গৌর অধিকারী

 

ভারতের ঝাড়খণ্ডে উপজাতি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তিরিশেরও বেশি। এছাড়া বেশকিছু গৌণ জনগোষ্ঠী আছে। একটা উল্লেখযোগ্য উপজাতি হলো বৈগ্যা। প্রথমে এদের সন্ধান পাওয়া যায় নি। কারণ এরা লোকালয়ের কাছে থাকে না। গড়বা জেলার গভীর জঙ্গল আর পাহাড়ে এদের বাস। ১৮৬৭ সালে এদের প্রথম সন্ধান পাওয়া যায়।

ইংরেজ শাসকেরা এদের আখ্যা দিলো Wild Tribe সাদা বাংলায় বুনো বলুন বা বন মানুষ। আর দেবে নাই বা কেনো। এদের দিয়ে জঙ্গলে কাঠ কাটানো গেলো না, খনির শ্রমিক বানানো গেল না, রাস্তা বা রেললাইন করার কাজে মজুরও এরা হলেন না। বনমানুষ নয় তো কী!

বহু যুগ কেটে গেল। স্বাধীন দেশ। সত্তর বছর কাটলো আধুনিক ভারতের। সরকারি দস্তাবেজে বৈগ্যা উপজাতির বর্তমান অভিধা – Least civilized ভাষার মারপ্যাচে আসল বক্তব্য হলো – অসভ্য জাতি। হবে না কেনো – কাঠ মাফিয়াদের কল্যাণে সেই দূর্ভেদ্য জঙ্গল আর নেই। সব আবরণ গেছে ঘুঁচে। বৈগ্যারা কিন্তু একইরকম একবগ্গা আছে। সভ্য মানুষের আদায় চুম্বন তারা গ্রহণ করবে না। অসভ্য কোথাকার!

কী জীবিকা এদের?

প্রথাগত চাষ এরা করেন না। মাটিতে লাঙল বা কোদাল এরা চালান না। মাটি যে মা। মায়ের ব্যথা লাগবে, কষ্ট হবে। তারা ভেজা মাটিতে বীজ ছড়িয়ে দেন। সেই শস্য তাদের জীবন বাঁচায়।

কিন্তু এই পর্যন্ত যদি তাদের জীবন-যাপন হতো তাহলে এই কাহিনী লিখতে বসতাম না। যুগ যুগ ধরে বৈগ্যারা পুরুষানুক্রমে যে কাজটি করে আসছেন তা হলো ওষুধ তৈরি। (বৈগ্যা নামের সঙ্গে বৈদ্য নামটির সাদৃশ্য লক্ষ্য করার মতো)। এই জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে দূর্গম পাহাড়, গভীর জঙ্গল ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছে নানা ফল ফুল শেকড় কন্দ বাকল পাতা ঝুরি। তারপর সেগুলো দিয়ে ওষুধ বানিয়ে মানুষের ওপর প্রয়োগ করে পর্যবেক্ষণ করেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, সিদ্ধান্তে এসেছেন। নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার করেছেন।

শহুরে ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিধারীরা যদি এই কাজটি করতো, তাহলে ধন্যি ধন্যি পড়ে যেতো। দিস্তে দিস্তে পেপার বেরুতো, দেশে বিদেশে পেপার পড়ার ডাক পড়তো, আরটিকেল লেখা হতো। কিন্তু এরা তো বুনো অসভ্য!

কেনো বুনো অসভ্য? এরা যে সভ্য সমাজের ডাকে রাস্তার মজুর হন নি, বাবুর বাড়ির চাকর হন নি, দিন মজুরির কড়ারে কয়লার খনিতে ঢোকেন নি, গণতন্ত্রের রক্ষায় ভোটার সাজেন নি। আমাদের সভ্যতা তাই দেগে দিয়েছে – অসভ্য বনমানুষ!

সভ্যতার মাপকাঠি যে সভ্যদেরই তৈরি।

গৌর অধিকারী এর ব্লগ   ১৬৬ বার পঠিত