শামসুজ্জোহা মানিক

 

 

ইসলামের সমস্যা

 

 

মুসলিম বা ইসলামী সমাজের সমস্যা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের সমস্যা। কারণ মুসলিম সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি ইসলাম ধর্ম তথা ইসলামী প্রথা, বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ। এগুলির প্রধান উৎস কুরআন ও হাদীস। কুরআন হচ্ছে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদের বলা সেই সকল বাণীর সংকলন যেগুলিকে সরাসরি আল্লাহর প্রত্যাদেশ বলা হয়, আর হাদীস হচ্ছে মুহাম্মদের কথা, কাজ এবং কাজের অনুমোদন সংক্রান্ত সংকলনগুলি।

এটা ঠিক যে, আধুনিক যুগে ইসলামের বহু নিয়ম ও রীতিনীতি মেনে চলা সম্ভব হয় না বা মানাও হয় না। যেমন ধরা যাক চিত্র নির্মাণের কথা। ইসলামে প্রাণীর মূর্তি বা চিত্র নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও এটা এখন খোদ সৌদী আরবও সব ক্ষেত্রে মানে না। ফলে হজের জন্য পাসপোর্ট করতে হলেও ছবি লাগে। এখন ছবি নিষিদ্ধ করলে পাসপোর্ট এবং সেই সঙ্গে সৌদী নাগরিক নয় এমন সবার হজ নিষিদ্ধ করতে হয়। ইসলামে নিষিদ্ধ বা অনাকাঙ্ক্ষিত এমন বহু কিছু আছে যেগুলিকে নিষিদ্ধ বা বন্ধ করা সম্ভব নয়। ফলে সিনেমা, অভিনয়, পর নারী-পুরুষের মেলামেশা, নারীদের শিক্ষা ও পুরুষ নিকটাত্মীয় সঙ্গে না নিয়ে এবং মুখ-মাথা-শরীর না ঢেকে বাহিরে যাওয়া ইত্যাদি অনেক কিছুকে ইসলামী সমাজ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এসবই সাধারণভাবে পাশ্চাত্য সভ্যতার আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবের ফল। ফলে এসবই বহিরারোপিত, যার প্রতি থাকে অক্ষম ইসলামের অন্তর্গত ঘৃণা ও প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা, যা যে কোনও সুযোগে বিস্ফোরিত হতে ও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

ইসলামে সমস্ত ক্ষমতা এককেন্দ্রীভূত। খ্রীষ্টধর্মে একেশ্বরবাদ থাকলেও ঈশ্বরপুত্র যীশু খ্রীষ্টের হাতে এ পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষমতা অর্পিত। বাইবেলে বলা হচ্ছে বিচার দিবস পর্যন্ত স্বর্গ ও মর্ত্যের যাবতীয় ক্ষমতা ঈশ্বর যীশুর হাতে অর্পণ করেছেন। শুধু তাই নয় বিচার দিবসে ঈশ্বরের পাশে বসে যীশু মানুষের পাপ-পুণ্যের বিচার করবেন। এভাবে খ্রীষ্টধর্ম তত্ত্বগতভাবে দ্বৈততার এমন এক অবস্থান দিয়েছে যা সমস্ত ক্ষমতা এক হাতে কেন্দ্রীভূত করার পথে বিরাট বাধা অর্পণ করে। খ্রীষ্টধর্ম একেশ্বরবাদী হলেও এটা দ্বৈততার এমন এক জায়গা তৈরী করেছে যা চিন্তা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজের ভিতর ব্যক্তি এবং ফলত গণতন্ত্রের অস্তিত্বের একটা সুযোগ করে রাখে ইসলামে যেটার কল্পনাও করা চলে না। অন্যদিকে, খ্রীষ্টধর্ম মানুষকে ঈশ্বরের দাস মাত্র করে নাই যে তার কোনও অধিকার থাকবে না। সে দয়াময় বা প্রেমময় ঈশ্বরের সন্তানও বটে। ফলে এই সন্তান তার পিতার কাছে অনেক কিছুই দাবী করতে পারে। কিন্তু ইসলামে স্বাধীন মানুষের অস্তিত্ব নাই। সকলেই আল্লাহর বান্দা বা দাস। কুরআনে বলা হচ্ছে, ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেহ নাই, যে দয়াময়ের নিকট বান্দারূপে উপস্থিত হইবে না’(১৯ নং সূরা মার্য়াম ꞉ ৯৩ নং আয়াত)।[1] অথবা বলা হচ্ছে, ‘আমার দাসত্বের জন্যই মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করেছি’(৫১꞉৫৬)।[2] হাদীসে মুহাম্মদ নিজেও বলছেন, ‘আমি আল্লাহর বান্দা ও রসূল।’[3]

অর্থাৎ এই ধর্মে মুহাম্মদসহ সবাই আল্লাহর দাস। এই রকম সর্বাত্মক দাসত্বের ধর্মে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের বান্দা তার মালিক বা প্রভু আল্লাহর কাছে তেমন কোন দাবীই করতে পারে না যা খ্রীষ্টধর্মের মানুষ তার পিতা ঈশ্বরের কাছে করতে পারে। সুতরাং মানুষের স্বাধীনতার চেতনা ইসলামের চেতনা বিরোধী। বান্দাত্ব বা দাসত্বের সর্বাত্মক চেতনার উপরই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত।

এই রকম এক বান্দা সমাজ তথা দাস সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (জন্ম আনুমানিক ৫৭০ খ্রীঃ – মৃত্যু ৬৩২ খ্রীঃ) যে পথ বেছে নিয়েছিলেন তা হল যুদ্ধ। যতদিন তিনি মক্কায় শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম প্রচার করেছিলেন ততদিন তার অনুসারীদের সংখ্যা ও শক্তি খুব সামান্য ছিল। মক্কায় তেরো বৎসরে তার অনুসারী একশত থেকে দেড়শত জনের মত ছিল। কিন্তু মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই অবস্থা বদলে যায়। মদীনায় গিয়ে তিনি যে পথ গ্রহণ করেন তা হল যুদ্ধ। কুরআনে বলা হল, ‘তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেওয়া হইল যদিও তোমাদের নিকট ইহা অপ্রিয়। কিন্তু তোমরা যাহা অপসন্দ কর সম্ভবত তাহা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যাহা ভালবাস সম্ভবত তাহা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ্ জানেন আর তোমরা জান না’ (২꞉২১৬)।[4] অথবা ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের হইল কী যে, যখন তোমাদিগকে আল্লাহর পথে অভিযানে বাহির হইতে বলা হয় তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হইয়া ভূতলে ঝুঁকিয়া পড়? ….. যদি তোমরা অভিযানে বাহির না হও, তবে তিনি তোমাদিগকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিবেন …..’ (৯꞉৩৮-৩৯)। বুঝাই যায় যে মুসলমানরা প্রথম দিকে যুদ্ধের পথে যেতে অনিচ্ছুক ছিল, যে কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের সপক্ষে এভাবে আরও অনেক ওহী বা আয়াত নাজিল করতে হয়েছে। এই বাস্তবতায় একদিকে নিরঙ্কুশ একেশ্বরবাদ এবং অপর দিকে যুদ্ধ ইসলামকে যে বিশিষ্টতা দিয়েছে তা দিয়ে তাকে বুঝতে হবে।[5] বুদ্ধ বা যীশুর মতাদর্শ বা ধর্ম ছিল অহিংসা ও শান্তিতে বিশ্বাসী। বুদ্ধ বা যীশু সংসারীও ছিলেন না। মানুষের মুক্তির পথের সন্ধানে রাজার পুত্র গৌতম বুদ্ধ সংসার ও স্ত্রী-পুত্র ত্যাগ করেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে তার শান্তি ও অহিংসার ধর্ম প্রচার করেন। একইভাবে যীশুও তার ধর্ম প্রচারে মানুষের প্রতি শান্তি ও অহিংসাকে গুরুত্ব দেন। যীশু বলছেন, ‘যে কেহ তোমার দক্ষিণ গালে চড় মারে, অন্য গাল তাহার দিকে ফিরাইয়া দেও’(বাইবেল꞉নূতন নিয়ম, মথি – ৫꞉৩৯)। যীশুর অনেক পরবর্তী কালে খ্রীষ্টধর্মে জবরদস্তি ও যুদ্ধ প্রবেশ করলেও সেটা ছিল খ্রীষ্টানদের প্রতি দীর্ঘ নির্যাতন ও সহিংসতার প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে দীর্ঘ ইসলামী আগ্রাসনে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা থেকে খ্রীষ্টধর্ম উচ্ছেদ হয়ে যায়। ইউরোপ ছিল দীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত ইসলামী আরব ও তুর্কী আক্রমণের শিকার। এছাড়া ছিল প্যালেস্টাইনে যাওয়া ইউরোপের খ্রীষ্টান তীর্থযাত্রীদের প্রতি দুর্ব্যবহার। এইসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ঘটে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ। তবে মনে রাখতে হবে পোপ তথা চার্চের আহ্বানে ক্রুসেড সংগঠিত হলেও যুদ্ধ করেছিল যোদ্ধা ও রাজারা।

বস্তুত ধর্মের প্রভাবে যেসব সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় সেইসব সমাজের মূল বৈশিষ্ট্য, প্রবণতা এবং চরিত্র বুঝবার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে সেই সব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাদেরকে বুঝা। এটা বুঝতে হবে যে, একটা সমাজ যত শান্তিবাদী হোক বাইরের শক্তির আগ্রাসন ও অধীনতা বা ধ্বংস থেকে তা বাঁচতে পারে না যদি তার সামরিক বা যুদ্ধের শক্তি না থাকে। এভাবে আমরা দেখি খ্রীষ্টান বা বৌদ্ধ সমাজেও যুদ্ধ ও সহিংসতার উপস্থিতি। এটা হচ্ছে বাস্তবতা বা ব্যবহারিক জীবনের চাহিদা বা দাবীর পূরণ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে যুদ্ধকে সমাজ বিশেষত ধর্মীয় দৃষ্টি থেকে তার নৈতিক আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে। এই অবস্থায় আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা ধর্মের দিক থেকে কখনও যুদ্ধকে গ্রহণ করা বা বৈধতা দেওয়া হলেও যুদ্ধকে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয় না। যে কারণে খ্রীষ্টান পাদ্রী বা বৌদ্ধ শ্রমণ তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করে বেড়ায় না। কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে আমরা বিপরীতটা ঘটতে দেখি। এখানে ধর্ম প্রচারক ও যোদ্ধা একই ব্যক্তি।

বুদ্ধ বা যীশুর পাশে মুহাম্মদকে দাঁড় করালে ইসলামকে আমরা অনেক সহজে বুঝতে পারব। ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলা হলেও তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুদ্ধের মাধ্যমে। ইসলামী ইতিহাসবিদদের দ্বারা লিখিত মুহাম্মদের জীবনীতে মদীনায় তার বসবাসকালীন শেষ দশ বৎসরে মুহাম্মদ কর্তৃক পরিচালিত বা নির্দেশিত ৭০ থেকে ১০০টি ব্যর্থ বা সফল আক্রমণ, লুণ্ঠন অভিযান এবং যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৭ থেকে ২৯টিতে মুহাম্মদ নিজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।[6]  মজার ব্যাপার হচ্ছে বদর, ওহোদ ও খন্দক বাদে এই যুদ্ধগুলির সবই পরিচালিত হয়েছে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী বা উপজাতিদের উপর বাধ্যতামূলকভাবে তার ধর্ম চাপিয়ে দিবার জন্য। বদর, ওহোদ ও খন্দকের যুদ্ধ ছিল মুহাম্মদের নিজ গোত্র কুরাইশদের দিক থেকে মদীনার উপর আক্রমণ। কিন্তু কুরাইশদের দ্বারা পরিচালিত প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধ ছিল কুরাইশদের বাণিজ্য বহরসমূহের উপর মদীনার ইসলামী বাহিনীর আক্রমণ, লুণ্ঠন ও হত্যা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত। এই যুদ্ধে মক্কার কুরাইশ বাহিনী পরাজিত হয়ে ফিরে যায়। এরপর কুরাইশ সেনাবাহিনী পুনরায় মদীনা আক্রমণ করলে ওহোদের প্রান্তরে যে যুদ্ধ হয় তাতে ইসলামী বাহিনী পরাজিত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মুহাম্মদ নিজে গুরুতর আহত ও অজ্ঞান হয়ে যান। কুরাইশরা ইচ্ছা করলে তাকে হত্যা করতে পারত। কিন্তু তারা তা না করে চলে যায়। যাবার পূর্বে তারা বলে যে, তারা মুহাম্মদকে হত্যা করতে আসে নাই, বরং বদরের যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এসেছিল। সেই প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে। সুতরাং তারা ফিরে যাচ্ছে।

এটা বুঝা যায় যে, যে কারণে কুরাইশরা মক্কায় মুহাম্মদকে তার ধর্ম প্রচারের তেরো বৎসর সহ্য করেছিল একই কারণে তারা মুহাম্মদকে হত্যা না করে ফিরে গিয়েছিল। তারা চেয়েছিল তিনি যাতে শান্তিপূর্ণভাবে তার ধর্ম প্রচার করেন। সুতরাং ওহোদের যুদ্ধের পর তারা সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু তারা মুহাম্মদকে চিনতে ভুল করেছিল। এরপর মুহাম্মদ পুনরায় ধর্ম প্রচারে তার যুদ্ধ তৎপরতায় ফিরে যান। কুরাইশদের তৃতীয় এবং শেষ আক্রমণ ছিল খন্দকের যুদ্ধ। মুহাম্মদ কুরাইশদের বিশাল বাহিনীর মোকাবিলায় সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ না হয়ে পরিখা খনন করে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করেন। আরবরা এমন কোন যুদ্ধ কৌশলের কথা ইতিপূর্বে জানত না এবং এ ধরনের যুদ্ধের জন্য তাদের কোন প্রস্তুতি ছিল না। সুতরাং কয়েক দিন (প্রায় কুড়ি দিন, কারও মতে প্রায় এক মাস)[7] অবরোধ করার পর কুরাইশরা হতোদ্যম হয়ে মক্কায় ফিরে যায়। এটাই ছিল কুরাইশদের দিক থেকে প্রত্যাঘাতের শেষ প্রয়াস।

যাইহোক, যুদ্ধ ইসলামকে যে বিশিষ্টতা দিয়েছে তা না বুঝলে আমরা ইসলামের কিছুই বুঝব না। পৃথিবীর কোন ধর্মই যুক্তি-প্রমাণ নির্ভর নয়। সবই বিশ্বাস বা আরও সঠিকভাবে বললে অন্ধ বিশ্বাস নির্ভর। আরবে তখন বিভিন্ন উপজাতির নিজস্ব যেসব ধর্ম ও দেবতা ছিল সেগুলি যেমন অন্ধ বিশ্বাস নির্ভর ছিল তেমন খ্রীষ্টান ও ইহুদীদের ধর্মও ছিল অন্ধ বিশ্বাস নির্ভর। কিন্তু মুহাম্মদ বললেন একমাত্র তার ধর্মই সত্য এবং অন্য সকল ধর্ম মিথ্যা। সুতরাং যারা তার ধর্মমত তথা তার আনুগত্য গ্রহণ করবে না তাদেরকে তিনি কাফের অর্থাৎ সত্য প্রত্যাখ্যানকারী বললেন। স্বাভাবিকভাবে সবাই যার যার নিজ বিশ্বাসকে সত্য মনে করে নিজ নিজ ধর্মকে ধরে রাখতে চাইবে। এ ক্ষেত্রে মুহাম্মদ অন্যদের উপর নিজ ধর্মকে চাপিয়ে দিবার জন্য তলোয়ার তথা যুদ্ধের আশ্রয় নিলেন। যুদ্ধের অনুষঙ্গ হিসাবে যা যা আনা দরকার মনে করলেন সবই তিনি তার ধর্মে আনলেন। তার পক্ষে যুদ্ধ করে যারা মৃত্যু বরণ করবে তাদেরকে তিনি মৃত্যুর পর স্বর্গ বা বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘তোমরা জানিয়া রাখ, নিশ্চয় বেহেশ্ত তরবারির ছায়াতলে।’[8] তিনি প্রতিপক্ষের সম্পদ লুণ্ঠনকে ধর্ম সম্মত করলেন। পরাজিতদের তিনি বন্দী এবং দাস করলেন। তাদেরকে এবং তাদের সকল সম্পদ ও সম্পত্তি তিনি গনীমতের মাল হিসাবে ভাগবাটোয়ারা করলেন। এই গনীমতের মাল হল নারী ও শিশুরাও। কুরআনের নির্দেশ (কুরআন- ৮꞉৪১) হাজির করে গনীমতের মালের এক পঞ্চমাংশ বা ২০% নিজের ভাগে রেখে বাকী চার পঞ্চমাংশ বা ৮০% যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা করলেন।

