শামসুজ্জোহা মানিক

প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, আমি এ কথা মনে করি না যে, আমার সমর্থনে বা অসমর্থনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কিছু যায় বা আসে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যারা গঠন করেছেন তারা সেটা করেছেন আমার সমর্থন পাবেন কি না পাবেন সে প্রশ্ন বিবেচনা না করে। বরং তাদের ইশতেহারে উল্লিখিত কর্মসূচী পড়লে বুঝা যায় যে, তারা সেটা করেছেন দেশের আপামর জনগণের স্বার্থ এবং চাহিদার কথা বিবেচনা করে। শুধু কর্মসূচীর কারণে যে আমি ঐক্যফ্রন্টকে সমর্থন করি তা নয়, বরং তার গঠন প্রক্রিয়ার কারণেও আমি তাকে সমর্থন করি। আমার বিবেচনায় আওয়ামী লীগের গত দশ বৎসরের শাসনে দেশে যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে মুক্তির একটা দিশা নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের আবির্ভাব। আমার মত আর দশজন সাধারণ মানুষের নিকটও ঐক্যফ্রন্ট সেভাবেই দেখা দিয়েছে বলে আমি ধারণা করি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচী আগাগোড়া আমি পড়েছি। সেগুলির অনেক কয়টির বাস্তবায়ন হলেও দেশে একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। অবশ্য আরও মৌল কিছু প্রশ্নকে কর্মসূচীতে আনা হয় নাই বা হয়ত আনা যায় নাই। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে এটা এমন একটা নির্বাচনী কর্মসূচী যেখানে বিভিন্ন দল এবং মতের একটা সমাহার ঘটেছে। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সম্ভবত এ দেশের ইতিহাসে এমন প্রথম ফ্রন্ট যেখানে শুধু বিভিন্ন দল নয় অধিকন্তু দলহীন ব্যক্তিরও অংশগ্রহণ ঘটেছে।

যাইহোক, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গঠনকে আমি এ দেশের বাস্তবতায় জাতীয় রাজনীতিতে একটা যুগান্তকারী ঘটনা হিসাবে দেখি। অবশ্য কেউ কেউ ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচীতে অনেক সীমাবদ্ধতা দেখতে পারেন। কিন্তু নূতন পথে এ দেশের রাজনীতির যাত্রার জন্য একটা সূচনার প্রয়োজন হয়েছিল। একটা দীর্ঘ অন্ধকার এবং শ্বাসরুদ্ধকর অচলাবস্থা থেকে দেশ ও জাতির মুক্তির পথে আগামী দিনের যাত্রায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটা মাইল ফলক হিসাবে কাজ করবে বলে আমি মনে করি।

আমার অনুমান সুদীর্ঘ কাল পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জাতিকে নূতন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। যে স্বপ্ন দেখতে আমরা ভুলে যাচ্ছিলাম সেই স্বপ্ন দেখতে শিখাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার মুহূর্ত থেকে এ দেশের মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গ শুরু হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী কালে আওয়ামী লীগের শাসনাধীন সেই অরাজকতা, লুণ্ঠন, দুর্নীতির মহোৎসবের কথা অনেকেরই ভুলবার কথা নয়। সেটা ছিল পাকিস্তানের দীর্ঘ চব্বিশ বৎসর ধরে লালিত স্বপ্নের নিদারুণ ধ্বংস ও সংহারের কাল। তারপরও বারবার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে এ দেশের মানুষের। মানুষ দেখেছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তামাশা। ১৯৯০-এর তিন জোটের রূপরেখার প্রতি অঙ্গীকারকে ১৯৯১-তে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার কীভাবে উপেক্ষা করেছিল সে কথাও তো আমাদের ভুলে যাবার কথা নয়। অথচ এই রূপরেখার অংশীদার তো বিএনপিও ছিল।

অবশ্য এ ধরনের বা আরও নির্লজ্জ অঙ্গীকার ভঙ্গ এ দেশে নূতন কিছু নয়। পাকিস্তান কালের কথা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্টন্ট গঠিত হয়, যার প্রধান শরীক দল ছিল আওয়ামী লীগ। যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচী ছিল একুশ দফা। একুশ দফার অন্যতম কর্মসূচী ছিল তৎকালীন পূর্ব বঙ্গের স্বায়ত্তশাসন। নির্বাচনে বিপুল ভোটে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। এই নির্বাচনেই এ দেশে মুসলিম লীগের কবর রচিত হয়।

