Avatar

রুশদীর ঘটনাঃ

১৪ই ফেব্রুয়ারী ১৯৮৯ এর পূর্বেঃ

১২৮০ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে ইবন্ কামমুনা নামক একজন ইহুদী দার্শনিক ও চিকিৎসক একটি অসাধারণ বই লেখেন। বইটির নাম “Examination of the Three Faiths”। বইটি অনন্য এই কারণে যে এটিতে ইহুদীবাদ, ক্রিশ্চানত্ব এবং সর্বোপরি ইসলাম নিয়ে আলোচনা করা হয়। বলা হয়,” অজ্ঞেয়বাদের সুক্ষ্ম ছিদ্র দিয়েই আল্লাহ প্রবেশ করেন।

নবী মোহাম্মদকে অস্বীকার করা হয় এই বলে, “আমরা এমন কিছুই খুজে পাই নি যা মোহাম্মদ যোগকরেছেন কিন্তু পূর্বের কোন ধর্মগ্রন্থের তা ছিল না।” এবং নবীজির সততা নিয়েও সিদ্ধান্ত দেওযা হয়, “মুহম্মদের ত্রুটিহীনতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি, যা তিনি দাবী করেছেন।” জনসাধারন ইসলাম গ্রহণ করে শুধু “ভয়ে অথবা ক্ষমতার লোভে অথবা অধিক করের হাত থেকে বাঁচার জন্য অথবা শাস্তি এড়ানোর জন্য অথবা বন্দী হয়ে বা মুসলিম রমনীর পাণিগ্রহণ করে।” 

একজন ধনী অমুসলিম তার নিজ বিশ্বাসে সুদৃঢ় এবং উপরোক্ত কোন কারণ ছাড়া তার ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার কোন কারণ নেই। সবশেষে দেখা যাচ্ছে,মুসলিমরা মুহম্মদের নবীত্ব সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যর্থ।তাহলে মুসলমানগন কিভাবে এই সন্দেহবাদীদের কাছে টানবে?

১৩ শতকের ইতিহাসবিদ ফুয়াতি(১২৪৪-১৩২৩) এই বই প্রকাশের চার বছর পরে লেখেন,

“এ বছর(১২৮৪) বাগদাদে এই কথা জানাজানি হয় যে, ইহুদী ইবন্ কামমূনা একটি বই লিখেছেন…… যাতে তিনি রাসূল সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন।খোদা আমাদেরকে রক্ষা করুন যেন তিনি যা বলেছেন তা আবার শুনতে না হয়।ক্রুদ্ধ জনতা তার দাঙ্গা বাধাল,এবং তার (ইবন্ কামমূনা’র) বাড়ি আক্রমন করল তাকে হত্যা করার জন্য।শহরের আমীর এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা মুসতানসিরীয়া মাদ্রাসা অভিমুখে গেল এবং প্রধান কাজীকে ডেকে পাঠাল এই ঘটনার বিচারের জন্য। তারা ইবন্ কামমুনাকে খুজল কিন্তু তিনি আত্মগোপন করেছিলেন।দিনটি ছিলো শুক্রবার।প্রধান কাজী জুম্মার নামাজের জন্য যাচ্ছিলেন,কিন্তু ক্রুদ্ধ জনতা তাকে আবার মুসতানসিরীয়া মাদ্রাসায় ফেরত আনল। আমীর জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা চালালেন,কিন্তু ক্রুদ্ধ জনতা তাকে ইবন্ কামমুনা’র পক্ষে থাকার ও তাকে রক্ষা করার জন্য অভিযুক্ত করল। এ অবস্থায় আমীর আদেশ জারী করতে বাধ্য হলেন যে পরদিন ইবন্ কামমুনাকে শহর প্রাচীরের বাইরে জ্বলন্ত আগুনে পোড়ানো হবে। সমস্ত বাগদাদে এ খবর প্রচারিত হলো।জনতা শান্ত হয়ে বাড়ী ফিরলো। এদিকে ইবন্ কামমুনা একটি চামড়ার বাক্সে করে ‘হিল’ এ তার ছেলের কাছে পলায়ন করলেন যে সেখানে দাপ্তরিক কাজে কর্মরত ছিলো। সেখানে তিনি আমৃত্যু অবস্থান করেন।”