এভাবে অপরের সম্পদ ও সম্পত্তি লুণ্ঠন এবং অপরকে দাস-দাসী করার এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা হল। এর ফলে ধর্মের মাধ্যমে ইসলামী সমাজে দাস ব্যবস্থা ব্যাপকায়তনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। শুধু তা-ই নয় যুদ্ধে বন্দিনী বা দাসী ধর্ষণকেও ধর্মীয় বিধানে বৈধতা দেওয়া হল। কুরআনে বলা হল, ‘যাহারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে, নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত, ইহাতে তাহারা নিন্দনীয় হইবে না’ (২৩꞉৫-৬), ‘এবং যাহারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে, তাহাদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত, ইহাতে তাহারা নিন্দনীয় হইবে না’ (৭০꞉২৯-৩০), ইত্যাদি। এ ছাড়া বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা ‘অধিকারভুক্ত দাসীদের’ প্রতি ইসলামের যোদ্ধাদের এই ধরনের অধিকারের প্রয়োগ সম্পর্কে জানতে পারি। একটি হাদীসের কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক, ‘আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, “কোন এক জেহাদে শত্রু পক্ষের লোক আমাদের হাতে বন্দী হইল। (নারী বন্দিনীদের সুব্যবস্থাপনাকল্পে শরীয়ত সম্মত বৈধ সম্পর্ক সূত্রে) তাহারা আমাদের করায়ত্তে আসিলে পর আমরা নিজ নিজ প্রাপ্ত রমণীকে ব্যবহার করিলাম।”[9]

এই ধর্ষণের চর্চা অন্যান্য সাহাবার মত ইসলামের নবী মুহাম্মদও যে করতেন কুরআন-হাদীসের যে কোন মনোযোগী পাঠক তা বুঝবেন। এ প্রসঙ্গে এখানে বেশী আলোচনা না করে একটা উদাহরণ উল্লেখ করব। মদীনার বানু কুরাইযা গোত্র ছিল ইহুদী। মুহাম্মদ ও ইসলামের বিরুদ্ধে তারা চক্রান্ত করছে এই অভিযোগ তুলে মুহাম্মদ শান্তিপূর্ণ এবং যুদ্ধের জন্য অপ্রস্তুত বানু কুরাইযা গোত্রকে আক্রমণ করলেন। সবাইকে বন্দী করা হল। অতঃপর মুহাম্মদ যৌনাঙ্গে কেশ গজিয়েছে এমন সকল পুরুষ বন্দীকে প্রাপ্তবয়স্ক বিবেচনা করে হত্যার নির্দেশ দেন। নিজ হাতে বানু কুরাইযা গোত্র প্রধান কাব বিন আসাদের শিরোশ্ছেদ করে তিনি এই হত্যাযজ্ঞের সূচনা করেন। একটি গর্ত খুঁড়ে তার পাশে এভাবে গলা কেটে হত্যা করে লাশ সেই গর্তে ফেলা হচ্ছিল। এভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যার অন্ধকার হলে মশাল জ্বালিয়ে ৮০০ থেকে ৯০০ ইহুদীকে হত্যা করা হয়।[10]

ইতিমধ্যে বন্দী নারী ও শিশুদের গনীমতের মাল হিসাবে ভাগবাটোয়ারা করা হয়। এরা হল দাস-দাসী। সেই সঙ্গে ভাগ করা হল ইহুদীদের সহায়-সম্পদ যা ছিল সবকিছু। এই ভাগ বাটোয়ারায় মুহাম্মদ নিজ ভাগে নেন এক সুন্দরী তরুণী রায়হানাকে। অন্যান্য বন্দীর মত রায়হানা প্রত্যক্ষ করে তার স্বামী, পিতা এবং ভাইদেরকে গলা কেটে হত্যা করার দৃশ্য। ঐ নারীর ‘ট্রমা’ আমরা সহজেই অনুভব করতে পারি।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ঐ নারীর অমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পরেও ঐ রাতেই নবী রায়হানাকে সম্ভোগ করার জন্য নিজ শয্যায় টেনে নিয়ে যান। ঐ একই রাতে মুহাম্মদের অন্য সাহাবীরাও নিজদের ভাগের নারীদেরকে ধর্ষণ করে, যারা একইভাবে এক ভয়ংকর ‘ট্রমা’র শিকার হয়েছিল সারাদিন ধরে আপনজনদের হত্যাযজ্ঞ দেখে। ইসলামের এই এক পদ্ধতিই যথেষ্ট মানুষের অনুভূতিকে ধ্বংস করে দিবার জন্য। এটা অস্বাভাবিক নয় যে ইসলামের এই ধরনের ভয়ংকরতার শিকার যারা হয় তারা তাদের শিকারীদের মতই একটা পর্যায়ে মানবিকতার সব কিছু হারিয়ে ফেলে।

বন্দী নারী এবং দাসী সম্ভোগে ইসলামের নবীর রুচির কথা আমাদের অজানা নয়। উপহার হিসাবে পাঠানো মিসরের সুন্দরী দাসী মারিয়ার গর্ভে মুহাম্মদের এক স্পল্পায়ু পুত্রের কথাও আমরা হাদীস থেকে জানতে পারি, যার নাম ছিল ইবরাহীম।

বস্তুত ইসলামের নবী মুহাম্মদ হলেন ইসলামের প্রথম হেরেম প্রতিষ্ঠাতা, যেখানে ছিল তার বহু সংখ্যক স্ত্রী এবং যুদ্ধবন্দী দাসী। তার স্ত্রীর সংখ্যা নিয়ে মতৈক্য নাই। সেটা নিম্নে নয় বা এগারো এবং ঊর্ধ্বে কুড়ি বা একুশ হতে পারে। নারীর প্রতি অসংযত লালসা যে নবীর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা ছিল তা তার ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে কিছু জানলেই বুঝা যায়।

মুহাম্মদের পালক পুত্র যায়িদের স্ত্রী ছিলেন যয়নব। এক সময় তার প্রতি মুহাম্মদের আসক্তি জন্মালে আরবের সর্বজন পালিত রীতিকে লঙ্ঘন করে যায়িদ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যয়নবকে তিনি বিবাহ করেন। অথচ তৎকালীন আরবে পালক-পুত্রকে আপন পুত্রসম জ্ঞান করা হত। এই রীতি লঙ্ঘনের সমর্থনে তিনি আল্লাহর তরফ থেকে ওহী উপস্থিত করেন, ‘তোমার পোষ্য পুত্রদিগকে তিনি তোমাদের পুত্র করেন নাই’ (কুরআন-৩৩꞉৪)। তাছাড়া দ্রষ্টব্য কুরআনের ৩৩꞉৩৭ আয়াত যেখানে যয়নবকে বিবাহের সপক্ষে আল্লাহর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।[11] যয়নব ছিলেন নবী থেকে তেইশ বৎসরের ছোট।

কিন্তু আবু বকরের ছয় বৎসরের শিশু কন্যা আয়েশাকে পঞ্চাশ বৎসর বয়সী নবীর বিবাহকে কী দৃষ্টিতে দেখা যাবে? জীবনের ভাল-মন্দ কিছুই বুঝবার বয়স যার হয় নাই এবং পুতুল নিয়ে যার খেলবার কথা তাকে পঞ্চাশ বৎসরের বৃদ্ধ নবী বিয়ে করেন। আয়েশার বয়স নয় হলে মুহাম্মদ তাকে স্বগৃহে নিয়ে যান।

একটা ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা যদি তার ধর্মমত প্রতিষ্ঠার জন্য আক্রমণ, যুদ্ধ, লুণ্ঠন, ধর্ষণ এবং দাসকরণের পথ বেছে নেয় তবে তার ফল কত ভয়ানক হতে পারে তা সহজে অনুমেয়। এই সবকিছুকেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে আল্লাহর নামে। অর্থাৎ আল্লাহর ধারণা এবং বিশ্বাস ছিল মুহাম্মদের হাতিয়ার।

মরুময় আরবের যাযাবর ও পশুপালক বেদুইন উপজাতিরা ছিল যুদ্ধপ্রবণ। তৎকালীন আরবের ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র মক্কার সবচেয়ে প্রভাবশালী গোত্র বা উপজাতি কুরাইশরা তাদের ঐক্যবদ্ধ ও সংযত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ দিয়েছিল। যেমন বিভিন্ন উপজাতির নিজ নিজ দেবতার প্রতীক হিসাবে তাদের মূর্তিকে মক্কায় অবস্থিত কাবাগৃহে স্থান দান এবং ধর্মমন্দির হিসাবে কাবাকে কেন্দ্র করে নিয়মিত বাৎসরিক পূজা ও মিলন মেলার আয়োজন করা। এভাবে কাবা হয়ে উঠে বৃহত্তর আরবের ঐক্যের প্রতীক। বলা হয় কাবা গৃহে ছিল ৩৬০টি প্রতিমা। এছাড়া আরবের উপজাতিগুলির মধ্যে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে চার মাস যুদ্ধ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যা আরবরা কঠোরভাবে মেনে চলত। এভাবে কুরাইশরা পেগান বা পৌত্তলিক আরবদের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন দেবতা-বিশ্বাস বা উপজাতীয় ধর্ম-বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে আরবে এমন একটা ঐক্য গড়ে তুলছিল যার পরিণতি ছিল একটা রাষ্ট্র গঠন, যা তখন পর্যন্ত মূল আরব ভূখণ্ডে ছিল না। অর্থাৎ কুরাইশরা বিভিন্ন গোত্র-উপজাতি ও ধর্ম বিশ্বাসের সমন্বয়ে আরবে শান্তিপূর্ণভাবে একটি বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া চালু করেছিল।

মুহাম্মদ এই রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াকে ভিন্ন রূপ ও পদ্ধতি দান করেন যুদ্ধ এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজের নিরঙ্কুশ একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা দ্বারা। এ কাজে ধর্ম এবং ধর্মযুদ্ধ বা জিহাদ হল তার হাতিয়ার। মুহাম্মদের ধর্ম প্রচারে যুদ্ধ এমনই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হল যে আরবের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও রীতিকে উড়িয়ে দিয়ে যে চার মাস ছিল যুদ্ধের জন্য নিষিদ্ধ এবং শান্তির সময় সেই সময়েও তিনি আক্রমণ ও যুদ্ধ শুরু করলেন। এই সবই করলেন তিনি আল্লাহর নামে। কুরাইশ এবং মক্কার আশপাশের আরবদের প্রধান দেবতা আল্লাহকে তিনি একমাত্র দেবতা বা উপাস্য হিসাবে ঘোষণা করলেন এবং অন্য সকল দেবতাকে নাকচ করলেন। যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহর নিরঙ্কুশ একত্ব (লা শরীক আল্লাহ) ও শ্রেষ্ঠত্বের (আল্লাহু আকবর) ধারণা প্রতিষ্ঠা দ্বারা আরবের বিদ্যমান উপজাতীয় স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিকে চূর্ণ করে একটি যুদ্ধ ভিত্তিক নিরঙ্কুশ একনায়কী ধর্মীয় সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন। ধর্মকে ব্যবহার করে তিনি হলেন এই রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ একনায়ক।

এই একনায়কী সামরিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুহাম্মদ আরব মরুচারী বেদুইনদের সহিংসতা, লুণ্ঠনপরায়ণতা এবং ধর্ষণপরায়ণতাকে অর্গলমুক্ত করে ব্যবহার করলেন। এক উপজাতিকে ইসলামে দীক্ষিত করে তাকে তিনি আর এক অমুসলিম উপজাতিকে আক্রমণের বাহিনী হিসাবে ব্যবহার করলেন। আক্রান্ত ও পরাজিত উপজাতি লুণ্ঠিত ও ধর্ষিত হবার যে অভিজ্ঞতা লাভ করল বাধ্যতামূলকভাবে ইসলাম গ্রহণ করার পর একই অভিজ্ঞতার শিক্ষা তারা অন্যদের উপরেও প্রয়োগ করল। এটা একটা চেইন রিঅ্যাক্শন। যুদ্ধ, হত্যা, লুণ্ঠন এবং ধর্ষণের মধ্য দিয়ে গোটা আরবের ইসলামীকরণ সম্পন্ন হলে একই প্রক্রিয়ায় চলল আরবের বাইরেও ইসলামের সম্প্রসারণ । ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ইসলামের নামে যে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ যজ্ঞ পরিচালনা করেছিল তা মুহাম্মদের দ্বারা প্রবর্তিত এই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা মাত্র।

জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধ হচ্ছে ইসলামের প্রাণশক্তির মূল উৎস। অর্থাৎ মুহাম্মদ তার নিরঙ্কুশভাবে একনায়কী আধিপত্য এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন মূলত যুদ্ধের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে অপর দুই প্রধান ধর্ম প্রতিষ্ঠাতা যীশু এবং বুদ্ধের সঙ্গে তার একটি মৌল পার্থক্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। মুহাম্মদ যীশু এবং বুদ্ধের মত শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের হৃদয়ের কাছে আবেদন রেখে তার ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন নাই। তাই মক্কা থেকে মদীনায় যাবার পর থেকেই একজন আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী সেনাপতি বা যোদ্ধা হিসাবে তার আবির্ভাব। যোদ্ধা হিসাবে আবির্ভাবের পর থেকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তিনি তার ধর্মের প্রসার ও প্রতিষ্ঠায় সফল হন। অর্থাৎ তিনি সাফল্যের সাথে তার কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, সম্পদ এবং অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সমর্থ হন। সুতরাং মুহাম্মদের ধর্ম তথা ইসলামকে বুঝতে হবে মূলত যুদ্ধের ধর্ম হিসাবে। অপর পার্থক্যটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেটা হচ্ছে মুহাম্মদ যীশু বা বুদ্ধের মত কোন অরাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নাই, বরং ধর্মের মাধ্যমে এমন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন যা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্র নেতা বা শাসকে পরিণত করেছিল। অর্থাৎ মুহাম্মদকে চিনতে পারতে হবে একজন সশস্ত্র ও সহিংস ধর্ম প্রচারক, রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে। সুতরাং মুহাম্মদের ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে যুদ্ধ। এখানে যুদ্ধ, রাষ্ট্র এবং ধর্ম একীভূত অথবা এমনইভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে একটাকে অপরটা থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। সুতরাং যুদ্ধ কী জিনিস তা বুঝলে ইসলামের মর্ম উদ্ঘাটন করা আরও সহজ হবে।

প্রথমে বুঝতে হবে যুদ্ধ কেন? অন্ধ বিশ্বাস বাদ দিলে উত্তর সহজ। ধর্ম বিশ্বাসকে ব্যবহার করে মুহাম্মদের নিজের একক শ্রেষ্ঠত্ব এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। যারা তার কথায় বিশ্বাস ক’রে তার নিরঙ্কুশ শ্রেষ্টত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে নিবে তথা তার কাছে আত্মসমর্পণ করবে তারা তার শত্রু হবে না। যারা তা করবে না তারা হবে শত্রু। তার ভাষায় এরা সবাই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী অর্থাৎ কাফের। এই সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তিনি করবেন জিহাদ বা যুদ্ধ।

তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? মুহাম্মদের মতানুযায়ী বিশ্ব-স্রষ্টা ও বিশ্ব-শাসক হিসাবে আল্লাহ যেমন একমাত্র সত্য তেমন পৃথিবীতে তার প্রতিনিধি হিসাবে মুহাম্মদও একমাত্র সত্য। আল্লাহর অস্তিত্বের একমাত্র সাক্ষী ও প্রমাণ মুহাম্মদ নিজে। সুতরাং যারা তাকে বা তার কথা অস্বীকার করে তারা সবাই মিথ্যা। এই মিথ্যার উপর জয়যুক্ত হওয়া তথা তার স্বমতে এবং নিজ আধিপত্যাধীনে সবাইকে আনার জন্য যুদ্ধবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী তিনি সবই করেছেন বা করাকে যুক্তিসঙ্গত মনে করেছেন, যেটা পৃথিবীর সকল দক্ষ ও সফল সেনাপতি বা জেনারেলই করে। সুতরাং মুহাম্মদকে চিনতে হবে বুদ্ধ বা যীশুর বিপরীতে এমন একজন দক্ষ ও সফল জেনারেল রূপে যিনি তার ধর্মমত ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন যুদ্ধের মাধ্যমে।

একজন আধিপত্যবাদী রাজা বা সেনানীর মত তিনি তার প্রতি আনুগত্য প্রদান কিংবা আরও সঠিকভাবে বললে আত্মসমর্পণের জন্য প্রথমে অন্যদেরকে আহ্বান জানাচ্ছেন। যারা সেই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি সকল দক্ষ সেনাপতি বা সমর নেতার মতই কৌশলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এবং সেই সঙ্গে ছল-চাতুরী, গোপনতা, মিথ্যা এবং প্রতারণাকে। মুহাম্মদ নিজেই বলছেন, ‘কৌশলই যুদ্ধের প্রাণ বস্তু।’[12] কিংবা বলছেন, ‘কূটকৌশলের নামই যুদ্ধ।’[13] অথবা ‘কৌশলই হল যুদ্ধ।’[14] শুধু এইটুকুই নয়, মুহাম্মদ আরও বলছেন, ‘যুদ্ধ একটি প্রতারণা বিশেষ।’[15]

এ যেন মুহাম্মদেরও প্রায় এক হাজার বৎসর পূর্বে জন্ম নেওয়া চীনের বিশ্ববিখ্যাত সমর বিজ্ঞানী সান জু-এর কথার প্রতিধ্বনি। আজকের যুগে যুদ্ধ বিদ্যা বা সমর বিজ্ঞানের চর্চা যারা করেন তাদের নিকট সান জু খুব পরিচিত একটা নাম। খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ বৎসর পূর্বে চীনের উ রাজ্যের অজেয় সেনাপতি সান জু তার লেখা গ্রন্থ ‘যুদ্ধবিদ্যা’ (The Art of War)-এর জন্য অমর হয়ে আছেন।

সান জু-এর মতে সামরিক শক্তি বা গায়ের জোরের চেয়ে কৌশল, গোপনতা এবং প্রতারণা যুদ্ধে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। সান জু বলছেন, ‘সব যুদ্ধেরই ভিত্তি হচ্ছে প্রতারণা।’ (All warfare is based on deception.)

যুদ্ধে গোপনতা রক্ষার উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ যে তার অনুসারী বা সাহাবীদের নিকটও সত্যের পরিবর্তে মিথ্য বলতেন সে সম্পর্কেও আমরা হাদীস থেকে জানতে পারি। বোখারী শরীফের একটি হাদীস থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক, ‘রসুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু অসাল্লাম কোন অভিযানের ইচ্ছা করিলে পূর্বাহ্নে উহার স্থান নির্দিষ্টরূপে উল্লেখ করিতেন না; বরং গোপনীয়তা রক্ষার্থ অন্য কোন স্থানের (এলাকা বা দিক রূপে) নাম উল্লেখ করিতেন।’[16] শত্রুদের বিশ্বাসঘাতকতা বা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ যে পূর্বেই নবীকে জানিয়ে দিতেন সে কথা আমরা হাদীস থেকে জানতে পারি। এ প্রসঙ্গে বোখারী শরীফের একটি হাদীসের কথা আমরা উল্লেখ পারি যেখানে বলা হয়েছে যে, ইহুদী বনু নযীর গোত্রের সঙ্গে মুহাম্মদের আলোচনা সভায় তাকে হত্যার জন্য বনু নযীররা হত্যার ষড়যন্ত্র করলে আল্লাহ ওহী মারফৎ তাকে তা জানালে তিনি আলোচনা না করে সভাস্থল থেকে উঠে চলে আসেন। ‘ইহুদীগণ প্রকাশ্যে তাঁহাদিগকে সাদর আহ্বান জানাইল এবং খাতির-তাওয়াজু ও বন্ধুত্বের পরিচয় দিল; কিন্তু ভিতরে ভিতরে অন্যরূপ দুরভিসন্ধি করিল যে ….. একটি বড় পাথর রাসুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লামের উপর ফেলিয়া দিয়া তাঁহাকে প্রাণে বধ করিয়া ফেলিবে। ….. সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা ওহী মারফত রসুলুল্লা (সঃ)-কে সমস্ত ষড়যন্ত্র জ্ঞাত করাইয়া দিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি তথা হইতে উঠিয়া আসিলেন, তাঁহার সঙ্গী ছাহাবীগণও চলিয়া আসিলেন।’[17] অর্থাৎ বুঝাই যায় যে, যে কোন কাজের অজুহাত দিবার জন্য সর্বদাই নবীর নিকট আল্লাহর নাম মজুত থাকত।

যুদ্ধজয়ী হতে হলে নিজের দুর্বলতা, শক্তি, অবস্থান ইত্যাদি শত্রুর নিকট গোপন রাখতে হয়, শত্রুকে ভালভাবে জানতে হয়, সুতরাং তার সম্পর্কে বিশদ সংবাদ সংগ্রহ করতে হয় এবং শত্রুকে মিথ্যা দ্বারা প্রতারিত করে তার দুর্বল জায়গায় ও দুর্বল মুহূর্তে আক্রমণ করতে হয়। আধুনিক কালে যারা সমর বিজ্ঞান চর্চা করেন তারা জানেন যে, এগুলি সকল যুদ্ধের মূলনীতির মধ্যে পড়ে। তাহলে হয়ত প্রশ্ন করা হবে, তাহলে কি মিথ্যা ও প্রতারণার কারণে সকল যুদ্ধই অন্যায়? কিন্তু আমরা জানি যুদ্ধ মাত্রই অন্যায় নয়। তাহলে ’৭১-এ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জাতির যুদ্ধও অন্যায় যুদ্ধ হত। সাধারণ বিচারে আত্মরক্ষা, মানবিক অধিকার অর্জন ও নারীর মর্যাদা রক্ষার জন্য যে কোন শান্তিপূর্ণ মানুষ, জাতি বা জনগোষ্ঠীর যুদ্ধই ন্যায় যুদ্ধ। কিন্তু ইসলামের যুদ্ধকে কি সেই ভাবে বিচার করা যাবে? সুতরাং যুদ্ধের প্রয়োজনে তার মিথ্যা ও প্রতারণার পক্ষে কোন যুক্তিই টিকে না। সবচেয়ে বড় কথা ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য কাউকে যুদ্ধ করতে হবে কেন? তাহলে কি এই দাঁড়ায় না যে আসল উদ্দেশ্য মোটেই পরলৌকিক বা অলৌকিক নয় বরং সম্পূর্ণরূপে ইহলৌকিক বা লৌকিক? ধর্মটা হচ্ছে স্রেফ ধাপ্পা। আত্মপ্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। বস্তুত, কুরআন-হাদীসের মনোযোগী পাঠ আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে নিয়ে যায় যে, এই ধর্ম পুরাটাই দাঁড়িয়ে আছে মিথ্যা, ভণ্ডামি ও প্রতারণার উপর। যুদ্ধে তিনি যেমন মিথ্যাচার, প্রতারণা ও ভণ্ডামি করেছেন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও তিনি তেমন সেই একই কাজ করেছেন।

জিহাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠায় কৌশল, গোপনতা এবং প্রতারণা তথা ছল-চাতুরী ও মিথ্যা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা সহজেই অনুমেয়। ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা। সুতরাং ইসলাম প্রসার ও প্রতিষ্ঠার অপ্রিয় সত্যকে প্রথম থেকেই ইসলামের ইতিহাস লেখকরা যে, যতটা সম্ভব গোপন করেছে তাতে কোনও সন্দেহ নাই। তা সত্ত্বেও ইসলামের মূল ধর্মগ্রন্থ কুরআন এবং হাদীসসহ আদি ইসলামী পর্বের বিভিন্ন দলিল থেকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার যেটুকু অন্ধকার দিক বেরিয়ে আসে সেটুকুই এই ধর্মের তাৎপর্য বুঝার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি কোনও উপজাতি বা গোত্র কিংবা জনগোষ্ঠীকে আক্রমণের পূর্বে মুহাম্মদ কীভাবে গোপনতা অবলম্বন করতেন, কীভাবে তাদের সম্পর্কে গোপনে খোঁজ-খবর নিয়ে অসতর্ক অবস্থায় থাকা তাদের বসতিতে আক্রমণ করতেন। মদীনায় প্রথম দিকে নিজের দুর্বল অবস্থায় তিনি আশপাশের যেসব অমুসলিম উপজাতির সাথে শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন উপযুক্ত সময়ে তাদেরকে আক্রমণ করতেও তার দ্বিধা হত না। তার জন্য তার ছলের অভাব হত না। তার সমালোচনা বা নিন্দা করাও ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। হাদীস থেকে জানা যায় যখন তিনি মক্কা জয় করেন নাই তখনও এ ধরনের ব্যক্তিদেরকে তিনি গুপ্তঘাতক পাঠিয়ে হত্যা করতেন। যখন তিনি জয়ী তখন আর কে তার বিরোধিতা করে বেঁচে থাকবে? মোট কথা আল্লাহর নবীর কোনও ধরনের বিরোধিতার জায়গাই তিনি রাখেন নাই। কিন্তু সকল কাজই মুহাম্মদ আল্লাহর নামে করতেন; সেটা আক্রমণ হোক, যুদ্ধ হোক, লুণ্ঠন হোক, হত্যা হোক, ধর্ষণ হোক, দাসকরণ হোক এবং গনীমতের মালের বণ্টন হোক।

এখানে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ নাই। তবু আশা করি এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা মুহাম্মদ ও ইসলামের স্বরূপ বুঝতে অনেকখানি সাহায্য করবে। বস্তুত ধর্ম প্রবক্তা হিসাবে বুদ্ধ ও যীশুর সঙ্গে মুহাম্মদকে যেমন এক কাতারে ফেলাটা ভ্রান্ত তেমন ধর্ম হিসাবে বৌদ্ধ ও খ্রীষ্ট ধর্মের সঙ্গে ইসলামকে গুলিয়ে ফেলাটাও ভ্রান্ত। একই যুক্তি অনুযায়ী ইসলামের ভূমিকার সঙ্গে বৌদ্ধ এবং খ্রীষ্টান ধর্মের ভূমিকাকে গুলিয়ে ফেলাটাও ভ্রান্ত। যারা নিজেদেরকে বস্তুবাদী বা লোকবাদী কিংবা যুক্তিবাদী মনে করেন তাদের অনেকে সব অলোকবাদী ধর্মকে ভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়ে ধর্মগুলির ভূমিকার পার্থক্য এবং সমস্যার ভিন্নতাকে যেমন অস্বীকার করেন তেমন মনে করেন জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং যুক্তি চর্চার একই প্রক্রিয়ায় অলোকবাদী সকল ধর্মের সমস্যার সমাধান হবে। তাদের মত মানলে আমাদের প্রাণী হিসাবে যেমন বাঘ, নেকড়ে, হায়েনা এবং গরু, ঘোড়া, ছাগলকে এক দৃষ্টিতে দেখতে এবং সেগুলির প্রতি একই রকমভাবে আচরণ করতে হবে তেমন মানুষের পৃথক পৃথক সমাজ ও সংস্কৃতি নির্মাণে ধর্মগুলির ভূমিকার ভিন্নতাকে অস্বীকার করে সেগুলিকেও একই দৃষ্টিতে দেখতে এবং সেগুলির প্রতিও একই রকমভাবে আচরণ করতে হবে।

অথচ যে কোন অলোকবাদী ও অন্ধ বিশ্বাস নির্ভর ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে আধুনিক সভ্যতা এবং তার উপযোগী সমাজ নির্মাণ করা অসম্ভব। পশ্চিম ইউরোপ এবং পূর্ব ইউরোপ এই কাজ করেছে তাদের মত করে। আজ চীন ও ভিয়েৎনামের মত দেশগুলি যে অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সেটাও সম্ভব হত না এই সংগ্রাম ছাড়া। এই সংগ্রাম হয়েছে যার যার ধর্মের ও সমাজের বাস্তবতা অনুযায়ী। যেহেতু খ্রীষ্ট বা বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব যুদ্ধ, বলপ্রয়োগ, সহিংসতা ও নারী ধর্ষণের মধ্য দিয়ে হয় নাই সেহেতু এইসব ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ধরনও তুলনায় অনেক শান্তিপূর্ণ হতে পারে। এর পরেও ইউরোপে খ্রীষ্টধর্ম এবং তার প্রতিষ্ঠান হিসাবে চার্চের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ও প্রবল সংগ্রাম করতে হয়েছে। রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রক্রিয়ায়ও বিপুল রক্তপাত হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্রোটেস্ট্যান্টদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী ইত্যাদি দেশে প্রধানত ধর্ম সংস্কারকে সামনে রেখে, মোটা দাগে একটা সময়কে ধরলে, ১৫২৪ খ্রীঃ থেকে ১৬৪৮ খ্রীঃ পর্যন্ত যে সকল যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় তার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়।

খ্রীষ্ট ধর্মের ভিতর অনেক মানবিকতা, সহিষ্ণুতা, প্রেম, সমতা ও ব্যক্তির মর্যাদা থাকার পরেও এই যেখানে অবস্থা সেখানে চরম সহিংসতা, সন্ত্রাস, মিথ্যাচার ও যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইসলামের অধীন সমাজে যুক্তি ও লোকবাদ, সহিষ্ণুতা, ব্যক্তির স্বাধীনতা, নারীর মানবিক অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কতখানি কঠিন তা সহজেই অনুমেয়।

এ কথা আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, মানুষের ভিতর বিবেক, বিবেচনা, দয়া এবং মানবিকতা যেমন থাকে তেমন তার বিপরীত গুণাবলীও থাকে। ফলে মানুষ সহিংস এবং নৃশংস বা নিষ্ঠুরও হতে পারে। মানুষ যেমন ত্যাগ করতে পারে তেমন স্বার্থান্ধ ভোগবাদীও হতে পারে। বরং মানুষের ভিতর পশু প্রবৃত্তির প্রভাবই বেশী থাকে। কিন্তু প্রকৃতির জগতে মানুষ একা বাঁচতে পারে না। ফলে সমাজবদ্ধ হয়েই তাকে বাঁচতে হয়। আর সমাজবদ্ধ হতে গিয়ে তাকে সমাজ গঠন করতে হয়। কিন্তু কিছু সামাজিক নিয়ম এবং নীতি-নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজ গঠন করা যায় না। এগুলির চর্চা দ্বারা মানুষ এবং তার সমাজ মানুষের পশু প্রবৃত্তিকে যতটা সম্ভব সংযত করতে চেষ্টা করে। আদিম মানুষ যখন আত্মা ও অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কল্পনা করতে শিখেছে তখন তারা তাদের গোত্র এবং উপজাতি গঠন ও রক্ষার জন্য যে সকল নিয়ম ও নীতি-নৈতিকতা প্রবর্তন ও অনুশীলন করত সেগুলির সঙ্গে আত্মা ও অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কল্পনা স্বাভাবিক নিয়মে জড়িয়ে যেত। এভাবে ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটতে থাকে। এক একটি উপজাতি নিজেদের উপজাতীয় সংহতি ও অন্যান্য উপজাতির সঙ্গে নিজেদের পার্থক্য রক্ষার প্রয়োজনে ধর্মকে ব্যবহার করতে শুরু করে। সভ্যতার দিকে মানুষ যত এগিয়ে যেতে থাকে তত ধর্ম বোধেরও বিকাশ হতে থাকে। মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির অতিপ্রাকৃতিক রূপ কল্পনার পাশাপাশি তাদের উপজাতির নিজস্ব অতিপ্রাকৃতিক শক্তির রূপ তথা দেবতার কল্পনা করতেও শিখে। দেবতাদের তুষ্ট করার জন্য তাদের প্রতীক নির্মাণ ও পূজা দিতে শুরু করে। প্রাকৃতিক শক্তি এবং মূর্তি বা প্রতীক পূজা মূলক এই ধর্মগুলিকে আমরা পেগান (Pagan) ধর্ম বলতে পারি। এই শব্দ দিয়ে এক সময় খ্রীষ্টানরা খ্রীষ্টান ধর্মের আবির্ভাবের পূর্ব কালীন এবং সমকালীন সকল পৌত্তলিক ধর্মকে বুঝাত।

