শ্রীশুভ্র

অর্ধ শতাব্দীর বেশি অতিক্রান্ত স্বাধীন ভারতবর্ষে প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের এক অদ্ভুত সহাবস্থানে বসবাস আমাদের। যে বিপুল আশা নিয়ে উড়েছিল স্বাধীনতার প্রথম পতাকা তার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হয়েছে বিগত ছয় দশকে তা হয়ত তর্কসাপেক্ষ। তবে এই স্বাধীনতার সুফল সমাজের সকল স্তরে দেশের সমস্ত কোণে যে সমানভাবে গিয়ে পৌঁছুয়নি সেটা নিদারুণ সত্য। সেই সত্যের হাত ধরে একদিকে বিশ্বধনকুবেরদের সংঘে যেমন এক শ্রেণীর ভারতীয়দের উজ্জ্বল উপস্থিতি, ঠিক তারই বিপ্রতীপে নিদারুণ দারিদ্রের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কোটি কোটি ভারতীয় পরিবারে। একদিকে সীমাহীন অশিক্ষার অন্ধকার অন্যদিকে বিশ্বে ভারতীয় মেধার জয়জয়কার। এরই যুগলবন্দী ভারত।

ভারতবর্ষের একটা ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস কোনো একটি জাতির একক ইতিহাস নয়। কোনো একটি সমাজের সম্প্রদায়ের একক ইতিহাস নয়। ইউরোপের মতোই একাধিক জাতি ও সম্প্রদায়ের মিলিত ইতিহাস। ইউরোপের আশীর্বাদ অন্য মহাদেশ আগত কোনো একটি জাতির কাছে তাকে কোনোদিন পরাধীনতা স্বীকার করতে হয় নি। ভারতবর্ষের অভিশাপ ব্রিটিশের পরাধীনতা স্বীকার। এই সত্যটি আধুনিক ভারতের সকল দূর্বলতা এবং সকল সমস্যার মূল। দুঃখের বিষয় আমরা কেউই আজঅব্দি এই মহাসত্যের গভীরে প্রবেশ করি নি। ভারতবর্ষের ইতিহাসের মূল বৈশিষ্ট্য যদিও বৈচিত্র্যের মধ্যে সমন্বয়, তবুও এখানে কোনো জাতিই তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে কোনোদিনও ভারতীয় হয়ে উঠেছিল না ঠিক ইউরোপের মতোই।

ব্রিটিশ আসার আগে ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন সাম্রাজ্যে বিভক্ত হয়ে স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতিসহ নিজস্ব অর্থনীতি, আইনআদালত পদ্ধতি, এবং সামরিক বাহিনীর সুরক্ষায় জীবনযাপন করতো। এবং প্রতিবেশী জাতিগুলির সাথে সাম্রাজ্য বিস্তারে যুদ্ধ বিগ্রহে ব্যস্ত থাকত। ইউরোপের ইতিহাসও ঠিক এইভাবেই আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে এর সাথেই ঘটে গেছে একটা মূল পার্থক্য। কয়েকহাজার বছর ধরেই ভারতে ক্রমাগত ঘটেছে বৈদেশিক অনুপ্রবেশ। আর্যরাও মূলত বিদেশী। এই অনুপ্রবেশ হয়েছে দুইভাবে, একদিকে আলেকজান্ডার থেকে নাদির শাহ’রা শুধু যুদ্ধ করে লুণ্ঠন করে ফিরে যেত, অন্যদিকে আর্যদের মত শক হূন মোগল পাঠান এদেশেই থেকে গেল। বিভিন্নপর্বে বিভিন্ন ভিনদেশী জাতি প্রধানত ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম দিক দিয়ে ঢুকে এই ভুখণ্ডে সাম্রাজ্য বিস্তার করলেও কালক্রমে তারা এই ভুখণ্ডকেই আপন দেশ বানিয়ে নিয়েছে। ছিন্ন হয়ে গেছে তাদের মুল ভুখণ্ডের সাথে সমস্তরকম সংযোগ। নতুন ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে তাদের মিলন হয়েছে সম্পূর্ণ। এবং তারাও ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারে নিরন্তর যুদ্ধ বিগ্রহ করে গেছে বিভিন্ন আঞ্চলিক জাতি গোষ্ঠির সাথে। এইভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের মানচিত্র বদল হয়েছে বারংবার। গড়ে উঠেছে নানান ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন জাতি সত্তা। রাজপুত পাঠান শিখ মারাঠী তামিল বাঙালি উড়িয়া প্রভৃতি। এটাই ভারতবর্ষ।

