বাসব রায়

এনআরসি তালিকা-উত্তর রাজনৈতিক খেলাটা বেশ জমে উঠেছে।

১৯৮৫ সালে হয়েছিল অসম চুক্তি। তার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা এবং তাদেরই তত্ত্বাবধানে অসমে এনআরসি। বীরেশ্বর দাস সঠিক সনতারিখ বলতে পারবেন, মোটামুটি বিষয়টা এরকম যে ২০০৫ সালে এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং প্রথমেই বরপেটায় চরম বিরোধিতার সামনে পড়েন সরকারি কর্মীরা। পুলিশের গুলিতে তখন মৃত্যু হয়েছিল চারজনের। তারপর আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে এনআরসি প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়। এবং এখানে উল্লেখ্য বিজেপি-র সেই সময় এই বিষয়ে কোনো বক্তব্যই ছিল না।

এখন এনআরসি প্রক্রিয়া প্রায় শেষ। সর্বশেষ তালিকা বেরনোর পর সবচেয়ে যৌক্তিক কথাবার্তা বলছেন কিন্তু কংগ্রেসের নেতারাই। অসম কংগ্রেসের সভাপতি রিপুন বরা যেমন বলেছেন, ‘যেসব পরিবারের একজনের নাম উঠেছে তাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে ছাড়াই সরাসরি এনআরসি তালিকায় নাম ওঠা উচিত।’ একেবারে সঠিক যুক্তি। ভাইয়ের নাম উঠলে বোনের নাম স্বভাবত থাকা উচিত তালিকায়। যেমন মা কিংবা বাবার নাম থাকলে সন্তানরা এমনিতেই ভারতীয় হয়ে যায়।

যাঁর আমলে এনআরসি-র কাজকর্ম শুরু হয়েছিল, অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ, বেশ কয়েক বছর আগে বলেছিলেন যে ২০১৪ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী এনআরসি হোক। এখন বলছেন এবং লিখেওছেন যে এনআরসি-র ভিত্তি হোক ২০১৯ ভোটার তালিকা। বিষয়টা একই, সর্বশেষ ভোটার তালিকা।

তাঁর কথায় এখন আর কেউ বিশেষ গুরুত্ব দেন না, কিন্তু বক্তব্যে যথেষ্ট সারবত্তা আছে। কেননা যে উনিশ লক্ষ মানুষের নাম ওঠেনি, তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৫ লক্ষ (অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাদ দিয়ে) এবছর নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। এবং অসমের সব সাংসদই তাঁদের ভোট পেয়েছেন। তাঁরা বিদেশি হলে সাংসদের স্টেটাস কী হবে? এই জায়গাটায় কেউ আলো ফেলছেন না।
যেমন ১৯ লক্ষ মানুষ ১২০ দিনে ৩০০টা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করবেন, এপর্যন্ত এটাই স্থির হয়েছে। এবং ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০ মাসের মধ্যে সব মানুষের নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে রায় দেবে।

মজার ব্যাপার হল, গত ৩০ বছরে ট্রাইব্যুনালের কাছে এরকম ৪ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্বের মামলা হয়েছে তার ভেতরে ২ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এই হারে ১৯ লক্ষের নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে ট্রাইব্যুনালের কতদিন লাগবে ঈশ্বর জানেন!

আবার যদি ধরে নিই, নামহীন ১৯ লক্ষই বিদেশি তাহলে তাঁদের ভবিষ্যৎ কী? বাংলাদেশে গিয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে এনআরসি ভারতের অভন্তরীণ ব্যাপার যেমন নাকি কাশ্মীর। তো, ১৯ লক্ষ নামহীন শেষপর্যন্ত যদি বিদেশিই ঘোষিত হন তাঁদের আর বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা যাবে না, কেননা এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এখন পর্যন্ত নিয়ম হল, এনআরসি-ছুট নামহীনরা যদি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারেন যাবেন ডিটেনশন ক্যাম্পে। ১৯ লক্ষ মানুষ ডিটেনশন ক্যাম্পে যাবেন! সম্ভব!