গ্রীক এবং রোমান সভ্যতা যারা নির্মাণ করেছিল তারা ছিল পেগান। পেগান ধর্মের একটা সমস্যা হল উপজাতির বাইরের মানুষদের প্রতি ভ্রাতৃত্ব বোধ বা সহমর্মিতার অভাব, যে কারণে বৃহত্তর সমাজ বা রাষ্ট্র গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণকারী উপজাতি অন্যান্য উপজাতির প্রতি নিষ্ঠুর ও নির্বিবেক হয়ে উঠতে পারে। সিন্ধু সভ্যতা ছাড়া মিসর, মেসোপটেমিয়া ও চীনের প্রাচীন সভ্যতায় রাষ্ট্র ও সভ্যতা গঠনে পেগান মানুষদের সীমাহীন নিষ্ঠুরতার কথা জানা যায়। সমকালীন মিসর ও মেসোপটেমিয়ার তুলনায় অনেক বেশী এলাকায় বিস্তৃত সিন্ধু সভ্যতা (পাঁচ হাজার বৎসর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত) প্রাচীন পৃথিবীর এক বিস্ময়, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রধানত শান্তিপূর্ণ ও অহিংস উপায়ে। তবে সেখানে যে ধর্ম ছিল তাকে প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য থেকে এবং হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদের সূত্র ধরে মূলত শান্তিপূর্ণ, নিরাকারবাদী এবং একেশ্বরবাদী বলে অনুমান করা চলে। এটা উপজাতীয় চেতনার গণ্ডী ভেঙ্গে মানুষকে বিশ্বজনীনতার বোধ দিয়েছিল। আমার অনুমান এই ধর্ম সেখানে বিভিন্ন উপজাতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। যাইহোক, এটা ভিন্ন ও বিস্তারিত আলোচনার বিষয়।[18] আমরা এখানে শুধু এইটুকু বলতে পারি যে, পেগান সমাজগুলি রাষ্ট্র ও সভ্যতা গঠনে যে সহিংসতা ও বর্বরতার আশ্রয় নিয়েছিল খ্রীষ্ট এবং বৌদ্ধ ধর্ম ছিল তার বিরুদ্ধে একটা প্রতিক্রিয়া। এটা খুব লক্ষ্যণীয় যে পেগান গ্রীক ও রোমান সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত ছিল যুদ্ধ, জবরদস্তি এবং ব্যাপক দাস প্রথার উপর।

গ্রীক ও পরবর্তী কালে গড়ে উঠা রোমান সভ্যতা বিরাট উন্নতি সাধন করলেও দাস শ্রমের উপর নির্ভরতার কারণে একটা পর্যায়ে গিয়ে আটকে গিয়েছিল। অন্যান্য সমাজ থেকে মানুষ ধরে এনে দাস করে তাদের শ্রমের উপর গোটা সভ্যতার নির্ভরতা সভ্যতার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে দিল। একদিকে, যুদ্ধ ও নির্দয়তা, অপর দিকে, সহজলভ্য দাস শ্রম দিয়ে সব কাজ করাবার প্রবণতা সভ্যতার প্রাণশক্তি নিংড়ে নিচ্ছিল। ভূমধ্যসাগরের চারপাশ ঘিরে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল অঞ্চল ব্যাপী বিস্তৃত রোমান সাম্রাজ্যের মানুষকে এমন একটা সময়ে খ্রীষ্টের প্রেম ও সৌভ্রাতৃত্বের বাণী নূতন আশায় উজ্জীবিত করল। সভ্যতার ক্ষয়ের সঙ্গে, হুন-গথ-ভ্যান্ডাল ইত্যাদি পেগান বর্বরদের ক্রমাগত আক্রমণের মুখে পেগান রোমান সভ্যতার বিপর্যয়ের সঙ্গে সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিস্তৃত হল খ্রীষ্টের ধর্ম। ক্রমে সর্বজনীন প্রেমের ধর্মের শক্তির কাছে পরাভূত হল আক্রমণকারী ও আক্রান্ত সব পেগানরাই। এক সময় রোমের বিশাল বস্তুগত সাম্রাজ্য থাকল না, কিন্তু খ্রীষ্টধর্মকে অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠিত হল ভাবগত সাম্রাজ্য। উন্নত নগর সভ্যতা হারিয়ে গেল, সেই সঙ্গে হারিয়ে গেল দাস ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত নির্দয় সভ্যতা। রোমান সাম্রাজ্যের তুলনায়ও বিশালায়তনে প্রতিষ্ঠিত হল ধর্ম সাম্রাজ্য যে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসের পরিবর্তে হাতিয়ার হল অহিংসা ও প্রেম বা ভালবাসার আবেদন।

ধর্মগ্রন্থের চুলচেরা বিশ্লেষণ দিয়ে যীশুর শক্তির কিছুই বুঝা যাবে না যদি না মানুষের জন্য ব্যথিত ক্রুশবিদ্ধ যীশুর আত্মদানের মহিমাকে বুঝা না যায়। দয়াহীন পৃথিবীতে যীশু মানুষকে শুনালেন তার দয়াময় পরমপিতা ঈশ্বরের স্বর্গরাজ্যে যাবার বার্তা। এই ঈশ্বর সব মানুষের জন্য দয়াময়। সেখানে জাতি, উপজাতি, গোত্র, বর্ণ ও শ্রেণীর কোন ভেদ নাই। শুধু বাণী নয়, বরং নিজের জীবনাচরণ ও শেষাবধি ক্রুশে আত্মদান করে নিজের বিশ্বাসকে মহিমান্বিত করলেন। হয়ত ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করলে সব হারিয়ে যেত। কিন্তু কবরস্থ করার পরেও তৃতীয় দিনে ফিরে এসে শিষ্যদের নিকট তার দর্শন দান ঈশ্বর-পুত্র হিসাবে তার প্রতি শিষ্যদের বিশ্বাসকে নূতন শক্তি দান করল। এরপর চল্লিশ দিন তিনি তার শিষ্যদের নিকট তার বাণী প্রচার করেন এবং অবশেষে অদৃশ্য হন। দয়াহীন পৃথিবীতে দয়াপূর্ণ স্বর্গরাজ্যের সন্ধান দিতে চেয়ে যীশুর তিরোধানের পর তার শিষ্যরা যীশুর প্রেম ও ক্ষমার বাণী প্রচারে নেমে পড়ল। নির্দয় সভ্যতার পেষণে পিষ্ট মানুষের কাছে তাদের প্রতি  দয়ামায়াহীন যুক্তি ও বিচার-বুদ্ধির কী মূল্য?

রোমান সভ্যতার পতনের পর উন্নত নগর সভ্যতা থেকে মানুষ পিছিয়ে গেল। অন্ধ বিশ্বাস নির্ভর ধর্মে মানুষ আশ্রয় নিল। কিন্তু, এও ঠিক যে ধর্মের আবরণে ইউরোপে গ্রীক ও রোমান সভ্যতার এমন কিছু উপাদান রক্ষা পেল যা ভবিষ্যতে ইউরোপের পুনর্জাগরণে সহায়ক হবে। দাস ব্যবস্থা নির্ভর সভ্যতার সঙ্গে একটা ছেদ দরকার ছিল। প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত খ্রীষ্ট ধর্ম এই ছেদ ঘটাবার ক্ষেত্রে ভাবাদর্শিক প্রয়োজন পূরণ করেছিল। এটা স্পষ্ট যে খ্রীষ্ট ধর্মের কারণে ইউরোপে আর কখনই দাস ব্যবস্থা ফিরে আসে নাই।

এর মধ্যে অর্থনীতি খুঁজে লাভ নাই। অর্থাৎ অর্থনীতির পশ্চাৎপদতার কারণে ইউরোপে দাস ব্যবস্থা আর প্রবর্তিত হয় নাই বা টিকে নাই এটা ভাবা ভুল হবে। তা হলে প্রশ্ন আসবে অনেক পশ্চাৎপদ অর্থনীতি নিয়ে ইসলাম যেখানে গেছে সেখানেই দাসত্বের ভয়াবহ বিস্তার কীভাবে ঘটেছে। ইসলাম উন্নত সভ্যতা দিতে না পারলেও দাস ব্যবস্থার বিস্তার দিতে পেরেছে। ইসলামের প্রভাবে সর্বত্র উৎপাদন ব্যবস্থার যে অধঃপতন ঘটে তার ফলে গ্রীস বা রোমের মত দাস ব্যবস্থা ভিত্তিক উন্নত সভ্যতাও আর নির্মাণ করা সম্ভব হয় নাই। যে কারণে ইসলামে দাসত্বের ভয়াবহ প্রসার ঘটলেও উৎপাদন তথা অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসাবে সেটা আর দাঁড়াতে পারে নাই। কিন্তু এ থেকে এ কথা মনে করা ভুল হবে যে ইসলাম চেতনাগত বা আদর্শিকভাবে দাসত্ব বিরোধী ছিল। বরং মানুষের বান্দাত্ব বা দাসত্বের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত ইসলাম ধর্মীয় বিধান অনুযায়ীই দাসত্ব চর্চা করেছে, যার সূত্রপাত করেন মুহাম্মদ নিজেই। ইসলামের এই বাস্তবতার সঙ্গে খ্রীষ্টীয় মূল্যবোধ ও আদর্শ সাংঘর্ষিক। প্রকৃতপক্ষে খ্রীষ্টীয় চেতনা ও মূল্যবোধ দাস ব্যবস্থার বিরোধী ছিল।

এটা স্পষ্ট যে বৌদ্ধ ও খ্রীষ্ট ধর্ম বৃহত্তর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে চেয়ে মানুষের মানবীয় গুণাবলীকে ধারণ ও রক্ষা করতে এবং সহিংসতা, লোভ, নির্দয়তা ইত্যাদি প্রবৃত্তিকে সংযত বা দমন করতে চেয়েছে। তা সত্ত্বেও বৌদ্ধ ও খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীদের সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার ইতিহাস কম দীর্ঘ নয়। এই যেখানে অবস্থা সেখানে যদি কোন ধর্ম মানুষের ভিতরকার সহিংসতা ও পশু প্রবৃত্তিগুলিকে অর্গল মুক্ত এবং লালন করে তবে কী ভয়ানক অবস্থা হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

মিথ্যাচার, প্রতারণা, ভণ্ডামি, সহিংসতা ও হিংস্র আক্রমণাত্মকতা, অসহিষ্ণুতা, লোভ, হত্যা, নারী ধর্ষণ এবং চক্রান্ত জন্মলগ্ন থেকে ইসলামকে যেভাবে অধিকার করে আছে তার ফল ইসলামের জন্যও মুহাম্মদের মৃত্যুর সাথে সাথে ফলতে শুরু করে। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে মদীনায় তার অনুসারী বা সাহাবীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং চক্রান্ত শুরু হয়। দুইদিনের উপর তার লাশ দাফনের অভাবে বিছানায় পড়ে থাকে। অবশেষে ষড়যন্ত্রের প্রক্রিয়ায় ওমরের উদ্যোগে আবু বকরকে খলীফা মনোনীত করা হয়। উদ্দেশ্য মুহাম্মদের চাচাতো ভাই এবং জামাতা আলীকে বঞ্চিত করা। মিথ্যা, চক্রান্ত, হত্যা, সন্ত্রাস এবং যুদ্ধ দ্বারা ইসলামের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তার শিকার হয়েছিলেন প্রথম চার খলীফার মধ্যে প্রথম খলীফা আবু বকর বাদে বাকী তিন খলীফাই। আবু বকর মাত্র ২৭ মাস খলীফা হিসাবে বেঁচে ছিলেন। ৬৩২ খ্রীঃ-এ খলীফা পদ লাভ ক’রে ৬৩৪ খ্রীঃ-এ মারা যান। বাঁচলে হয়ত তাকেও মরতে হত বাকী তিন খলীফা যথাক্রমে ওমর, ওসমান এবং আলীর মত শত্রুর ছুরিকাঘাতে।

ইসলামে যুদ্ধ লাগবেই, আর যুদ্ধ করার জন্য স্বাভাবিক নিয়মে শত্রুও লাগবে। অসুমলমান বা কাফের পাওয়া না গেলে মুসলমানকেই কাফের বা শত্রু ঘোষণা করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। আলীর বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ শুরু হল ব্যাপকায়তনে। এমন কি আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন মুহাম্মদের বিধবা স্ত্রী আয়েশা, যিনি কিনা আবার আলীর সৎ শাশুড়িও বটে। এই যুদ্ধ উষ্ট্রের যুদ্ধ হিসাবে পরিচিত। যুদ্ধে আয়েশা পরাজিত ও বন্দী হন। তবে আলী তাকে মুক্তি দেন।

আসলে শান্তির মত গণতন্ত্রের একটা পদ্ধতি নির্বাচনের সঙ্গেও ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই। প্রাক-ইসলামী যুগের আরবদের মধ্যে উপজাতীয় গণতন্ত্রের যে প্রভাব ছিল তার ধারাবাহিকতায় প্রথমেই রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে নাই। ফলে আমরা প্রথম চার খলীফার ক্ষমতা গ্রহণে চক্রান্ত, সংঘাত ও রক্তপাত সত্ত্বেও পারিবারিক রাজতন্ত্রের বদলে এক ধরনের নির্বাচন দেখতে পাই। তবে এই প্রক্রিয়ায় যেটা উল্লেখ করার মত তা হল একদিকে আলীকে বাদ দেওয়া, অপরদিকে মদীনাবাসী এবং অকুরাশইদেরকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। অর্থাৎ মুহাম্মদের ধর্ম প্রকৃতপক্ষে কুরাইশদের বংশগত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। একনায়ক-শাসক নির্বাচনে অনিশ্চয়তা, রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য আলীর মৃত্যুর পর খলীফা মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ইসলামের সহিংসতার থাবা থেকে মুহাম্মদের বৎসধররাও রক্ষা পেলেন না। তার কোন পুত্র ছিল না। তার কন্যা ফাতেমার গর্ভে হাসান ও হুসেন নামে তার দুই দৌহিত্র ছিলেন। খলীফা মুয়াবিয়ার শাসনকালে হাসানকে বিষ প্রয়োগ ক’রে এবং মুয়াবিয়ার পুত্র খলীফা এজিদের শাসনকালে তার নির্দেশে হাসানের ছোট ভাই হুসেনকে কারবালার মরু প্রান্তরে আরও অনেকের সঙ্গে হত্যা করা হয়। হুসেনকে হত্যা ক’রে তার মাথা কেটে নিয়ে খলীফা এজিদের কাছে উপস্থিত করা হয়। এই হচ্ছে ইসলামের শান্তির ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার নমুনা!

