অাঞ্জু ফেরদৌসী

 

জাতীয়তাবাদ (Nationalism ) শুধুমাত্র একটি পলিটিক্যাল আইডলজিই ( Ideology ) নয়, সবচাইতে শক্তিশালী। পলিটিক্যাল আইডলজিতে আমরা দেখি কতগুলি নৈতিক মতাদর্শের সংকলন বা তত্ত্ব, বা সামাজিক আন্দোলন/প্রাতিষ্ঠানিক/বর্গের মিথ বা সিম্বল। অথবা সমাজের একটি বৃহত্তর গ্রুপ বলে দেয় কীভাবে সমাজ চলবে এবং সাথে সাথে একটি রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিচিত্রের প্রস্তাবনা দিয়ে থাকে। সরলভাবে বললে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ কিছু ইমেজ (তাত্ত্বিক) এবং সিম্বল ব্যবহার করে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ধারণায় বিশ্বাস এবং অ্যাক্ট করতে উদ্বুদ্ধ করে। ন্যাশনালিজম রাজনৈতিক মতাদর্শে ‘NATION‘-কে  ব্যবহার করে সেই লক্ষ্যে। ন্যাশনালিজম হচ্ছে একটি বিশ্বাস বা রাজনৈতিক মতাদর্শ যা একটি মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ‘NATION‘ সাথে ইমোশনালি ইনভলব করে। যা সে বিশ্বাস/গ্রহণ করে তার ন্যাশনাল আইডেন্টিটি হিসেবে।

ন্যাশনালিজম একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ কীনা এটি ভাববার আগে আমাদের মনে রাখা দরকার আইডলজি হচ্ছে এমন একটি কনসেপ্ট যার অর্থ অনেক কিছুই হতে পারে। মার্ক্স এবং এঙ্গেলস বলেছেন

“আইডলজি হচ্ছে এমন কিছু তত্ত্বের সমারোহ যা পুঁজিবাদের লক্ষ্যে শ্রমিকদের মধ্যে মিথ্যা চেতনায় প্রলুব্ধ করে।”

দ্বিতীয় মতামত আমরা জানি বামপন্থী বা ডানপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ, যেমন,  কমিউনিজম, সোশ্যালিজম, উদারনীতি এবং রক্ষণশীলতা। ন্যাশনালিজমকে বামপন্থী বা ডানপন্থী এই দু’য়ের মধ্যে ফেলা যাবে না। বরং বলা যায়, ন্যাশনালিজম তৃতীয় ধারা মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে। যা হতে পারে বামপন্থী বা ডানপন্থী, বা উভয়ই অথবা কোনটিই নয়।

সমাজ বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্রীডেন আধুনিক ‘আইডলজি’ নিয়ে অনেক কাজ করার জন্য খ্যাত। তিনি সনাতনী ধারার ‘আইডলজি’র সংজ্ঞা যা নির্ভর করে ‘স্থির বিশ্বাসে‘র ওপর, তা বাতিল করে গুরুত্ব দিয়েছেন ‘semantics‘-এর ওপর। উনার মতে, ন্যাশনালিজম গঠিত হয়েছে পাঁচটি মূল উপাদানের ভিত্তিতে-

১) একটি বিশেষ গ্রুপকে গুরুত্ব দিয়ে: the ‘nation‘ – একটি নির্দিষ্ট চিহ্নিতকরণ কাঠামো যা গঠিত হয়েছে মানুষ এবং তাদের অনুশীলনের জন্য।

২) একটি ধনাত্মক valorisation (increase in value) উক্ত নির্দিষ্ট ‘nation‘-এর ওপর নির্ধারিত করা। যা তার জনগণের আচরণের নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা দেয়।

৩) প্রথম এবং দ্বিতীয় ধারণাকে ‘politico-institutional‘ দেবার প্রত্যয়।

৪)স্থান এবং কাল‘কে সামাজিক পরিচয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারণকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

৫) ‘একাত্মতার (a sense of belonging) ধারনা’ এবং ‘সভ্যপদ‘ যার মুল হল ‘অনুভূতি‘ ও ‘আবেগ‘ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফ্রিডেন এখানে একটি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের অবস্মভাম্বী বিষয় কেন্দ্র এবং পেরিফেরির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন নি। তার প্রয়োজনও দেখছিনা। এখানে কীভাবে সামগ্রিক চিন্তা, সৃষ্টি এবং ইন্সটিটিউশনালাইজিং কেন্দ্রীয়-পেরিফেরির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। আর এই সম্পর্কটি এখানে সবচাইতে ক্রিটিক্যাল। একটি ‘nation‘ই যে কোর ভ্যালু দ্বিতীয় পয়েন্ট সেটাই সমর্থন করে। তৃতীয় পয়েন্ট, সেই ‘nation‘ এর কেন্দ্র এবং পেরিফেরি ক্রিয়েশনকে গুরুত্ব দিচ্ছে যেমন: বর্ডার, গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউশন এবং অন্যান্য অঙ্গীভূত অংশ। যা একটি প্রকৃত বাস্তবতাকে ধারণ করে। যেটা একটি আইডলজি বা মতাদর্শের উদ্দেশ্য বা স্বপ্ন।

