একের পর এক ব্লগার নিধনে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ! সম্ভবত খুব শীঘ্রই ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন হতে চলেছে। ইতিমধ্যেই সরকারীভাবে প্রশাসনিক স্তর থেকে ব্লগারদের উদ্দশ্যে উচ্চারিত হয়েছে সাবধান বাণী। কারুর ধর্মবিশ্বাসে আঘাত লাগে এমন কিছু বলা ও লেখা যাবে না! ভালো কথা। কিন্তু অন্য ধর্মের উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ, ভাঙ্গচুর, আরাধ্য দেবতার মূর্ত্তী ভাঙ্গা, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর শারীরীক ও মানসিক নির্যাতন, তাদের ঘরদোরে লুঠপাঠ চালানো ইত্যাদি ধর্মাচারণও কারুর ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত বলে প্রশাসনিক স্তরে বিবেচ্য হবে কিনা সে কথা অবশ্য বলা হয়নি। বলা হয়েছে কতিপয় নাস্তিক ব্লগার যারা এখনো চাপাতির তলায় রক্তার্ত হওয়ার লিস্টে রয়েছেন; তাঁদেরই উদ্দেশ্য। কারণ এই হিট লিস্টে নথীভুক্ত ব্লগারদের হাতেই না কি আবিশ্ব ইসলাম বিপন্ন! প্রায় দেড় হাজার বছরের সময় সীমায় এশিয়া আফ্রিকা ইউরোপের শত শত দেশে বিস্তৃত একটি ধর্ম বাংলাদেশের কতিপয় নাস্তিক ব্লগারদের ব্লগিঙে ও ফেসবুক স্ট্যাটাসে কি করে বিপন্ন হতে পারে সে কথা অবশ্য সরকারী প্রশাসনিক স্তর থেকে কিংবা চাপাতি সংগঠনের পক্ষ থেকেও যুক্তি সহকারে ব্যাখ্যা করা হয়নি এখনো। তবে একথা দুই পক্ষ থেকেই কার্যত স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা হবে না।

না হাত গুটিয়ে বসে থাকেওনি চাপাতি সংগঠন। তাঁদের প্রথম শিকার অবশ্য কোনো ব্লগার নয়, কারণ তাঁর সময়ে ব্লগিং এত জনপ্রিয়ও হয়নি, তিনি ব্লগে লিখতেন বলেও শোনা যায় না। তবুও আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষা প্রবাদপ্রতীম প্রাতঃস্মরনীয় ব্যক্তিত্ব হুমায়ুন আজাদকেই প্রথম রক্তার্ত হতে হয় চাপাতির ধর্মাচারণের তলায়। তারপর থেকে চাপাতির বাণীতে একে একে প্রাণ গেল রাজীব হায়দার অভিজিত ওয়াশিকুর অনন্তবিজয় নিলয় ও আরও কয়েকজনের! কি সব সাংঘাতিক নাম! এঁরা জীবিত থাকলে এতদিনে ইসলাম হয়তো রসাতলে যেত! তাই ধর্মরক্ষার্থে সম্ভাবানী যুগেযুগে বলে শ্রীকৃষ্ণের মতোই কলিযুগের অবতার হয়ে আত্মপ্রকাশ করতেই হল জনাব চাপাতিকে। তাই চাপাতি জিন্দাবাদ!