বস্তুত ইসলামের মূল সামাজিক ভিত্তির দিকে দৃষ্টি দিলে যুদ্ধ ও সহিংসতার ধর্ম হিসাবে তার বিকাশকে যৌক্তিক মনে হবে। মুহাম্মদের যোদ্ধা বাহিনীর প্রধান অংশ এসেছিল অপেক্ষাকৃত দরিদ্র, অর্ধযাযাবর এবং বিশেষত যাযাবর বেদুইন উপজাতিগুলি থেকে। বেদুইনরা কৃষক বা উৎপাদক জনগোষ্ঠী নয়। তারা ছিল যুদ্ধ প্রবণ, লুণ্ঠনপরায়ণ ও বিচরণশীল। ফলে তারা সভ্যতা নির্মাণের নয়, বরং লুণ্ঠন ও ধ্বংসের শক্তি।

এই জায়গায় পৃথিবীর বর্তমান আর সকল বৃহৎ ধর্মের সঙ্গে ইসলামের পার্থক্য। যেমন, মোশি বা মুসা মিসরে দাসে পরিণত ইসরাইলীয় কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষদেরকে মুক্ত করে প্যালেস্টাইনে আনেন এবং তাদেরকে নিজ ধর্মমতে দীক্ষিত করেন, যা আমাদের নিকট ইহুদী ধর্ম হিসাবে পরিচিত। অর্থাৎ মোশির ধর্মের মূল ভিত্তি উৎপাদক ও  শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতা মোশির ধর্মে সামরিকতা, উগ্র রক্ষণশীলতা ও অসহিষ্ণুতা প্রকট হলেও তা অন্য জাতি বা সমাজের প্রতি সেভাবে আগ্রাসী নয়। কারণ মোশির ধর্মের মূল লক্ষ্য ছিল দাসত্বে আবদ্ধ ইসরাইলীয়দেরকে ঈশ্বরের মনোনীত জাতি হিসাবে মুক্ত করা এবং তাদেরকে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমি হিসাবে প্যালেস্টাইনে নেওয়া। এভাবে মোশির ধর্মমতের মাধ্যমে একটি মুক্ত জাতিই শুধু সৃষ্টি হল না, অধিকন্তু একটি রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত হল। এই রাষ্ট্রটিও হল মূলত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ।

ইহুদী বংশোদ্ভূত যীশু কঠোর ও অসহিষ্ণু ইহুদী ধর্মকে নমনীয় রূপ দিতে গিয়ে এমন একটি সংস্কার ঘটালেন যা একটি নূতন ধর্ম জন্ম দিল। তার ধর্মে যোগ দিল সমাজের দরিদ্র শ্রমজীবী, কৃষক, কারিগর, ক্ষুদে ব্যবসায়ী, দাস ইত্যাদি নিম্নবর্গের শ্রমজীবী ও উৎপাদনশীল মানুষ। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জাতি ও শ্রেণীর মানুষ এতে যোগ দিলেও নম্রধারায় উদ্ভূত এই ধর্মের মূল ভিত্তি ছিল শাসিত, শোষিত, শ্রমজীবী ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী।

অহিংস ও শান্তিবাদী বৌদ্ধ ধর্মও উদ্ভূত ও প্রসার লাভ করে সমাজের কারিগর, বণিক, কৃষক এবং বিভিন্ন বৃত্তিজীবীর সমর্থন নিয়ে। পরবর্তী সময়ে সমাজের উপর তলার সমর্থন লাভ করলেও নিম্নবর্গ এবং বর্ণজাতিভেদ বিরোধী জনগোষ্ঠীর আন্দোলন রূপে তা বিকাশ লাভ করে। এভাবে বৌদ্ধধর্মের ভিত্তিমূলে আমরা পাই উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীকে।

বর্ণজাতিভেদ ভিত্তিক হিন্দু ধর্ম কোন একজন ধর্মনেতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। এক কথায় হিন্দু ধর্মকে ব্যাখ্যা করাও সম্ভব নয়। আত্মা, জন্মান্তরবাদ, দেবতা ইত্যাদি কতকগুলি বিশ্বাসকে ভিত্তি করে এমন একটি ধর্ম গড়ে উঠেছে যেটাকে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মত ধর্ম না বলে সামাজিক প্রথা ও বিশ্বাসের একটি সমষ্টি বলাই ভাল যেখানে সঙ্গতি বা ঐক্যের পাশে প্রভৃত পরিমাণে অসঙ্গতি, অনৈক্য এমনকি পরস্পর বিরুদ্ধতাও রয়েছে। এটি অবিশ্বাস্য রকম জটিলতায় আবদ্ধ একটি সমাজ। তত্ত্বগতভাবে হিন্দু সমাজ চার বর্ণে বিভক্ত, যথা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। কিন্তু এটা তত্ত্বগত ভাগ মাত্র। বাস্তবে সমাজ অজস্র ভাগে বিভক্ত, অর্থাৎ অসংখ্য বর্ণজাতিতে বিভক্ত। এই বর্ণজাতিগুলি শ্রমকর্ম বিভাজন এবং পবিত্রতা-অপবিত্রতার নির্দিষ্ট স্তরবিন্যাস দ্বারা আবদ্ধ হয়ে থাকে। সবার উপরে সবচেয়ে পবিত্র বর্ণজাতি হিসাবে ব্রাহ্মণ এবং সবার নীচে শূদ্র ও অস্পৃশ্যদের স্থান।

বর্ণজাতিভেদ মূলক ব্যবস্থায় আবদ্ধ হবার ফলে হিন্দু সমাজ যেমন গ্রীস, রোম বা সমকালীন চীনের সমপর্যায়ের উন্নত নগর সভ্যতা গড়তে অক্ষম হয় তেমন অসংখ্য বিভাজনের কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য কোন বৃহৎ রাষ্ট্র গড়তে ও কোন প্রবল বহিরাক্রমণকে মোকাবিলা করতে পারে নাই। একটা দীর্ঘ সময় ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ ধর্ম এবং হিন্দু ধর্মের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলেছিল। এই প্রতিযোগিতায় শেষাবধি হিন্দু সমাজ ব্যবস্থার বিকাশ ও প্রসারের সঙ্গে হিন্দু ধর্ম জিতে যায়। কিন্তু সেই সঙ্গে বৈদেশিক আক্রমণকারীদের মোকাবিলায় দাঁড়াতেও ভারতীয় রাষ্ট্রগুলির অক্ষমতা লক্ষ্যণীয়। শক ও হুন আক্রমণকারীরা উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশ দখল করে। অষ্টম শতাব্দীতে (৭১২ খ্রীষ্টাব্দ) আরব আক্রমণকারীরা সিন্ধুর রাজা দাহিরকে আক্রমণ ও পরাজিত ক’রে সিন্ধু দখল করে। একাদশ শতাব্দীতে সুলতান মাহমুদ সতেরো বার (১০০০-১০২৭ খ্রীষ্টাব্দ) উত্তর ও পশ্চিম ভারতে লুণ্ঠন অভিযান পরিচালনা করেন। আর ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চলে বহিরাক্রমণকারী তথা বহিরাগত মুসলিমদের লাগাতার শাসন। এর অবসান হয় আর একদল বহিরাগত আক্রমণকারী ব্রিটিশদের হাতে। ব্রিটিশ শাসন চলে প্রায় দুইশত বৎসর।

যাইহোক, হিন্দু ধর্ম সমাজ ও সভ্যতার বিকাশে বাধাদানকারী হলেও এটা ভারতবর্ষে নিম্ন মাত্রায় কৃষি ভিত্তিক সভ্যতাকে ধরে রাখায় সহায়ক হয়েছিল। অনুমান করি সিন্ধু সভ্যতার পতনের পর সভ্যতার পশ্চাৎগতির অবস্থায় গাঙ্গেয় উপত্যকায় সিন্ধু সভ্যতার ধর্ম ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সঙ্গে অসংখ্য পেগান উপজাতির ধর্ম ও সংস্কৃতির সম্মিলনে বিভিন্ন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যে নূতন ধর্ম ও সংষ্কৃতি গড়ে উঠে তা-ই হিন্দু ধর্ম হিসাবে বিকশিত হয়। সভ্যতার বিকাশের ধর্ম এটি নয়। বরং সভ্যতার সংকট কালে সভ্যতাকে নিম্ন মাত্রায় ধরে রাখার ধর্ম, যা ভারতবর্ষের বিশেষ ভূ-প্রাকৃতিক ও জনগোষ্ঠীগত বাস্তবতায় উদ্ভূত ও বিকশিত হয়েছিল।[19]

সিন্ধুর উন্নত নগর সভ্যতার পতন কালে এর উদ্ভবের বীজ রচিত হয়েছিল বলে সভ্যতার বিরুদ্ধে হিন্দু ধর্মে প্রতিক্রিয়ার প্রভাব এত গভীর বলে অনুমান করি। অবিশ্বাস্য রকম পশ্চাৎপদতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কার এই ধর্মে রয়েছে যেগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করা ছাড়া হিন্দু সমাজকেও আধুনিক সভ্যতার উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তবে হিন্দু ধর্ম বা সমাজ আক্রমণাত্মক এবং হিংস্র না হওয়ায় কাজটা প্রধানত শান্তিপূর্ণভাবে করা সম্ভব। অনেক কাল ধরে বহুমুখী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতে সেই চেষ্টা চলছেও।

যাইহোক, সবচেয়ে বড় কথা ইসলাম বাদে আর সকল প্রধান ধর্ম এক অর্থে কৃষক সমাজের ধর্ম তথা কৃষি নির্ভর সভ্যতার ধর্ম। প্রতীকীভাবে এগুলিকে কৃষকের ধর্মও বলা যায়। ফলে এইসব ধর্মে কমবেশী উৎপাদনশীলতা আছে। কিন্তু ইসলাম হচ্ছে এমন যাযাবর সমাজের ধর্ম যা আক্রমণ, যুদ্ধ, লুণ্ঠন ও ধর্ষণকে বেছে নিয়েছে তার জীবন-জীবিকার ভিত্তি এবং প্রেরণার উৎস হিসাবে। অন্যান্য কৃষি নির্ভর সমাজের উৎপাদনশীল জনগণের উপর ধর্মের অজুহাতে আক্রমণ ক’রে তাদেরকে পদানত এবং তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করা হবে, তাদের কাছ থেকে নিয়মিত কর আদায় ক’রে এবং তাদেরকে নানানভাবে শ্রমদানে বাধ্য ক’রে আরাম-আয়েশ করা হবে এবং তাদের নারীদের বন্দী ও দাসী করে ধর্ষণ ও সম্ভোগ করা হবে।

সুতরাং ভূমিকার বিচারে পরবর্তী কালের সভ্যতা ধ্বংসী ও গণহত্যাকারী বিশ্বত্রাস মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খানের (জন্ম আনুমানিক ১১৬২ খ্রীঃ-মৃত্যু ১২২৭ খ্রীঃ) সঙ্গে মুহাম্মদকে মিলানো যায়। মোঙ্গলরা সভ্যতাগুলিকে আক্রমণ ক’রে কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করে (এক হিসাবে চেঙ্গিস খান তৎকালীন চীনের আনুমানিক দশ কোটি মানুষের মধ্যে দুই কোটি মানুষকে হত্যা করেছিলেন), তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে, তাদের নারীদেরকে ধর্ষণ করে এবং বিশাল অঞ্চল ব্যাপী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে চেঙ্গিস নূতন ধর্ম প্রবর্তন করেন নাই। শুধুমাত্র সামরিক শক্তি এবং যুদ্ধকৌশলের সাহায্যে চেঙ্গিসের নেতৃত্বে মোঙ্গলরা বিজয় অভিযান পরিচালনা করে। মুহাম্মদ তার জিহাদী ধর্মের মাধ্যমে আরবদেরকে একটি একনায়কী ধর্মীয় সামরিক রাষ্ট্র দান করেন যার বলে বলীয়ান হয়ে মূলত মরুচারী ও যাযাবর আরবরা তৎকালীন সভ্য পৃথিবী লুণ্ঠন ও ধ্বংসের অভিযানে বের হয়ে পড়ে।

হাদীসসমূহ মনোযোগ দিয়ে পড়লে বুঝা যায় যে, বিশ্বজয়ের একটি পরিকল্পনা বহুকাল ধরেই মুহাম্মদ তার অন্তরে লালন করতেন। যার জন্য তার প্রয়োজন হয়েছিল নিজ একনায়কী নেতৃত্বে আরবদের সংগঠিত করা। এ কাজে ধর্ম হয়েছিল তার হাতিয়ার। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস উল্লেখ করা যায় যেখানে মুহাম্মদ বলছেন, ‘(পারস্য সম্রাট) কিস্রা ধ্বংস হবে, তারপর আর কিস্রা হবে না। আর (রোমক সম্রাট) কায়সার অবশ্যই ধ্বংস হবে, তারপর আর কায়সার হবে না। এবং এটা নিশ্চিত যে, তাদের ধনভাণ্ডার আল্লাহর রাহে ব্যয় হবে।’[20] আসলে সমস্ত পৃথিবীর মালিকানা তিনি নিজের মনে করতেন, যে কারণে একদিন তিনি ইহুদীদের নিকট গিয়ে তাদেরকে বললেন, ‘হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা মুসলমান হয়ে যাও, নিরাপদ থাকবে।….. তোমরা জেনে রেখো যে, যমীন কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের।’একই কথার পুনরুক্তি করে তিনি বললেন, ‘তোমরা জেনে রেখো যে, যমীন কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। আমি তোমাদেরকে দেশান্তর করতে মনস্থ করেছি। তাই তোমাদের যার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, তা যেন সে বিক্রি করে দেয়। অন্যথায় জেনে রেখো, যমীন কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের।’[21] মুসলিম শরীফে এই কথাটি আর একভাবে বলা হচ্ছে, ‘নতুবা জেনে রেখো যে, সমগ্র ভূ-মণ্ডল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের।’[22]

অপর একটি হাদীসে মুহাম্মদকে বলতে দেখা যাচ্ছে, ‘একদা আমি নিদ্রিত ছিলাম, স্বপ্নে বিশ্বের ধনভাণ্ডারের চাবিগুচ্ছ আমার হস্তে দেওয়া হইল।’[23]

মুহাম্মদ আরবের বাইরে তার বিজয় অভিযান দেখে যেতে পারেন নাই। কিন্তু তার আরব্ধ কাজ সমাপ্ত করার জন্য ধর্মের মাধ্যমে একদল অনুসারী এবং একটি দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী ও আগ্রাসী রাষ্ট্র রেখে গেলেন।

পেগান মোঙ্গল ও ইসলামী আরব উভয় অভিযানই ছিল কৃষি নির্ভর সভ্যতাগুলির জন্য ধ্বংসাত্মক। তবে মোঙ্গল দখলীকৃত অধিকাংশ অঞ্চলে পরবর্তীকালে নূতন করে সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সভ্যতার শক্তির কাছে বর্বরতা শেষ পর্যন্ত হার মানে। মোঙ্গলরা মরুময় মোঙ্গলিয়াতেও নগর-শহর গড়ে তুলে। এ ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীর লুণ্ঠিত সম্পদ, বন্দী শ্রমশক্তি ও মেধা তাদের কাজে লাগে। কিন্তু শুধু বর্বরতা ও হিংস্রতা নির্ভর মোঙ্গল সভ্যতা ও রাষ্ট্র বেশী দীর্ঘস্থায়ী হয় নাই। চীনে একশত বৎসরও তাদের শাসন স্থায়ী হয় নাই। মধ্য এশিয়া, রাশিয়া ইত্যাদি অঞ্চলে মোঙ্গল শাসন আরও বেশী কাল স্থায়ী হলেও সুদীর্ঘ কাল ধরেই মোঙ্গল অভিযান, বিজয়, হত্যা ও ধ্বংস স্মৃতি মাত্র।

