কাকন রেজা

সরকারি চাকরি করেন। ভালো পদে। আয়ও ভালো। তাই স্বামীর উপর নির্ভর করতে হয় না। এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। কিন্তু তারপর। নিজে টাকা আয় করেন, স্বামীরটাও ছাড়েন না। স্বামীর আয়ের হিসাব তাকে দিতে হয়, কড়াগন্ডায় ব্যয়ের হিসাবও। অথচ তার আয়-ব্যয়ের হিসাব চাইবার সাহস স্বামী বেচারা ধারণ করেন না। কেনো করেন না, সোজা কথায় চিল্লাচিল্লির ভয়ে।

শিক্ষিতা। নিজেকে ‘রুচিবতি’ ভাবেন। নিজের রুচি, রূপ ও কাজের প্রশংসা শুনতে চান স্বামীর কাছ থেকে। বিপরীতে স্বামীর কর্মকান্ড সম্পর্কে তার রয়েছে অপরিসীম অনিহা। স্বামী বেচারারও নিজের কর্মকান্ড বিষয়ে মতামত চাইবার স্পর্ধা জড়ো করার সাহস হয় না।

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সরকারি চাকুরে। স্বামী বেচারা আবার লেখক (মূলত লেখকেরা বেচারা হন বলেই লেখা)। সারাক্ষণ ঝাড়ির উপর থাকেন। অফিসের দাপট স্ত্রী বাড়িতেও প্রয়োগ করেন। তার আলাপ অফিসের কাজ নিয়ে, নিজের রুচি ও রূপ নিয়ে। তিনি কাজে কত দক্ষ, কতটা ‘রুচি’ ও ‘রূপ’বতি ইত্যাদি বিষয়ে অন্যের প্রশংসার যৌক্তিকতা প্রমান করতে হয় স্বামীকে ঘাড় নেড়ে। অনেকটাই ‘নেড়ি কুকুরে’র মতো। উল্টো নিজের লেখা সম্পর্কে ততটাই উদাসীন সেই ‘ঝাড়িবতি’ স্ত্রী। স্বামী কী লিখে তাও সঠিক জানেন না তিনি, পড়াতো ‘দূর অস্ত’। উল্টো অন্যের করা স্ত্রীর প্রশংসার যৌক্তিকতা প্রমানে স্বামীকে সীলমোহর মারতে হয়।

ইনারা মানে সেই ‘রুচি’ আর ‘রূপ’বতিরা সবাই নারীবাদী। তারা নারীকে পুরুষের সমান কিংবা তারোপরে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে তাদের আপত্তি। উনবিংশ শতকে জন্ম নেয়া নারীবাদের মূলকথা ছিলো নারীকে মানুষের যোগ্যতায় অধিষ্ঠিত করা। অথচ নারীবাদী চিন্তার শুরুতেই এটাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের মানসে। অর্থাৎ নারীকে পুরুষ হতে হবে, মানুষ নয়। অথচ, অনেক পুরুষই মানুষ হয় না, এ কথা বোঝার ক্ষমতা বেশিরভাগ নারীবাদীরই নেই। বিশেষ করে আমাদের দেশের কথিত নারীবাদীদেরতো নেই-ই।

আমার কাছে আমার ‘মা’ সবচেয়ে শ্রদ্ধার, এমন কথা সবাই বলেন। এই ‘মা’ তখন কোনো অর্থেই নারী নয়, নারী ও পুরুষের পরিচয়ের উর্ধে তিনি মানুষ। এই কথাটাই নারীবাদীরা বিশেষ করে আমাদের দেশের নারীবাদীদের মাথায় ঢোকে না। মাদার টেরেসা পুরুষ না নারী এটা মূখ্য কথা নয়, মূল কথা হলো তিনি মানুষ এবং মানুষের সেবায় ছিলেন নিবেদিত। একজন নারী যখন মানুষ হয়ে উঠেন, সেই ‘মানুষ’টাই মূল কথা। মাদার টেরেসাও তাই।