আর যদি ডিটেনশন ক্যাম্পে যানও, তাঁরা কি সেখানে আমৃত্যু থাকবেন? দেশের মানুষের করের টাকায় তাঁদের সরকার বাঁচিয়ে রাখবে, যদিও মানবেতরভাবে। সম্ভব? এবং এই ১৯ লক্ষের মধ্যে যাদের বয়স ৫-এর কম, নিতান্ত শিশু, তাদেরও নিয়ে যাওয়া হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে? মানবাধিকার কী বলে? রাষ্ট্রসংঘের নিয়মকানুন কী বলে?

ঘটনা হল, নামহীনরা কাতার দিয়ে অ-নাগরিক হয়ে গেলে তাঁদের নিয়ে কী করা হবে তা জানে না সরকার। এই বিষয়ে সরকারের, এখন পর্যন্ত, কোনো বক্তব্য নেই। অসম চুক্তির আধারে এনআরসি প্রক্রিয়া চলছে, আমরা জানি। অসমে অসম চুক্তির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এবং অসম চুক্তি শুধুই অসমের ব্যাপার। ঠিক যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র গতকাল বিধানসভায় প্রস্তাব আনা হয়েছে এনআরসি-বিরোধিতায়। মানে বলতে চাইছি, অসমে এনআরসি চেয়েছিল প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও অরাজনৈতিক প্রভাবশালী সংগঠনগুলো। তো হয়েছে এনআরসি। আর পশ্চিমবঙ্গে ঠিক তার উলটো, প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল এনআরসি বিরোধিতায় নেমেছে। যে যুক্তিতে অসমে এনআরসি হয়েছে, সব মানুষ চেয়েছে বলে, সেই যুক্তিতেই পশ্চিমবঙ্গে কখনো এনআরসি না-হওয়া উচিত।

এনআরসি-পর্বে সবচেয়ে মজার ভূমিকা পালন করছে বিজেপি। তারা খুব ভালোভাবেই জানে যে অসমের এনআরসি তালিকায় সবচেয়ে বেশি নামহীন হবেন হিন্দু বাঙালিরা। অথচ অসমে এঁরাই তাদের ভোটার। আর তাঁদের ‘সেফগার্ড’ হিসেবেই বিজেপি ঝুলি থেকে বের করেছে সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল (সিএবি)। যার মূল কথা, অ-মুসলমান হলেই ভারতে থাকতে পারবে। অঙ্কটা হল, এনআরসি-তে অ-নাগরিক হবে আর সিএবি-তে নাগরিক হবে।

আর মজাটা হল, নামছুটদের অধিকাংশই হিন্দু হবে জেনেও তালিকা প্রকাশের পর বিজেপি-র রাজ্য নেতাদের কথাবার্তা, ‘এই এনআরসি-তে অনেক বিদেশির নাম ঢুকে পড়েছে, আমরা তাদের বের করবই।’ আর কেন্দ্রীয় স্তরের বিজেপি নেতারা এনআরসি-কে রাষ্ট্র সুরক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন, প্রত্যাশিতভাবেই। যেন এনআরসি-ছুটরাই ভারতে সব সন্ত্রাসের মূল নায়ক!

অসমে এখন শোনা যাচ্ছে, ১৯৫১ সাল ভিত্তিবর্ষ ধরে রাজ্যস্তরে ফের পরীক্ষানিরীক্ষা হবে। যদি হয়, হলফ করে বলতে পারি সেই তালিকায় অন্তত এক কোটি মানুষ বাদ পড়বেন এবং তার ৭৫ শতাংশ হবেন হিন্দু। খেলা আরও জমবে, তখন।

আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে গোটা ভারতেই হবে এনআরসি।

আর হ্যাঁ, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশকুমার খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘বিহারে এনআরসি করতে দেব না।’ এবং সত্য হল, তাঁর দলের সঙ্গেই জোট করে বিহারের শাসনে রয়েছে বিজেপি।
এসব দেখে শুনে যদি কারো হাসি না পায়, আমার কিছু কওনের নাই।

0 Shares
বাসব রায় এর ব্লগ   ৫৪ বার পঠিত