কিন্তু একটি ধর্ম বা মতাদর্শের কারণে আরবের ইসলাম পৃথিবীর বিশাল অঞ্চলব্যাপী চৌদ্দশত বৎসর ধরে জীবন্ত হয়ে আছে। এটা ঠিক যে আরবের মরুময় বুকে আরবরা উন্নত সভ্যতা গড়তে না পারলেও সিরিয়া, ইরাক, ইরান ইত্যাদি সভ্য দেশগুলি দখলের পর সেখানে পরবর্তী কালে আরবরাও একটি উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলে। বিশেষত আব্বাসীয় যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানও যথেষ্ট উন্নতি সাধন করে। কিন্তু এটাও বিজয় অভিযানের ফলে উন্নত সভ্যতাগুলির কেন্দ্রীভবনের ফল। চারপাশের সম্পদ, জ্ঞান, মেধা ও শ্রমশক্তি কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ইসলামের অনেক রীতিনীতি ও বিশ্বাস লঙ্ঘন করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই বিকাশ ঘটে। কিন্তু এ সবই ছিল সাময়িক এবং অতিকেন্দ্রীভূত স্ফুরণ মাত্র। ইসলাম নিজে জ্ঞান-বিজ্ঞান বিমুখ এবং সভ্যতা বিরোধী। ফলে ইসলামীকরণ সম্পূর্ণ হলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাময়িক বিকাশ রুদ্ধ হয়ে গেল। সমাজতলের ইসলামী চেতনা জ্ঞানের সীমিত কেন্দ্রকে আক্রমণ ও ধ্বংস করল। সুতরাং নবম শতাব্দীতেই শুরু হল ইসলামের উদারপন্থী মুতাজিলা এবং অন্যান্য যুক্তিবাদীদের বিরুদ্ধে হত্যা অভিযান। হাজার হাজার পণ্ডিত ও জ্ঞানীকে তাদের উন্নত অথবা উদার এবং যুক্তিবাদী চিন্তার জন্য হত্যা করা হল। এভাবে ইসলামের প্রাথমিক বিজয় অভিযানের পর ইসলামপূর্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রীভবনের ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেটুকু বিকাশ ঘটেছিল তাকে শেষ করা হল। যুদ্ধ, ধ্বংস, হিংস্রতা ও অন্ধত্ব সমাজকে গ্রাস করল। এটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সমাজ ও সভ্যতা পিছিয়ে গেলেও খুবই মুষ্টিমেয় শাসকের নির্বিবেক ভোগের আয়োজনের জন্য অধীনস্থ সমাজ ও অবশিষ্ট সভ্যতার সকল শক্তি নিয়োজিত হল। ইসলাম যেখানে গেল সেখানেই স্থানীয় সকল সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস ক’রে তার মরু প্রকৃতির স্থূল ভোগবাদ ও নৃশংস সংস্কৃতি চাপিয়ে দিল, যার সবচেয়ে বড় শিকার হল নারী।

ইসলামী আগ্রাসন ও যুদ্ধের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু প্রতিপক্ষের নারী। শুধু লুণ্ঠনে তার তৃপ্তি নাই। পরাজিত ও দাস করে সবাইকে হত্যাও তা করতে চায় না। কারণ তা করলে অন্যদের শ্রমের বিনিময়ে ভোগ করবে কী করে? সুতরাং অপরের শ্রমোৎপন্ন ভোগের প্রয়োজনে সব সময় যে বাধ্যতামূলকভাবে ইসলামে দীক্ষিত করেছে তাও নয়। আরব ভূখণ্ডে ইসলাম গ্রহণ সবার জন্য বাধ্যতামূলক করলেও বাহিরে অনেক সময় অত্যন্ত অসম্মানজনক জিজিয়া করের দুর্বিষহ বোঝার বিনিময়ে অমুসলমানদেরকে নিজেদের ধর্ম পালন করতে দিত। তবে ইসলামের অধীনে অমুসলমানদের জীবন থাকত অত্যন্ত অনিশ্চিত, অপমানিত ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সব দিক থেকে দুর্গত।

তবে যে কথা একটু আগেই বলেছি, আর সব আগ্রাসী বর্বরতার মত ইসলামী আক্রমণের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে নারী। নারীদের বন্দী ক’রে দাসকরণ এবং ধর্ষণে যে শুধু পুরুষ যোদ্ধারা ধর্ষণের আনন্দ পেত তাই নয়, এ দ্বারা বন্দী নারীদের গর্ভে সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে তারা ইসলামের সংখ্যা বৃদ্ধিরও সহজ উপায় খুঁজে পেত। অধিকন্তু এটা ছিল বিরুদ্ধ বা অমুসলিম জাতি বা জনগোষ্ঠীর মর্যাদা বোধ ভেঙ্গে দিবার সহজ পদ্ধতি। নারী মানুষের জননী। সুতরাং নারী মানুষের মর্যাদা বোধ এবং আবেগ-অনুভূতিরও সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা। তাই যারা মুহাম্মদের অনুসারী, অনুগত এবং অধীনস্থ নয় তাদের সবচেয়ে দুর্বল বা স্পর্শকাতর জায়গাতে আঘাত করেও ইসলাম তাদের প্রতিরোধের শক্তিকে ভাঙ্গতে চেয়েছে। এর পাশাপাশি ছিল ইসলামের বর্বর ও হানাদার পুরুষ শক্তিকে তৃপ্তি দানের উদ্দেশ্য। সুতরাং ইসলামে বন্দী নারী এবং ক্রীতদাসী ধর্ষণ অনুমোদন লাভ করেছে। আমরা এই প্রসঙ্গে ১৯৭১-এ বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর লক্ষ লক্ষ নারী ধর্ষণের কথা স্মরণ করতে পারি, যার আদর্শিক উৎস ছিল কুরআনের অনুমোদন এবং মুহাম্মদের দৃষ্টান্ত।

বস্তুত ইসলামকে শুধু আগ্রাসী যুদ্ধের ধর্ম বললে খুব সামান্যই বলা হয়; তাকে একই সঙ্গে বলতে হবে লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের ধর্ম। তবে সবটাই তা ঢেকে রাখে অবিশ্বাস্য রকম ভণ্ডামি, মিথ্যাচার ও প্রতারণা দিয়ে। সুতরাং ন্যায়-নীতি বোধহীন দুর্নীতির ধর্মও এটা। ইসলামী পৃথিবীর দেশে দেশে শাসক বা সমাজ নেতাদের দুর্নীতির ব্যাপ্তি এই জন্য বিস্ময়কর নয়। পাশ্চাত্যের যে সমালোচনাই আমরা করি তার রাষ্ট্রনেতাদের কাছ থেকে যে নৈতিক সততা এবং সংযম সমাজ দাবী করে তার কোন প্রতিফলন ইসলামী পৃথিবীতে খুঁজে লাভ নাই।

নির্বিবেক নারী সম্ভোগী ও ধর্ষবাদী পুরুষ এবং স্বেচ্ছাচারী একনায়ক সৃষ্টি ও লালনের জন্য এমন অনুকূল সামাজিক পরিবেশ আর কোনও ধর্ম দেয় নাই যা ইসলাম দিয়েছে। ইসলাম যেখানে গেছে সেখানে মানুষের রক্ত, অশ্রু ও ঘামের উপর দিয়ে গড়ে তুলা হয়েছে নিরঙ্কুশভাবে একনায়কী শাসকের ভোগ-সম্ভোগের জন্য জমকালো সব আয়োজন, বিরাট বিরাট প্রাসাদ, অগণিত বন্দী ও অবরুদ্ধ নারীর হেরেম, এইসব হেরেম পাহারার জন্য নৃশংস খোজা ব্যবস্থা এবং ঘটানো হয়েছে দাস ব্যবস্থার অপ্রতিরোধ্য বিস্তার।

শুধু আরবের মরুচারী যাযাবরদের জন্য নয়, উপরন্তু পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি নির্ভর সভ্যতাগুলির প্রান্তে অবস্থিত যাযাবর ও অর্ধ যাযাবর বর্বর জনগোষ্ঠীসমূহের নিকট যুদ্ধ, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের উপযোগী ধর্ম হিসাবে ইসলামের আবেদন হল অপ্রতিরোধ্য। এদের রাষ্ট্র ছিল না, সভ্যতা ছিল না, প্রকৃতপক্ষে পশু পালন ব্যতিরকে উৎপাদনও ছিল না, নির্দিষ্ট ভূমির সাথে এরা আবদ্ধও ছিল না। আরব ছাড়াও উত্তর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের যাযাবর, অর্ধ যাযাবররা ইসলামী বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে হোক আর স্বেচ্ছায় হোক ইসলাম গ্রহণ ক’রে দলে দলে কৃষি সমাজগুলির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মিসর, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ভারত, স্পেন, গ্রীস ও বলকানের কৃষক সমাজগুলি তছনছ হয়ে গেল। সব জায়গায় ইসলামী বাহিনীর হাত ধরে গেল অর্ধসভ্য আরবের ভাষা ও সংস্কৃতি। সুপ্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মিসর, সিরিয়া, ইরাক তাদের ধর্ম ও  সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের ভাষাও হারালো। গর্বিত ও সুপ্রাচীন সভ্যতার অধিকারী ইরান আরবী লিপিমালা গ্রহণ করে তাদের ভাষাকে কোনক্রমে রক্ষায় সমর্থ হলেও তার প্রাচীন ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার গৌরবময় উত্তরাধিকারকে হারাতে বাধ্য হল। ভারতবর্ষ ইসলামের তরবারিকে মোকাবিলায় ব্যর্থ হলেও তার কৃষি সমাজ ও সভ্যতার শক্তির গুণে শেষ পর্যন্ত তার নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতিকে অনেকাংশে রক্ষা করতে সমর্থ হল। অবশ্য ইসলামের ধ্বংসযজ্ঞের বিরাট আঘাত তাকে তছনছ করেছে সহস্রাধিক বৎসর ধরে। অধ্যাপক লালের হিসাব অনুযায়ী ১,০০০ থেকে ১৫২৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে ভারতবর্ষে ইসলামের আগ্রাসনে ছয় থেকে আট কোটি মানুষ নিহত হয়েছিল। অর্থাৎ ৮ম শতাব্দীতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে আরব মুসলিম বাহিনী বৃহত্তর সিন্ধু অঞ্চলে যে ধ্বংস ও হত্যা যজ্ঞ পরিচালনা করে এবং ১৫২৫ খ্রীষ্টাব্দের পরেও মুসলিম হানাদাররা যে সকল হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে এই হিসাবের ভিতরে সেগুলিকে ধরা হয় নাই। এ থেকেই বুঝা যায়  ইসলামের আগ্রাসনের সমগ্র কাল জুড়ে ভারতবর্ষে ইসলামের তরবারিতে কী বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণ দিয়েছিল।[24] ধর্ষিত হয়েছিল হয়ত আরও বহু বেশী সংখ্যক নারী যাদের হিসাব করার চেষ্টা আজ অবধি হয়েছে বলে আমার জানা নাই। হয়ত সেটা সম্ভবও নয়। তবে নারীর প্রতি ভয়ঙ্কর ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণকারী এবং নারীকে পুরুষের মত মানুষ হিসাবে বিবেচনা না ক’রে শুধুমাত্র পুরুষের ভোগের সামগ্রী বিবেচনাকারী ইসলামের আক্রমণ ও আধিপত্য নারীর জন্য কী পরিণতি বয়ে আনতে পারে তা সহজেই অনুমান করা চলে।

যাইহোক, ইসলামের আঘাতে প্রাচীন সভ্যতাগুলি গুড়িয়ে গেলেও খ্রীষ্টধর্মের মাধ্যমে ঐক্যের শক্তিতে বলীয়ান কৃষক ইউরোপ শেষ পর্যন্ত ইসলামকে প্রতিহত করে এবং একটা পর্যায়ে প্রত্যাঘাতেও সক্ষম হয়। স্পেন থেকে ইসলাম উৎখাত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অতি সামান্য ভূখণ্ড বাদে বলকান এবং গ্রীসও মুক্ত হয়। তবে অনেক দূরবর্তী চীনের সভ্যতার শক্তিকে আঘাত করার ক্ষমতা ইসলামের ছিল না। তা সত্ত্বেও এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল অঞ্চলে ইসলামের প্রসার হল।

প্রত্যেক মানুষ তার চেতনা বা চরিত্র ও প্রবণতা অনুযায়ী পরিপার্শ্বকে নির্মাণ করে। এই অর্থে বলা যায় মানুষ নিজেকেই পুনরুৎপাদন বা সম্প্রসারণ করে, অন্যকে নয়। সুতরাং মুহাম্মদ এমন সমাজ নির্মাণ করেছেন যার নেতা বা শাসক হবে তার নিজের পুনরুৎপাদন বা সম্প্রসারণ। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী তার চরিত্র ও মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন ঘটবে শাসকের মধ্যে, এই সমাজের নেতার মধ্যে। একই সঙ্গে এই সমাজের শাসিতরা হবে স্বেচ্ছাচারী একনায়কী শাসকের স্বেচ্ছাচারী শাসনের উপযোগী। সাধারণ মানুষ বা জনগণ যে ভয়ঙ্কর দাস ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার হয় তারা সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থক ও রক্ষকে পরিণত হয়। উপরের তলার শাসকদের মধ্যে তবু শিক্ষা, প্রাচুর্য এবং তুলনামূলক নিরাপদ জীবনের প্রভাবে কিছু উদারতা ও সহিষ্ণুতা আসতে পারে। তাছাড়া শুধু নামাজ-রোজা দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। অন্যান্য সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রয়োজনেও ধর্ম বহির্ভূত কিছু জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজন হয়। সমাজ-তল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রতি বিমুখ বা বিরোধী হওয়ায় সমাজের ভিতর থেকে এ সবের বিকাশ ঘটে না। ফলে অন-ইসলামী সমাজ থেকে এগুলিকে যত সীমাবদ্ধ আকারেই হোক দখল বা গ্রহণ করতে হয়। এভাবে দেখা যায় উপর তলার শাসকরা ধর্মের বিধিনিষেধের গণ্ডী অনেক সময় ভঙ্গও করে রাষ্ট্র বা শাসন রক্ষার প্রয়োজনে, নিজেদের ভোগেরও প্রয়োজনে। কিন্তু সমাজের নীচ তলা ধর্মের প্রশ্নে হয়ে থাকে ভয়ঙ্কর রকম উগ্র, অন্ধ ও গোঁড়া। এভাবে এই ভয়ঙ্কর ব্যবস্থার যে সবচেয়ে বড় শিকার সে নিজেই হয়ে পড়ে ভয়ঙ্কর শিকারী।

ইসলামী পৃথিবীর এই কালো অধ্যায়ের অবসান সূচিত হয়েছে আধুনিক ইউরোপের আঘাতের ফলে। ইউরোপ যখন আধুনিক ও উন্নততর সমাজ সংগঠন, প্রযুক্তি এবং অস্ত্রের বলে বলীয়ান হয়ে ইসলামী সমাজকে আঘাত করেছে তখন ইসলামী সমাজের আক্রমণ ও আত্মরক্ষার শক্তি ভেঙ্গে পড়েছে। আধুনিক ইউরোপ পৃথিবীকে অনেক কিছুই দিয়েছে। দাস ব্যবস্থার অবসান, নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কে চেতনা, আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, শিল্প সভ্যতা – এ সবই ইউরোপের অবদান। কিন্তু একই সঙ্গে ইউরোপ দিয়েছে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ।

ইউরোপের অধীনে প্রায় সমগ্র পৃথিবী চলে যায়। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া – এই তিন মহাদেশকে আবিষ্কার এবং অধিকার করে ইউরোপীয়রা নিজেদের আবাস ভূমিতে পরিণত করে। দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানরা কিছু পরিমাণে টিকে থাকলেও উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় তারা প্রায় নির্মূল হয়ে যায়। আফ্রিকার সমগ্র এবং এশিয়ার বিশাল ভূ-ভাগ ইউরোপীয় বিভিন্ন রাষ্ট্রের অধিকারে চলে যায়। সেই সঙ্গে ইসলামী পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলও ইউরোপীয়দের অধিকারভুক্ত হয়।

ইউরোপের আধিপত্য সর্বত্র পরিবর্তন সূচিত করে। তার পুঁজি এবং প্রযুক্তি সর্বত্র কম-বেশী বিস্তৃত হয় সেই সঙ্গে বিস্তৃত হয় তার বাজার ব্যবস্থা। তবে সাম্রাজ্যবাদী রূপে আবির্ভূত পাশ্চাত্যের ইতিবাচক ভূমিকার তুলনায় নেতিবাচক ভূমিকাই প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামও ছিল সর্বত্র কম আর বেশী। বিশেযত বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এশিয়া-আফ্রিকার বহু সংখ্যক দেশ স্বাধীন হয়। এভাবে প্রত্যক্ষ সাম্রাজ্যবাদ বা উপনিবেশবাদের যুগের অবসান ঘটে।

