Avatar

আমরা কম-বেশী সকলেই আলোচনা করি যুক্তি বা যুক্তিবাদ নিয়ে। এতে অনেক আস্তিক নাস্তিক মিলেই তর্ক করেছে দিনের পর দিন। তেমনি আস্তিকদের কু-যুক্তির উত্তর দিতে গিয়ে অনেক হেনস্থা হতে হয়েছে নাস্তিকদের যারা নিজেকে যুক্তিবাদী মনে করতেছে।

যুক্তির অনেক বৈশিষ্ট্য আছে, এগুলো যুক্তিবাদীদের জানা না থাকার কারনে মাঝে মাঝেই তাদের বিপদে পরতে দেখি। আমি নিজেও কম বিপদে পড়িনি। এই বিপদে পড়ার কারনে আবার নতুন করে ভাবতে হয়েছে যুক্তি নিয়ে। তাহলে কি অবাস্তববাদী ঈশ্বরবাদীদের যুক্তি সঠিক? সঠিক না, সে বুঝতে পারা সত্ত্বেও সঠিক কোন জবাব দিতে পারতেছি না, কারন সেটা যে কু-যুক্তি ছিল বা ওটা যে কোন যুক্তিবোধক প্রশ্নের মধ্যেই পড়েনি, তা না চিন্তার করার কারনে।

একটি গল্প দিয়ে শুরু করি। এক রাজা একবার ঘোষণা দিলেন, যে তাঁকে কোন কথা অবিশ্বাস করাতে পারবে, তাকে অর্ধেক রাজ্য দিয়ে দিবেন। বেশ, কিছু দিন পর এক লোক তখন এসে বলল, রাজামশাই, এই রাজ্যের মালিক আসলে আমি। আপনাকে অস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় বসিয়ে আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম। এখন সিংহাসন ছাড়ুন। রাজা মহা বিপদে পড়লেন। লোকটার কথা বিশ্বাস করলে গোটা রাজ্যটাই দিতে হয়, আর বিশ্বাস না করলে অর্ধেকটা।

গল্পটাতেই বুঝা যাচ্ছে শুধু যুক্তি যুক্তি করলেই হবে না, চোখ কান খোলা রেখেই যুক্তিবাদী হতে হবে। যুক্তিতে ভুল হতে পারে- এটা ঠিক, তবে যুক্তিহীন অনড় বিশ্বাসে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আরো অনেক বেশী।

আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো চিন্তা শক্তি, যার ফলে মানবসভ্যতা বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। এই চিন্তাও কখনো কখনো অসাবধানতাবশত দূষিত হয়ে যেতে পারে। তখন আমরা ভুল পথে চালিত হবো, ভ্রান্তিকেই মনে হবে অকাট্য যুক্তি। চিন্তার প্রধান তিনটি দূষণকারী সম্পর্কে আমরা জানবো। এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিন্তাই যদি ঠিক পথে না এগোয় তবে যুক্তি দিয়ে কি হবে!

যেমন পূর্বপ্রভাবঃ একটা ধাধা দিয়ে শুরু করি। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ছেলেকে বাবা যখন হাসপাতালে নিয়ে গেলেন তখন কর্তব্যরত ডাক্তার ছেলেটিকে দেখে তার বাবাকে বললেন, “আমার ছেলের এমন দশা কিভাবে হলো?” প্রশ্ন হলো, ডাক্তার ও ছেলেটির মধ্যে সম্পর্ক কি? এই ধাঁধাতে যে ব্যাপারটি আমাদেরকে ধাঁধায় ফেলে দেয়, সেটি আর কিছুই নয়, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। আমরা পুরুষতান্ত্রিকতা দিয়ে এতটাই আচ্ছন্ন থাকি যে আমাদের মনেই থাকে না, যে একজন নারীও ডাক্তার থাকতে পারেন। এটাই পূর্বপ্রভাব বা Domination। একটা ঘটনার একাধিক ব্যাখ্যার মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম সম্ভাব্য ব্যাখ্যাটি যখন আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, তখনই এই সমস্যার উদ্ভব হয়। তখন আমরা আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য বিশ্বাস করতে শুরু করি এবং আমাদের চিন্তা দূষিত হয়ে পড়ে।

