Avatar

ভূমিকা: যারা ইসলামে নারীর অধিকার নিয়ে লেখালেখি করেন ও প্রমান করতে চেষ্টা করেন যে, ইসলামে নারীদের কোন মর্যাদা দেয়া হয় নি বরং চুড়ান্ত রকম অপমান করা হয়েছে, কোরান হাদিস থেকে যথাযথ উদ্ধৃতি দিয়ে সেটা প্রমান করলেও মুমিন মুসলমান বান্দারা দাবী করেন – সেসব হলো ইসলাম বিদ্বেষীদের নিজস্ব মনগড়া ব্যখ্যা। সে কারনে ইসলামি জগতের সবচাইতে বিখ্যাত ও শ্রেষ্ট  চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইমাম গাজ্জালীর লেখা সরাসরি প্রকাশ করার এ মহান দায়িত্ব আমি নিজ স্কন্ধেই নিলাম, যাতে করে মুমিন মুসলমান বান্দারা তা পড়ে প্রকৃত সত্য জানতে পারেন ও তথাকথিত ইসলাম বিদ্বেষীরা যাতে কিছুটা হলেও তাদের অপব্যাখ্যার অপবাদ থেকে রেহাই পায়।

ইসলামে স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক, পর্ব-১
মূল রচনা: ইমাম গাজ্জালি
অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান,সম্পাদক মাসিক মদিনা, ঢাকা।
উৎস: http://www.banglakitab.com/kitab.htm
এহইয়াউ উলুমিদ্দীন, খন্ড:২, পৃষ্ঠা: ২৯৬–৩০০

বিবাহ প্রকারান্তরে বাঁদী হওয়ার নামান্তর বিধায় স্ত্রী যেন স্বামীর বাঁদী হয়ে যায় সুতরাং স্বামীর আনুগত্য করা সর্বাবস্থায় তার ওপর ওয়াজিব। স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক যে বেশী এ সম্পর্কে অনেক হাদিস আছে। রাসুলুল্লাহ (সা: ) বলেন: যে স্ত্রী এমতাবস্থায় মারা যায় যে তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

কোন এক ব্যক্তি সফরে যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলে গেল- উপর তলার কক্ষ থেকে নীচে নামবে না। নীচে তার পিতা বসবাস করত। ঘটনাচক্রে সেই পিতা অসুস্থ হয়ে পড়ল। স্ত্রী নীচে পিতার কাছে নামার অনুমতি চেয়ে রসুলুল্লাহ (সা: ) র কাছে লোক পাঠালে তিনি বললেন: স্বামীর আদেশ পালন কর। শেষ পর্যন্ত পিতা মারা গেলে সে আবার অনুমতি প্রার্থনা করল। রাসুলুল্লাহ আবার বললেন: স্বামীর আদেশ পালন কর। ফলে পিতা সমাধিস্থ হয়ে গেল। কিন্তু সে  নীচে নামল না। অত:পর রসুলুল্লাহ (সা: ) এই মহিলাকে বলে পাঠালেন: তুমি যে স্বামীর আদেশ পালন করেছ, এর বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তোমার পিতার মাগফেরাত কামনা করেছেন। অন্য এক হাদিসে আছে:

যখন স্ত্রী পঞ্জেগানা নামাজ পড়ে  রমযান মাসের রোজা রাখে, আপন গুপ্তাঙ্গ হেফাজত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তখন সে তার পালনকর্তার জান্নাতে প্রবেশ করবে

এ হাদিসে স্বামীর আনুগত্যকে ইসলামের রোকনসমূহের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। একবার রসুলুল্লাহ (সা: ) মহিলাদের আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন: গর্ভবতী নারী, সন্তান প্রসবকারিনী নারী, দুগ্ধ দানকারিনী নারী, সন্তানদের প্রতি দয়াশীলা নারী, স্বামীর সাথে যে অসদাচরন করে, যদি তা না করত তবে তাদের মধ্যে যারা নামাজি, তারা জান্নাতে প্রবেশ করত। এক হাদিসে বলেন:

আমি দোজখে উকি দিয়ে দেখলাম, তার অধিকাংশ বাসিন্দাই নারীনারীরা আরজ করল: ইয়া রাসুলুল্লাহ, এর কারন কি ? তিনি বললেন: নারীরা অভিসম্পাত করে এবং স্বামীদের না শোকরী করে

অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, আমি জান্নাতে উকি দিয়ে দেখলাম, তাতে পুরুষ জান্নাতীদের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা খুব নগণ্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম: মহিলারা কোথায়? উত্তর হলো: দু’টি লাল বস্তু তাদের জান্নাতে আসার পথে বাধা হয়েছে। একটি স্বর্ণ ও অপরটি জাফরান। অর্থাৎ অলংকার ও রঙিন পোশাক। হযরত আয়েশা (রা: ) বলেন: কোন এক যুবতী রসুলুল্লাহ (সা: ) এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ  করল: ইয়া রাসুলুল্লাহ , আমি যুবতী। মানুষ আমার কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু বিবাহ আমার কাছে ভাল লাগে না। এখন জানতে চাই, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক কি? তিনি বললেন,: ধরে নেয়া যাক, স্বামীর আপাদ মস্তক পুঁজে ভর্তি। যদি স্ত্রী এই পুঁজ চেটে নেয়, তবুও তার শোকর আদায় করতে পারবে না। মহিলা বলল: আমি বিবাহ করব কি? তিনি বললেন: করে ফেল। বিবাহ উত্তম। হযরত ইবনে আব্বাস (রা: ) বলেন: খাসআম গোত্রের জনৈকা মহিলা রাসুলুল্লাহ (সা: ) এর খেদমতে এসে আরজ  করল: আমি স্বামীহীনা, বিবাহ করতে চাই। এখন স্বামীর হক কি, জানতে চাই। তিনি বললেন: স্বামীর এক হক – সে যদি উটের পিঠে থেকেও সহবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে স্ত্রী অস্বীকার করতে পারবে না। আরেক হক, কোন বস্তু তার গৃহ থেকে তার অনুমতি ব্যতীত কাউকে দেবে না। দিলে তুমি রোজা রেখে কেবল ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্তই থাকবে। তোমার রোজা কবুল হবে না। যদি তুমি স্বামীর আদেশ ছাড়া ঘর থেকে বের হও, তবে ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত ও তওবা না করা পর্যন্ত ফেরেস্তারা তোমার প্রতি অভিশম্পাত করতে থাকবে। এক  হাদিসে আছে-