ফুয়াতি’র বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে কিভাবে শুধু মৌলবাদীরাই নয়,সাধারন মুসলিম জনতাও ইসলামের প্রতি সামান্য বিরুপ সমালোচনাকেও কিভাবে আক্রমনাত্মক ভাবে গ্রহন করে। দুটো ছোট্ট উদাহরণ, আমেরিকান অর্থনীতিবীদ জন কেনেথ গ্যালব্রেরেথ যখন ভারতে রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন (১৯৬১-৬৩) প্রচার হয় যে তার বিড়ালের নাম “আহমেদ”, যা কিনা আবার পয়গম্বর মুহম্মদের আরেক নামও বটে।তখন তিনি মারাত্মক প্রতিবাদের মুখে পড়েন।যখন ‘ডেকান হেরাল্ড’ পত্রিকা একটি ছোট গল্প ছাপে যার শিরোনাম ছিল “বোকা মোহাম্মদ”, মুসলমানেরা পত্রিকা অফিসটি পুড়িয়ে ফেলে। গল্পটিতে নবীর কোনও উল্লেখও ছিলো না, শুধুমাত্র গল্পের নায়কের নাম ছিলো মুহাম্মদ। এছাড়া সাম্প্রতিক কালে দশজন ভারতীয়কে আরব আমিরাতে জেল দেওয়া হয়, কারণ তারা একটি মালয়ালম নাটক মঞ্চস্থ করছিলো,যার নাম ছিলো “মড়া খাওয়া পিঁপড়েগুলো”, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ হল এটিতে মুহম্মদের বিরুদ্ধে ইঙ্গিত ছিলো।

যে সমস্ত মুসলমানরা সমালোচনা করেছেন,তাদেরকে বলা হয়েছে মুরতাদ, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিরোচ্ছেদ, ক্রুশে ঝোলানো অথবা আগুনে পোড়ানো হয়েছে। আমি তাদের কয়েকজনের ইসলামের স্বর্নযুগে দুরবস্থার কথা ১০ম অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি। এখানে আমি সাম্প্রতিককালের মুসলিমদের ইসলামের সমালোচনা সম্পর্কে বলবো।

আমার অনেক বর্ননাই দানিয়েল পিপে’র অসাধারন বই “দি রুশদী এফেয়ার” থেকে নেওয়া।পিপে সেইসব মুসলিম লেখকদের কথা বলেছেন,যারা তাদের মুরতাদী লেখার জন্য শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং এই শাস্তি যারা কোনোরকম তওবা ছাড়াই এড়াতে পেরেছেন। তাদের দুর্ভাগ্য বর্ণনায় যাওয়ার আগে আমি দাস্তি’র “23 Years” বইয়ে কিছু চমকানো সমালোচনার উল্লেখ করতে চাই। যদিও বইটি ১৯৩৭ সালে লেখা, এটি বৈরুতে ১৯৭৪ সালের আগে প্রকাশিত হয়নি,যেহেতু ১৯৭১-৭৭ পর্যন্ত ইরানে শাহে’র রাজত্বে কোন ধর্ম সমালোচনামুলক বই প্রকাশ নিষিদ্ধ ছিলো।

১৯৭৯ তে’ ইসলামী বিপ্লব হওয়ার পরে দাস্তি বইটি প্রকাশ করেন গোপন বিপ্লবী বিরোধীদলের সহায়তায়। তার বইটি,যা নবীজীর ‘নবীত্ব ‘ লাভের ২৩ বছর নিয়ে রচিত, ১৯৮৬ সালের মধ্যে ৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বইটিতে দাস্তি প্রথমত, সাধারণ যুক্তি তুলে ধরেছেন এবং অন্ধবিশ্বাসকে ব্যঙ্গ করেছেন এই বলে যে “বিশ্বাস মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি ভোঁতা করে দেয়। যেখানে জ্ঞানী ব্যক্তিদের বেলায়ও যুক্তিবোধসম্পন্ন চিন্তা করতে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষন করতে হয়।

