অাঞ্জু ফেরদৌসী

 

৫ টি সহজ উপায়ে বাংলাদেশের পুরুষ নারীকে এগিয়ে নিতে পারে।

 

সিমন দ্য বোভোয়ারের একটি কোট দিয়ে শুরু করি। তিনি বলেছেন,

“নিজের পুরুষত্ব নিয়ে নিরাপত্তাহীতায় ভোগা একজন পুরুষ, নারীর প্রতি সবচাইতে বেশি অহম, আক্রমনাক্তক অথবা ঘৃণাপূর্ণ ভাব প্রকাশ করে থাকে।”

হাজার হাজার বছর ধরে নারীর সামাজিক বা শারীরিক নিষ্পেষণের মূল কারণটি গুরুজি একটি বাক্যে বলে দিয়েছেন। বাংলাদেশের পুরুষদের সোশ্যাল মিডিয়া বা নিউস মিডিয়ার ফোরামে যে কোন নারীর বিষয়ক আলোচনায় নারীর প্রতি যে মধ্যযুগীয় মনোভাব ফুটে উঠে সেটা মন এবং চোখের জন্য খুব পীড়াদায়ক। ২০১৪ সালেও এদেশের পুরুষ নারীদের দেখে মধ্যযুগীয় ধ্যান ধারণায়। তারা এখনও মনে করে নারী কখনও পুরুষের সমান নয়, তাই আইন কানুনেও নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখা উচিত। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অসংখ্যবার প্রমাণিত যে, নারী-পুরুষের মধ্যে বাহ্যিক শারীরিক কিছু পার্থক্য ছাড়া অন্য কোন পার্থক্য নেই।

বিজ্ঞানের প্রমাণকে বাংলাদেশী পুরুষ আজও বৃদ্ধাঙ্গুলিয়ে দেখিয়ে বলে নারী-পুরুষ কখনো সমান হতে পারে না। তাই নারীর উত্তরাধিকারসূত্রে বাবার সম্পত্তি অর্ধেক পাওয়া জাস্টিফাইয়াবল। কিছু অবিবেচক পুরুষ তাদের অপরিণামদর্শিতা আরও একটু প্রকট করে বলে উঠে, বিভিন্ন উন্নত দেশে কেন নারীরা এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাষ্ট্র শাসক বা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই? এটা বোঝা এতো কঠিন কেন যে, হাজার হাজার বছরের পুরুষশাসিত সমাজের নারী-বিরোধীই অবকাঠামো মাত্র কয়েক দশকে শুধু নারী কেন কারো পক্ষেই ভাঙ্গা সম্ভব নয়? তারপরেও, সময়ের বিচারে বলতে হয় যে, উন্নত দেশে নারীর অগ্রগতি পুরুষদের তুলনায় ঈর্ষণীয় বটে।

সব সমস্যার মতোই নারীর সমস্যা শুধু একজন নারীর পক্ষেই প্রকৃতপক্ষে বোঝা সম্ভব। একজন পুরুষ মানুষের পক্ষে তাদের সমস্যার প্রকৃতি বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু নারীর সমস্যাকে সমাধানের লক্ষ্যে সহানুভূতিশীল পুরুষের সদিচ্ছা অপরিহার্য। কারণ সমস্যার মূলে রয়েছে পুরুষ তথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের সমাজে নারীবাদী পুরুষ খুঁজে পাওয়া দূর্লভ রত্নের মতোই কঠিন। যাদের পাওয়া যায় তাদের সিংহভাগ নারীর অধিকার বিষয়ে পুরোপুরি সৎ নয়। এরা তাদের কমফোর্টজোনের বাইরে নারীর অধিকার বিস্তৃত করতে রাজি নয়। অথচ নারীর অধিকার নিশ্চিত করে, তাকে ক্ষমতায়ন করা শুধু সমাজ নয় পুরুষের নিজের জীবনের মান বৃদ্ধিতে অতি প্রয়োজন। একটি পরিবারের পুরো দায়ভার একজন পুরুষকে করে তোলে সেই পরিবারটির একজন প্রয়োজনের ক্রীতদাস। তাতে হয়তো সে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ওপর হম্বিতম্বি করার অধিকার পায় বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার জীবনের মানের কোন হেরফের হয় না। একমাত্র নারীর ক্ষমতায়ন এই অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে।

এখানে আমি পাঁচটি উপায় বলার চেষ্টা করছি, যেভাবে বাংলাদেশের পুরুষ নারীকে ক্ষমতায়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

 

১) উত্তরাধিকার সূত্র আইনটি পরিবর্তন করা:

বাংলাদেশ কোন ইসলামিক রিপাবলিক দেশ নয়। সংবিধান অনুসারে একটি সেক্যুলার দেশ। এর আইনকানুনও একইকারণে সেক্যুলার বা সিভিল আইন অনুসরণ করে চলে। শুধুমাত্র দু’টি আইন শরিয়া আইন এই সিভিল আইনের মধ্যে আইন প্রণয়নকারী পুরুষরা ঢুকিয়ে দিয়েছে। একটি উত্তরাধিকার সূত্র এবং অন্যটি পুরুষের বহুবিবাহ সংক্রান্ত আইনটি। একটি সেক্যুলার দেশে এই দু’টি ইসলামিক আইন বহাল রাখা শুধু সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোই নয়, এটি মেয়েদের প্রতি অবিচার এবং অন্যায়। সম্পদহীনতা নারীকে মানুষিক এবং সামাজিকভাবে পঙ্গু করে তোলে। পুরুষের পাশাপাশি কাজ করবার জন্য নারীকে তৈরি করতে এই মানুষিক এবং সামাজিক পঙ্গুত্বের অবসান জরুরী। অন্যদিকটি হল, এই আইন দু’টি সাক্ষ্যবহন করে বাংলাদেশের মেয়েদের প্রতি পুরুষদের স্থায়ীভাবে নৈতিক লঙ্ঘনের ইতিহাস। যা বাংলাদেশের পুরুষদের প্রতি নারীর বিশ্বাস চিরতরে নষ্ট করে দেয়। যেহেতু পুরুষ এই আইনটি নারীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, এটা তাদেরই দায়িত্ব সংশোধন করবার।