প্রশ্ন এটা নয় দেশের সরকার তার সকল নাগরিকের সুরক্ষার বিষয়ে দায়বদ্ধ কিনা। প্রশ্নটা এটাও নয় সরকার তার প্রশাসনিক স্তর থেকে নীতি আর দুর্নীতির মধ্যে কিভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবে কি আদৌ রাখবে কিনা! প্রশ্নটা এটাই জাতি হিসেবে বাঙালি কোন পথটি বেছে নেবে? ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মানবিক মূল্যবোধের যুক্তিতর্কের সুস্থচেতনার প্রগতিশীলতার পথ, অগ্রগতির পথ? না কি ধর্মীয় গোঁড়ামীর অন্ধআনুগত্যের সীমাহীন চর্চায় চাপাতির নৃশংস আস্ফালনের পথ? কোনটা! প্রশ্ন এটাই।

এই প্রবন্ধের বিষয় নাস্তিকতার সমর্থন নয়। এই প্রবন্ধের বিষয় চাপাতি সংস্কৃতির সমালোচনাও নয়। এই প্রবন্ধের বিষয় আমরা বাঙালিরা চলেছি কোন পথে? পরপর এতগুলি ব্লগার খুনে জাতির কি প্রতিক্রিয়া? জাতির প্রতিক্রিয়া চাপাতির ঝনঝনানির আস্ফালনে বোঝা যায় না। বোঝা যায় না প্রশাসনিক স্তরে সরকারী ভুমিকার চলনের তালেও। জাতির প্রতিক্রিয়া বুঝতে গেলে আমাদের কান পাততে হবে দেশের নাড়ীর স্পন্দনে। কিন্তু কিভাবে কান পাতবো আমরা? আমরা শহুরে নাগরিকবৃন্দ? যারা দেশ বলতে কোনো সমগ্র সত্ত্বা অনুভব করতে শিখিনি আজও? যাদের কাছে দেশ মানে নিজের গণ্ডীর ও ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থের চতুর্সীমানাটুকুই? বাঙালি হিন্দুর কাছে যেটা দেশ, বাঙালি মুসলিমের কাছেও কি সেটাই তার দেশ? ভারতীয় বাঙালির ও বাঙালাদেশী বাঙালির দেশতো আর এক নেই! নাগরিক বাঙালি ও পল্লীবাংলার বাঙালির দেশও তো ভিন্ন! ভিন্ন, সমাজের ননীমাখন খাওয়া নাগরিকের দেশ ও নুন আনতে পান্তা ফুরানো মাথার ঘাম পায়ে ফেলার কোটি কোটি মানুষের দেশও। তাই আমাদের আলোচনার সুবিধার্থে আমাদের কান পাততে হবে অধুনা আবিস্কৃত এই অন্তর্জালের সীমাবদ্ধ অথচ বিস্তৃত মাধ্যমের পরিসীমাতেই।