যদি আমি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে অবশ্যই স্ত্রীকে নির্দেশ করতাম যেন সে তার স্বামীকে সেজদা দেয়

এরূপ বলার কারন স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক বেশী। রসূলে আকরাম আরও বলেন: স্ত্রী আল্লাহর পবিত্র সত্তার অধিকতর নিকটবর্তী তখন হয়, যখন সে তার কক্ষের অভ্যন্তরে থাকে। স্ত্রীর পক্ষে গৃহের আঙ্গিনায় নামাজ পড়া মসজিদে নামাজ পড়া অপেক্ষা উত্তম। আর কক্ষের ভেতরকার কক্ষে নামাজ পড়া কক্ষের ভেতর নামাজ পড়ার তুলনায় শ্রেয়। এটা বলার কারন, স্ত্রীর অবস্থার উৎকৃষ্টতা ও অপকৃষ্টতা পর্দার ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং যে অবস্থায় পর্দা বেশী হবে, সে অবস্থাই তার জন্যে উত্তম। এ কারনেই রসুলুল্লাহ (সা: ) বলেন: নারী হলো নগ্নতা। সে যখন বের হয় তখন শয়তান উঁকি দিয়ে দেখে।তিনি আরও বলেন: স্ত্রীর দশটি নগ্নতা রয়েছে। সে যখন বিবাহ করে তখন স্বামী একটি নগ্নতা ঢেকে দেয়। আর যখন সে মারা যায়, তখন কবর দশটি নগ্নতা আবৃত করে দেয়। মোট কথা, স্বামীর হক স্ত্রীর উপর অনেক বেশী। তন্মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি – একটি আত্মরক্ষা ও পর্দা এবং অপরটি প্রয়োজনাতিরিক্ত জিনিসপত্র দাবী না করা এবং স্বামীর উপার্জন হারাম হলে তা থেকে বেঁচে থাকা। সেমতে পূর্ববর্তীকালে নারীর অভ্যাস তাই ছিল। তখন কোন পুরুষ সফরে গেলে তার স্ত্রী ও কন্যারা তাকে বলত: খবরদার! হারাম উপার্জন করবে না। আমরা ক্ষুধা ও কষ্টে সবর করব; কিন্তু দোজখের আগুনে সবর করতে পারব না। সে যুগের এক ব্যক্তি সফরে ইচ্ছা করলে তার প্রতিবেশীদের মনে সন্দেহ হলো। সবাই তার স্ত্রীকে বলল: তুমি তার সফরে সম্মত হ্চ্ছ কেন? সে তো তোমার খরচের জন্যে কিছুই রেখে যাচ্ছে না। স্ত্রী বলল: আমি আমার স্বামীক যেদিন থেকে দেখেছি, ভক্ষকই পেয়েছি – রিজিকদাতা পাই নি। আমার পালন কর্তা আমার রিজিকদাতা। এখন ভক্ষক চলে যাবে এবং রিজিকদাতা আমার কাছে থাকবে। রাবেয়া বিনতে ইসমাইল আহমদ ইবনে আবুল হাওয়ারীর কাছে নিজের বিবাহের পয়গাম দিলে এবাদতের কারনে তিনি তা অপছন্দ করেন ও বলেন: স্ত্রীর খায়েশ আমার নেই। আমি এবাদতেই মগ্ন থাকতে চাই। রাবেয়া বললেন: আমি আমার অবস্থায় তোমার চেয়ে অধিক মগ্ন আছি। পুরুষের খায়েশ আমার নেই। কিন্তু আমি আমার পূর্বের স্বামীর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক ধন সম্পত্তি পেয়েছি। আমি চাই তুমি এসব ধন সম্পদ তোমার সঙ্গীদের মধ্যে ব্যয় কর এবং তোমার মাধ্যমে আমি সজ্জনের পরিচয় লাভ করি। আহমদ বললেন: আমি আগে আমার ওস্তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নেই। অত:পর তিনি হযরত সোলায়মান দারানীর কাছে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি রাবেয়ার কথা শুনে বললেন: তাকে বিয়ে করে নাও। সে আল্লাহর ওলী। কেননা, এরূপ কথাবার্তা ওলীরাই বলেন। আহমদ বলেন: ইতোপূর্বে ওস্তাদ আমাকে বিবাহ করতে বারণ করতেন এবং বলতেন আমাদের সঙ্গীদের মধ্যে যে কেউ বিয়ে করেছে, সে-ই বদলে গেছে। এর পর আমি রাবেয়াকে বিয়ে করলাম। এই রাবেয়াও সিরিয়ার তেমনি ছিল, যেমন ছিল বসরার রাবেয়া বসরী।

0 Shares

ভবঘুরে এর ব্লগ   ৪৪ বার পঠিত