নারীবাদের একটি ব্যাখ্যা হলো এরকম, ‘নারীবাদ পুরুষের তুলনায় নারীর সমতা ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে।’ ইউরোপের একটি ছোট শহরের এক স্বামী-স্ত্রীর কথা বলছি। সঙ্গত সেখানে দুজনেই কাজ করেন। অর্থাৎ চাকরিজীবী। তারা কে কত বেতন পান কেউ জানেন না, কেউ কারো কাছে খরচের হিসাব চান না। ঘরের প্রয়োজন দুজনেই নিজেদের মতন মেটান, সন্তানদেরও তাই। নিজেদের কেউ অন্যের চেয়ে সুপিরিয়র প্রমান করতে চান না।

অ্যামেরিকার আরেকটি শহর। স্ত্রী চাকরী করেন। স্বামী ফ্রিল্যান্সার, লেখক মানুষ। যা উপার্জন লিখেটিখেই। স্ত্রী আবার তার লেখার খুব ভক্ত। মাঝে-মধ্যে স্বামী বেচারার পকেটে টান পরে, নির্দ্বিধায় স্ত্রী কাছে হাত পাতেন। আবার নিজের আয় থেকেও স্ত্রীর প্রয়োজন হলে মেটান। স্বামী লেখক, অন্যার্থে ভবঘুররে। তার নির্দিষ্ট কোনো কাজের সময় বা ধরণ নেই। সারাদিন বাসায় ঘুমান, সারারাত জাগেন। স্ত্রীর তাতে আপত্তি নেই। তিনি লেখক জেনেই এবং বুঝেই তাকে বিয়ে করেছেন। লেখক স্বামীও তার স্বাধীনতায় কখনো বাদ সাধেননি। এই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা। স্বাধীন জীবনযাপন।

এখানে অপ্রয়োজনে স্ত্রীর প্রশ্বস্তি গাইতে হয় না স্বামীকে। শুনতে হয় না, ‘অমুকজনেরা আমার এতো প্রশংসা করে খালি তুমি মুখ বুজে থাকো।’ উল্টোদিকে স্বামীর প্রশ্বস্তিতো ‘দূর কা বাত’, কাজের মূল্যই দেন না। এই হলো আমাদের নারীবাদ। নারী স্বাধীনতা। আমাদের এখানের নারীবাদীদের কাছে পুরুষ হলো দখলকৃত সম্পদ। যে সম্পদে ভাগ বসানোর অধিকার কারো নেই। তিনি কারো সাথে গল্প করতে পারবেন, সেখানে প্রশ্ন উঠলে নারী স্বাধীনতায় বাধা। বিপরীতে অধিকৃত পুরুষ কারো সাথে কথা বললে, তা ভয়াবহ অপরাধ। এই যে দখলদার মানসিকতা, এতেই ব্যর্থ হয় নারীবাদ। অন্যকে পরাধীন রেখে নিজে স্বাধীন হওযা যায় না, এই স্বাভাবিক বোধহীনরাই আজ নারীবাদী! মনের দাসত্বকে পুষে রেখে, মুখে স্বাধীনতার কথা বলা প্রবঞ্চকতা, আমাদের কথিত নারীবাদীরা তেমনি প্রবঞ্চক।

জরায়ুর স্বাধীনতাও কারো কাছে বড় নারীবাদ। পুরুষের কথিত ‘বহুচারিতা’কে সামনে এনে এই চাওয়া। এক অর্থে ‘উছিলা’ বলতে পারেন। নিজের মনের নিভৃতে লুকিয়ে থাকা ‘পারভার্সন’ জরায়ুর স্বাধীনতা বিষয়ক তত্ত্বের উদ্যোক্তা। পুরুষ দশজনে আসক্ত বলে জরায়ুর স্বাধীনতার কথা বলেন যে নারীরা, তারা কি আয়নায় কখনো নিজের মুখোমুখি হয়েছেন? তারা কি দেখেছেন তাদের ভেতরে বসে আছেন কতজন পুরুষ! দেখেননি। না দেখেই তারা বঞ্চিতা, অবহেলিতা। এমন চিন্তা মূলত জগার খিচুরি, নারীবাদ বা কোনো দর্শন প্রসূত নয়। অল্প শিক্ষিত ও শিক্ষিত মূর্খের দেশের নারীবাদ মূলত তাই। চাল, ডাল, বেগুন, ঢেঁড়স দানের মাল, যে যা দেয় তাতেই ঘুঁটা দেয়া অদ্ভুত এক জিনিস।