তিনি দৃঢ়তার সাথে কিছু অত্যুতসাহী মুসলমানবর্ণনাকারক কর্তৃক মুহম্মদের উপর আরোপিত যেকোন অলৌকিকত্ব অস্বীকার করেন।

দাস্তি ‘কোরান আল্লাহর নিজের বাণী,এর বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর অলৌকিকত্বের ভিত্তিতে’ ,এই গোড়াঁ মতবাদকে কিছু যুক্তির মধ্যদিয়ে বিশ্লেষন করেন। 

তিনি দেখান,

“প্রবল ক্ষমতা ও শক্তি করায়ত্ত হওয়ার আগেও কিছু মুসলিম পন্ডিত খোলাখুলি স্বীকার করেছিলেন যে কোরানের সংগঠন ও পদবিন্যাস অলৌকিক নয়, এবং এর সমান বা এর থেকেও উৎকৃষ্ট গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব কোন ধর্মভীরু মানুষের পক্ষে।”

“আবার, কোরানে এমন বাক্যসমূহ আছে যেগুলো সম্পূর্ন নয়,এবং তাফসীর,বিদেশী শব্দ,অপ্রচলিত আরবী শব্দ এবং সাধারন শব্দের অর্থের বিপরীতে অন্য অর্থ বুঝিয়ে, ক্রিয়া ও বিশেষন এর ব্যবহার লিঙ্গ ও বচন এর সাথে সামঞ্জস্য না রেখে, অযৌক্তিকভাবে ও ব্যাকরনের বাইরে গিয়ে সর্বনাম ব্যবহৃত কখনও কখনও কোন বিশেষ্যকে উল্লেখ না করেই, এবং ছন্দে কখনও বাক্যের উদ্দেশ্য ও বিধেয় এর মধ্যে কোন সুস্পষ্ট সম্পর্ক ছাড়াই ব্যবহৃত হয়েছে।এই অস্বাভাবিকতাগুলি অন্যকে সুযোগ করে দিয়েছে কোরানের অলৌকিক রচনাশৈলীর দাবীকে উপহাস করতে। …..মোট কথা, প্রায় একশটি এরকম ভূল ধরা সম্ভব যা সাধারনভাবে হওয়ার কথা নয়।”

এ তো গেল রচনাশৈলী প্রসঙ্গ। বিষয়বস্তুর অলৌকিকত্বের খবর কি? ইবন্ কামমুনা’র মতই আলী দাস্তি দেখিয়েছেন,

“কোরানে তার আগ পর্যন্ত অপ্রকাশিত এমন কোনো বিষয় অবতারনা করা হয় নি। কোরানের সকল ঈন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর প্রমান হচ্ছে সার্বজনীন ও কোরানে দাবীকৃত। এর কাহিনী ইহুদী এবং খ্রিষ্টানদের লোককাহিনী থেকে সামান্য পরিবর্তিত, যাদের ‘রাব্বী’ ও ‘যাজক’দের সাথে মুহম্মদের পরিচয় ও মেলামেশা ছিল সিরিয়ায় বাণিজ্য করতে যাওয়াকালীন। এছাড়াও “আদ ও তামদ” এর উত্তরসূরীগনের কাছ থেকেও একই কাহিনী তিনি শুনে থাকবেন। যাহোক, নীতিশিক্ষার ক্ষেত্রে কোরানকে অলৌকিক বলা যাবে না,কারণ মুহম্মদ আগে থেকে প্রচলিত নীতিশিক্ষাই কোরানে সংযোজিত করেছেন। কনফুসিয়াস, গৌতম বুদ্ধ, জরাথ্রুষ্ট, মূসা ও ঈসা আগে থেকেই এই নীতিগুলো ব্যক্ত করেছিলেন। ইসলামের অনেক ধর্মীয় আচার আচরন(সুন্নত) ও পালনীয় কর্তব্য(ফরজ) আগে থেকেই পৌত্তলিক আরব সমাজে প্রচলিত ছিল যা তারা আবার পেয়েছিল ইহুদীদের কাছ থেকে।”