নির্বাচন পরবর্তী কালে আওয়ামী লীগের ভূমিকা অনেকেরই ভুলবার কথা নয়। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের আইন মন্ত্রী হবার পর আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তানের যে সংবিধান প্রণয়ন করা হল তাতে পূর্ব বঙ্গসহ পাকিস্তানের প্রদেশগুলির স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নকে জলাঞ্জলি দেওয়া হল। এর পুরস্কার স্বরূপ পাঞ্জাবী স্বার্থের প্রাধান্যবিশিষ্ট পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী সোহরাওয়ার্দীকে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী পদে আসীন করল। পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হয়ে তিনি জোরালো ভাষায় পূর্ব বঙ্গের স্বায়ত্তশাসনের দাবীকে অস্বীকার করলেন। ১৯৫৭ সালের ১৪ জুন তারিখে ঢাকার পল্টন ময়দানে ঘোষণা দিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানকে শতকরা আটানব্বই ভাগ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে।’

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী স্বায়ত্তশাসন দাবীর প্রশ্নে অনড় রইলেন। ফলে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার মতবিরোধ চরম আকার ধারণ করে। শেখ মুজিব তখন সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রীসভার একজন সদস্য। তিনিও এ প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন দিলেন। এভাবে আওয়ামী লীগে বিভাজন ঘটল।

অন্যদিকে দেখা দিল পাকিস্তানের পররাষ্ট্র বা বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে বিরোধ। আওয়ামী লীগের অন্যতম কর্মসূচী বা দাবী ছিল পাকিস্তানের মার্কিন নির্ভর পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তে স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এই প্রশ্নেও সোহরাওয়ার্দী অঙ্গীকার ভঙ্গ করলেন। তিনি পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হয়ে আওয়ামী লীগের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে এক তত্ত্ব হাজির করলেন যাতে বলা হল যে, শূন্য যোগ শূন্য যোগ শূন্য, এভাবে শূন্যের সঙ্গে যত শূন্য যোগ করা যাক ফলাফল শূন্যই হয়। সুতরাং পাকিস্তানকে আমেরিকার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। এভাবে এ দেশে বুক ফুলিয়ে অঙ্গীকার ভঙ্গের পথিকৃৎ হলেন সোহরাওয়ার্দী, আর তার একনিষ্ঠ অনুসারী হলেন শেখ মুজিব।

সোহরাওয়ার্দী এবং মুজিবের অঙ্গীকার ভঙ্গের মোকাবিলায় দাঁড়াতে গিয়ে ন্যায় এবং নীতি নিষ্ঠ ভাসানী তার নিজ প্রতিষ্ঠিত দলেই কোণঠাসা হলেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় তার দল। ক্ষমতার লোভে নেতাদের এক বড় অংশই তখন অন্ধ। ক্ষমতাকে ব্যবহার-অপব্যবহার করে অর্থ-বিত্ত সংগ্রহ  করে রাতারাতি বড়লোক হবার এমন মওকা হাতছাড়া করবার মন তখন তাদের নাই। ন্যায়, নীতি, আদর্শ তখন চুলায়। সুতরাং ভাসানী নয়, বরং সোহরাওয়ার্দী হলেন তাদের আদর্শ পুরুষ। এই অবস্থায় আদর্শ এবং সত্য ও ন্যায়ের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে চেয়ে ভাসানী তার নিজ হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা সংক্ষেপে ন্যাপ গঠন করতে বাধ্য হলেন।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় ভাসানী এ দেশের রাজনীতির এক ট্র্যাজিক নায়ক, যিনি প্রায় সারা জীবন তার বোধ-বুদ্ধি অনুযায়ী গণ-মানুষের মুক্তির জন্য এক প্রায় নিঃসঙ্গ লড়াই চালিয়ে গেছেন। বহু মানুষ তার সঙ্গে থাকলেও তিনি প্রায় নিঃসঙ্গ থেকে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে যাদেরকে তিনি পেয়েছিলেন তাদের একদল ছিল প্রতারক, নীতি-নৈতিকতাহীন এবং স্বভাবত বিশ্বাসঘাতক। সুতরাং তাকে ব্যবহার করে যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই তাকে এবং ন্যায়-নীতি ও আদর্শকে পরিত্যাগ করে লোভ চরিতার্থ করার পথে চলে গেছে। আর বাকী যারা ছিল তাদের বেশীর ভাগ মানুষ আদর্শনিষ্ঠ হলেও তারা ছিল মতান্ধ, বিদেশী আদর্শ এবং রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ অনুগত। এ দেশের বাস্তবতায় আদর্শ বা রাজনীতি গড়ে তুলবার যোগ্যতা বা সক্ষমতার অভাবকে তারা পূরণ করত বিদেশ থেকে পাওয়া আদর্শ ও রাজনীতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য দ্বারা। এই লোকগুলি সাধারণভাবে ত্যাগী, সংগ্রামী ও জনগণের মুক্তির জন্য নিবেদিত হলেও মতান্ধতা তাদেরকে মতিচ্ছন্নে পরিণত করেছিল। পাকিস্তান কালে বিশেষত ন্যাপ গঠন পরবর্তী কালে এই মতিচ্ছন্ন লোকগুলিই তাকে ঘিরে রেখেছিল এবং অনেক সময় তাকে সময়োচিত পদক্ষেপ দানে বাধা দিয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পূর্ববর্তী কালে বিদেশী বিপ্লবের ফর্মুলা অনুযায়ী বিপ্লব করতে চেয়ে এরা তাকে পরিত্যাগ করে চলেও গিয়েছিল।

