গিয়াসুদ্দিন

nas
প্রাক ইসলাম যুগে আরবে নারী আজকের মুসলিমদের তুলনায় অনেক বেশী স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতো এবং অনেক বেশী সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলো। এ বিষয়টি পৃথক একটি অধ্যায়ে একটু বিশদে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে শুধু এ প্রসঙ্গে এ টুকু বলার যে মুসলিমদের ধারণা ও বিশ্বাস ঠিক এর বিপরীত। শুধু মুসলিমদের মধ্যেই নয়, একই ধারণা ও বিশ্বাস বিদ্যমান রয়েছে অমুসলিমদের মধ্যেও। তাঁরা মনে করেন যে মুহাম্মদ যখন আরবে জন্মগ্রহণ করেন তখন নারীদের অবস্থা ছিলো খুবই সঙ্গীন, ক্রীতদাসীর মতো তাদের জীবন যাপন করতে হতো, এমনকী তাদের জন্মের পর মেরে ফেলাও হতো। মুহাম্মদ সেই অবস্থা থেকে নারীকে উদ্ধার করেন এবং তাদের পুরুষের সমান অধিকার ও স্বাধীনতা দেন।

মুসলিম সমাজ তো মুহাম্মদকেই নারীর একমাত্র নারীর ত্রাণকর্তা ও মুক্তিদাতা বলে মানেন। মুসলিমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে মুহাম্মদই বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নারীবাদী ব্যক্তিত্ব। নারীর প্রতি কতো দরদ ছিল এবং সারাজীবন কীভাবে নারীর স্বাধীনতা, মুক্তি ও কল্যাণের জন্যে মুহাম্মদ সংগ্রাম করে গেছেন তার বিবরণ দিতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের একজন খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবি ও ইসলামি পণ্ডিত লিখেছেন,

“নিখিল জগতের দূর্গত রমণীকুলের অচিন্ত্যণীয় ঐতিহাসিক ত্রাণকারী মানব, যিনি তাঁর সমস্ত শক্তির অর্ধেকটা নিযুক্ত করেছিলেন সারা সৃষ্টিজগতের কল্যাণের জন্য, দুর্গত মানুষের জন্য। বাকি অর্ধেকটা নিয়োগ করেছিলেন শুধুমাত্র মায়ের জাতি, অবহেলিত, নির্যাতিত নারী সম্প্রদায়ের জন্য …।”
(দ্রঃ মহানবী, ড. ওসমান গণি, পৃ.-৩৯০)

মুহাম্মদ সম্পর্কে এরূপ মূল্যায়ন ও দাবী সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন। বরং সত্যিটা হলো এই যে, আরব বেদুইন রমণীরা সেসময় যেসব স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতো সেগুলি সবই মুহাম্মদ হরণ করে নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টান্ত হিসেবে সর্বাগ্রে হিজাবের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রাক ইসলাম যুগে আরবে ‘হিজাব’- এর প্রচলন ছিল না। ‘হিজাব’ হলো নারী দাসত্বের একটি ঘৃণ্য প্রতীক, যা মুহাম্মদ আরোপ করেন মুসলিম নারীর ওপর।

প্রাক ইসলাম যুগে আরব নারী প্রায় পুরুষের মতোই স্বাধীনভাবে জীবন-যাপন করতো। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতো এবং যুদ্ধেও অংশ নিতো। মুহাম্মদ নারীর সেই স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করে তাদের গৃহবন্দী ও পর্দার ভিতরে বন্দী করে ফেলেন। নারীর পর্দানসীনতাই ইসলামের পরিভাষায় ‘হিজাব’। মুহাম্মদ আল্লাহর দোহাই দিয়ে ‘হিজাব’ প্রসঙ্গে বলেছেন,

“…এবং বিশ্বাসিনী নারীদিগকে বলো, তারা যেনো স্ব স্ব দৃষ্টি সকলকে বদ্ধ করে এবং কণ্ঠদেশে স্বীয় বস্ত্রাঞ্চল ঝুলাইয়া রাখে।”
(কোরান, ২৪:৩১)

কোরানে এ প্রসঙ্গে আরও আদেশনামা রয়েছে। সেটা হলো-

“হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে এবং মুমিনদের নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ তাদের নিজেদের উপরে টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।”
(কোরান ৩৩:৫৯)

