নাজিম উদ্দিন

দুনিয়ার কোন মানে নেই, জীবনের কোন মূল্যবোধ নেই। মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে মহাবিশ্বের কারো কোন মাথাব্যাথা নেই। মানুষের সমাজের যত সব মূল্যবোধ, যত ভ্যালুজ আছে সব আমাদেরই সৃষ্টি। Life has no meaning, we are here to give it one।  অস্তিত্ববাদী দার্শনিক আলব্যের কামু মনে করতেন, আমাদের জীবনে মূল্যবোধ আরোপ করতেই হবে এমন কোন কথা নেই, কারন যে বিশ্বে আমরা বাস করি তার কোন মূল্য চেতনা নেই, মহাবিশ্ব অনন্ত, অসাড়, আর আমরা এর মাঝে বন্দী। আমাদের সকল প্রচেষ্টা তাই নিস্ফল, অসার। তবে দুনিয়া নিজে অর্থহীন নয়, আমাদের চিন্তাও অর্থহীন নয়, কিন্তু নির্বাক,নিথর দুনিয়ার সবকিছুতে আমাদের অর্থ খোঁজার বাতিক থেকেই হাস্যকর অসামঞ্জস্য বা এবসার্ডিটির জন্ম দেয়।

“The absurd is born of the confrontation between the human need ( for meaning) and the unreasonable silence of the world.”

 

দার্শনিক,লেখক আলব্যের কামু



কামু গ্রিক পুরাণ দ্বারা প্রভাবিত হন, বিশেষ করে সিসিফাসের পুরাণ তাঁকে একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ‘The Myth of Sisyphus’ নামে তাঁর  বইয়ে কাম্যুর দর্শনের মূল বক্তব্য ফুটে ওঠেছে। গ্রিক পুরাণে সিসিফাস ছিল এক অত্যাচারী, ধুরন্ধর ও দূর্বৃত্ত রাজা। সে তার রাজ্যে ভ্রমণকারী পথচারী, নাবিক ও অতিথিদের মেরে ফেলত। দেবতাদের সাথে ছলনা করে মৃত্যুকে জয় করার চেষ্টা করায় তাকে জোর করে পাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে শাস্তি হিসেবে খাড়া পাহাড় ঠেলে বিশাল এক পাথরকে উঠাতে হয়। পাথরটাকে পাহাড়ের চুড়ায় উঠানোর পরে সেটা আবার গড়িয়ে নীচে পড়ে যায়, ফলে সিসিফাস আবার সেটাকে ঠেলে চুড়ায় তোলে। এভাবে অনন্তকাল ধরে অভিশপ্ত সিসিফাস পাথর ঠেলে উপরে তোলার মত নিস্ফল চেষ্টা করে যেতে থাকবে।

 

মানুষের জীবনও সিসিফাসের মতই অভিশপ্ত,  প্রতিদিন সকালে ওঠে তাকে একঘেঁয়ে জৈবিক রুটিন পালন করে যেতে হয়। একটা সুন্দর আগামীকালের আশা নিয়ে মানুষ বাঁচে, কিন্তু এভাবে সে ক্রমে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তার জীবনের এ ছুটে চলার কোন মানে নেই। আসলেই এতে সুখ কোথায়? তবে কারো কাছে যদি সিসিফাসের জীবনকে সুখের মনে হয় তাহলে আর কোন কথা থাকে না। চিন্তার রোমান্টিসিজম বাদ দিলে এ জগৎ আসলে একটা ক্রুড়, কঠিন জায়গা। তাই কারো কাছে জীবনের নিরর্থকতা, অসার বাস্তবতার এ বোধ যখন তৈরি হয় তখন সেটাকে আর অবহেলা করা যায় না।

অভিশপ্ত সিসিফাস ঢালু পাহাড় ঠেলে পাথর উপরে তুলছে।

কামু নিজে এবসার্ডিজম থেকে বাঁচার তিনটি উপায় নির্দেশ করেছেন।

প্রথম উপায় হলো, জীবনের অসারতা বুঝতে পেরে আত্মহত্যা করা।  জীবনের যে কোন মানে নেই একমাত্র আত্মহত্যা থেকে সেটা সবচেয়ে ভালভাবে প্রমাণিত হয়। তবে এটি হল সবচেয়ে সহজ উপায়, ‘ইজি ওয়ে আউট’।

দ্বিতীয় উপায় হলো, যে কোন ধরনের ধর্মকে আঁকড়ে ধরে মিনিং খুঁজে নেয়া। এ পথ যে বেছে নেয়  দার্শনিকভাবে  তার মৃত্যু ঘটে, সে তখন ‘Philosophically dead’, কিন্তু প্রাণে বেঁচে যায়।

তৃতীয় উপায় হলো, বিদ্রোহ করা, আত্মহত্যা করতে অস্বীকার করে দার্শনিকভাবে না মরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। এ তরিকায় জীবন যাপনের অর্থ হলো জীবনের অর্থহীনতাকে, এবসার্ডকে স্বীকার করে নেয়া। কামুর মতে এবসার্ডকে স্বীকার করে নিলে আমাদের জীবন আরো সহনীয় হয়।  তাঁর মতে দার্শনিকেরা তাদের দর্শনে জীবনের মানে খুঁজে না বেড়িয়ে তাদের উচিত দর্শনের মাধ্যমে জীবনের অন্তর্নিহিত অর্থহীনতাকে মেনে নেয়া কারন  “life is inherently meaningless”। শুনতে খুব হতাশাজনক মনে হলেও কামু মনে করতেন একমাত্র জীবনের এ অসারতাকে স্বীকার করে নিলে আমরা আরো পরিপূর্ণভাবে জীবন যাপন করতে পারব। সে জীবন হয়ত সবচেয়ে ভাল জীবন নাও হতে পারে কিন্তু সেটা হবে একটা পূর্ণ জীবন।

নাজিম উদ্দিন এর ব্লগ   ৭০৫ বার পঠিত