মহিউদ্দিন আহমদ

judi

 

লেখালেখি নিয়ে মাঝেমধ্যে সমস্যায় পড়ে যাই। যা লিখতে চাই, তা নিয়ে ভাবলেও কলম নড়ে না। নানা রকম বাধা। ঘাড়ের ওপর ঝুলছে ৫৭ ধারার খড়্গ। আদালত অবমাননার জুজু সব সময় তাড়া করে। সেই যে নাগরিক সমাজের ৪৯ জনএক বিবৃতিতে সই দিতে গিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন, তারপর থেকেই বুক দুরুদুরু করে—কী জানি কী হয়। গোদের ওপর বিষফোড়া হলো—ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত। কোন শব্দে কার অনুভূতিতে আঘাত লাগে, তার পূর্বাভাস পাওয়া অসম্ভব। হামলা-মামলা আর থানা-পুলিশ এড়িয়ে চলতে চাই। ঘরের খেয়ে বনের মোষ অনেক তাড়িয়েছি। কৈশোর-যৌবনে কোনো বাধা মানিনি। মন্ত্র ছিল একটাই—জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন। এখন সময় বদলে গেছে। যাঁরা দেশ ছেড়ে বিদেশে থিতু হয়েছেন, কিংবা বিদেশি পাসপোর্ট নিয়ে দেশে নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন, তাঁরা অনেক স্বাধীন। ফেসবুকের লেখাজোকা দেখে অনেকটা বোঝা যায় যে তাঁরা এ দেশে থাকেন না, এ দেশের আইন তাঁদের ছুঁতে পারবে না। আমাদের যাদের যাওয়ার জায়গা নেই বা যাওয়ার ইচ্ছা নেই, তাদের এখনো অনেক কিছু সমঝে চলতে হয়। অনেকেই অনুরোধ করেন বা উসকানি দেন—ভাই, এ নিয়ে কিছু লিখুন। আমি ভাবি, এঁরা নিজেরা কেন লেখেন না?

যা হোক, লেখালেখির জমিটা ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে সংসদে বলেছিলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই—এই অভিযোগ যাঁরা করেন, তাঁরা ঠিক বলছেন না। গণতন্ত্র নেই, এই কথাটা বলার মতো গণতন্ত্র তো আছে। হাস্যরস করেই তিনি অভিযোগকারীদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, বনের বাঘে খায় না—মনের বাঘে খায়। কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আবার একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি?

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। বিচারকদের বিচার করার ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে থাকবে কি থাকবে না, এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি মত ছিল, মামলা হয়েছিল। আমি এই রায় নিয়ে বা এ বিষয়টি নিয়ে আপাতত মাথা ঘামাতে চাই না। আমার বিষয় বিচারব্যবস্থা নিয়ে। আমরা কি বিরাজমান বিচারব্যবস্থায় খুশি?

এ দেশে একসময় কাজির বিচার চালু ছিল। বইয়ে পড়েছি, ওই ব্যবস্থায় নাকি সবাই আস্থাশীল ছিলেন। সবাই ন্যায়বিচার পেতেন, বিচার বেচাকেনার সুযোগ ছিল না। তারপর আমরা যখন ইংরেজদের গোলাম হলাম, আমরা কোট-পাতলুন পরা শিখলাম, ওদের দেশের বিচারব্যবস্থাও আমরা গ্রহণ করলাম। আমরা ‘সভ্য’ হতে শুরু করলাম। ইউরোপে জারি থাকা তিন-চার শ বছরের রেনেসাঁ আমাদের সমাজে আসেনি। ওদের কেতাব পড়ে তো আর আমাদের মনমানসিকতা এক-দুই প্রজন্মের তৈরি হবে না? আমরা ওদের সিস্টেমটা নিলাম, ইউরোপীয় মনটা তৈরি হলো না। ফলে বদহজম হলো।

ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, থানার পুলিশ ঘুষ খায়, উকিল মিথ্যা সাক্ষী জোগাড় করে দেয়, বাদী-বিবাদীর উকিলে-উকিলে সলাপরামর্শ হয়ে মক্কেলের জমিজিরাত হাতছাড়া হয়। কেউ মামলা করলে, তার নাতি-পুতিরাও তার শেষ দেখে যেতে পারে না। তার মানে, বিচারব্যবস্থার এই সমস্যা নতুন নয়। শুরু থেকেই হয়ে আসছে।

বিচার বিভাগ মানে শুধু প্রধান বিচারপতি এবং বিচারকেরা নন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন লাখ লাখ উকিল-ব্যারিস্টার, দিস্তায় দিস্তায় আইনকানুন। থানা-পুলিশ তো আছেই। সুতরাং, বিচারব্যবস্থাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হলে একটা-দুটো রায় দিয়ে কাজ হবে না। কোর্ট-কাছারিতে দাঁড়িপাল্লা ঝুলিয়ে দিলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাবে না। আবার দেবী থেমিসকে উচ্ছেদ করলেই ন্যায়বিচারের সর্বনাশ হবে না। আরও ভেতরে যেতে হবে।

সব বিচারের রায়ে আমরা সবাই সন্তুষ্ট হই না। রায়ে সন্তুষ্ট হওয়া বা না হওয়ার ওপর আদালত অবমাননার বিষয়টি নির্ভর করে না। বর্তমান সংজ্ঞা অনুযায়ী, বিচারব্যবস্থা তথা আদালতের ওপর অনাস্থা বা ঘৃণা তৈরির চেষ্টা হলে সেটাকে বিচারকেরা অবমাননা বলে বিবেচনা করেন।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের একটি উক্তি মনে পড়ছে। প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘কোর্ট’ চলে জনগণের টাকায়। সুতরাং, বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আছে জনগণের। এটা ১৯৯৫ সালের কথা। তাঁর সংকলিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি বইয়ে কথাটির উল্লেখ আছে।