নারী কী করবে-কী করবে না, কী পরবে-কী পরবে না ও কীভাবে পরবে, কীভাবে চলবে- কীভাবে চলবে না, কীভাবে কথা বলবে-কীভাবে কথা বলবে না, এসব নানাবিধ নিয়ম-কানুন বা বিধান যা সমাজে চালু আছে তা সবই পুরুষেরদের দ্বারা রচিত। নারীকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ জীবন যাপন করতে হয় সেই বিধান মেনেই। এসব বিধানের সামান্য উল্লঙ্ঘন করলে বা এদিক ওদিক করলে নারীকে পেতে হয় শাস্তি ও নানারূপ ভর্ৎসনা।

অসতী, কুল্টা, বেহায়া, চরিত্রহীন, বেশ্যা এরূপ পুরুষরচিত কুৎসিত ভাষা ও নোংরা গালাগাল নারীদের শুনতে হয়। পাছে নারী এসবকে অগ্রাহ্য করে তারজন্যে তাদের তথাকথিত পরকালের শাস্তির ভয়ও দেখানো হয়। নারীকে পুরুষ শিখিয়েছে, তার প্রধান ধর্ম হলো পতিসেবা করা। নারী যদি পতিসেবায় সামান্য ত্রুটি করে তবে মৃত্যুর পর তার জন্যে রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি, একথা তাকে পুরুষ বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মের নামে, সমাজের নামে।

নারীর ‘মুক্তিদাতা’ মুহাম্মদ পুরুষ রচিত সেই কুৎসিত বিধানগুলি শুধু অনুমোদনই করেন নি, আপন ভঙ্গিমায় সেগুলিকে আরো নবরূপে এবং আরো কঠোর ও নিবিড়ভাবে আল্লাহর নামে আইনরূপে প্রবর্তন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন অবলীলায় যে, পতিসেবায় সামান্য ত্রুটি হলে পরকালে নারীকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে যা তিনি নিজের চোখে দেখে এসেছেন আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে গিয়ে। কী দেখেছেন তা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন,

“আমি তো জান্নাত দেখেছিলাম এবং একগুচ্ছ আঙ্গুরের প্রতি হাত বাড়িয়েছিলাম, আমি তা পেয়ে গেলে, দুনিয়া কায়েম থাকা পর্যন্ত তোমরা তা খেতে পারতে। তারপর আমি জাহান্নাম দেখলাম, আজকের মতো ভয়াবহ দৃশ্য আর কখনও দেখিনি। আর আমি দেখলাম, জাহান্নামের অধিবাসীরা অধিকাংশই স্ত্রীলোক। লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ; কী কারণে? তিনি বললেন, তাদের কুফরীর কারণে। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারা কী আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে? তিনি উত্তর দিলেন, স্বামীর অবাধ্য থেকে স্বামীর এহসান অস্বীকার করেছে।”
(বোখারী শরিফ, ১ম-৭ম খণ্ডে একত্রে, মল্লিক ব্রাদার্স, কলকাতা, হাদিস নং ৩৬৪)

নারীকে কীভাবে পতিসেবা করতে হবে তার খুঁটিনাটি বিবরণ দিয়ে গেছেন মুহাম্মদ। তিনি যা বলেছেন তার মধ্যে রয়েছে এ হাদিসটি,

“হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন – স্বামী যদি স্ত্রীকে বিছানার প্রতি আহ্বান করে এবং তাতে স্ত্রী অসম্মতি প্রকাশ করে, যদ্দরুণ স্বামী অসন্তুষ্টির সহিত রাত্রি যাপন করে তবে সেই স্ত্রীর রাত্রি এই অবস্থায় অতিবাহিত হয় যে, ফিরিস্তাগণ রাত ভোর পর্যন্ত তার প্রতি লানত (অভিশাপ) বর্ষণ করে।”
(সূত্র – ঐ, হাদিস নং ১১১৫)

এ হাদিস অনুযায়ী এটা স্পষ্ট হয় যে, পতির যৌনকামনা ও যৌনক্ষুধা পূরণে পত্নীর কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি বাধা হতে পারে না। পতির যৌন আবেদনে সাড়া দেওয়াই যে নারীর প্রাথমিক ও প্রধান কর্তব্য সেটা মুহাম্মদ স্পষ্ট করে দিয়েছেন আরও একটি হাদিসে। হাদিসটি হলো-