এরপর যারা তার সঙ্গে থাকল তাদের অধিকাংশ হল আর একদল লোভী এবং আদর্শহীন। তারা তার মৃত্যুর পর তার ধর্মীয় রাজনীতিমুক্ত ন্যাপকে নিয়ে গেল ধর্মাশ্রিত রাজনীতির দল বিএনপিতে। এটা ঠিক যে, ভাসানী নিজেও ধর্মকে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সেটা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য ছায়া বা আড়াল স্বরূপ। প্রকৃতপক্ষে এ দেশে সেক্যুলার রাজনীতির তিনি ছিলেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং এক অর্থে উদগাতাও। অথচ রাজনীতিতে নেতা হিসাবে তার উত্থান মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মাধ্যমে। ব্রিটিশ শাসনামলে তিনি ছিলেন আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই ব্যক্তিই হলেন এ দেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবর্তক। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে পরবর্তী সময়ে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ নামকরণও হয় তারই দৃঢ় উদ্যোগে। এভাবে আমরা যেমন ব্যক্তি ভাসানীর পরিবর্তন ও উত্তরণ দেখতে পাই তেমন একটা জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় সম্প্রদায় থেকে জাতি হয়ে উঠবার পথে আগ্রগমন ও উত্তরণকেও দেখতে পাই। এই জাতি হয়ে উঠবার কাজটাকে এগিয়ে নেবার জন্য একজন নেতার দরকার ছিল। ভাসানী হলেন সেই নেতা। ধর্মীয় রাজনীতি থেকে আসা এই নেতা হলেন এ দেশে ধর্মমুক্ত রাজনীতির ছায়া বা আড়াল স্বরূপ। তার দেওয়া এই ছায়ায় বা আড়ালেই পাকিস্তান কালে এ দেশে শুধু সেক্যুলার রাজনীতির নয়, অধিকন্তু সম্পূর্ণরূপে ধর্মবিশ্বাস মুক্ত কম্যুনিস্ট রাজনীতিরও বিস্ময়কর বিস্তার ঘটেছিল। আর সেটা তার জন্য অনেক সমস্যাও সৃষ্টি করেছিল।

তবে সেসব আলোচনার জায়গা এটা নয়। যেমন ভাসানীর নিজেরও যে সীমাবদ্ধতা ছিল সেই আলোচনার জায়গাও এটা নয়। আমি এখানে শুধু এইটুকু বলতে চাই যে, ভাসানী ছিলেন এমন এক কাল ব্যতিক্রমী পুরুষ যিনি শুধু মহান নেতা ছিলেন না, উপরন্তু ছিলেন এমন এক নেতা যিনি নিজে যেমন ছিলেন সত্য ও ন্যায় নিষ্ঠ তেমন নিজ দৃষ্টান্ত দ্বারা সবাইকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছিলেন। আমি গৌরবান্বিত বোধ করি এ কথা ভেবে যে আমি এমন এক নেতার কর্মী ছিলাম। তার ছায়ার নীচে আমার রাজনৈতিক জীবনের অনেকটাই বিকশিত। আমি এ কথা ভেবে গর্ব অনুভব করি যে আমি তার কাছে যাবার এবং তাকে কাছ থেকে দেখবার সুযোগও পেয়েছিলাম। যাইহোক, এসব ভিন্ন প্রসঙ্গ। ভাসানী প্রসঙ্গে আমি আমার গ্রন্থ ‘রাজনীতির পুনর্বিন্যাস’-এ যে কথা বলেছিলাম সে কথার পুনরুক্তি করি, ‘ভাসানী ছিলেন প্রাচীন যুগের সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি যিনি তাঁর সন্তানদের দেখতে চেয়েছিলেন আধুনিক যুগের অগ্রদূত রূপে।’*