ফলে এইভাবেই বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠিগুলি পারস্পরিক ভুখণ্ড দখল করে সাম্রাজ্য বিস্তারের সূত্রে আপন জাত্যাভিমানের বিকাশ ঘটিয়েই জাতিকে কালে কালে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তোলায় ব্যস্ত থাকে। এর মধ্যেই এক এক যুগে এক একটি সাম্রাজ্য বিপুল শক্তি অর্জন করে উপমহাদেশের বিশাল অঞ্চলে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটায়। যেমন গুপ্ত সাম্রাজ্য মোগল সাম্রাজ্য ইত্যাদি। আবার তাদের শক্তির ভাটার সময়ে আঞ্চলিক জাতিগোষ্ঠিগুলি তাদেরকে সমরযুদ্ধে পরাস্ত করে নিজ নিজ হৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধার করে। এটাই ভারতবর্ষের ইতিহাস। ইউরোপের সমান্তরাল। সেখানেও এক এক যুগে এক একটি সাম্রাজ্য বিশাল শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যেমন রোমান, প্রুয়েশিয়া, জার্মান, ফরাসি ইত্যাদি। এবং এই ইউরোপেও ঠিক ভারতবর্ষের মতোই সাম্রাজ্যগুলির শক্তি দূর্বল হয়ে পড়তে থাকার সময়ে আঞ্চলিক গোষ্ঠিগুলি তাদের অঞ্চলকে পরাধীনতার কবল থেকে মুক্ত করতে থাকে। এইভাবে ইউরোপেও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীগুলি পারস্পরিক যুদ্ধ বিগ্রহ সংঘর্ষের মধ্যে দিয়েই গড়ে তুলতে থাকে তাদের স্বাজাত্যবোধ। গড়ে ওঠে এক একটি শক্তিশালী সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের দুর্ভাগ্য ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে তাকে বশ্যতা স্বীকার করতে হল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের কাছে। পাঠান মোগলদের মতো সে ভারতবর্ষকে আপন করে নিল না। শোষকের মতো ভারতবর্ষকে সে লুণ্ঠন করা শুরু করল কয়েক শতাব্দীব্যাপী। একের পর এক উপমহাদেশীয় সাম্রাজ্য সে দখল করে নিতে থাকল।

এইভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের সকল রাজ্য সকল জাতি গোষ্ঠীকে ব্রিটিশ তার সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শোষণের জন্য একদেশীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করল। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন এই ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশের কামান বন্দুকের নলের সামনে এই প্রথম ‘একদেশীয় শাসন প্রণালীর‘ অধীনস্ত হলো। ব্রিটিশের স্কুলে আমরা হলাম ইন্ডিয়ান। কারণ ব্রিটিশের চোখে আমাদের আর কোনো আলাদা অস্তিত্ব স্বীকৃত নয়। আমাদের একটাই পরিচয় পরাধীন ভারতীয়। আমরা ভুলে গেলাম আমাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তাগুলির কথা। ভুলে গেলাম আমাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার কথা। ব্রিটিশের ইংলিশ শিখে আমারা উপমহাদেশের মানুষ জানলাম আমাদের দেশের নাম ভারতবর্ষ।