“যদি কোন ব্যক্তি সঙ্গম করার ইচ্ছায় স্ত্রীকে আহ্বান করে তবে সে যেন তৎক্ষণাৎ তার নিকট উপস্থিত হয় যদি সে উনানের উপর রন্ধনের কাজে লিপ্তও থাকে।”
(মুসলিম শরীফ )

‘নারীর ধর্ম’ নামে নারীর প্রতি এসব নির্দেশ হলো নারী দাসত্বের এক একটি ঘৃণ্য বিধান। নারী দাসত্বের অনেক বিধান আছে যা নারীকে সর্বদা স্বীয় অঙ্গে বহন করতে হয়। যেমন হিন্দু নারীর হাতের শাখা, সিঁথির সিঁদুর, পতির পদবী ধারণ ইত্যাদি। তবে স্বীয় অঙ্গে বহন করা সবচেয়ে ঘৃণ্য দৃষ্টান্তটি হলো ‘হিজাব’। নারী দাসত্বের এই ঘৃণ্য ও অসভ্যতম প্রতীকটি বহন করতে হয় কেবল মুসলিম নারীদেরকেই।

হিজাবের পক্ষে মুসলিম পণ্ডিতগণ অনেক যুক্তি (পড়ুন অপযুক্তি বা কুযুক্তি) দেখালেও মুসলিম নারীরা কিন্তু হিজাবকে তাদের স্বাধীনতার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ বলেই মনে করেন। ইসলামি রাষ্ট্রসমূহে মুসলিম নারীরা সবাই বোরখা পরে। এটা এ জন্যে নয় যে, তারা সকলেই বোরখা পরিধান করাকে সমর্থন করেন। খুব কম মেয়েই আছেন যারা বোরখা পরার আল্লাহর নির্দেশকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেন এবং স্বেচ্ছায় বোরখা পরেন। অধিকাংশ নারীই ভয়ে বোরখা পরেন যেহেতু সেসব দেশের আইনে বোরখা পরা বাধ্যতামূলক এবং বোরখা না পরে রাস্তায় বের হওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যেসব দেশে মুসলিম দেশে সাংবিধানিক আইনে বোরখা পরা বাধ্যতামূলক নয় এবং বোরখা না পরলে শাস্তির মুখে পরতে হয় না সেখানে ৮০-৯০% মুসলিম নারীই বোরখা বর্জন করেছে। ভারতের সংবিধানেও মুসলিম নারীদের বোরখা পরা বাধ্যতামূলক নয় বলে ভারতের মুসলিম নারীরাও ৮০-৯০ শতাংশই বোরখা পরেন না। এটাই সত্যি যে মুসলিম নারীরা বোরখা বা হিজাব পরতে চান না।

না, এটা আমার মনগড়া কথা নয়। ইতিহাসে এর অনেক প্রমাণ আছে। মুসলিম নারীরা যুগে যুগে দেশে দেশে হিজাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। সে সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। হিজাব সম্পর্কে মুসলিম নারীদের মনোভাব জানবার জন্যে সে ইতিহাস আমাদের জানা আবশ্যক। ইরানের আমেরিকা প্রবাসী একজন খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ও লেখক সেই ইতিহাস সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করেছেন। তিনি লিখেছেন,

“In the struggle for the liberation for the Muslim woman the veil has become a symbol of her servitude. Thus in 1923 the president of the Egyptian Feminst Union Mr. Houda Cha’araoui, and her colleagues difiantly threw their veils into the sea. Similarly in 1927 there was a campaign of “de-hijabization” in communist Turkestan. Not less than 87,000 Uzbek women publicly repudiated their “black cowls”, though not less than 300 of their sisters had been killed by the male heads of the Muslim families for betraying Islam. In 1928, at the independence celebrations, the Shah of Afghanistan ordered his wife to “unveil” herself in public. Following the public scandal, the shah was obliged to backtrack and cancel his projects for the emancipation of women. He himself was obliged to abdicate. In 1936 Reza Shah of Iran forbade the tchador by a special decree. Obviously the people were not ready to break with tradition and so after mass protests in 1941 he also had to retreat and abrogate law.
(Why I am not a Muslim, Ibn Warraq, p. 315, Prometheus Books, New York)

