কাকন রেজা

গণমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ছবি দেখলাম। তিনি আমাদের কক্সাবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প দেখতে এসেছেন, সেই ছবি। অনভ্যস্ত চোখ বিস্মিত হলো, একজন মন্ত্রীর মাথার ছাতা ধরে আছেন, আরেকজন পাশে, মাত্র দু’জন! এই হলো তার সাথে ‘লটবহর’। অথচ উন্নত বিশ্বের প্রথমসারিতে থাকা এ দেশটির উন্নয়নের ক্রম নম্বর হলো ১৫। বছরে মাথাপিছু আয় ৪৮ হাজার ২৮৮ ডলার। তুলনায় আমাদের হলো, ১৯’শ ডলার।

এমন একটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এত গরিবী হাল! বিস্মিত হবারই কথা। এদের হয়তো ‘প্রেস্টিজ’ জ্ঞান নেই। বিপরীতে গরিব হতে পারি আমাদের সেইটা আছে। আমরা যেখানে যাই খবর করে যাই। আমাদের মশা মারা শিখতে সিঙ্গাপুর যাওয়া লাগে, পুকুর খনন শিখতে নেদারল্যান্ড। বালিশ কিনি আট হাজারে, বই আশি’তে, পর্দায় খরচ যায় এক-দুই লাখ নয়, সাড়ে সাইত্রিশ লাখ। যেনতেন ব্যাপার নয়, ভেবে দেখার মত ব্যাপার।

যাক গে, অস্ট্রেলিয় মন্ত্রী এসেছিলেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের সরকারের পরিচালনায় বিভিন্ন কার্যক্রমের অবস্থা দেখতে। রোহিঙ্গারা আসাতে কক্সবাজারের এটুকু অন্তত উপকার হয়েছে যে, বিভিন্ন দেশের দেশের প্রধান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আসছেন কক্সবাজারে। দেখে যাচ্ছেন বিশ্বের দীর্ঘতম সি-বিচ’টি। সারা বিশ্বে এত প্রচার বোধহয় কক্সবাজার আর কখনো পায়নি। শুধু প্রচারই নয়, পেয়েছে আরো অনেক কিছুই।

প্রবাসী সাংবাদিক মুশফিক ওয়াদুদ সামাজিকমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের আসায় আমাদের প্রাপ্তির বিষয়টি লিখেছেন। যেসব এখন অপ্রাপ্তির ধামাকায় বিস্মৃত প্রায়। ‘ডেইলি স্টার’কে উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, ২০১৬ সালে ডমেস্টিক টুরিস্টের সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার। ২০১৭ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৫০ লাখ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে বিদেশী টুরিস্ট ছিল ১৬ হাজার। ২০১৭ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার। মূলত রোহিঙ্গাদের বিপুল প্রবেশ ঘটেছে ২০১৭ সালে। পর্যটনের ক্ষেত্রে এই যে উর্ধ্বগামী সূচক, তার কারণটাও রোহিঙ্গা প্রবেশের সাথে যুক্ত। ১৯৯৫ সালের পর থেকে পর্যটন খাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব এসেছে ২০১৭-তে। এর পরিমান ৩’শ ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের সমৃদ্ধিতে এই অর্থও একটি বড় ব্যাপার।

মুশফিক তার লেখায় বাংলাদেশ ব্যাংককে উদ্ধৃত করে বলেছেন, ২০১৬-১৭ অর্থ-বছরে বিদেশী সাহায্যের পরিমান ছিল ৩৫৬৩.৬ মিলিয় মার্কিন ডলার। এক বছরেই অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থ-বছরে তা বেড়ে হয়ে প্রায় দ্বিগুন। অর্থাৎ ৬১২৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির গ্রাফে এটাও উল্লেখযোগ্য একটি সংযোজন। নয় কি?

আমাদের অনেকের ধারণাই নেই, কী পরিমান লোকজন করে খাচ্ছে কক্সবাজারে আসা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায়। পর্যটকের কারণে কক্সবাজারে হোটেল থেকে শুরু করে ‘স্ট্রিট ফুড’ সবখানেই লেগেছে অর্থনৈতিক সেই অগ্রগতির ছোঁয়া। শুধু কী তাই, বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবী-গবেষকের ‘রুটি-রুজি’র জোগান দিচ্ছে রোহিঙ্গা বিষয়ক আলাপ এবং গবেষণার কাজ। অথচ রোহিঙ্গাদের কিন্তু আমরা খাওয়াচ্ছি না, তাদের খাবার জোগান দিচ্ছে জাতিসংঘ। তারপরও অনেকে রোহিঙ্গাদের প্রবল বিরোধী। মুশফিকের আক্ষেপ এ জায়গাতেও। মুশফিকের এই আক্ষেপ কি একেবারেই ভিত্তিহীন?

জানি রোহিঙ্গাদের জন্য আমাদের পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের বাড়তি একটা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। রোহিঙ্গারা অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠার খবরও প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। ক্রসফায়ারেও যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। কিন্তু তারপরেও রোহিঙ্গাদের অপরাধ প্রবণতার হার আর আমাদের সার্বিক অপরাধ প্রবণতার গড় কি লক্ষ্য করে দেখেছি আমরা? আমাদের কথা বলার সময়, লেখার সময়, হোমওয়ার্ক বড় বেশি প্রয়োজন। নজরুল বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই পাপী, আপন পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি’। অন্যের পাপ বিষয়ে বলার আগে নিজের পাপের ওজন নেয়াটা কি নৈতিকভাবে উচিত নয়?

শহীদ বুদ্ধিজীবী, লেখক আনোয়ার পাশা’র ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসটি যদি পড়া থাকে, তবে সেখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যে বর্বরতা আর নৃশংসতার কথা বর্ণিত হয়েছে, তার সম্পূর্ণই খাটে রোহিঙ্গাদের জন্য। তারাও নিপীড়ন আর নির্যাতনের শিকার। আর সেই কারণেই তারা শরণার্থী। যেমন আমরা ছিলাম একাত্তরে। শুধু ভারতে নয় শরণার্থী হিসাবে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম আরাকানেও। রোহিঙ্গাদের কাছেই। তাই আমাদের আরো বেশি উপলব্ধি করার কথা সেই নিষ্ঠুর সময়ের প্রতিটি পর্বের। অথচ তা-কি হচ্ছে? হচ্ছে না। আমরা ঢোলের সাথে শরীর দোলাচ্ছি। ঢোল যখন যে তালে বাজছে আমাদের ‘ফাল’টাও সেই লয়েই বাঁধা।

ও, ‘আওরাতে’র প্রশ্নটা বাদ রয়ে গেলো। অপ্রকাশ্যে প্রচলিত রয়েছে যে, কক্সবাজারের যে রাতের হাট, সেখানের মূল্ পণ্যও নাকি রোহিঙ্গা ‘আওরাত’রা। ‘রুটি-রুজি’র সাথে অনেকের আনন্দের সঙ্গীও হচ্ছেন তারা। অবশ্য প্রকাশ্যেও এর কিয়দংশ জানিয়েছে আমাদের অনেক গণমাধ্যম। এসব বিবেচনায় চিন্তায় নিঠুর হওয়ার আগে, আরেকটু বিশ্লেষণ এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সঠিক কূটনীতি সাথে মানবিক আচরণের ধারাবাহিকতার নিশ্চিত দাবী রাখে।

0 Shares
কাকন রেজা এর ব্লগ   ৯ বার পঠিত