বঙ্গযান

love

ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থ-

মূল শব্দটি হল ‘ভালবাসা‘। যদিও আজকাল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘ভালোবাসাই’ লেখা হয়। এই শব্দটি সাধারণ বাঙালি যত না ব্যবহার করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহার করেন কবি-সাহিত্যিকেরা। এবং সন্দেহ নেই প্রায় সবাই তা LOVE অর্থের ব্যবহার করে থাকেন। সংসদ অভিধান অনুসারে শব্দটির অর্থ হলভালবাসাপ্রণয়যুক্ত বা প্রেমযুক্ত হওয়া, অনুরাগী হওয়া; প্রীতিভাবাপন্ন হওয়া; স্নেহ করা; শ্রদ্ধ করা, ভক্তি হরা; আসক্ত বা আকৃষ্ট হওয়া; পছন্দ করা। প্রণয়, প্রেম, অনুরাগ, প্রীতি, সদ্ভাব, বন্ধুত্ব; স্নেহ; শ্রদ্ধা; ভক্তি; আসক্তি, আকর্ষণ, টান; পছন্দ। (ভালউত্তম, শুভ, হিতকর ইত্যাদি এবং বাসাবাসস্থান, কুলায়, নীড়।) বোঝা যায়, একটি মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের সম্পর্কে যে-টান, এক্ষেত্রে তার প্রায় সমস্ত বিশেষ্যভিত্তিক প্রতিশব্দ বা নতুন পরিচিতি দিয়ে গিয়েছেন বিশেষ্যভিত্তিক অভিধানকারকগণ। তবে এগুলি মুলত LOVE-ই, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কেবল তাই নয়, ভালবাসাশব্দের ( ভাল=উত্তম, বাসা=বাসস্থান) ‘উত্তম বাসস্থান অর্থটিও তাঁরা গিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভালোবাসার সব কথা ধরা পড়েনি, শব্দটির অতীত পরিচিতি তো নয়ই।

শব্দটির অতীত পরিচিতি কী ছিল, তা নিয়ে যতরকম তথ্য রয়েছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করলে সেটি এইরকম দাঁড়ায় ভা (ভা, প্রভা, প্রতিভা = উজ্জ্বলতা, দীপ্তি) রূপ অভীষ্ট দান করে যে ভাল‘ বলে। যা পেলে আপনার মুখচোখ চকচক করে ওঠে, ঝিলিক দিয়ে ওঠে, সেটি তো ভাল হবেই। এককালে কপালে লিখন (তিলকের সারি) দেখে ঠিক হত তিলকধারী সামাজিক উৎপাদনের কতটা অধিকারী। তখন কপালটাই ভাল হয়ে যায়। কিন্তু বাসা কী? ‘বাসা’ চার রকম। প্রথম তিনটিতে আমাদের শরীর বাস করে, চতুর্থটিতে আমাদের মন বাস করে। প্রথম তিনটি হল ঘর, বস্ত্র আর সুবাসিত বস্তু (খাদ্রবস্তুও হতে পারে)। আর চতুর্থ ‘বাসা’টি হল আমাদের‘বাসনা’ যেখানে আমাদের মন বাস করে। এই চার রকম‘বাসা’ই আপনার মনেমতো হলে আপনার চোখমুখ ঝকমক করে উঠতে পারে। অর্থাৎ ‘ভালবাসা’ এই রকমই হতে পারে।

তবে ‘ভালবাসা’ শব্দটি প্রধানত চতুর্ত প্রকার ‘বাসা’কেই বোঝাতেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যেখানে আমাদের মন বাস করে। এ হল আপনি ‘বাসেন’, আমি ‘বাসি‘, এই ক্রিয়াপদের বিশেষ্যরূপ। এই বাসা-বাসিটা আসলে ‘বাসনা করা’, আপনি‘বাসনা করেন’ বা বাসেন, আমি ‘বাসনা করি’ বা বাসি। অথ্যাৎ, আমাদের মন যেখানে বাসন ( বাস+অন্) করে, সেটিই আমাদের বাসনা, আমাদের মনের ‘বাসা’। এখানে আমাদের মন বিশেষ উদ্দেশ্যে একাদিক্রমে (মন-অন = মনন, কথ-অন = কথন-এর মতো) বাস-অন করতে থাকে। ‘বাসনা করি’মানে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে মানসিক বসবাস চালাতে থাকি, মন বসাই, মানসিক বাস করি, অর্থাৎ বাসি।

 

আমি ফুটবলে মানসিক বাস করি, সে রবীন্দ্রসংগীতে মানসিক বাস করে, তারা কবিতায় মানসিক বাস করে এবং লায়লা মজনুতে এবং মজনু লায়লাতে মানসিক বাস করে। এভাবে যখন আমাদের মন বিভিন্ন ‘বাসা’য় বসে, বসবাস করে, এবং তার ফলে আমরা এত খুশি হই যে, আমাদের চোখমুখ ঝকঝক করে- তখন আমরা বলি, আমি ফুটবল ভালবাসি, সে রবীন্দ্র সংগীত ভালবাসে, তারা কবিতা ভালবাসে, লায়লা মজনুকে এবং মজনু লায়লাকে ভালবাসে।
সূত্র:

কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী, বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ

 

বঙ্গযান এর ব্লগ   ৪৩ বার পঠিত