(মুসলিম নারীদের মুক্তির সংগ্রামে হিজাব একটি দাসত্বের প্রতীক হয়ে উঠে। তাই ১৯২৩ সালে ইজিপ্টের নারীবাদী সঙ্ঘের সভানেত্রী ও তাঁর সহকর্মীরা সমুদ্রের জলে হিজাব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে ১৯২৭ সালে কম্যুনিস্ট শাসিত তুর্কিস্তানে হিজাব বিরোধী প্রচারণা ও আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল। সেসময় কমপক্ষে ৮৭০০০ (সাতাশি হাজার) মুসলিম নারী একযোগে তাদের ‘কালো মস্তকাবরণ’ প্রকাশ্যেই বর্জন করেছিলেন। যদিও তার জন্যে কম পক্ষে ৩০০ জন মুসলিম নারীকে ইসলাম বর্জন করার ‘অপরাধে’ তাদের পরিবারে পুরুষ অভিভাবকরা হত্যা করেছিল। ১৯২৮ সালে আফগানিস্তানের শাহ তাঁর পত্নীকে প্রকাশ্যে স্বাধীনতা উদযাপনের একটি অনুষ্ঠানে ‘হিজাব’ বর্জন করতে বলেছিলেন। পরে প্রবল লোক নিন্দার কারণে তিনি পিছু হটতে বাধ্য হন এবং নারীমুক্তির কর্মসূচি বাতিল করেন। ১৯৩৬ সালে ইরানের শাহ চাদর (হিজাব) বর্জনের জন্যে একটি বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করেন। কিন্তু ইরানের জনগণ সে ঐতিহ্য বর্জনের জন্যে প্রস্তুত ছিল না, ফলে মানুষের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৯৪১ সালে শাহ পিছু হটতে বাধ্য হোন এবং আইনটি (অধ্যাদেশটি) প্রত্যাহার করেন।

‘হিজাব’ শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ ‘হাজাবা’ থেকে। ‘হাজাবা’র মানে হলো আড়াল করা বা গোপন করা। শরিয়তি আইনে হিযাবের উপর একটি অধ্যায় বিদ্যমান। হিজাব-আইনটি থেকে বোঝা যায় যে, প্রাক ইসলাম যুগে আরবে নারী ও পুরুষ স্বচ্ছন্দে একসঙ্গে চলাফেরা ও মেলামেশা করতো। আধুনিক সমাজেও মুসলিম মেয়েদের কাছে হিজাবের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই তা চারদিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়, এবং হয়তো কোনোকালেই ছিলো না। আধুনিক মুসলিম সমাজ যেহেতু হিজাব পরতে সম্মত নয়, তাই ইসলামি আইনের সংস্কারপন্থীরা অনেকেই হিজাবকে সংশোধিতরূপে উপস্থাপিত করার চেষ্টায় মগ্ন রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ বলেন যে, হিজাব শুধু মুহাম্মদের পত্নীদের জন্যে প্রযোয্য, সমস্ত মুসলিম নারীদের জন্যে নয়।

আবার হিজাবকে আধুনিক সমাজের মুসলিম নারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে সংস্কারপন্থীরা হিজাবের আকার, আকৃতি ও আয়তন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত ও মাসালা ব্যক্ত করেছেন। তাদের একটা অভিমত হলো, নারীর কিয়দংশ চোখ, নাক, হাত ও পায়ের অগ্রভাগ খোলা রেখে শরীরের বাকি অংশ কাপড় দিয়ে ঢাকতে হবে। কিন্তু উপরে উল্লেখিত কোরানের আয়াত দু’টি সংস্কারপন্থীদের এই মতকে নস্যাৎ করে দেয়। সংস্কারপন্থীদের অভিমত ও বাখ্যা-বিশ্লেষণ কোরান দ্বারা সমর্থিত ও স্বীকৃত না হলেও তার প্রভাব পড়েছে মুসলিম সমাজে। তৈরি হয়েছে হিজাবের খুঁটিনাটি নিয়ে মতভেদ। ফলে হিজাবের ভিন্ন পোশাক ও ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদের প্রচলন দেখা যায় বিভিন্ন জাতি ও দেশে। বাংলায় হিজাব বলতে বোঝানো হয় পর্দা, বোরখা, চাদর ইত্যাদি। ইংরেজিতে ব্যবহার করা হয় Veil, Cloak, Outer Garment, Shawl ইত্যাদি শব্দ। মুসলিম দেশগুলিতে হিজাবকে কী বলে সে প্রসঙ্গে ইবন ওয়ারাক তাঁর উক্ত গ্রন্থে একটি বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন-