পূর্বানুমানঃ ধরা যাক, ভোটার তালিকা প্রস্তুত করতে ১০০ জন লোকের ১০০ দিন সময় লাগে, তাহলে ১০০০০ জনের কত দিন সময় লাগবে? ঐকিক নিয়মে উত্তর হয়, ১ দিন। কিন্তু বাস্তবে কি দেখা যাবে? জনবল বাড়ালেই কি সেই হারে সময় কমে আসে? প্রকৃত বিষয়টি মোটেও তা নয়। আমরা ঐকিক নিয়মে এমন অনেক কিছু ধরে নিয়েছি যা আমাদের হিসাবটা সহজ করে দিয়েছে কিন্তু সেসবের বাস্তব কোন ভিত্তি নেই। আমরা ধরে নিয়েছি, সব লোকের কর্মদক্ষতা সমান, সবাই একই সাথে সমানভাবে কাজ করবে, পুরো প্রকল্পটি যদি পরিচালনা যে করবেন তাঁর সাংগঠনিক দুক্ষতা প্রশ্নাতীত…ইত্যাদি। এভাবে হিসাবের সুবিধার্থে আমরা এমন অনেক কিছুই ধরে নিই, এই ধরে নেওয়াটা কোন সমস্যা নয়। সমস্যা বাধে তখনই, যখন আমরা ভুলে যাই যে, আমরা ‘ধরে নিয়ে’ শুরু করেছিলাম এবং সে কারণে আমাদের উত্তর শতভাগ নির্ভুল নয়। চিন্তার এ ধরনের দূষণকে বলে পূর্বানুমান (assumption)জনিত দূষণ। আমরা বিন্দুকে মাত্রাবিহীন অস্তিত্ব বলছি, আবার কাগজে একটা ফোঁটা দিয়ে দেখাচ্ছি সে এটাই হচ্ছে বিন্দু। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে কাগজের ঐ ফোঁটাটিকে হিসাবের সুবিধার্থে আমরা বিন্দু বলে ‘ধরে নিয়েছি’ মাত্র, প্রকৃতপক্ষে মাত্রাবিহীন কোন কিছু আমরা কখনোই দেখতে পারি না। বিজ্ঞানের যে কোন রাশির তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক মানের মধ্যে যে হেরফের হয়, তার মূলে রয়েছে এই পূর্বানুমান।

তেমনি আমাদের এই ‘ধরে নেওয়া ঈশ্বর’ কে কেউ ভুলেও হিসাবের সুবিধার্থে মেনে নিতে নারাজ। তাই ঈশ্বর বিশ্বাসীরা ঈশ্বর আছে, এই বিশ্বাসেই অনড়।

রৈখিক চিন্তনঃ এটাতেও একটা ধাধা দিয়ে শুরু করি। গাছে পাঁচটা পাখি বসে ছিল, গুলি করে একটাকে ফেলে দিলে সেখানে ক’টা পাখি থাকবে? রৈখিক চিন্তনে উত্তর হবে ৫-১=৪ টি। কিন্তু বুঝতেই পারছেন এটা সঠিক উত্তর নয়। আসলে, গুলির শব্দ শুনে এবং একটা পাখির পতন দেখে বাকি পাখিগুলো আর সেখানে বসে থাকবে না। এই ধাঁধাটির সঠিক উত্তর দিতে হলে আমাদেরকে সোজাপথে চিন্তা করলে চলবে না, একটু খানি ঘুরিয়ে চিন্তা করতে হবে। একটি সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আমরা যখন তার পারিপার্শ্বিকতাকে বিবেচনায় না এনে স্রেফ সুত্র বসিয়ে কাজ চালাই, তখনই রৈখিক চিন্তনজনিত ত্রুটি আমাদের চিন্তাকে দূষিত করে।

যুক্তির জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো চিন্তা শক্তি। এই চিন্তাশক্তি যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ আমরা না করতে পারি তখনই আমাদের যুক্তি, কু-যুক্তিতে রুপান্তরিত হবে এবং ধাধার মধ্যে পড়ে গিয়ে মাঝপথে আটকে যাবো। ফলে ভ্রান্ত যুক্তি নিয়েই আমরা যুক্তিবাদী হবো এমনটা আমরা আশা করতে পারি না। 

 

0 Shares

রঞ্জন এর ব্লগ   ২৬ বার পঠিত