 

২) বহুবিবাহ রোধ করা:

পুরুষের বহুবিবাহ নারীকে হীনমন্যতার মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। নিজেকে পুরুষের মতো যোগ্য ভাবার পথে এটি একটি বড় অন্তরায়। নারীর মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙ্গে দিতে এর চাইতে ভয়াবহ অস্ত্র আর কিছুই হতে পারে না। এটি রোধ করা আশু প্রয়োজন। এর জন্য পুরুষকেই দায়িত্ব নিয়ে ব্যবস্থা করতে হবে।

 

৩) ধর্মীয় অনুশাসন মেয়েদের ওপর চাপিয়ে না দেয়া:

প্রচলিত ধর্মীয় অনুশাসন নারীর ক্ষমতায়নের পথে শুধু বাধাই নয়, বরং নারীকে উল্টোপথে হাটতে পুরুষকে প্ররোচিত করে। যেটা নারী এবং পুরুষের তথা সামাজিক উন্নয়নে একটি কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অত্যন্ত সচেতনভাবে পুরুষকে লক্ষ রাখতে হবে যেন, ধর্মীয় কোন অনুশাসন নারীর উন্নয়নের পথে যাতে বাঁধা হতে না পারে। ধর্মীয় অনুশাসন মেয়েদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে, তাদের যে কোন উদ্যোগকে নষ্ট করে হাতুড়ি পিটা করে অলস, অযোগ্য ও ভোতা করে নারীকে শুধুমাত্র একটি মাংসপিণ্ড হিসেবে তৈরি করে। এছাড়াও ধর্মীয় অনুশাসন ‘নারী একজন মানুষ নয় পুরুষের আধা-প্রাণী‘ এই ধারণা একজন পুরুষের মধ্যে শিশুবয়স থেকে শিক্ষা দেয়। এটা রোধ করতে পুরুষকেই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

৪) মেয়েদের মুক্ত চলাচল নিশ্চিত করা:

সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী। মনে রাখা দরকার যে, অভিজ্ঞতা বা এক্সপোজার মানুষকে যে কোন পরিবেশের জন্য উপযুক্ত করে তোলে। নারী যে মানুষ, সে কোনো অবলা প্রাণী নয়; এই ধারণা দূর করে তাকে মেইনস্ট্রিম সমাজব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। যা বাস্তবায়নে পুরুষদেরই ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

৫) Mansplaining বন্ধ করতে হবে:

ম্যান্সপ্লানিংয়ের প্রকৃত বাংলা শব্দ আসলে নেই। থাকলেও আমার জানা নেই। যার অর্থ হচ্ছে, পুরুষ যখন বড়াই করে যে, সে নারীর নিজের জীবন বা নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নারীর চাইতে বেশি জানে। একটি সরল উদাহরণ দিই, একটি ছেলে বন্ধুকে তার একজন বান্ধবী বলল, ‘ছেলেটি এমন নোংরাভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিল, আমাকে আড্ডা থেকে চলে আসতে হলো“;  তার বন্ধুটি সাথে সাথে বলল, ‘ছেলেটি না হয় একটু তাকিয়েছে তাতে কী হয়েছে? সেতো আর বাঘ-ভাল্লুক কেউ না“। এখান ছেলেটি সাথে সাথে মেয়েটির হয়ে তার মানসিক অবস্থাটার বিচার করে ফেলল। এটাই ম্যান্সপ্লানিং। বাংলাদেশের মেয়েদের প্রতিটি পথচলায় তার কাছের পুরুষটি (বাবা, ভাই, স্বামী ) বাচ্চা মেয়ে থেকে নারী হয়ে মরবার আগ পর্যন্ত এই কাজটি সারাক্ষণ করে। পুরুষদের এটা বন্ধ করতে হবে।

পুরুষ জানেনা এই কাজটি একজন নারীকে মানসিকভাবে কতোটা ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রখ্যাত অভিনেত্রী Bette Davis কম কষ্টে বলেননি,

“When a man gives his opinion, he’s a man. When a woman gives her opinion, she’s a bitch.”

বর্তমান সমাজে যেখানে ‘মহিলা বা নারী‘ শব্দকে একটি গালি হিসেবে দেখা হয়, মেয়েদের পুরো অস্তিত্বের প্রতি পুরুষের মনোভাবটি এখানই প্রকট হয়ে উঠে। এই মনোভাব পুরুষকে তাদের নিজের প্রয়োজনে বদলাতে হবে। হাজার হাজার বছর ধরে পুরুষ এই কাজটি করেছে একান্তই কুসংস্কার, পূর্বধারণা, পক্ষপাত, একদেশদর্শীতা, অজ্ঞতা থেকে। যাতে পুরুষের কোন উপকার হয়নি। পুরুষ নিজেকে করেছে প্রয়োজনের ক্রীতদাস। একমাত্র পুরুষই পারে এই কুসংস্কার এবং অজ্ঞতা থেকে বের হয়ে এসে নারীকে এগিয়ে নিতে।