“In Morocco, Algeria, and Tunisia we find haik, safsari, akhnif, and adjar. In Egypt, Israel, Syria, Iraq, and among the Bedouins, we find abaya, tarna, izar, milhafa, khabara, chambar, niquab, litham, and bourqou; in Iran, bourda, tchadar, pitcha, and rouband; in Turkey, yatchmek, yalek, harmaniya, and entari; in India and Pakistan, burka.”

নারী গৃহবন্দী:

বিভিন্ন দেশে এবং একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিজাবের পোশাকেও বিভিন্নতা দেখা যায়। হিজাব শব্দের মানে হলো কোনো বস্তুকে লুকানো বা আড়াল করা। কিন্তু নারীকে এক টুকরো কাপড়ে সম্পূর্ণ লুকানো সম্ভব নয়। তাই হিজাবের মধ্যেই রয়েছে কিছু কিছু উপ-ধারা, যাতে নারীকে সম্পূর্ণই লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। কোরানে দু’টি আয়াত আছে যেখানে নারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যাতে তারা ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। আয়াতদ্বয়ের একটি হলো-

“…এবং তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে; প্রাচীন জাহিলী যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা নামায কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সঃ)-এর প্রতি অনুগত থাকবে; হে নবীর পরিবার। আল্লাহতো চান তোমাদের হতে শুধু অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।”
(কোরান, ৩৩:৩৩)

আর একটি আয়াত আছে যাতে নারীদের পরপুরুষের সাথে কার্যতঃ কথা বলতে বারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষদের নিকট থেকে নারীকে পৃথক রাখা বা লুকিয়ে রাখার জন্যেই এই নির্দেশ। সেই আয়াতটি হলো-

“হে নবী পত্নীরা! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তবে পর-পুরুষের সঙ্গে কোমলকণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়, এবং তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে কথা বলবে।”
(কোরান, ৩৩:৩২)

অজুহাত অন্বেষণকারীরা বলতে পারেন যে, এ আয়াতটি তো নবী পত্নীদের উদ্দেশ্যে এসেছে। তাদের জবাব দিয়েছেন মুহাম্মদ আয়াতটির উদ্দেশ্য বাখ্যা করার সময়। সেটা এরকম-

“আল্লাহ তা’আলা স্বীয় প্রিয় নবী (সঃ)-এর সহধর্মিণীদেরকে আদব-কায়দা ও ভদ্রতা শিক্ষা দিচ্ছেন। সমস্ত স্ত্রীলোক তাদের অধীনস্থ। সুতরাং এই নির্দেশাবলী সমস্ত মুসলিম নারীর জন্যেই প্রযোজ্য।”
(দ্রঃ ইবনে কাথিরের তফসির, পঞ্চদশ খণ্ড, পৃ.৮৭৩,সূত্রঃ http://IslamiBoi.wordpress.com)

ইসলামি পণ্ডিত প্রখ্যাত তফসিরকার ইবনে কাথিরের এই বিবরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে হিজাবের বিধান সমস্ত মুসলিম নারীদের জন্যেই। হিজাবের উদ্দেশ্য কী তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্যেই এ আয়াত দু’টিতে নারীকে একেবারে গৃহবন্দী করা হয়েছে এবং পুরুষদের থেকে পৃথক করে দেওয়া হয়েছে। এমনকী ঘরের ভিতরেও নারীকে তার স্বাভাবিক, স্বাধীন ও স্বাচ্ছন্দ জীবন-যাপনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। স্বগৃহেও (অবশ্য নারীর নিজের সত্যিকারের গৃহ বলতে কিছু নেই) নারীকে কাপড়ে অবগুণ্ঠিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারীকে কেবল অবগুণ্ঠিত হওয়া থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে কেবল পিতা, পুত্র, ভাইপো, ভাগ্নে, এবং অন্য নারীদের সামনে। বাকি সকলের সামনে নারীকে পর্দায় অবগুণ্ঠিত থাকতে হবে। কোরান এ প্রসঙ্গে বলছে-