কি দেখছি আমরা সেখানে? দেখছি আর চমৎকৃত হচ্ছি। শুধু হচ্ছিও না চমৎকৃত করেও চলেছি বাকিদের। দীর্ঘদিনের বন্ধুদের বন্ধু তালিকার পুনর্বিন্যাসের সংবাদে আপটুডেট হচ্ছি প্রতিনিয়ত। ফেসবুকের কি অসীম ক্ষমতার চাবিকাঠি আমাদের হাতের মুঠোয়। মূহুর্মূহু ফল্স রিপোর্ট, ব্লক আর আনফ্রেণ্ডের অপশানে ক্লিক করে চলেছি সবাই চাপাতির কোপের মতোই বাঁই বাঁই করে। আমাদের হাতে চাপাতি নেই তো কি হয়েছে? তোমার কথা মানি না বলেই তো ফেসবুক আমার হাতে রিপোর্ট, ব্লক আর আনফ্রণ্ডের সেকেণ্ডি দাওয়াই তুলে দিয়েছে। বন্ধু হতে যতদিনই লাগুক, অবন্ধু হতে তো এক সেকেণ্ড। তার বেশি তো নয়? কিন্তু কেন এই অসহিষ্ণুতা? এতদিনের চেনা জানা আলাপ পরিচয়ের বন্ধুত্বের মূল্য কিছুই নয়? মুল্য শুধুই আমার মতের পক্ষে থাকা কিংবা না থাকাটাই? আমার কথা আমার আচরণকে অন্ধানুগত্যে মেনে নেওয়ার শর্ত্তেই শুধু বন্ধুত্বের স্থায়িত্ব? আমার ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিলে, কিংবা আমার মতের পক্ষে রায় না দিলেই তার জবাব ফল্স রিপোর্টিং? ব্লক কিংবা আনফ্রেণ্ড? এইকি প্রগতিশীলতা? তাহলে আর চাপাতি সংগঠনের সদস্যদের সাথে ফেসবুক একাউন্ট হোল্ডারদের মূলগত পার্থক্য কোথায়? তারাওতো বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের স্তব্ধ করে দিতেই চাপাতি চালাচ্ছ। আমাদের ফল্স রিপোর্টিং, ব্লগ আর আনফ্রেণ্ড অপশানে ক্লিক করার মতোই? অর্থাৎ সবাই, সে চপাতি সংগঠনের সদস্যই হোক আর সোশ্যাল সাইটের একাউন্ট হোল্ডারই হোক লক্ষ্য একটাই, বিরুদ্ধমতাবলম্বীদের স্তব্ধ করে দাও। সে যেন আর তার মতটা জনমানসে প্রচার করতে না পারে। এই যে ভিন্ন মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, ভিন্ন স্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার দুর্নিবার প্রয়াস ও উদ্যো‌গ এই হলো প্রকৃত মৌলবাদ! সেই মৌলবাদ ধর্মকে কেন্দ্র করে নিজের জাল বিস্তার করতে পারে। রাজনীতিকে কেন্দ্র করে আবিশ্ব একমেরু সাম্রাজ্যবাদ বিস্তার করতে পারে। সোশ্যাল সাইটের ব্যক্তিগত ওয়ালে ওয়ালে তার প্রকৃত পরিচয় রাখতে পারে। মৌলবাদ কোনো বিশেষ ধর্মের সম্পত্তি নয়। মৌলবাদ মূলত একটি মানসিকতা। আমি বা আমার গোষ্ঠীই শ্রেষ্ঠ! আমরা যা বলবো সেটাই বেদবাক্যে! আমাদের পথটিই একমাত্র সঠিক পথ! আমাদের ইচ্ছাই আইন! আমাদের চরিত্রই সকলের আরাধ্য ধর্ম! হ্যাঁ এটাই মৌলবাদ। মানুষের সমাজ সংসারে সভ্যতায় যা সবচেয়ে মারাত্মক রোগ! যার প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে গিয়েই মানুষের হাতে খুন হতে হয় মনীষীদের। সেই সক্রেটিসের আমল থেকেই যে ট্রাডিশান আজও বহমান।

সাম্প্রতিক বর্ষে ব্লগার নিধনের এই মারণ যজ্ঞে জাতির অভ্যন্তর থেকে এখনো কোনো আন্দোলন গড়ে না ওঠাটাই আসল অশনি সংকেত! আর সেই না ওঠার কারণ সরূপ যে যে লক্ষ্মণগুলি সমাজদেহের অভ্যন্তরেই সুপ্ত হয়ে থাকে, বিভিন্ন সোশ্যাল সাইটের ওয়ালে তারই প্রতিফলন ঘঠছে মাত্র। আর সেইখানেই কান পাতলে টের পাওয়া যাবে দেশের নাড়ীর সেই স্পন্দন; যার কথা বলতেই এই প্রবন্ধের অবতারণা। আমাদের সমাজ সংসারেই রয়েছে পরমত সহিষ্ণতার বিষয়ে প্রকৃত শিক্ষার অভাব। আমরা নিজের মতটাকেই স্বতঃসিদ্ধ বলে সকলের কাছে চালাতে চাই। অন্যের মতকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো রুচি গড়ে তোলাও যে শিক্ষারই একটি অন্যতম মূল স্তম্ভ, সে কথা মানি না আমরা। আর তাই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি যারা করে তারা অন্যের মতকে প্রাধান্য দিতে চায় না। আবার ধর্মকে যারা আফিম বলে মনে করে তারাও ধর্মবিশ্বাসীদের কথার মূল্য দিতে রাজী নয়। পার্থক্য শুধু এটাই, আবিশ্ব কোথাও নাস্তিকের হাতে আস্তিকের প্রাণ যায় নয়। আস্তিকের হাতেই আবহমান কাল ব্যাপিই নাস্তিকরা খুন হতে থাকে। তার একটই কারণ, তা হল আস্তিকতা বা ধর্মবিশ্বাস ধর্মব্যাবসার মূলধন। কিন্তু নাস্তিকতা কোনো ব্যবসারই ব্যবসায়িক মূলধন নয়~!