আমাদের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আমার দুটো সরল পর্যবেক্ষণ আছে। প্রথমত, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। দ্বিতীয়ত, এটা খুবই ব্যয়বহুল। সংগতি না থাকার কারণে অনেকেই আদালতের কাছে যান না। আর উকিলের পাল্লায় পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার ভয়ে অনেকেই মামলা করতে চান না। কথাটা তো মিথ্যা নয়। দু-একটা এনজিও অবশ্য নিখরচায় গরিবদের আইনি সাহায্য দিয়ে থাকে। কিন্তু এর প্রচার যতই থাকুক না কেন, ব্যাপ্তি কম।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রথম জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে চতুর্থ সংশোধনী বিল ১৯৭৫ ২৯৪-০ ভোটে গৃহীত হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংসদ নেতা হিসেবে তাঁর শেষ ভাষণটি দিলেন। দীর্ঘ ভাষণে তিনি অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলেন। বিচার বিভাগ নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন কিছু। আমার মনে হয়, তাঁর ওই কথাগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন:

‘আজকে বিচার বিভাগের কথা ধরুন। আমরা আজকে একটা কোর্টে বিচারের জন্য গেলে, একটা সিভিল মামলা যদি হয়, আপনি তো উকিল, স্পিকার সাহেব-আল্লাহর মর্জি যদি একটা মামলা সিভিল কোর্টে হয়, তাহলে বিশ বছরেও কি সেই সিভিল মামলা শেষ হয়—বলতে
পারেন আমার কাছে? বাপ মারা যাওয়ার সময় বাপ দিয়ে যায় ছেলের কাছে, আর উকিল দিয়ে যায় তার জামাইয়ের কাছে সেই মামলা। আর ক্রিমিনাল কেস হলে লোয়ার কোর্টের মামলা জজ কোর্টে—বিচার নাই। জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড। উই হ্যাভ টু মেক আ কমপ্লিট চেঞ্জ এবং সিস্টেম আমাদের পরিবর্তন করতে হবে, যেন ইজিলি মানুষ বিচার পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচার পায়।

‘সমস্ত কিছুর পরিবর্তন দরকার। কলোনিয়াল পাওয়ার-এর রুল নিয়ে দেশ চলতে পারে না। কলোনিয়াল পাওয়ারে দেশ চলতে পারে না।

‘নতুন স্বাধীন দেশ, স্বাধীন মতবাদ, স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করতে হবে। সেখানে জুডিশিয়াল সিস্টেমের অনেক পরিবর্তন দরকার। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো কথা শুনব না।’

এরপর পেরিয়ে গেছে ৪২টি বছর। যাঁরা উঠতে-বসতে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কায়েম করার জন্য মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন, তাঁদের রিপোর্ট কার্ডটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার। প্রশাসনিক আর বিচারিক সংস্কারের জন্য কমিশনের পর কমিশন তৈরি হচ্ছে, অবসরে যাওয়ার পরও বিচারকেরা মোটা বেতন-ভাতা নিয়ে নানা কমিশনে কাজ করছেন। প্রতিবছর আইনশাস্ত্রে হাজার হাজার স্নাতক তৈরি হচ্ছেন। দেশে সংবিধান বিশেষজ্ঞের ছড়াছড়ি। কিন্তু পঁচাত্তর সালে সংসদে দেওয়া সংসদ নেতার সত্য ভাষণে যে অবস্থার বিবরণটি পাওয়া যায়, আমরা কি তার চেয়ে আগে বাড়তে পেরেছি?

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করা, আইন সংস্কার—এসব কথা শুনতে শুনতে আমাদের কান পচে গেছে। ব্যাঙের ছাতার মতো অনেক প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠছে। কিন্তু বিচার বিভাগের দৈন্যদশা কাটছে না। বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনুযোগ কমছে না।

সম্প্রতি ভয়াবহ সব সংবাদ দেখছি গণমাধ্যমে, কেউ ২০ বছর, কেউ ১০ বছর বিনা বিচারে জেলহাজতে পচে মরছেন। বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই জেলে বন্দী অবস্থায় মারা যাচ্ছেন। একজনের দোষে নির্দোষ অন্য কেউ সাজা ভোগ কিংবা হাজতবাস করছেন। দু-চারটা হাই প্রোফাইল মামলা নিয়ে আমরা হইচই করি। আর হাজার হাজার মামলা ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে থাকে বছরের পর বছর। বাহাত্তর আর পঁচাত্তর নিয়ে মারামারি করি। শব্দ নিয়ে কুতর্ক-বিতর্ক চলে, চায়ের পেয়ালায় তুফান ওঠে। তারপরও আমরা ঘটা করে স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবস উদ্‌যাপন করি। কার স্বাধীনতা? কার বিজয়? স্বাধীনতা এবং বিজয়কে অর্থবহ করতে হলে নাগরিকদের মনের কথা পড়ার ক্ষমতা শাসকদের অর্জন করতে হবে। তাঁরা কি পেরেছেন?

 

নোট: আমার এই লেখাটি প্রথম আলো‘য় প্রকাশিত।

0 Shares