ইউরোপ থেকে উদ্ভূত আধুনিক সভ্যতা সর্বত্র যে পরিবর্তন সূচিত করে সেই পরিবর্তনের ঢেউ মুসলিম পৃথিবীতেও আছড়ে পড়ে। প্রথম পর্যায়ে পরিবর্তন সূচিত হয় সেইসব দেশে যেসব দেশ প্রত্যক্ষ ইউরোপীয় শাসনাধীনে যায়। পরবর্তী সময়ে তুরস্ক, সৌদী আরব বা ইরানের মত যে দেশগুলি ইউরোপের অধিকারে যায় নাই সেই দেশগুলিতেও ধীর গতিতে আধুনিক সভ্যতার স্পর্শ লাগতে শুরু করে। বিশেষ করে অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রায় সব ইসলামী দেশে লক্ষ্যণীয় মাত্রায় ঘটেছে।

অর্থাৎ বস্তুগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইসলামী পৃথিবীও সামনের নিকে যাত্রা করেছে। কিন্তু এটা লক্ষ্যণীয় যে এই যাত্রায় অমুসলিম চীন, ইন্দোচীন কিংবা লাতিন আমেরিকার দেশগুলির সাফল্যের তুলনায় ইসলামী দেশগুলির সাফল্য নগণ্য। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সম্পদে সমৃদ্ধ দেশগুলির ব্যর্থতা থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। এবং ইসলামী পৃথিবীর প্রায় সব দেশ হয়ে আছে লাগামহীন দুর্নীতি, সন্ত্রাস, আত্মঘাতী সহিংসতা ও খুনাখুনি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও দুর্বলদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন এবং নারী নিগ্রহের লালন-ভূমি। পরমাণু শক্তিধর ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান ইসলামের কোন চিত্র তুলে ধরে? ইসলামী পৃথিবীর এই সামগ্রিক দুর্দশার বাইরে বাংলাদেশও নাই।

এই অবস্থার জন্য কাকে দায়ী করব? অনেকে এর জন্য ‘যত দোষ নন্দঘোষ’ পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে শান্তি পান। তাতে অবশ্য নিজেদের ত্রুটি ও ব্যর্থতার মূল কারণ অনুসন্ধানের কঠিন কাজটা এড়ানো যায়। কিন্তু সমাধানের পথ পাওয়া যায় না। এ কথা বুঝতে হবে যে, পাশ্চাত্যের আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ ইসলামী পৃথিবীর উপর চেপে আছে ইসলামী সমাজের নিজস্ব দুর্বলতার কারণে, যার উৎস ইসলাম নিজেই।

আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে অলোকবাদী ধর্মগুলির সম্পর্ক মূলত সাংঘর্ষিক। কারণ আধুনিক সভ্যতা অন্ধবিশ্বাস নির্ভর ধর্ম চর্চার পরিবর্তে যুক্তি ও প্রমাণ নির্ভর জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উপর নির্ভরশীল। এই অবস্থায় বিদ্যমান ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই না করে আধুনিক সভ্যতা কোথায়ও অগ্রসর হতে পারে নাই। এই কাজ পশ্চিম ইউরোপ একভাবে, পূর্ব ইউরোপ আর একভাবে, আবার চীন, ভিয়েৎনাম, উত্তর কোরিয়া, লাওস, কম্বোডিয়ার মত দেশগুলি যার যার মত করে করেছে। খ্রীষ্টধর্ম এবং বৌদ্ধধর্ম মূলত শান্তিপূর্ণ সামাজিক ধর্ম হওয়ায় এই ধর্মগুলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের রূপ সাধারণভাবে থেকেছে শান্তিপূর্ণ। তবে পশ্চিম ইউরোপে বিদ্যমান ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই যে এক সময় শান্তিপূর্ণ এবং সহজ ছিল না সে বিষয়ে ইতিপূর্বে বলেছি। ক্যাথলিক ধর্মমতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে এক সময় সেখানে প্রোটেস্ট্যান্টদেরকে অনেক নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে যেমন হয়েছে রেনেসাঁর নায়কদের অনেককে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানীর মত দেশগুলিতে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়। ধর্মীয় আন্দোলনের পাশাপাশি ছিল বুদ্ধির মুক্তি তথা যুক্তিবাদী আন্দোলন। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের উপর ধর্মের আধিপত্য শেষ হয়েছে, ব্যক্তির ধর্ম বিশ্বাস ও পালন না করার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং জাগ্রত ইউরোপ পৃথিবীতে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তার ধর্মমুক্ত সেকিউলার বা লোকবাদী চেতনাও ছড়িয়ে দিয়েছে।

বস্তুত মানবিক উন্নয়নের প্রধান শর্ত তার চেতনার উন্নয়ন। এই চেতনাকে অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত না করে মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথে যাত্রা করা সম্ভব নয়। সুতরাং ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে আজকের যুগে সব আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রকেই অলোকবাদী ধর্মের শাসন ও খবরদারী থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য কম অথবা বেশী পদক্ষেপ দিতে হয়েছে। এটা ঠিক যে ইউরোপ বা আমেরিকায় ধর্ম বিশ্বাস ও পালনের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু সেটা শর্ত সাপেক্ষে। অন্যের ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করে নয়। রাষ্ট্র চলে জাগতিক তথা লোকবাদী আইনে। সেখানে আল্লাহর আইনের মত ঈশ্বর বা ধর্মের আইন প্রয়োগের উপায় নাই। রাষ্ট্র সেটাকে মানবে না। খ্রীষ্টধর্ম রাজনৈতিক ও সামরিক ধর্ম না হওয়ায় ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় তা ফিরে যেতে ও থাকতে পারে। ব্যক্তির জীবনাচরণে সীমাবদ্ধ থাকলে তা সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কোন সমস্যা সৃষ্টি করে না। তখন তার বিরুদ্ধে লড়াইটাও শান্তিপূর্ণ হতে পারে। তখন সকলে যে যার যুক্তি অথবা বিশ্বাস নিয়ে পরস্পরকে সমর্থন অথবা খণ্ডনের চেষ্টা করতে পারে।

এই প্রসঙ্গে এই কথাও এখানে বলা প্রাসঙ্গিক হবে যে, অতীতে অনেক নেতিবাচক ভূমিকা রাখলেও খ্রীষ্টীয় নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের এমন কিছু ইতিবাচক দিক আছে যেগুলি সমাজের জন্য বিপুলভাবে কল্যাণকর ভূমিকা পালন করেছে। খ্রীষ্টধর্ম বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকায় ক্রমবর্ধমানভাবে  প্রভাব হারাতে থাকলেও তার উত্তরাধিকার বৌদ্ধ ধর্মের মতই মানুষের জন্য এমন এক মহৎ উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছে যার মূল্যায়নে আমরা যেন অনুদার না হই। এই আলোচনায় ইতিপূর্বে আমি যে কথা বলেছি সেই কথার জের টেনে বলতে হয় যে, খ্রীষ্টধর্মের উত্তরাধিকার ছাড়া আধুনিক ইউরোপের জন্ম হত না। আবার এক সময় এই উত্তরাধিকারের সঙ্গে একটা ছেদেরও প্রয়োজন হয়েছিল। এই ছেদ কোথায়ও কম, কোথায়ও বেশী এবং নানান রূপে ঘটেছিল। না ঘটলে আধুনিক সভ্যতার উদ্ভব এবং সমাজ ও রাষ্ট্র বিপ্লব কিংবা শিল্প বিপ্লব কোনটাই সম্ভব হত না।

কিন্তু যে কথা খ্রীষ্ট বা বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে বলা যায় ইসলাম সম্পর্কে যে সে কথা বলা যায় না তা আশা করি আমার এই আলোচনায় ইতিমধ্যেই কিছুটা হলেও স্পষ্ট করতে পেরেছি। এই তিন ধর্মের ভূমিকাকে আরও স্পষ্ট করার জন্য তিন ধর্ম প্রতিষ্ঠাতার দিকে আর একবার দৃষ্টি দেওয়া যাক। ধর্মের আবরণ সরালে আমরা কী দেখতে পাই? মানুষের জন্য শুধু নয়, বরং সব প্রাণীর জন্যও করুণাঘন বুদ্ধ যেন প্রেম ও দয়ার মূর্ত প্রতীক। মানুষের মুক্তির পথ সন্ধানে সমাজ, সংসার, স্ত্রী-পুত্র সবই ত্যাগ করে রাজপুত্র বুদ্ধ তার বিশ্বাস অনুযায়ী আমৃত্যু মানুষের কাছে বাণী প্রচার করে গেছেন। বুদ্ধ চলে গেছেন। কিন্তু তার শিক্ষা ও দৃষ্টান্তে অগণিত মানুষ অনুপ্রাণিত হয়েছে। সবাই বুদ্ধের পথ অনুসরণ করে সংসার ত্যাগী বা ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণী হয়ে শুদ্ধ জীবন যাপন করে না, করতে পারেও না। কিন্তু সঙ্ঘে বাস ক’রে যে সব নারী ও পুরুষ সেই ধরনের জীবন যাপন ও ধর্ম চর্চা করে বুদ্ধ তাদের মধ্য দিয়েই সমাজে বেঁচে থাকেন। সংসারী ও সাধারণ মানুষ তাদের মধ্য দিয়েই বুদ্ধের সামনে প্রণত হয়ে সমাজ, মানুষ ও জীবন সম্পর্কে একটা বোধের সামনে প্রণত হয়। আসলে একেবারে শুদ্ধতার ধারণা দিয়ে সমাজ-রাষ্ট্র চলতে পারে না। কিন্তু মহত্তর একটা বোধ যদি মানুষের মধ্যে না থাকে তবে পৃথিবী ও সমাজ বাসযোগ্য থাকে না। সে কালে সে কালের মত করে বুদ্ধ সেই বোধ মানুষের মধ্যে জাগাতে পেরেছিলেন। এটা হয়ত এমন একটা আদর্শ যাকে ধ্রুবতারার মত দেখা যায় কিন্তু ধরা যায় না। তবু এটা পথ দেখাতে তো পারে। যে কালে কম্পাসের সন্ধান মানুষের জানা ছিল না সে কালে অকূল সাগরে রাতের আঁধারে জাহাজের পথের দিশা ধ্রুবতারাই তো দিবে।

মানুষের দুঃখে ব্যথিত যীশুও যেন মানুষের জন্য প্রেম ও দয়ার মূর্ত প্রতীক। শান্তির পথচারী, অকৃতদার যীশু তার প্রেম, করুণা ও সেবার ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে আত্মদান করে গেছেন। এ যেন ক্রুশবিদ্ধ বুদ্ধ। তবে প্যালেস্টাইনে জন্ম লাভকারী এ বুদ্ধের বিস্তার মূলত রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত তিন মহাদেশের বিশাল অঞ্চলে। পরবর্তী কালে সারা পৃথিবীর আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তার বিস্তার। তিনিও পেয়েছেন বুদ্ধের মত অনুসারী ও সঙ্ঘ বা চার্চ। প্রেম ও করুণার প্রতীক যীশুর ভূমিকাও অনেকাংশে বুদ্ধের অনুরূপ।

প্রেম ও করুণার প্রতীক বুদ্ধ ও যীশুর পাশে এবার দাঁড় করানো যাক মুহাম্মদকে। মুহাম্মদ যেন মানুষের প্রতি এবং আরও বিশেষ করে নারীর প্রতি ঘৃণার মূর্ত প্রতীক। এ ঘৃণা যেন জীবনের প্রতি, জীবের প্রতি। এই জীবনকে যে তার গর্ভে ধারণ করে সেই নারীর প্রতি তাই বুঝি তার সবচেয়ে বেশী ঘৃণা। মুহাম্মদ বলছেন, ‘দোযখ পরিদর্শন কালে আমি দোযখের দ্বারে দাঁড়াইলাম এবং জানিতে পারিলাম যে, দোযখীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হইবে’(হাদীস নং- ২০৫১, বোখারী শরীফ),[25] ‘দোযখও দেখিয়াছি (জ্ঞাত হইয়াছি) যে, তথায় প্রবেশকারীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হইবে নারীদের (হাদীস নং- ২০৫২, বোখারী শরীফ)।’[26] এক হাদীসে মুহাম্মদ নারীকে গাধা এবং কাল কুকুরের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, ‘যখন তোমাদের কেহ নামাযের জন্য দাঁড়াইবে, সে তাহার সম্মুখে হাওদার পিছনের কাঠটির পরিমাণ একটি কাঠ রাখিয়া দিবে। যদি ঐ রূপ কোন কাঠ বা অন্য কিছু রাখা না হয় এমতাবস্থায় তাহার সম্মুখ দিয়া গাধা,  স্ত্রীলোক অথবা কাল কুকুর গমন করিলে তাহার নামায ভঙ্গ হইয়া যাইবে।’ লাল বা হলুদ রঙের কুকুর থেকে কাল কুকুরকে পৃথক করার কারণ সম্পর্কে মুহাম্মদকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন, ‘কাল কুকুর একটি শয়তান।’[27]  অন্যত্রও তিনি নারীকে শয়তানের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, ‘নারী শয়তানের আকৃতিতে সম্মুখে আসে এবং শয়তানের আকৃতিতে চলিয়া যায়’ (বোখারী শরীফ)।[28]

ত্যাগের মহিমা নয় বরং ভোগের লোভ এবং শাস্তির ভয় দেখিয়ে মুহাম্মদ তার ধর্মরাজ্যের যাত্রাপথ নির্মাণ করেছেন। যারা তাকে অনুসরণ করবে তাদের জন্য ভোগের আয়োজন শুধু পরলোকে নয় ইহলোকেও করেছেন। আর যারা তাকে প্রত্যাখ্যান করবে তাদের শাস্তির আয়োজনও শুধু পরলোকে নয় ইহলোকেও করেছেন। সুতরাং মানুষের মনে লোভের পাশে ভয় বা ত্রাস সৃষ্টির জন্য যা যা করা সম্ভব সবই মুহাম্মদ করেছেন। এক হাদীসে মুহাম্মদ গর্বের সঙ্গে বলছেন, ‘এক মাসের পথের সুদূর প্রান্তে আমার প্রভাবে ভীতির সঞ্চার দ্বারা আল্লাহ তাআলা আমায় সাহায্য করিয়াছেন।’[29]

শান্তি ও সহিষ্ণুতার কথা বলা আর যা-ই হোক ইসলামের জন্য সাজে না। অথচ এগুলির কথা হরহামেশাই ইসলাম আর তার অনুসারীরা শুনায়। এটা তার ভণ্ডামি ও প্রতারণা মাত্র। মুহাম্মদ বা তার ইসলাম ভিন্নতার সামান্যতম চিহ্নকে পর্যন্ত সহ্য করে না। সুতরাং মুহাম্মদ তার ধর্মমতের অনুসারী যারা নয় তাদের সবাইকে সমগ্র আরব ভূমি থেকে বিতাড়নের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, ‘আমি ইয়াহুদী ও নাসারাদের অবশ্যই আরবভূমি হতে বের করে দেব এবং এখানে মুসলমান ছাড়া আর কেউ থাকবে না।’[30] তার জীবদ্দশায় সে কাজ শুরু করলেও সমাপ্ত করতে পারেন নাই। তার মৃত্যুর পর খলীফা ওমর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। ইসলাম গ্রহণ যারা করল না তাদেরকে বিতাড়ন অথবা হত্যা ক’রে আরব উপদ্বীপকে সম্পূর্ণরূপে মুসলিম আবাস ভূমিতে পরিণত করা হল। তবে মুহাম্মদের মৃত্যুর পর প্রথম খলীফা আবু বকরের শাসনকালে আরবের নিরঙ্কুশ ইসলামীকরণ সম্পূর্ণ হবার আগেই ইসলামের বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল সভ্য পৃথিবীর উপর।