—————————————————————————————————————————————-

* আমার ‘রাজনীতির পুনর্বিন্যাস’ নামক গ্রন্থে ‘মওলানা ভাসানী : জনতা জাগাবার কারিগর’ এই শিরোনামে সপ্তম অধ্যায়ে ভাসানীর উপর একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন আছে। গ্রন্থটি বঙ্গরাষ্ট্রের গ্রন্থাগার বিভাগের রাজনীতি বিষয়ক গ্রন্থে দেওয়া আছে।

লিংক : http://www.bangarashtra.net/article/934.html                

—————————————————————————————————————————————-

হ্যাঁ, এটাই ভাসানী সম্পর্কে এক কথায় এবং সংক্ষিপ্ততম ভাষায় আমার মূল্যায়ন। আর এই কারণে আমার মত যারা ধর্মবিশ্বাসমুক্ত এবং লোকবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিল তাদের সম্পর্কে খুব ভালভাবে জানা সত্ত্বেও এবং নিজে একজন বিরাট ধর্মীয় গুরু হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে তিনি তার সর্বোচ্চ পরিমাণ লালন এবং রক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এমন পীর আমার জানা মতে যার ছিল লক্ষ লক্ষ মুরীদ। কিন্তু তিনি কখনও আমাদেরকে তার মুরীদ হতে এমনকি নামায-রোজা পড়তেও বলতেন না। কারও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তার বিন্দুমাত্রও মাথা ব্যথা আমি দেখি নাই।

ভাসানীর কথা আমি যখন চিন্তা করি তখন আজও বিস্ময় জাগে এ কথা ভেবে যে কীভাবে একই মানুষের পক্ষে ধর্ম এবং ধর্মমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে এভাবে পাশাপাশি নিয়ে চলা সম্ভব! মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গ বাদ দিলেও তিনি নিজে ছিলেন পীর বা ধর্মনেতা। সেটা তার সত্তার এক দিক। অপর দিকে ছিল তার রাজনীতি, গণ-মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে যার বিকাশ হয়েছিল। আর এইটাই ক্রমে হয়ে উঠেছিল তার সত্তার প্রধান দিক বা অংশ। আর তাই তিনি নিজের পীরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতিকে ব্যবহার করেন নাই। বরং গণ-মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত ধর্ম ও অসাম্প্রদায়িকতা মুক্ত এবং একটা পর্যায়ে বিপ্লবী রাজনীতির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের প্রয়োজনে ধর্মকে ব্যবহার করেছিলেন। আর এই প্রয়োজন বোধ থেকে তিনি কম্যুনিস্টদেরকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাদেরকে দু’হাত দিয়ে আগলে রেখেছিলেন।

আমার কানে আজও বাজে আমার সামনে অন্যদেরকে বলা ঐ মহান নেতার কথাগুলো, ‘আমি বিপ্লব করতে পারব না। বিপ্লব করবেন আপনারা। কিন্তু আমি আপনাদের পাশে থাকব। আপনাদের রক্ষার জন্য কাজ করব।’ কিংবা ‘কারা আপনাদেরকে নাস্তিক বলে, না কী বলে তা নিয়ে চিন্তা করেন কেন? তাদেরকে সামলাবার জন্য আমি তো আছিই। আপনারা নিশ্চিন্ত মনে আপনাদের কাজ করে যান।’

আমি রাজনীতিতে মওলানা ভাসানীকে আমার পিতৃতুল্য বিবেচনা করি। সন্তান পিতার সবকিছুকে ধারণ করে না। আমিও করি না। যেমন তার ধর্মের জায়গা। কিন্তু এই দেশ, জনগণ, জাতি এবং মানবতার জন্য তার আর্তি ও নিবেদনকে আমি কখনই ভুলতে পারি নাই। তার এই মহৎ উত্তরাধিকারকে আমি সর্বদা আমার জীবনে লালন করতে চেয়েছি।