“নবী-পত্নিগণের জন্য তাদের পিতৃগণ, পুত্রগণ, ভ্রাতৃগণ, ভ্রাতুষ্পুত্রগণ, ভগ্নিপুত্রগণ, সেবিকাগণ এবং তাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীগণের ব্যাপারে পর্দা পালন না করা অপরাধ নয়।”
(কোরান, ৩৩:৩৫)

যা নবীপত্নীদের জন্যে আদেশ তা যেসকল মুসলিম নারীর জন্যেই প্রযোয্য, এ কথা যে মুহাম্মদ বলেছেন তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলিম নারীকে অবগুণ্ঠনের মধ্যে থাকতে হবে ঘরের বাইরে এবং ঘরের মধ্যেও। এই হলো হিজাবের মূল নির্দেশ। পুরুষের কারণে যাতে নারীর হিজাববন্দী জীবনের শৃঙ্খলায় (শিকলে) কোনো ব্যত্যয় না ঘটে তার জন্যে পুরুষের উপরেও হিজাবের একটি ধারা আরোপ করা হয়েছে। মুসলমান পুরুষদের বলা হয়েছে পরের ঘরে ঢুকে পরনারীদের কাছে কিছু না চাইতে। অবশ্য এক্ষেত্রেও নবীপত্নীদের দোহাই দেওয়া হয়েছে। আল্লাহকে দিয়ে মুহাম্মদ তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বলিয়েছেন,

“হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা না করে ভোজনের জন্য নবীগৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমাদের ডাকলে- তোমরা প্রবেশ করো, এবং আহার শেষ হলে চলে যেয়ো। তোমরা কথা-বার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না, কারণ এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক; সে তোমাকে উঠে যাবার জন্য বলতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচ করে না। তোমরা তার পত্নীদের নিকট হতে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল হতে চাইবে, এ বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র। তোমাদের কারও পক্ষে রসুলকে কষ্ট দেওয়া অথবা তার মৃত্যুর পর তার পত্নীদের বিবাহ করা কখনও সঙ্গত নয়।”
(কোরান, ৩৩:৫৩)

নিজের পত্নীদের মানুষের বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে গৃহবন্দী ও কাপড়বন্দী করে সম্পূর্ণ তালুবন্দী করতে মুহাম্মদ তাঁর শিষ্যদেরও তাঁর গৃহে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে দ্বিধা করেন নি। যা যা তাঁর পত্নীদের উপর আরোপ করেছেন সেগুলি পরে সমস্ত মুসলিম নারীদের উপরেও আরোপ করেছেন। এভাবে হিজাবের নামে নারীকে ঘরে-বাইরে সর্বত্রই সম্পূর্ণ বন্দী, অবরুদ্ধ, সম্পূর্ণ পরাধীন ও শৃঙ্খলিত করা হয়েছে। আর এসবই করা হয়েছে আল্লাহর ওহির দোহাই দিয়ে। প্রত্যেকটি ওহি বা আয়াতের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট (তফসির বা শানে নুযুল) রয়েছে যা পাওয়া যায় হাদিসে ও কোরানের তফসিরে। অবশ্য হাদিস ও তফসির নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতও রয়েছে। হিজাবের প্রেক্ষাপট নিয়েও মতভেদ রয়েছে।

হিজাবের প্রেক্ষাপট নিয়ে যে কথাগুলি শোনা যায় তার মধ্যে একটি এ রকম-

দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুক যিনি ছিলেন মুহাম্মদের অতিঘনিষ্ঠ সাহাবী এবং শ্বশুর মশাই, একদিন মুহাম্মদকে বলেন তাঁর (মুহাম্মদের) ঘরে যেসব মুসলমানরা ঢোকেন তাদের মধ্যে মন্দ চরিত্রের লোকও থাকতে পারে, তাদের হাত থেকে নবী-পত্নীদের মান-মর্যাদা রক্ষা করার স্বার্থে তিনি কেনো তাঁদের (নবী-পত্নীদের) আড়ালে থাকার নির্দেশ প্রদান করছেন না। তারপরই কোরানে ২৪:৩১ নং আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি মত হলো- একদিন মুহাম্মদের কনিষ্ঠতম ও প্রিয়তম পত্নী আয়েশার সঙ্গে ওমর ফারুকের আকষ্মিকভাবে দৈহিক সংস্পর্শ ঘটে এবং তারজন্যে তিনি ভীষণ লজ্জিত ও বিব্রত বোধ করেন। তারপরেই তিনি মুহাম্মদকে বলেন কেনো তিনি তাঁর পত্নীদের আড়ালে থাকার নির্দেশ প্রদান করছেন না। এর প্রেক্ষাপটেই নাকী হিজাব সংক্রান্ত ওহিগুলো অবতীর্ণ হয়।