ন্যশন্যালিজম বা জাতীয়তাবাদ একটি আইডিওলজি নয় এর পক্ষে যারাই কথা বলেন তারা সব সময় ‘জাতীয়‘তে এসে থমকে যান ‘বাদ‘-এর কথা ভুলে যান। রাষ্ট্রের পরিসর অবশ্যই যে কোন আইডলজির চাইতে ব্যাপক। উনাদের আর একটি সমস্যা আইডিওলজির কনসেপ্টকে একটি অনড় সংজ্ঞায় নিয়ে যাওয়া। অথচ আমরা জানি আইডিওলজির কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। সমাজ বিজ্ঞান এবং রাষ্ট্র বিজ্ঞান হচ্ছে সব চাইতে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিজ্ঞান। পলিটিক্যাল আইডলজির নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নিয়ে খুব বেশি এগোনোযায় না। এই জন্যই অ্যান্থনি স্মিথ তার বিখ্যাত উক্তটি তার বই ‘থিউরি অব ন্যশন্যালিজম‘ করে বলেছিলেন,

“why nationalism often ‘inhabits’ other ideologies and belief-systems, and channels their ideas and politics to nationalist ends? But whether nationalism helps to ‘fill out’ other ideologies, or is filled out by them, is secondary. Nationalism is conceptually richer than the critics allow.”

ন্যশন্যালিজম বা জাতীয়তাবাদ একটি আইডিওলজি হিসেবে বিজ্ঞানীরা দেখা শুরু করেছে মূলত কলোনিয়াজমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় থেকে। আমেরিকান জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (1765 এবং 1783), এবং ফরাসি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (1789 থেকে 1799) পলিটিক্যাল আইডলজির সংজ্ঞায় জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করে দেয়। যেখানে ‘জাতীয়তাবাদ‘ ছিল একমাত্র মতবাদ, যার মূলে ছিল জেনারেল উইল। ফরাসি ‘জাতীয়তাবাদী‘ আন্দোলনে ধারনায় ‘ফ্রান্স‘ ছিল ‘NATION‘ এবং ফরাসিরা ছিল এর ‘CITIZENS‘ এবং যুদ্ধ ছিল তাদের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব। সমস্ত ‘জাতীয়তাবাদী‘ আন্দোলনটির ভিত্তি ছিল মানুষের একটি ‘NATION‘ গড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। যেখানে ‘NATION‘ কোণ natural community নয়, বরং নিরপেক্ষ পলিটিক্যাল community।

ন্যশন্যালিজম আইডিওলজিতে nationhood এবং statehood অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত। যেখানে জাতীয় আইডেন্টিটির আশা রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার অভীষ্টে ধাবিত করে। যা সাধারণত জাতীয় সংকল্পের মূল উৎস।

ন্যশন্যালিজমের উদ্দেশ্যে হচ্ছে একটি nation-state গঠন করা। এখনও পর্যন্ত এটি অর্জিত হয়েছে দুটি উপায়ে: একত্রীকরণ প্রক্রিয়া (a process of unification), এবং বাহিরের শাসিত শক্তিকে বিতাড়িত করে নিজের কন্ট্রোল নিজে নেয়া।

একজন স্বাদেশিকের (nationalist) কাছে একটি ‘NATION‘ এস্টেট সবার উচ্চে এবং সব চাইতে বেশি ডিজারাবল পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশন । একটি nation-sate-এর শক্তিশালী বন্ধন মানুষকে একইসাথে আবদ্ধ করে সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং রাজনৈতিক ঐক্যে। একেই সাংস্কৃতিক এবং জাতিগত বন্ডেই অর্জিত হয় self-government, যেখানে nationality এবং citizenship সমাপিত হয়।

রিচার্ড হ্যান্ডলর তার বই ‘ন্যশন্যালিজম অ্যান্ড দা পলিটিক্স অফ কালচার ইন কুইক‘-এ ন্যশন্যালিজম যে একটি আইডলজি তা ব্যক্ত করে বলেছেন,

“Nationalism is an ideology about individuated being. It is an ideology concerned with boundedness, continuity, and homogeneity encompassing diversity. It is an ideology in which social reality, conceived in terms of nationhood, is endowed with the reality of natural things.”

এর পক্ষে গিয়ে উনি ব্যাখ্যা করেছেন,

“In principle the individuated being of a nation—its life, its reality—is defined by boundedness, continuity, and homogeneity encompassing diversity. In principle a nation is bounded—that is, precisely delimited—in space and time: in space, by the inviolability of its borders and the exclusive allegiance of its members; in time, by its birth or beginning in history. In principle the national entity is continuous: in time, by virtue of the uninterruptedness of its history; in space, by the integrity of the national territory. In principle national being is defined by a homogeneity which encompasses diversity: however individual members of the nation may differ, they share essential attributes that constitute their national identity; sameness overrides difference.”