দাস্তি ইসলামের অনেক ধর্মীয় আচারের প্রতি ব্যঙ্গ করেছিলেন,যেমন মক্কায় হজ্জ্ব করার পদ্ধতি। মুহম্মদ নিজেকে অবস্থানপরিবর্তনকারী হিসেবে পরিচিত করেছিলেন যার ঝোঁক ছিলো রাজনৈতিক হত্যা ও শত্রুর নিশ্চিহ্নকরনের দিকে। নবীজির সাহাবীদের মধ্যে হত্যাকে পরিচিত করানো হল “আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালন” হিসেবে।নারীর অবস্থান পর্যালোচনা করেও দেখা যায় সেখানেও নারীরা নিকৃষ্টতম বলে গণ্য। “আল্লাহ” কে নিষ্ঠুর, ঈর্ষপরায়ন, গর্বিত ও রাগী হিসেবে দেখানো হয়েছে  — যে গুণগুলি আনুগত্য পাওয়ার উপযুক্ত নয়। সবশেষে, এটা নিশ্চিত যে কোরান আল্লাহর বাণী নয়, কারন অসংখ্য জায়গায় এর বক্তা দুইজন, ‘মুহম্মদ ও আল্লাহ’। 

দাস্তিকে শেষ পর্যন্ত খোমেনীর আমলেই ১৯৮৪ সালে কারাগারে ৩ বছর নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়,তার ৮৩ বছর বয়সও এক্ষেত্রে কোনো করুণার সৃস্টি করতে পারে নি।মারা যাওয়ার আগে এক বন্ধুকে তিনি বলে যান,”যদি শাহ আমার বইটা প্রকাশ করতে দিত,তবে আমাদের কখনো ইসলামী বিপ্লব দেখতে হত না।

আলী আবদ আল-রাজিক,প্রসিদ্ধ আল-আজহার এর শিক্ষক ১৯২৫ সালে “Islam and the Principles of Government” বইটি প্রকাশ করেন। এই বইয়ে আল-রাজিক ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করার পক্ষে যুক্তি দেখান যেহেতু তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কেবলমাত্র এভাবেই ইসলামের বিস্তৃতি সম্ভব। 

এই দৃষ্টিভঙ্গি আল আজহারের অন্যান্য শেখ (শিক্ষক) দের কাছে অগ্রহনযোগ্য মনে হওয়ায় তারা তার ‘নাস্তিকতা’র বিচার করে এবং তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়। অবশিষ্ট জীবনে তিনি আর কখনো ইসলামকে নিয়ে কিছু লিখবেন না, এই নির্দেশও জারী করা হয়।

আল-আজহারে’র আরেকজন কামেল মিশরের পন্ডিত তাহা হুসেন। এছাড়া তিনি ফ্রান্সেও পড়াশোনা করেন,যেখানে তার যুক্তিবাদী মনের বিকাশ ঘটে। অমোঘভাবেই মিশরে ফিরে তিনি তার সমাজের অযৌক্তিক বিশ্বাসকে সমালোচনা করা শুরু করেন। তার লেখনীও ইসলামের পক্ষে অসহ্য ঠেকে এবং তাকে জনসম্মুখে কোন লেখা প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়। তার “On Pre Islamic Poetry” বইতে তিনি লেখেন যে কোরানে ইব্রাহীম ও ইসমাঈল এর উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়।

১৯৬৭ সালের এপ্রিলে, ইসরাইলের সাথে ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ শুরু হওয়ার কিছু আগে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর পত্রিকা “জয়েশ-আশ-শাহ” তে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যা শুধু ইসলামকেই নয়, আল্লাহ ও ধর্ম সবকিছুকেই মমি বানিয়ে মিউজিয়ামে পাঠানোর পক্ষে মত দেয়। স্বাভাবিকভাবেই, ইবন্ কামমুনার মতই এখানেও ইসলামী জনতা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে রাস্তায় নেমে আসে এবং সহিংসতা শুরু হয়। 