সুতরাং তার মৃত্যুপরবর্তী কালে যাদু মিয়ারা যেদিন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে সামরিক শাসক জিয়ার অনুবর্তী করলেন এবং জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি গঠন করলেন এবং সেই সঙ্গে হলেন জিয়ার ইসলামী রাজনীতির অনুসারী সেই দিন আমি দলীয় রাজনীতি ত্যাগ করি। অজপাড়াগাঁর লেখাপড়া না জানা জমিচষা চাষী আর আমজনতার মধ্য থেকে উঠে আসা এক গণতান্ত্রিক এবং মজলুম জননেতাকে নেতা মানবার এবং তার স্নেহের প্রশ্রয় পাবার পর আমার পক্ষে উর্দীপরা একজন সামরিক শাসককে নেতা মানা সম্ভব ছিল না। আর ন্যাপের মত ধর্মমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির দল করবার পর আমার পক্ষে বিএনপি-এর মত কোনও ধর্মাশ্রিত দল করাও সম্ভব ছিল না। বস্তুত ন্যাপের পর আর কোনও রাজনৈতিক দল এ দেশে আমার জন্য থাকে নাই।

জাতীয় পর্যায়ে কোনও দল এখনও আমার জন্য নাই যাকে আমি সমর্থন করতে পারি কিংবা যেখানে আমি যোগ দিতে পারি। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কোনও দল নয়। এখানে যোগ দেওয়ার প্রয়োজনও নাই। এটা কর্মসূচী ভিত্তিক বহুদলীয় এবং বহুব্যক্তিক একটা সংগঠন। মূলত নির্বাচনকে সামনে রেখে এটার গঠন। সেই নির্বাচন মোটামুটি অবাধ ও নিরপেক্ষ হলেও তাতে যে ঐক্যফ্রন্ট বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করবে তাতে আমার সন্দেহ নাই। তবে সেই নির্বাচন কীভাবে সম্পন্ন হবে তা নিয়ে আমার সংশয় আছে। হয়ত নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে হবে এবং ঐক্যফ্রন্ট জয়লাভ করবে। যদি তা করে তবে তারপর কি তারা তাদের পূর্বসূরিদের মতই অতীতের বারংবার বিশ্বাসভঙ্গের দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে? হয়ত ঘটাবে, হয়ত ঘটাবে না। তবে এটা নির্ভর করছে অনেকটা নাগরিক সচেতনতার উপর, নূতন সামাজিক শক্তির জাগরণের উপর।

তবে আমার কাছে ঐক্যফ্রন্ট এ দেশে আগামী নূতন রাজনীতির যাত্রাপথে একটা সূচনাবিন্দু মাত্র। সেই যাত্রা শুরু হয়েছে। আসলে গোটা সমাজ এবং রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে হবে। তার জন্য দেশের সমগ্র রাজনীতিকেই নূতন করে ঢেলে সাজাতে হবে এবং নূতন অনেক কর্মসূচী হাতে নিতে হবে। কিন্তু তার জন্য কোথায়ও থেকে যাত্রা শুরু করতে হত। আমার মতে ঐক্যফ্রন্ট তার সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই যাত্রা শুরুর কাজটা করেছে। আর তাই ঐক্যফ্রন্ট যদি নির্বাচনে ব্যাপক সন্ত্রাস ‍ও কারচুপির কারণে জয়লাভ করতে না পারে তাতেও আমি হতাশ হব না। কারণ জাতীয় রাজনীতিতে যে যাত্রার প্রয়োজন ছিল সেই যাত্রা তো শুরু হয়েছে। এই রাজনীতির যাত্রার জন্য নির্বাচন আদৌ কোন অপরিহার্য ফ্যাক্টরও নয়। তবে এই যাত্রার জন্য একটা অনুঘটকের প্রয়োজন ছিল। আসন্ন নির্বাচন সেই প্রয়োজন পূরণ করেছে।

রাজনীতি যে অচলায়তনে অবরুদ্ধ ছিল ঐক্যফ্রন্টের গঠন সেটাকে ভেঙ্গে ফেলেছে। সুতরাং আমি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সমর্থন করি। তবে সেটা যে শর্তসাপেক্ষ এই আলোচনায় আশা করি সেটা আমি স্পষ্ট করতে পেরেছি।

১৯-২০ ডিসেম্বর, ২০১৮