তাসনিম খলিল

আল জাজিরার হেড টু হেডে আমার একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা হলো। মেহেদী হাসান এই শো’টির পাবলিক ফেইস হলেও এর পিছনে যে টীমটি কাজ করে তাদের কর্মনিষ্ঠা ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশ বিষয়ে তারা একটি এপিসোড করবে জানিয়ে তারা যখন প্রথম আমার সাথে যোগাযোগ করে তখন আমি আসলে বেশ স্কেপ্টিক্যাল ছিলাম কারণ শো’টির প্রযোজকদের বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ক ধারণা ছিলো একেবারেই ভাসাভাসা। অনুষ্ঠানের রেকর্ডিংয়ে যখন দেখলাম মাত্র কয়েক মাসের প্রস্তুতি দিয়ে তারা মেহেদী হাসানের হাতে এমন একটা ওয়েল-রিসার্চড স্ক্রীপ্ট তুলে দিয়েছে তখন অবাক আর মুগ্ধ হয়েছি অবশ্যই।

মূল ইভেন্টটি কিন্তু ছিলো তিন ঘন্টার মতো, সেখান থেকে এডিট করে ৪৫ মিনিটের মতো নিয়ে এই এপিসোডটি ব্রডকাস্ট করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের রেকর্ডিংয়ের সময় অক্সফোর্ড ইউনিয়নে যারা ছিলেন তারা পুরোটাই দেখেছেন, শুনেছেন।

আল জাজিরার শো’টি ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্সের জন্য, তারা সেটা মাথায় রেখে এডিট করবে তাই স্বাভাবিক। তবে আমার মনে হয়েছে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গাই কেটে বাদ দিয়েছে। গওহর রিজভীর সাথে আমার কিছু আলাপ তারা ব্রডকাস্ট করেনি। সেটা তাদের বিবেচনা। তবে আমি এখানে এই রেকর্ডটি রাখতে চাই — সেদিন যারা অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ছিলেন তারা এর স্বাক্ষী।

অনুষ্ঠানের ভিডিও  দেখুন এখানে:  (সৌজন্যে: Al Jazeera English) 

এক.

বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তাঁর স্মৃতিকথায় গওহর রিজভীর কথা লিখেছেন যে রিজভী জানতেন কিভাবে শেখ হাসিনা ডিজিএফআই লেলিয়ে দিয়ে বিচারপতি সিনহাকে দেশছাড়া করেছিলেন। আবার বিচারপতি সিনহা আমাকে ইন্টারভিউ দিয়ে বলেছেন যে বাংলাদেশে প্রায় সকল এনফোর্সড ডিজএপিয়ারয়েন্সের জন্য ডিজিএফআই দায়ী। আমি সরাসরি গওহর রিজভীকে এই রেফারেন্স দিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কোনও সন্তোষ জনক উত্তর (স্বীকার বা অস্বীকার) দেননি — তবে বলেছেন যে বিচারপতি সিনহার স্মৃতিকথা এবং সিনহার সাথে আমার ইন্টারভিউ দুটিই তিনি পড়েছেন।

দুই.

বিচারপতি সিনহা আমাকে ইন্টারভিউ দিয়ে দাবী করেছিলেন যে শেখ হাসিনা হেফাজতে ইসলামকে টাকা দিয়ে ঠান্ডা রাখেন। হেফাজতের আমীর আহমদ শফী নিজেও বলেছেন যে আওয়ামী লীগের লোকজন তাদের মোটা অংকের সাহায্য দেয়। আমি এই দুটি রেফারেন্স দিয়ে কমেন্ট করেছিলাম। আমার কমেন্টের একটা অংশ (“কওমী জননী”) রেখে বাকিটা কেটে দেওয়া হয়েছে। আমার এই কমেন্টের সূত্র ধরে মেহেদী হাসান গওহর রিজভীকে প্রশ্ন করেন যে “শেখ হাসিনা কি হেফাজতে ইসলামকে টাকা দেন”? রিজভী এই প্রশ্নটির উত্তরও নিজের প্রশ্ন দিয়ে দেন — মেহেদী হাসানকে বলেন “আপনাকে কেউ এরকম প্রশ্ন করলে কি করতেন?” মেহেদী তখন উত্তর দেন “ওহ! এটাতো খুবই সোজা। আমি বলবো না আমি দেই না…” বলাই বাহুল্য, এই পর্বেও দর্শকরা উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করেন। এই অংশটিও ব্রডকাস্টে বাদ গেছে।