প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশের এতগুলি পৃথক রাজ্য ও জাতির সমন্বয়ে ভারতবর্ষের একটি দেশরূপে আত্মপ্রকাশ। আধুনিক রাষ্ট্র শাসনপ্রণালীতে ব্রিটিশ, ভারতবর্ষকে একটি মানচিত্রে বেঁধে ফেলল। এইরকম দূর্বিপাক ইউরোপের ভাগ্যে ঘটেনি। তাই সেখানে প্রত্যেক জাতির স্বাধীন বিকাশ গড়ে উঠেছে স্বাভাবিক নিয়মে। ব্রিটিশ শাসনে ভারতবর্ষে সেই স্বাভাবিক বিকাশের গতি অবরুদ্ধ হয়ে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে এই প্রথম বিভিন্ন জাতির সার্বভৌমতা খর্ব করে একটি দেশের নাগরিক হিসেবে একাধিক জাতির পরিচিতি গড়ে তোলা হয়। প্রকৃতিবিরুদ্ধ এই দূর্ঘটনা সেদিনের মনীষীরা অনুধাবন করতে পারেন নি।

মনীষীরা অনুধাবন করতে পারেন নি তার একটা ঐতিহাসিক কারণ ছিল। ব্রিটিশ এখানে পরাধীন জাতিগুলির আত্মমর্য্যাদায় আঘাত করেছিল প্রথমেই। উপমহাদেশের জাতিগুলি শিক্ষায় ধর্মে বিজ্ঞানে শিল্পে বাণিজ্যে সর্ব বিষয়েই ব্রিটিশের থেকে অনুন্নত। ব্রিটিশের এই প্রচারের বিরুদ্ধে নিজেদের আত্মপরিচয় সন্ধানে ব্যাপৃত হলেন মনীষীরা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে। ইউরোপের মতোই এই উপমহাদেশেরও একটা সাধারণ ইতিহাস ও প্রকৃতি আছে। সেখানেই ভারতের সকল জাতির সাধারণ একটা যোগ বিদ্যমান। মনীষীরা সেইসত্যের বৈচিত্র্যের মধ্যেকার ঐক্যকেই মনে করলেন একটি দেশের আত্মা বলে। ভুলে গেলেন ইউরোপেও সেইরূপ একটি ইউরোপিয়ান আত্মা থাকলেও তারা তাকে একটি দেশ বলে ভাবে না।

দ্বিতীয়ত ব্রিটিশের শোষণ ও অত্যাচারের শিকার হয়ে এই পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্খা কোনো একটি জাতির মধ্যেই এককভাবে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এবং একই শাসনতন্ত্রের অধীনে থেকে ব্রিটিশ প্রবর্তিত ভারতীয় নাগরিক পরিচয়ের বলয়ে স্বাভাবিকভাবেই মনীষীরা নিজেদের জাতিসত্তার ঊর্দ্ধে উঠে নিজেদের ভারতীয় স্বরূপকেই সাধারণ জাতিসত্তা বলে অনুভব করা শুরু করলেন। স্ব স্ব জাতিসত্ত্বার পরিচয় গৌণ হয়ে মুখ্য হয়ে উঠল ভারতীয়তার পরিচয়। অথচ ইউরোপে ঘটল ঠিক উল্টো। যেটা স্বাভাবিক। অর্থাৎ সেখানে স্ব স্ব জাতিসত্ত্বার পরিচয়টাই হল মুখ্য। ইউরোপিয় পরিচয় থাকল গৌণ হয়ে। আর এখানে ভারতীয় উপমহাদেশের এতগুলি জাতি মিলে একটি দেশের আত্মপ্রকাশ হল।

