একজন নির্বাসিত

পুরুষতন্ত্র গড়ে উঠার ইতিহাস

যৌনতা সম্পকে প্রথম বুঝতে পারি রসময় গুপ্তের চটি থেকে। আমার পাড়ার একমাত্র জামাত ইসলামের একমাত্র ঢ্যাঙ্গা পোলা ছিলো দুনিয়ার ফাউল। তারে সবাই খারাপ পোলা হিসেবে গন্য করতো। তার খারাপ বিশেষনের পেছনে যুক্তি ও উদাহরনের অভাব নাই। তো হুট করে একদিন সন্ধ্যার পর থেকে আমাদের কাছে সে হয়ে উঠলো ‘নায়ক’ কারণটা কি? কারণ হলো সে নিউজপ্রিন্টে ছাপানো, অসংখ্য  ভুলেভরা বানানের একটি ম্যাগাজিন দিলো। সেই ম্যাগাজিনে অদ্ভুদ ধরনের গল্প ছিলো। যা পড়লে শরীরের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া  ‍শুরু হয়। পাশের বাড়ির মেয়েটির প্রতি যে আজন্ম প্লেটোনিক লাভ তা রাতারিত ফ্রয়ডিয় ভাব ধারায় খাবি খায়। নিশ্বাস ঘন হয়ে আসে। লেখকের নাম রসময় গুপ্ত। যৌনতা বিষয়ক আমার প্রথম ক্লাসের মাস্টার ছিলো সেই জামাতের পোলাটা আর প্রথম টেক্সট  ’বুকের জ্বালা নিভায় দে’।

যারা আজকের ইন্টারনেট কম্পিউটারের যুগে বড় হয়নি তাদের প্রায় সবাই, দুই একজন ব্যতিক্রম ছাড়া যৌনতার হাতেখড়ি রসময়গুপ্ত আর পাড়ার বখে যাওয়া ছেলেটার কাছ থেকে। যেহেতু আমি মেয়ে নই পুরুষ সে কারণে মেয়েদের সম্পর্কেও একটি গড়পতড়ায় আন্দাজ মার্কা বক্তব্য হলো, ছেলেদের মত মেয়েদেরও এ বিষয়ে স্কুলিং প্রায় কাছাকাছি।

কিন্তু নারী পুরুষের সম্পর্কের অতি  গুরুত্বপূর্ণ এ সম্পর্কটি নিয়ে সব দেশের সব সমাজ যেভাবে রক্ষণশীল তাতে মনে হতেই পারে বিষয়টি অতিব ‘পবিত্র’ ‘মহান’ ধরনের কিছু। এ কারণে নারী ও পুরষের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কটিকে জটিল করেছে তার সমাজ ব্যবস্থার নানাবিধ অথনৈতিক সম্পর্কের মতই। আর তার অভিঘাতের বড় অংশের স্বীকার হয়েছেন নারীরা।

এ জন্যই যৌনতাকে ঘিরে যত গালি এবং আক্রমন তা নারীকে ঘিরে। নারী ‘বেশ্যা’ হলেও পুরুষের ক্ষেত্রে আমরা তেমন কিছু রাখি নাই। আর কূলটা, কলঙ্কিনী সহ এরকম অসংখ্য শব্দ পাওয়া যাবে। ভাবটা এমন যেনো যৌন সম্পকে পুরুষ চালক শক্তির আসনে থাকে। অত্যন্ত বাজে কথা। আপাত দৃষ্টিতে তা মনে হলেও বাস্তবে তা নয়।

আমাদের দেশে বিবাহ বর্হিভূত যৌন সম্পক গর্হিত অপরাধ। প্রায় সব ধর্মেই বিষয়টিকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। অথচ নানান কারণে একটি ছেলে ত্রিশের আগে বিয়ে করার মত পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে না। অথচ তার শরীর তৈরী হয় আরো দশ বারো বছর আগে থেকে। ফলে এই সময়টি সে নানান ধরনের চিপাগলি ব্যবহার করে আর বড় অংশ হতাশাগ্রস্ত হয়। তৈরী হয় নানান কিসিমের ফ্যান্টাসি।  যৌনতা বিষয়ক তার যে ফ্যান্টাসি এবং অনুশীলন তার ফলশ্রুতিতে দেশে বাড়ছে ড্রাগস, পর্নগ্রাফী, ধর্ষন, কূপমন্ডুকতা সহ নানান বিপথগামী বিষয়।

মেয়েরা এ অবস্থা যৌন সম্পকে সময়ের বিচারে ছেলেদের থেকে এগিয়ে থাকলেও তাদের অবদমন বা বিকৃতি ছেলেদের তুলনায় কোন অংশেই কম নয়।

ঠিক পশ্চিমা আদলের লিভটুগেদার না হলেও ইরানেও মুতা বিয়ের সম্মতি দিচ্ছে আহমদিনিজাদ সরকার। আর বাংলাদেশে তখন পোলাপানগুলো ইভটিজারের খ্যাতি নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে বখাটে হয়ে। আর মেয়েগুলোর ক্ষেত্রে বিপরীত নিয়মে ভিন্ন কিছু হচ্ছে, সাভাবিক বেড়ে উঠা হচ্ছে বাধাগ্রস্ত।

এখন নারীতো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে, শরীর যার সিদ্ধান্ত তার। তার সমান বয়সী কোন পুরুষের সাথে তার অতি সাভাবিক যৌন সম্পক থাকাতো কোন দোষের নয় বরং তা স্বাস্থ্যগতভাবে অনেক প্রয়োজনীয়। কিন্তু আমাদের সমাজ তা কোনভাবেই অনুমোদন দেয় না কেন?