হিজাবের আদেশ (তথাকথিত ওহি বা প্রত্যাদেশ) মুসলিম নারীদের ওপর চাপানো হয় চতুর্থ হিজরিতে (৬২৫ খ্রিস্টাব্দে) অর্থাৎ মুহাম্মদের মদিনায় হিযরত করার চতুর্থ বছরে। মুহাম্মদ ৬১০ খ্রিস্টাব্দে দাবি করেন যে নবুয়ত প্রাপ্ত হয়েছেন অর্থাৎ আল্লাহ তাঁকে নবী করে পাঠিয়েছেন। স্বভাবতঃই এ প্রশ্নটির উদ্রেক হয় যে, মন্দ চরিত্রের লোকদের হাত থেকে নবী-পত্নীদের শ্লীলতা, সতীত্ব ও মর্যাদার হেফাজত (রক্ষা) করার জন্যে হিজাবের ওহিগুলি পাঠাতে আল্লাহ এতো বিলম্ব করেছিল কেন? তাঁর প্রথম পত্নী খাদিজার জীবদ্দশায় হিজাবের আদেশ আল্লাহ কেন পাঠান নি? তাহলে কী এজন্যই যে, খাদিজা ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী বণিক, প্রবল প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী এবং প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহিলা? ইসলামি পণ্ডিত কিংবা মুসলিম ঐতিহাসিকদের নিকট থেকে এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না। সুতরাং এটা প্রতীয়মান হয় যে মুসলিম নারীদের ওপর হিজাব আরোপ করার অন্য আরও কোনো প্রেক্ষাপট আছে।

ইতিহাস বলে যে, মুহাম্মদই প্রথম আল্লাহর কাছ থেকে প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত হয়ে নারীদের ওপর হিজাব চাপিয়েছেন তা নয়। ইসলামের আবির্ভাবের বহুকাল আগে থেকেই পার্সিয়ানদের সমাজে হিজাবের প্রচলন ছিল। হিজাবের বিধানটি মুহাম্মদ পার্সিদের কাছ থেকেই নিয়েছিলেন। আবার নারীদের ঘরের অভ্যন্তরে আবদ্ধ থাকার কুপ্রথাটিও বাইজান্টাইন সমাজে বিদ্যমান ছিল প্রাক ইসলাম যুগে। বাইজান্টাইনের মানুষ সেটা গ্রহণ করেছিল গ্রিকদের কাছ থেকে। মদিনায় হিজরত করার পর কয়েক বছরের মধ্যে মুহাম্মদের আরবের বাইরের জগতের সংস্পর্শে আসার ব্যাপক সুযোগ ঘটে। তার আগেও অবশ্য বাণিজ্য করার সুবাদে মুহাম্মদকে বেশ কয়েকবার আরবের বাইরে যেতে হয়েছিল। এরফলে আরবের বাইরের বিভিন্ন দেশের মানুষদের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে তিনি আসেন এবং বহুক্ষেত্রেই সেগুলির প্রভাবিত হয়ে পড়েন। যেগুলির দ্বারা তিনি প্রভাবিত হন সেগুলি তিনি ইসলামিকরণ করেন আল্লাহর দোহাই দিয়ে। হিজাবের সংস্কৃতিও তিনি পার্সিয়ান ও বাইজান্টাইনদের কাছ থেকে নিয়ে তার ইসলামিকরণ করে মুসলিম সমাজে তা প্রবর্তন করেন। হিজাব বাদে আর যেসব পশ্চাদপদ প্রথা ও নিয়ম-কানুন অন্যদের কাছ থেকে নিয়ে আল্লাহর ওহির নামে মুসলমানদের ওপর চাপিয়েছিলেন তার মধ্যে নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাতও আছে। এগুলির কোনটাই ইসলামের তথা মুহাম্মদের আবিষ্কার নয়।

গিয়াসুদ্দিন এর ব্লগ   ২৪৬ বার পঠিত