ভারতীয় উপমহাদেশ আত্মপ্রকাশ করল ভারতবর্ষ রূপে। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিমুখ হয়ে উঠল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। আধুনিক রাষ্ট্রতন্ত্রের যুগে আমরা হলাম ভারতীয় নাগরিক। এদিকে ক্ষুরধার ব্রিটিশ উপমহাদেশে আমদানী করল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষ। ভারতবর্ষ হয়ে উঠল হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্বের পীঠস্থান। দুই পক্ষেরই স্বার্থান্ধ নেতা নেত্রীরা নিজেদের আখের গোছাতে ব্রিটিশের সাথে হাত মিলিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষকে মহীরূহে পরিণত করে তুললেন। ফলে স্বাধীনতার ভাগ-বাটোয়ারার সময় সাম্প্রদায়িকতার মানদণ্ডে দেশভাগের বন্দোবস্ত হলো। আমরা ভুলে গেলাম আমরা এতগুলো জাতি পরস্পর স্বতন্ত্র। ব্রিটিশের রোপন করা সাম্প্রদায়িকতার গাছে উঠে বসলাম। স্বাধীনতার ভাগ-বাটোয়ারার সেইদিনে ব্রিটিশের তাঁবেদার নেতাদের সাথে প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামীরাও ভুলে গেলেন ঠিক যে কারণে ইউরোপ একটি দেশ হতে পারে না, সেই একই কারণেই ভারতও একটি দেশ নয়। যে কারণে ইউরোপের দেশগুলি স্ব স্ব মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে; ভারতীয় উপমহাদেশের জাতিগুলির ক্ষেত্রেও ঠিক সেইভাবেই দেশগুলির গড়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক হতো। বরং সেইদিন ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক জাতীয়তার ভিত্তিতে একাধিক রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষটি উপড়িয়ে ফেলা যেত। এবং ইউরোপের আগেই সেই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলি ভারতীয় ইউনিয়ন গঠন করে বিশ্বে অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারতো।

১৯৪৭ এ এইরকম স্বাভাবিক ঘটনাটি ঘটলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও লাগানো যেত না। কোটি কোটি মানুষকে নিজের জন্মভূমিও ত্যাগ করতে হতো না। কিন্তু সেদিন একজন বাদে এই দূরদৃষ্টি কারুর ছিল না। এবং দূর্ভাগ্যবশত তিনি কোনো বড়োমাপের জননেতাও ছিলেন না। তাই সেদিন তাঁর কথায় কেউই কর্ণপাত করেননি। আমাদের মনীষীদের মতোই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত নেতারাও অনুধাবন করতে পারেননি এতগুলি বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে একটি দেশগঠন খুবই অবৈজ্ঞানিক। বরং যেটা হওয়া উচিত ছিল, সেটা হলো জাতিসংঘ গঠনের মাধ্যমে জাতিসমূহের ইউনিয়ন গড়ে তোলা। যে ইউনিয়নের মধ্যে প্রত্যেকটি জাতি স্বাধীন ও সার্বোভৌম রাষ্ট্র গঠন করে জাতি ও দেশের উন্নয়নে সমৃদ্ধ হতো।

খুব বড়মাপের জননেতা না হলেও অনেক বড়োমাপের রাজনীতিবিদ ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসু। কিন্তু তাঁরও অনেকদিন দেরি হয়ে গিয়েছিল প্রকৃত সত্যটি অনুধাবন করতে। নেতাজীর মতো তিনিও অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু নেতাজীর অবর্তমানে চতুর ব্রিটিশের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগের যড়যন্ত্রে যখন দেশের সমস্ত স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ একজোট হয়ে তাদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থপূরণে তীব্রভাবে সচেষ্ট হয়ে উঠলেন; তখন তাদের মুখোশের আড়ালের প্রকৃত মুখগুলি স্পষ্ট দেখতে পেয়ে তবেই ঘোর কাটল শরৎ বসুর। তিনিই একমাত্র অনুধাবন করলেন প্রতিটি ভাষাভিত্তিক এক একটি স্বাধীন দেশ গঠনের গুরুত্ব।

২৬ জানুয়ারি ১৯৪৭। কলকাতায় অনুষ্ঠিত ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির কনফারেন্সে শরৎচন্দ্র বসু বললেন,

“I have always held the view that India must be a Union of autonomous socialist republics and I believe that if the different provinces are redistributed on a linguistic basis and what are today called provinces are converted into autonomous socialist REPUBLICs; those socialist republics will gladly co-operate with one another in forming an Indian Union. It is not the Indian Union of British conception and British making. I look forward to that Union…..”

ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলীম লীগের তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে কেন্দ্রীয় অন্তর্বতী সরকার থেকে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে শরৎচন্দ্র বসুকে বাদ দেওয়ার পর আবুল হাশিম কলকাতায় শরৎচন্দ্রের বাসভবনে তাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাত করেন। এইপ্রসঙ্গে হাশিম বলেন;

“এই প্রথম সাক্ষাতে শরৎচন্দ্র বসু স্বীকার করেছিলেন যে ভারত একটি দেশ নয়, একটি উপমহাদেশ, এবং ভারতীয়রা এক জাতি নয় এবং ভারত যথার্থভাবে তখনই স্বাধীন হবে যখন ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলি ও জাতিসমূহ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হবে।’ ভারতীয় উপমহাদেশের সকল জাতি সমূহের দূর্ভাগ্য, এই মূলসত্য সেদিন আর কেউ অনুধাবন করেননি।”

 

দুই

স্বাধীনতার পর সাড়ে ছয় দশক অতিক্রান্ত। তবুও আজও আমরা অতিক্রম করতে পারিনি সেই দূর্ভাগ্য। জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে না উঠলে গড়ে ওঠে না সাজাত্যবোধ। গড়ে ওঠে না প্রকৃত দেশপ্রেম। ফলে জাতির সার্বিক উন্নতি সফল হয় না। কেবল ক্ষমতা দখলের চর্চা হতে থাকে দেশের সম্পদের ওপর ভাগ বসানোর লোভে। ফলে সমাজের সর্বস্তরে জমাট বাঁধতে থাকে দূর্নীতি। কেবলমাত্র উচ্চবিত্ত ও বুদ্ধিমান এবং অসৎ ও দূর্নীতিবাজরাই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে থাকে। ব্যহত হয় জনসাধারণের সার্বিক উন্নয়ন। আজ ভারতবর্ষে এইগুলিই সত্য হয়ে উঠেছে। কারণ ভারতীয়রা এক জাতি নয়। ভারতবর্ষ এক দেশ নয়। ভারতের কোনো মাতৃভাষা নেই। তাই নেই কোনো সাজাত্যবোধও।

আমাদের বাঙালিদের অবস্থা আবার আরও অভিশপ্ত। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে অখণ্ড বাংলাকে সেই ১৯৪৭ই কেটে দুটুকরো করে একই ভাষার বাঙালিকে বিদেশী করেছি। নিজেদের স্বভূমিকে করেছি বিদেশ। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীকে মনে করেছি স্বদেশ। একদিন যে মারাঠা বর্গীরা বাংলার গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল শত শত নিরীহ বাঙালিকে, বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনীতির মেরুদণ্ডটি ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়ে চলে গিয়েছিল, আজ রাজনৈতিক মানচিত্রে রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্বে তারা ও আমরা পরস্পর স্বদেশী। এইরকম উল্টোপুরাণ ইউরোপিয়রা কল্পনাও করতে পারত না। তাদের জৌলুসকে নকল করতে শিখেছি শিখিনি তাদের বাস্তববোধকে সাজাত্যবোধকে অনুসরণ করতে।