আল জাজিরার হেড টু হেডে এই এপিসোডের টাইটেল ছিল: “বাংলাদেশ কি একটি এক-দলীয় রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে?” এর উত্তরটাওতো আমরা সবাই জানি। বাংলাদেশে এখন দল (আওয়ামী লীগ) কোথায় শেষ হয় আর রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) কোথায় শুরু হয় তারতো আসলে কোনও ঠিক নেই। এর নমুনা বা প্রমাণতো আমরা দেখলাম চাক্ষুষ। হেড টু হেডে শেখ হাসিনার উপদেষ্টা গওহর রিজভী কোথায় শেষ হয়েছেন আর “বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত” সৈয়দা মুনা তাসনিম কোথায় শুরু হয়েছেন তারতো কোনও লাইন ছিলোনা — দুইজনই লকলকিয়ে শেখ হাসিনার বন্দনা করেছেন।

সৈয়দা মুনা যে আমাকে ব্যাক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন তাতে আমি একটুও অবাক হইনি। আমি কেন, কবে দেশ ছেড়েছিলাম সেটা তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তারপরও নির্লজ্জভাবে মিথ্যাচার করেছেন অন ক্যামেরা। আমি তার কাছ থেকে ঠিক এই আচরণটিই এক্সপেক্ট করছিলাম। সেদিন যারা অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ছিলেন তারা স্বাক্ষী যে এরপরেও আমি তাঁকে পূর্ণ সম্মান দেখিয়ে কথা বলেছি, এক্সেলেন্সি বলেই সম্বোধন করেছি পুরোটা সময়। সৈয়দা মুনা রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধি, তাঁর সাথে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মতো জায়গায় নোংরা বাদানুবাদে লিপ্ত হওয়াটা আমার সমীচীন মনে হয়নি।

আওয়ামী সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফফার চৌধুরী সারাজীবন লন্ডনে বসে যদি ঢাকায় কলাম লিখতে পারেন বা আওয়ামী মুখপাত্র সজীব ওয়াজেদ জয় যদি ডিসি/ভার্জিনিয়াতে বসে বাংলাদেশ নিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিতে পারেন, টুইট করতে পারেন বা দশকের পর দশক ব্রিটেনে থেকে ব্রিটিশ নাগরিক শেখ রেহানা যদি আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হতে পারেন তাইলে আমি কেন সুইডেন থেকে বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলতে পারবোনা?

বাংলাদেশের মানুষেরতো দুর্ভাগ্য আর লজ্জা যে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা আলাপ করতে যেতে হয় কাতারী আমীরের স্পন্সরড চ্যানেলে। এই যে এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ সাংবাদিক মেহেদী হাসানের প্রশংসা করছে আর বাংলাদেশের সাংবাদিকদের গালাগালি করছে এই লজ্জাটা কার আসলে?

শেষ করি ড. গওহর রিজভীকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়ে। অক্সফোর্ড ইউনিয়নে তিনি যেভাবে প্রায় তিন ঘন্টা হাসির পাত্র হয়েছেন তাতে আমার আসলে খারাপই লেগেছে। এমনটি হবে তাতো জানাই ছিলো। তারপরও তিনি যে অক্সফোর্ডে গিয়ে মেহেদী হাসানের মুখোমুখি হয়েছেন সেটা তাঁর সাহসিকতারই পরিচয়। শেখ হাসিনাতো কখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে লাইভ ইন্টারভিউ দেবেননা — সেই সাহসতো শেখ হাসিনার নাই।

0 Shares
তাসনিম খলিল এর ব্লগ   ৩৭ বার পঠিত