বাংলাদেশের ব্লগার নিধন যজ্ঞে সোশ্যলসাইট কার্যতো দুইভাগ। এক ভাগে ধর্ম বিশ্বাসে অঘাতকে সমাজ সংসারের সবচেয়ে বড়ো অপরাধ বলে গন্য করা হচ্ছে। এরাই সংখ্যাগুরু। তাদের কাছে মানুষ কোপানোর আঘাতের থেকেও ধর্মগুরু কিংবা ধর্মগ্রন্থ সম্বন্ধে কটুক্তি অনেক বড়ো অপরাধ বলেই বিবেচিত হচ্ছে। অপর পক্ষের সওয়ালে চাপাতির কোপকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। আর ঠিক এইখানেই সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দিশাহীনতায় ভুগছে। প্রশ্রয় পাচ্ছে মৌলবাদী সংগঠনগুলি। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বোঝানো হচ্ছে নাস্তিকদের হাতেই ইসলাম বিপন্ন। তাই নাস্তিক নিধনই ধর্মরক্ষার সঠিক ও একমাত্র পথ। সোশ্যালসাইটের দেওয়াল জুড়ে এই তত্ত্বই কমবেশি প্রতিফলিত হচ্ছে। আবার ক্ষীণস্বরে হলেও ব্লগার নিধনের যৌক্তিকাতার বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন অনেকেই। আর সেখানেই ঘটছে অনভিপ্রেত বন্ধুবিচ্ছেদ। দুটি গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে অন্তর্জালের বাঙালি। পরস্পরের বিরুদ্ধে চলছে ফল্স রিপোর্টিং আর ব্লকিং! আর সেইটাই আজকের সবচেয়ে বড়ো অশনি সংকেত। এই যে বিরুদ্ধ মতকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জঙ্গী মানসিকতা, এই মৌলবাদী চেতনাই আজকের বাঙালির জাতীয় চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেই চালাচ্ছে চাপাতি, কেউ চালাচ্চে ফল্স রিপোর্টিং আর ব্লকিং। উভয়েরই মানসিকতা অভিন্ন! উভয়েরই লক্ষ্য অভিন্ন! আমার কথাই কথা। বাকিরা হয় আমার দলে থাকো, নয় আমার শত্রুতার শিকার হও! স্মরণে রাখা দরকার বিশ্বের সবচেযে ভয়ানক মৌলবাদী সংগঠন পেন্টাগনের অধিপতি ছোট বুশ সাহেব ঠিক এই কথাই প্রচার করে মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আফগানিস্তান ইরাকের উপর, বাকি বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে। আজ ঠিক সেই একই মানসিকাতারই প্রতিফলন সোশ্যাল মিডিয়ার সাইটে সাইটে। বাংলা ভাষার স্বরবর্ণে ব্যাঞ্জনবর্ণে! জাতিকেই আজ ঠিক করতে হবে সে এই মৌলবাদের প্রহরকেই তার ভবিষ্যৎ করে তুলবে কি না? না কি আমাদের মনীষীদের স্বপ্নগুলিকে বাস্তব করার লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে মৌলবাদের বিরুদ্ধেই?

 

শ্রীশুভ্র এর ব্লগ   ৪৯ বার পঠিত