বর্তমান ভারতে যে যে জাতি সমূহের মধ্যে সাজাত্যবোধ প্রবল, আপন সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য নিয়ে গর্ব বোধ বেশি; তারা কিন্তু আমাদের থেকে অনেক বেশি উন্নতি করে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। এই প্রসঙ্গে তামিল মালয়ালাম পাঞ্জাবী গুজরাটীদের উন্নতি খুবই প্রণিধানযোগ্য। অন্যান্য জাতিসমূহের উন্নতি কিন্তু সমানভাবে হয় নি। ফলে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয়ভাবে সকল অঞ্চলে সমানভাবে উন্নয়ন ঘটানো কখনোই সম্ভব নয়। নিজ নিজ জাতিসত্তার প্রকৃতি ও উদ্যোমের ওপর সেই অঞ্চলের অগ্রগতি নির্ভরশীল। এইখানেই ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্ব। সুখের কথা ভারতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান সেই সেই অঞ্চলের পক্ষে আশীর্বাদরূপে দেখা দিচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখা দরকার, সোভিয়েত ইউনিয়নেও ভারতবর্ষের মতো একাধিক জাতিকে একটিমাত্র সংবিধানের আওতায় মস্কোর কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে একটি দেশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। কম্যুনিস্ট দেশটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর হয়ে উঠেও শেষ রক্ষা করতে পারে নি। এতগুলি জাতি নিয়ে চলতে গিয়ে লৌহযবনিকার আড়ালেও দূর্নীতির রোগে আগাগোড়া অসুস্থ হয়ে অবশেষে তাদের ঘোর কাটে। কম্যুনিজমের পতনের সাথে রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় স্বাধীন করে দেওয়া হয় রাশিয়ার সাথে বাকি জাতিগুলিকে। আজ তারা সব স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্য হয়ে নিজ নিজ জাতির উন্নয়নে একনিষ্ঠ। সম্পূর্ণ বিনা রক্তেপাতে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

অনেকেই বলবেন এটা বিচ্ছিন্নতার মানসিকতা। তা কিন্তু নয়। এটা কঠিন বাস্তব সত্য। যে স্বপ্ন নিয়ে একটি দেশ বলে বিশ্বাস করা হয় ভারতবর্ষকে, সেই স্বপ্নের কোনো বাস্তব ভিত্তি এবং বৈজ্ঞানিক সত্যই নেই। সম্পূর্ণ প্রকৃতিবিরুদ্ধ এই একদেশীয় মানসিকতা। ঠিক এই কারণেই ভারতবর্ষে আজ এত বিভিন্ন রকমের সমস্যা। দেশের মেরুদণ্ড হল সেই দেশের জাতি। একটি দেশের একাধিক মেরুদণ্ড তো হতে পারে না। তাই ভারতবর্ষের সেই মেরুদণ্ডটিই নেই। ভারতীয় প্রজাতন্ত্র গঠনের সময় সেই সত্য কেউ খেয়াল করেননি। যে দুজন করেছিলেন সেই শরৎচন্দ্র বসু ও আবুল হাশিম- তাদের কথায় কেউই কর্ণপাত করেননি সেদিন। কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্কের কোন বিন্যাসেই শুধরাবে না সেই ভুল।

ফলে যে স্বপ্ন নিয়ে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের গঠন; বিগত সাড়ে ছয় দশকে তা অধরাই রয়ে গেছে। সব জাতির উন্নতি ও বিকাশ সমানভাবে হয় নি। সমাজের উচ্চবিত্ত স্তর ছাড়া জীবনযাপনের মানের বিশেষ কোনো উন্নতি ঘটেনি। শিক্ষা স্বাস্থ্য সম্পদের অধিকার মুষ্টিমেয় শ্রেণীর কুক্ষিগত। গণতন্ত্রের নামে লুণ্ঠন হচ্ছে দেশের সম্পদ। জনসাধারণের মৌলিক অধিকারগুলি পদে পদে লাঞ্ছিত। আইন ও প্রশাসন জনসাধারণের পাশে নেই। প্রজাতন্ত্র সংবিধান সর্বস্ব নিয়মতান্ত্রিক। দূর্নীতিযুক্ত রাজনীতির চাপে জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে। জীবনধারণ আজ কঠিন থেকে কঠিনতর। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের এই ব্যর্থতার দায় প্রজাতন্ত্রকেই নিতে হবে। ভাবতে হবে নতুন করে। নতুন কথা।

0 Shares

শ্রীশুভ্র এর ব্লগ   ৫০৩ বার পঠিত