প্রতিটি মানুষই তার বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতার মধ্যে বড় দায়বদ্ধতা হলো, আমি যে দোষে দোষী, সেই দোষের বিচারক না হওয়া। অথচ আমাদের দেশের নারীবাদীরা তেমন বিচারকের চেয়ে বড় বিচারকত্রী হয়ে যান। বলিহারি। সম্প্রতি দেশের এক নারী সেলিব্রেটি ভিনদেশি একজনকে বিয়ে করেছেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন সংসার করেছেন দেশি আরেক সেলিব্রেটির সাথে। তাদের বিয়ে যখন ভেঙে যায়, তখন স্বভাবতই দোষ পড়েছিলো সেই পুরুষ সেলিব্রেটির প্রতি। কারো নিশ্চিত ধারণা ছিলো, সেই পুরুষের দোষেই তাদের বিয়ে ভেঙেছে। পুরুষটি হয়তো অন্য নারীতে আসক্ত। অথচ সময় তার প্রমান দিয়েছে। সেই নারী সেলিব্রেটির কীর্তির কথা ক্রমেই সবাই জেনেছে। অন্য আরেকজনের সাথে তার আপত্তিকর ছবি বেড়িয়েছে, আরো সম্পর্কের কথা গুঞ্জরিত হয়েছে, অবশেষে বিয়ে করেছেন পরদেশিকে। বিপরীতে তার সাবেক স্বামী ছিলেন অনেকটাই শুদ্ধ। অথচ নারীবাদীরা সেই নারী সেলিব্রেটিকে নিয়ে আলোচনা করেননি, তার বহুচারিতা তাদের কাছে ছিলো ‘স্বাধীনতা’! বরং তার অনৈতিক ছবি যখন প্রকাশিত হয়েছে, তাকে আখ্যা দিয়েছেন, ব্যক্তি স্বাধীনতায় অযাচিত হস্তক্ষেপ বলে। আহারে স্বাধীনতা! সাবেক স্বামীর এমন বেরুলো হামলে পড়ে বলে দিতেন, ‘দেখেছেন এই জন্যই ওই নারী এমন করেছেন। পুরুষেরা খারাপ, নারীরা সর্বংসহা।’ সর্বংসহাই বটে, সবাইকে সয়ে নেন।

যাক গে, এ ব্যাপারটা আনা শুধুই উদাহরণের জন্য। যদিও জানি, কানে তুলো দেয়া আর পিঠে কুলো বাঁধা এ দেশের নারীবাদের নামে গড়ে উঠা অদ্ভুত তত্ত্বধারীদের এসবে কিছু যায় আসবে না, তারা তাদের কাজ করে যাবেন। প্রতিবাদের নামে, মানববন্ধনের নামে, মিছিলের নামে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় মাতবেন, সেলফি তুলবেন। তাদের সেলফির তুমুল আধিপত্যে প্রকৃত নারীবাদ মুখ লুকাবে লজ্জায় আর অপমানে সাথে নারীবাদী মানুষেরাও।

ফুটনোট : কদিন আগে ঢাকার হাতিরঝিলে এক পুরুষকে কুকুর বানিয়ে এক নারীর কথিত ‘আর্ট’ বিষয়ক কর্মকান্ড সম্পর্কে জেনেছেন মানুষ। আমাদের দেশে কথিত ‘নারীবাদ’ অনেকটা তাই, পুরুষকে শিকলে বেঁধে অনুগত কুকুর করে রাখা বা রাখার প্রচেষ্টা।

 

0 Shares
কাকন রেজা এর ব্লগ   ৪ বার পঠিত