এই ঘটনার পেছনে আমেরিকা-ইসরাইলের হাত আছে,এই অজুহাত জনতা গ্রহন না করলে তখন প্রবন্ধটির লেখক ইবনে খালাশ কে তার দুজন সহকারী সম্পাদক সহ আজীবন সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। সৌভাগ্যের ব্যাপার, এই সাজা তাদের বেশিদিন খাটা লাগেনি, তারা মুক্তি পান।

১৯৬৯ সালে ইসরাইলের হাতে সিরিয়া পর্যদুস্থ হওয়ার পরে একজন সিরিয়ান মার্কসবাদী লেখক, সাদিক আল আযম ধর্ম সম্পর্কে একটি অসাধারন সমালোচনা করেন। তিনি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বৈরুত থেকে তার ডিগ্রি লাভ করেন এবং ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে তার পি.এইচ.ডি করেন। তিনি ব্রিটিশ দার্শনিক বিশপ বার্কলে সম্পর্কে একটি থিসীস করেন। আল আযমের ইসলাম ও ধর্ম নিয়ে সমালোচনা বৈরুতের সুন্নি মহলে গ্রহনযোগ্য হয় নি, তাকে ধর্মে বিশৃঙ্খলা আনার অপরাধে বিচারের মুখোমুখি করা হয় যদিও তিনি বেকসুর খালাস পান,তার সিরিয়ান রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাবে। এরপর কিছুদিন এর জন্য বিদেশ কেই বসবাসের জন্য বেছে নেওয়া ছাড়া তার আর কোনও উপায় ছিলো না।

সাদিক আল আযম আরবের নেতাদেরকে সমালোচনা করেন এই বলে যে ,”তারা জনগনের মাঝে সমালোচনামূলক মনোভাব গড়ে তুলতে পারেননি এবং তারা নিজেরাও ইসলাম সম্পর্কে অন্ধ ।

আরবের প্রগতিবিরোধীরা ধর্মীয় অনুভুতিকেই আদর্শিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, এবং এখনও পর্যন্ত কেউই তাদের আরবের মানুষকে ব্যবহারের জন্য করা জালিয়াতিকে প্রকাশের কোন যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা করতে পারে নি। তারা সমাজের বিদগ্ধশ্রেনীর কাছ থেকে কোন সমালোচনা পায় না তাদের উত্তরাধিকারবিষয়ক ব্যাপারে।

তারা জনগনের ধর্ম,বিশ্বাস,ঐতিহ্য,সংস্কৃতি,নীতি রক্ষার অজুহাতে আরবের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী চেতনাকে সমাজের পশ্চাৎগামী প্রতিষ্ঠানসমুহকে এবং মধ্যযুগীয় রীতিনীতি ও অস্পষ্ট আদর্শকে রক্ষায় ব্যবহার করে আসছেপ্রতিটি মুসলিমকেই বিগত ১৫০ বছরের বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের মুখোমুখি হতে হবে। বেশ কয়েকটি বিষয়ে মুসলিম বিশ্বাস সরাসরি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু সবথেকে মৌলিক পার্থক্য হলো চিন্তার প্রক্রিয়ায়–ইসলাম অন্ধবিশ্বাস ও অযৌক্তিক গ্রন্থের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে,যেখানে বিজ্ঞান যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষালব্ধ ফলের উপর নির্ভর করে,যেগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং বাস্তব।আমাদের আর অন্ধভাবে কোন ধর্মীয়গ্রন্থ মেনে নেওয়া উচিত নয়, সমস্ত প্রাচীন ধর্মগ্রন্থই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আওতায় আসা উচিত। 

