জোবায়েন সন্ধি

সুফি গানের প্রতি দূর্ণিবার টানের কারণেই হোক কিংবা শিকড়ের টানেই হোক ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় পুরো ভারতবর্ষ সফর করেছি। এরমধ্যে কয়েকবার দিল্লি, পাঞ্জাবের নকোদ্বার (মুসলিমরা এই জায়গাকে নেকির দরোজা বা নেকিদ্বারও বলেন) ভ্রমণ করেছিলাম কেবলমাত্র সুফি গানের লাইভ প্রোগ্রাম দেখার জন্য।

ঠ্যালায় পড়ে জরুরী প্রয়োজনে ২০১৫ সালে বেশ কিছুদিন দিল্লি ছিলাম। সেসময় বিভিন্ন সুফি সাধক ও মুঘলরাজদের কীর্তি জানার সুযোগ হাতছাড়া করিনি। নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন তাগিদ দিয়েছিলেন ‘সময় থাকলে একবার হুমায়ুন টম্ব ঘুরে আসো’। তখনো ঠিকানা জানতাম না কীভাবে যাবো। তিনি সেখানে যাওয়ার পথ বাতলে দিয়েছিলেন। আর দেরি করিনি, হুমায়ুন টম্ব খুঁজে পেতে কোনোই সমস্যা হয় নি।

পাশাপাশি সুফি সাধক আবুল হাসান ইয়ামিন আল-দ্বীন খুশরো, যিনি আমির খসরু (জন্ম ১২৫৩ খ্রিস্টাব্দ ও মৃত্যু ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দ) নামেই সর্বাধিক পরিচিত, তাঁর সমাধি দেখার সুযোগ মিলবে এমন সুযোগ কে হাতছাড়া করতে পারে! যাঁরা মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্র (হুমায়ুন টম্ব) দেখতে যান, তারা চাইলে নিজামুদ্দিন আউলিয়া ও আমির খসরুর সমাধিটাও একনজর দেখে আসতে পারেন।

ভারত তো বটেই, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান এমনকী তুরস্ক থেকেও প্রচুর পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত থাকে আমির খসরুর সমাধি। আমি একে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় লালন সাঁই-এর মাজারের সাথে মেলানোর চেষ্টাও করেছি বহুবার, হয়তো মিলেও যায়! বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক মানুষই আমির খসরু সম্পর্কে জানেন। জানার জন্য যে পরিবেশ দরকার তা নাই বলেই হয়তো বাংলাদেশে তিনি অজানা।

অনেক বন্ধু প্রশ্ন করেন, জানতে চান আমি আপাদমস্তক ঈশ্বর অবিশ্বাসী মানুষ হবার পরেও কী কারণে সুফি গানের প্রতি এতো আসক্ত! আমি সুফিবাদী নই, তারপরও এতো আসক্তির কারণ কী?

সত্যি বলতে আমি নিজেও এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। জানার চেষ্টা যে করি নি তাও নয়, সারাক্ষণই জানার চেষ্টা করি; কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর পাই না। শুধু এটুকু অনুভব করার চেষ্টা করি যে, আজকে বিশ্বব্যাপী ইসলাম ধর্মের ধর্মগুরু বা শাসকরা যেভাবে জনগণের ওপরে জোর-জবরদস্তি করে সহিহ ইসলাম পালনের যে চেষ্টা করছেন; জিহাদিরা বিশ্বব্যাপী মুহাম্মদ প্রণীত যে ইসলাম কায়েমের জন্য প্রতিনিয়ত অবলীলায় মানুষ হত্যা করে যাচ্ছে। অথচ সেই যুগে- যখন প্রযুক্তি আজকের মতো আধুনিক ছিল না, তখনও তো মানুষ ধর্ম-কর্ম করতেন, তখনও প্রেম-ভালোবাসা ছিল। তখন তো ধর্মে ধর্মে বিভাজন, মানুষে-মানুষে বিভাজন থাকলেও মতপ্রকাশের কারণে কেউ কারুর ওপরে চাপাতি নিয়ে হামলে পড়তো না।

কথায় কথায় ধর্মরক্ষার দোহাই দিয়ে ঈশ্বর অবিশ্বাসী মানুষের ওপর হামলে পড়ার ঘটনা ছিলনা বলেই হয়তো সেসময় রচিত হয়েছে অজস্র কবিতা, সংগীত ও সুর। উপমহাদেশে সংগীতের ভিত্তি যদি ধরি তাহলে সুফি সাধকদের ভূমিকাকেই সবার আগে স্বীকার করতে হবে। মাঝে মাঝে ভাবি উপমহাদেশে আজ সংগীত চর্চার এই যে বেহাল অবস্থা, এর জন্য রাজনীতিতে ধর্মের অনুপ্রবেশই দায়ী। আধুনিক যুগের কল্যাণে আজ সংগীতযন্ত্রের আধুনিকায়ন হয়েছে, উন্নতমানের স্টুডিও, ভালো ভালো শিল্পী তৈরি হচ্ছে বটে; কিন্তু ভালো গান কী তৈরি হচ্ছে? উত্তর- না।

একবারেও জন্যও যদি জুল ভার্নের টাইম মেশিনে চড়ে কাওয়ালি সম্রাট আমির খসরুর যুগে চলে যেতে পারতাম, তাহলে আর কখনোই এই যান্ত্রিক যুগে ফিরে আসতাম না; আমির খসরুর গানের বাগানে মালি হয়ে সেখানেই রয়ে যেতাম।

[আমির খসরুর লেখা অনেক গানের মধ্যে ‘জেহাল-এ-মিসকিন’ অন্যতম। গেয়েছেন অনেকেই। আমার পছন্দের দুটো গান শেয়ার করলাম।]

 

 

 

 

0 Shares