাঁকে থামিয়ে দিয়েছিলাম। ব্যস্ত একজন মানুষ আমার মতো অপদার্থকে সাইকোলজি বোঝাতে গিয়ে অকারণ সময় নষ্ট করবেন সেটা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিলনা। সেই সময়টা অন্য কাজে দেওয়া সকলের জন্যই বেশি লাভজনক।

পরে কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম যে কঠিন বিষয়কে সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে এই মানুষটি খুবই দক্ষ। ‘বিশ্বাসের ভাইরাস‘ বইটা পড়তে গিয়ে কোথাও একটুও আটকায়নি। অথচ এর আগ অবধি ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, ব্রেন ইত্যাদি সম্পর্কে আমার জ্ঞানের পরিমাণ বলতে ছিল স্কুলের বইয়ের অর্ধেক ভুলে যাওয়া আতঙ্কময় স্মৃতি। আর সাইকোলজির কথা উঠলে আমি নিজেই উঠে যেতাম। এমন নিরেট মাথার অপদার্থের বোধগম্য ভাষায় লিখতে গিয়ে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে সেটা অবশ্য অনুমান করতে পারি। অনুমান করে আতঙ্কিত হই। এই গুরুদায়িত্ব এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো মানুষ সহজে পাওয়া যাবেনা। সস্তা গলাবাজির লোকের অবশ্য অভাব নেই।

নিজের অভিজ্ঞতা আছে বলেই জানি যে বিদেশের মাটিতে কাজ করার পরিশ্রম কেমন। সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন দেখি এই মানুষটার সেইসব অতিরিক্ত পরিশ্রমের সৃষ্টিগুলোকে কিছু ধান্দাবাজ মহানন্দে কপি করে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। যারা কাজগুলো করছে তাদের সম্পর্কে একসময় বেশ ভাল ধারণাই ছিল। ভেবেছিলাম অভিজিৎ না থাকলেও এইসব মানুষের মধ্যেই কেউ হয়তো তাঁর কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখলাম প্রথমেই তারা অভিজিৎ-এর ‘বেস্ট ফ্রেন্ড‘ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করল, আর কিছুদিন পরেই অভিজিৎ-এর ব্লগ, বই, ছবি এমনকী লাশের ছবি নিয়েও ব্যবসা শুরু হয়ে গেল। এ ব্যাপারে তেঁতুল হুজুর শফিমোল্লা বা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অভিজিৎ রায়ের সো কল্ড ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’দের বিশেষ তফাৎ দেখলাম না। এমনকী অভিজিৎ’র লেখাপত্র কপি করে ‘অনুমতিক্রমে প্রকাশিত‘ লেবেল লাগাতেও দেখেছি। এই অনুমতি কে দিয়েছেন সেটা অবশ্য সন্ধান পাইনি, তবে আমেরিকায় অভিজিৎ’র উত্তরাধিকারি অনুমতি না দেবার কথা নিশ্চিত করেছেন। বাকি থাকেন বাংলাদেশে অভিজিৎ’র পরিবার। সেখানের কেউ অনুমতি দিয়ে থাকলে আমার জানা নেই, কারণ আমি সন্ধান করিনি।

অভিজিতের সঙ্গে তোলা ছবি পোস্ট করেই যারা দায় সেরেছেন সেইসব সেলিব্রিটিদের ওপর আর ভরসা রাখিনা। এখন নতুন প্রজন্ম যদি নিজস্ব মগজ খাটিয়ে কিছু করতে পারে সেই আশাতেই আছি। লক্ষ লক্ষ অভিজিৎ জন্মানোর স্লোগান অনেকদিন ধরেই শুনলাম, কিন্তু আজ অভিজিতের জন্মদিনে দশজনকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলার মতো মানুষ একটাও যদি জন্মাতে দেখি তাহলেও যথেষ্ট হয়। তার আগে শুভ জন্মদিন জানাতেও কেমন যেন আড়ষ্ঠ হচ্ছি।

শুভ জন্মদিন অভিজিৎ।

 

ওয়াদি উজ্ জামান

বার্লিন, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