কেবলমাত্র তখনই আমাদের পশ্চাৎগতি রুদ্ধ হবে আর ধর্ম তার অন্ধকার মতামত দিয়ে চিন্তা ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করা থেকে বিরত হবে।”

সাদিক আযমে’র বইটি আরও বেশি প্রচারিত হওয়া উচিত ছিলো, কিন্তু কোন কারনে এটি ইংরেজিতে অনুবাদিত হয় নি। সাম্প্রতিক সময়ে সাদিক তার “Die Welt des Islams (1991)” নামক অত্যন্ত সাহসিক প্রবন্ধে সালমান রুশদিকে যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

-(চলবে)



(অনুবাদকের কৈফিয়তঃ আমি কখনও ভাবতে পারিনি যে একটা ৪০০ পাতার বই বাংলায় অনুবাদ করে ফেলবো। কিন্তু বর্তমানে আমার মনে হচ্ছে এই বইটা বাংলায় অনুবাদিত হওয়া উচিত। উগ্রপন্থীরাও অনেক সময় হানাহানির ভুল বুঝতে পারে, কিন্তু মডারেট দের নিয়েই মুশকিল। এরা হয়ত সমাজে ধর্ম নিয়ে সমস্যা করে না,কিন্তু কড়া প্রতিবাদও করে না। ধর্মের ব্যাপারে তো আরও অসম্ভব। এরা বাইরে মানবতার গান গায়,ভিতরে বেহেশতের মজা লোটার প্রস্তুতি নেয়। ইসলামের ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রকট। কোরান হাদিস মেনে কখনও সম্পূর্ন মানবতাবাদী বা সেক্যুলার হওয়া অসম্ভব। প্রাত্যহিক জীবনে সে প্রতিটা ক্ষেত্রে কোরান হাদিস মানছে না, তবু সে কখনও মনে করে না যে এগুলো না মানাই স্বাভাবিক। বরং সে শেষ জীবনের আশায় থাকে, কখন হজ্জ্ব করে বা একজন অমুসলিম কে মুসলিম করে তার এতদিনের অবাধ্যতার ক্ষতিপুরণ করা যায়। আর মুসলিম হিসেবে জন্ম নিয়ে সে তো খোদার গুডবুকে নাম লিখিয়েছে,সেই নাম কাটা যাওয়ার ভয় নেই যদি সে মুহম্মদ ও কোরানকে সত্য মানে, কোরানের জন্য জীবন বিলিয়ে দেয় অকাতরে। তার অবচেতন মনে গাথাঁ আছে, “লা ইলাহা ইল্লালাহা মুহম্মদুর রসুলুল্লাহ”, এই অমোঘ বাণী। কোরানে সব মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি বলা হলেও তিনি মুসলমান ছাড়া আর কোন মতাবলম্বীকে ভালবাসেন, এই কথা নেই। আজ আমরা হাহুতাস করি দেশের রাজনৈতিক অনৈক্য নিয়ে। আমরা কি ভেবে দেখেছি, কোরানই এর মূলে? যে আল্লাহ তার অনুগত ছাড়া আর কাউকে ছাড় দেবেন না আগুনে রোষ্ট করার হাত থেকে(মুহম্মদের সময়ে আরবে মনে হয় মাংস রোষ্ট করাই জনপ্রিয় ছিল), সে আল্লার অনুসারী, তা সে মৌলবাদীই হোক বা মডারেট, কিভাবে অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করবে? সবাই বইটা ধৈর্য্য ধরে পড়বেন, রেফারেন্সগুলো সময় স্বল্পতার জন্য এখন দিতে পারছি না।তবে মূল বইটা দেখলে রেফারেন্স গুলো পাবেন। অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেকস্থানে ভাবানুবাদ ব্যবহৃত হয়েছে,অর্থের পরিবর্তন ঘটে থাকলে আমাকে জানাবেন, আমি সংশোধন করে নেব।

মূল বইটির ডাউনলোড লিংকঃ  http://www.mediafire.com/?emuzmttnnwn )

0 Shares

রুশদী এর ব্লগ   ৮৪ বার পঠিত