এ কথা মানার সময় এসেছে যে, নারীর কাছ থেকে প্রত্যাখাত হয়ে যত ছেলেরা এ সময় ও অতীতে বিগড়ে গেছে তা কিন্তু কোন ড্রাগস আমাদের সমাজকে বিগড়াতে পারেনি। এই বিগড়ে যাওয়া বা অতলে হারিয়ে যাওয়া পুরুষ ও সংখ্যায় কম নারীদের কথা সমাজ যেমন মনে রাখে না, বন্ধ বান্ধবরাও ভুলে যায়।

তবে  যে কোন নিপিড়ন সামাজিক বা অথনৈতিক তা পুরুষের চেয়েও নানান কারণে অনেকগুন বেশি আকারে ফিরে আসে নারীর উপর। আর যদি তা হয় ‘যৌন’ সম্পর্কিত তাহলে অবদমনকারী পুরুষটিও যেন তা খুবলে খাওয়ার জন্য হামলে পড়ে। ফলে যৌনতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও নারীকে তার আগেই সমাজ এমন সব বিধি নিষেধে বেধে ফেলেছে-এইসব বিধি নিষেধের সামাজিক অভিঘাত, শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার আগে তাকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। তবে সেইসব আলাপে যাবার আগে সমাজে নারীর অবস্থান এবং এই পরিণতির বিষয়গুলি সম্পকে একটা সাধারণ আলাপ বেশি জরুরী।

সমাজে নারীর অবস্থান

নারীর ওপর পুরুষের যে বিজয়বার্তা তার অস্থি মজ্জায় মূলত ব্যক্তিগত সম্পতির ভিন্নতর প্রকাশ। সমাজের অভ্যন্তরে নারী পুরুষের যৌথ শ্রমে যতখাননি উদ্বৃত্ব উ‍ৎপাদন রাখতে সক্ষম হয়েছে ততখানিই নারী পুরুষের পরাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। নারীর ওপর আজকে পুরুষের যে বিজয় এবং নারীকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিক কিছু মনে না করা, তার জন্য পুরুষকেও পাড়ি দিতে হয়েছে বহুপথ।

ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্ফীত হওয়ার প্রক্রিয়ায় নারী পরিণত হয়েছে সম্পত্তির বিন্যাসে পাল্টা আরেক অবিনিময়যোগ্য সম্পদে এবং পুরুষ তাকে বাতিল হয়ে যাওয়া মুদ্রার বেশি কিছু ধর্ত্যেবের মধ্যে আনে না।

এক ঈশ্বরের মত ব্যাক্তিগত সম্পতির যুগে একপত্নি পরিবারে জোড় বাধলেও পুরুষ তার স্বাধীনতা বহাল রেখেছে পরিবারের বাইরে গোটা সমাজটাকেই উপপত্নি, রক্ষিতা বা নিত্যনতুন ভাবধারার নামে যা বাস্তবে পুরুষের অবাধ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে আর নারীকে পরিণত করেছে সমাজের সেই নিকৃষ্ট ক্লিব হিসেবে যে কেবল হাত বদল হয় ভিন্ন ভিন্ন সময়, ভিন্ন ভিন্ন হাতে; কিশোরী থেকে যুবতীকালে আর শেষ জীবনে শিশুকালের মত অসহায় থেকে।

যে সমাজে যতখানি ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা বহাল রয়েছে সে সমাজে ততখানি পুরুষের আধিপাত্যেল কাছে নারী বশ্যতা স্বীকার করেছে। এ কারণে ‘নারী’ হলো সর্বহারার মধ্যে সর্বহারা। এ কারণে নারী মুক্তি একমাত্র শ্রেণীমুক্তি না হলে সম্ভব নয়।

ব্যক্তিগত সম্পত্তি রেখে শুধু আইনি কাঠামোর পরিবর্তন নারীকে আরও অধিক ভোগের মর্মবস্তুতে পরিণত করতে পারে, মুক্তি সম্ভব নয়।

একটি শ্রেণী বিভক্ত সমাজে শ্রেণীর মুক্তি ব্যাতিত সেই সমাজে অন্য কোন নিপিড়তের মুক্তি সম্ভব নয়। তাই আলাদা করে নারী মুক্তি বুর্জোয়ারা কখনোই করতে পারবে না।  নারী নীতি এবং সম্পত্তির ওপর সমানধিকার হলো বুর্জোয়া সমাজের ভূমি সংস্কারের মত যা আইনিভাবে সর্বহারা কৃষকদের মধ্যে বন্টন হয় যা আবার বুর্জোয়াদের কাছেই ফিরে যায় বৈধ আইনি প্রক্রিয়ায়। নারীর ওপর সম্পত্তির অধিকার তার বেশি হবার কোন কারণ নেই যতোক্ষণ খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রটাই না উপড়ে ফেলা যাচ্ছে।

0 Shares