আসলে এই রকম বর্বরতাপূর্ণ ধর্মের উত্থান তখনই সম্ভব হয়েছিল যখন বিশাল অঞ্চল ব্যাপী সভ্যতায় ব্যাপক ধ্বংস এবং ক্ষয় নেমে এসেছিল। প্রাচীন মিসর, মেসোপটেমিয়া, সিন্ধুর সভ্যতার আলো বহু কাল আগে নিভে গেছে। গ্রীসের আলোও নিভে গেছে। রোমের সভ্যতাও তখন ধ্বংস প্রায় । ভিসিগথ বর্বরদের হাতে ৪১০ খ্রীষ্টাব্দে রোম নগর লুণ্ঠিত হয়। রোমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা পশ্চিমের রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দে। এরপর কন্সট্যান্টিনোপলকে কেন্দ্র করে টিকে থাকা পূর্ব দিকের বিরাটায়তন বাইজেন্টাইন রোমান সাম্রাজ্যও তখন পতনের দিকে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু রোমান সভ্যতার সেই গৌরব তখন অনেকটাই স্মৃতি মাত্র। তার সাম্রাজ্যের পূর্ব দিকে অবস্থিত বৃহৎ ও শক্তিশালী পারস্য সাম্রাজ্যও তখন ক্ষয়িষ্ণু। তৎকালীন পৃথিবীর এই দুই পরাশক্তি পরস্পরের সঙ্গে অমীমাংসিত যুদ্ধে অবসন্ন। এক বিশাল ভূভাগের মানুষ সভ্যতার উপর আস্থা রাখার কারণ দেখছিল না। যে কোন বর্বরতার উত্থানের জন্য এটা ছিল একটা উপযুক্ত সময়। এই রকম সময়েই সভ্যতার প্রান্তে থাকা আরবের এক মরূদ্যান শহর মক্কায় আনুমানিক ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে মুহাম্মদের জন্ম।[31]

আরবের নিকটবর্তী বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যের প্রয়োজনে সেই সময় আরব বণিক বিশেষত কুরাইশদের যেতে হত। বাণিজ্যোপলক্ষ্যে তার গোত্রের অন্যান্য কুরাইশের মত মুহাম্মদও একাধিক বার সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। অন্যান্য কুরাইশের মত সভ্যতার এই সঙ্কট দশা তারও নিশ্চয় চোখে পড়েছিল। এটাই যুক্তিসঙ্গত মনে হয় যে, সভ্যতার সঙ্কট ও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বজয়ের উচ্চাকাঙক্ষা তার মাথায় কাজ করছিল। এর জন্য প্রয়োজন ছিল একটি সেনাবাহিনীর, যা হবে প্রথমে আরব জয়, সেখানে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং অতঃপর বিশ্বজয়ের হাতিয়ার। এই সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তার প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন উপজাতিতে বিভক্ত আরব উপদ্বীপে ঐক্যবদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার। এই ঐক্যবদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ধর্মকে দেখতে পান সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে।

কিন্তু আরবের বিদ্যমান ধর্মগুলিকে অথবা এগুলির কোন একটিকে তিনি তার উদ্দেশ্য সাধনের উপযোগী দেখতে পান নাই। এ ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন হয়েছিল আরবে প্রচলিত ধর্মগুলিকে ব্যবহার করে একটি নূতন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা। তার জন্য তিনি তার মত করে আরবে বিদ্যমান পৌত্তলিক তথা পেগান, ইহুদী ও খ্রীষ্টানসহ সকল ধর্ম থেকে তার উপকরণ সংগ্রহ করলেন এবং আরবে কুরাইশদের প্রভাব ও ঐতিহ্যকে ব্যবহার করলেন। আরবের নেতৃস্থানীয় কুরাইশ গোত্রের প্রভাবশালী পরিবারের একজন হওয়ায় কাজটা তার জন্য সহজতর হল। তার এই প্রয়োজনে তিনি তৎকালীন মক্কা এবং কুরাইশদের প্রধান দেবতা আল্লাহকে সর্বশক্তিমান ও একমাত্র উপাস্য দেবতা হিসাবে ঘোষণা করলেন।

কিন্তু এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে তৎকালীন আরব সমাজের মানদণ্ড বিচারে মক্কার সভ্য কুরাইশদের মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েক জন বাদে মুহাম্মদ আর কাউকে তার ধর্মে স্বেচ্ছায় নিতে পারেন নাই। তাদেরকে যুদ্ধে পরাজিত ক’রে হত্যার ভয় দেখিয়ে নিতে হয়েছে। এর জন্য তিনি সাহায্য নিয়েছেন প্রধানত মরুচারী, বর্বর ও সভ্যতাবিরোধী বেদুইনদের। সুতরাং এই বেদুইনদের জীবন বোধ, বিশ্বদৃষ্টি, আচার-আচরণ ও চরিত্র ইসলামের গভীরে ছায়া ফেলে আছে। বেদুইনদের উপর নির্ভর করে তিনি যে ধর্ম গড়লেন তা যে শুধু অমানবিক হল তাই নয় সেই সঙ্গে হল সভ্যতা বিরোধী।

ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে তিনি কী ধরনের মানুষ তার চারপাশে জড়ো করেছিলেন এবং কী ধরনের মন-মানসিকতা তার অনুসারীদের মধ্যে সঞ্চারিত করেছিলেন সে সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার জন্য বুখারী শরীফের একটি হাদীস থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দেওয়া যাক, ‘তিনি পানি ভরে একটি পাত্র আনতে বললেন। (পানি আনা হল) তিনি এর মধ্যে নিজের উভয় হাত ও মুখমণ্ডল ধুয়ে কুল্লি করলেন। তারপর (আবূ মূসা ও বিলাল [রা]-কে) বললেন, তোমরা উভয়ে এ থেকে পান করো এবং নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুকে ছিটিয়ে দাও। আর সুসংবাদ গ্রহণ করো। তাঁরা উভয়ে পাত্র তুলে নিয়ে যথা নির্দেশ কাজ করলেন। এমন সময় উম্মে সালামা (রা) পর্দার আড়াল থেকে ডেকে বললেন, তোমাদের মায়ের জন্যও অবশিষ্ট কিছু রেখে দিও। অতএব তাঁরা এ থেকে অবশিষ্ট কিছু উম্মে সালামা (রা)-এর জন্য রেখে দিলেন।’[32] আর একটা হাদীস থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দেওয়া যাক যেটা হুদায়বিয়ার সন্ধির অল্প সময় পূর্ববর্তী একটি দৃশ্যের বিবরণ ꞉ ‘এতদ্ভিন্ন ওরওয়া এই বিষয়ের প্রতি বিশেষরূপে লক্ষ্য করিয়াছিল যে, রসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লামের থুথু বা শ্লেষ্মা মাটিতে পতিত হইতে পারিত না, বরং উহা ছাহাবীগণ নিজ হস্তে লইয়া লইতেন এবং তৎক্ষণাৎ স্বীয় চেহারা ও শরীরে মাখিয়া ফেলিতেন।’[33]  এই ধরনের মনন ও রুচি সভ্যতার কোন মানদণ্ডে পড়ে সঙ্গত কারণেই সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু এই ধরনের মনন ও রুচির অনুসারীরাই হল এই ধর্মের মূল সামাজিক ভিত্তি, যারা আবার ছিল প্রধানতই অসভ্য বা অর্ধসভ্য যাযাবর বেদুইন।

সুতরাং যা কিছু মানুষের মনকে চিন্তাশীল করে, নম্র করে, সুকুমার বৃত্তির অধিকারী করে, সৃজনশীল করে তার প্রতিই তার ঘৃণা এবং বিদ্বেষ। প্রকৃতপক্ষে মানুষকে যা কিছু সভ্যতামুখী করে তার প্রতিই ইসলামের ঘৃণা এবং বিদ্বেষ। যে সভ্যতা তা নির্মাণ করতে পারে না তার প্রতি তার ঘৃণা। অথচ ঘৃণিত এই সভ্যতার প্রতি তার লোভ। লোভ সভ্যতার দ্বারা সৃষ্টি ভোগের সামগ্রীর জন্য। কাজেই ঘৃণার সঙ্গে ভোগ ইসলামের মর্মমূলে গাঁথা। যেমন তা ঘৃণার সঙ্গে নারীকে সম্ভোগ করে তেমন তা ঘৃণার সঙ্গে সভ্যতাকেও ভোগ করে। এই রকম ধর্ম নিয়ে যে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন কোনও সমাজ এবং উন্নত সভ্যতা নির্মাণ করা সম্ভব নয় সেটা বহু অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত।

 

 

রেফারেন্সসমূহ: 

[1] আল-কুরআনুল করীম, প্রকাশক- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ছত্রিশতম মুদ্রণ, ডিসেম্বর ২০০৭।

[2] কোরান সূত্র, অনুঃ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, প্রকাশক, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রকাশ- ১৯৮৪।

[3] বোখারী শরীফ (বাংলা তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা), তৃতীয় খণ্ড, অনু- মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রঃ) ও মাওলানা আজিজুল হক সাহেব; হামিদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা, একাদশ সংস্করণ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা- ৯২

[4] আল-কুরআনুল করীম, প্রকাশক- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ছত্রিশতম মুদ্রণ, ডিসেম্বর ২০০৭। পরবর্তী সকল আয়াতের অনুবাদ নেওয়া হয়েছে এই অনুবাদ গ্রন্থ থেকে।

[5] ইসলামে যুদ্ধের বিস্তারিত ভূমিকা জানার জন্য দেখুন꞉ এম এ খান, জিহাদ ꞉ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও দাসত্বের উত্তরাধিকার, ব-দ্বীপ প্রকাশন, কাঁটাবন, শাহবাগ, ঢাকা।

[6] দেখুন ꞉ এমএ খান, জিহাদ ꞉ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও দাসত্বের উত্তরাধিকার, ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১০, পৃষ্ঠা- ৮৯-৯০।

 

[7] বোখারী শরীফে বলা হচেছ, ‘প্রায় দীর্ঘ এক মাসকাল এই অবস্থা চলিল।’ বোখারী শরীফ, তৃতীয় খণ্ড, অনুবাদ- মাওলানা শামছুল হক ও মাওলানা আজিজুল হক, হামিদিয়া লাইব্রেরী, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা- ১৯২।

[8] বোখারী শরীফ (বাংলা তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা), তৃতীয় খণ্ড, অনুবাদ- মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রঃ) ও মাওলানা আজিজুল হক সাহেব, হামিদিয়া লাইব্রেরী লিঃ, ঢাকা, একাদশ সংস্করণ. জুন ২০০৭, পৃ- ৬৩।

[9] ঐ, ষষ্ঠ খণ্ড, সপ্তম সংস্করণ ২০০৬, পৃ-১৪৯।

[10] বানু কুরাইযা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন ꞉ ‘ইসলাম বিতর্ক’ গ্রন্থে সংকলিত আয়েশা আহমেদ-এর বনি ক্বারাইযার হত্যাযজ্ঞ ꞉ মুসলিম উম্মার সবচেয়ে খুশীর দিন, ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা, ২০১০, পৃ ꞉ ৬৮-৭১।

[11] যয়নবকে বিবাহ সংক্রান্ত বিশদ আলোচনার জন্য দেখুন ꞉ মুমিন সালিহ্, যয়নব ও জানোয়ার ꞉ মুহাম্মদের সঙ্গে যয়নবের স্বর্গীয় বিবাহ এবং যায়িদের জীবন ধ্বংস, ইসলাম বিতর্ক, প্রকাশক- ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা, ২০১০, পৃষ্ঠা-৩৯-৪৭)।

[12] বোখারী শরীফ, [বাংলা তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা], ৩য় খণ্ড, অনুবাদঃ মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী [রঃ] ও মাওলানা আজিজুল হক সাহেব, প্রকাশকঃ হামিদিয়া লাইব্রেরী লিঃ, ঢাকা, একাদশ সংস্করণ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা-৮৯।

[13] হাদীস নং ৪৩৮৯- মুসলিম শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, সম্পাদনা পরিষদের তত্ত্বাবধানে অনূদিত এবং সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় সংস্করণ জুন ২০১০, পৃষ্ঠা- ২৬৬।

[14] হাদীস নং ৪৩৯০, ঐ, পৃষ্ঠা- ২৬৭।

[15] সুনানু ইবনে মাজাহ্, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রকাশক- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, মে ২০০৮, পৃষ্ঠা-৫৬৯।

[16] বোখারী শরীফ, তৃতীয় খণ্ড, অনু- মাওলানা শামছুল হক ও মাওলানা আজিজুল হক, হামিদিয়া লাইব্রেরী লিঃ, একাদশ সংস্করণ- জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা- ২৬১।

[17] বোখারী শরীফ, তৃতীয় খণ্ড, অনু- মাওলানা শামছুল হক ও মাওলানা আজিজুল হক, হামিদিয়া লাইব্রেরী লিঃ, একাদশ সংস্করণ- জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা- ১৪৮-১৪৯।

[18] সিন্ধু সভ্যতায় ধর্ম ও রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনার জন্য দেখুন ꞉ শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল, আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা, ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৩।

[19] হিন্দু ধর্ম এবং বর্ণজাতি প্রথার উদ্ভব ও বিকাশ সংক্রান্ত আলোচনার জন্য দেখুন꞉ শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল, আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা, ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা। এছাড়া এ বিষয়ে লেখকের সংক্ষিপ্ত আকারে আরও কিছু আলোচনার জন্য দেখুন ꞉ শামসুজ্জোহা মানিক, বাঙ্গালী জাতির সঙ্কটের উৎস ও তার প্রতিকার সন্ধান-এর পাদটীকা, ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা, ২০১০, পৃষ্ঠা-৬৭-৬৮।

[20] বুখারী শরীফ, পঞ্চম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ১৯৯৯, পৃষ্ঠা-২৪৩।

[21] বুখারী শরীফ, দশম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মে ১৯৯৪, পৃষ্ঠা- ৩০৪।

[22] হাদীস নং ৪৪৩৯, মুসলিম শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, সম্পাদনা পরিষদের তত্ত্বাবধানে অনূদিত এবং সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় সংস্করণ, জুন ২০১০, পৃষ্ঠা-২৯৪।

[23] বোখারী শরীফ (বাংলা তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা), তৃতীয় খণ্ড, অনুবাদক ꞉ মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রঃ) ও মাওলানা আজিজুল হক সাহেব, প্রকাশক- হামিদিয়া লাইব্রেরী লিঃ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা- ৮৫।

[24] এমএ খান, জিহাদ꞉ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও দাসত্বের উত্তরাধিকার, প্রকাশ- ২০১২, ব-দ্বীপ প্রকাশন, পৃষ্ঠা- ২৭০।

[25] বোখারী শরীফ, ষষ্ঠ খণ্ড, অনুঃ মাওলানা শামছুল হক ও মাওলানা আজিজুল হক, সপ্তম সংস্করণ, জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা- ১৪৬।

[26] ঐ, পৃষ্ঠা- ১৪৭।

[27] মুসলিম শরীফ, বঙ্গানুবাদ, ২য় খণ্ড, অনুঃ আল্লামা মৌলানা নেছারুল হক, ইসলামিয়া লাইব্রেরী, চট্টগ্রাম, ১৯৭৫, পৃষ্ঠা- ৩১৭।

[28] বোখারী শরীফ, ষষ্ঠ খণ্ড, অনুঃ মাওলানা শামছুল হক ও মাওলানা আজিজুল হক, সপ্তম সংস্করণ, জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা- ২৯১।

[29] বোখারী শরীফ, তৃতীয় খণ্ড, অনুঃ মাওলানা শামছুল হক ও মাওলানা আজিজুল হক, একাদশ সংস্করণ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা-৮৫।

[30] আবু দাউদ শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৬, পৃষ্ঠা- ২১৭।

[31] সভ্যতার এই সঙ্কট বিষয়ে লেখকের কিছু বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন ꞉ শামসুজ্জোহা মানিক, ইসলামের ভূমিকা ও সমাজ উন্নয়নের সমস্যা, ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা, ২০১০, পৃঃ ৭৫-৮০)

[32] বুখারী শরীফ (সপ্তম খণ্ড), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় সংস্করণ,  মে ২০০১, পৃষ্ঠা- ১৬৮।

[33] বোখারী শরীফ (বাংলা তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা), তৃতীয় খণ্ড, অনুবাদ ꞉ মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রঃ) ও মাওলানা আজিজুল হক সাহেব, হামিদিয়া লাইব্রেরী লিঃ, একাদশ সংস্করণ, জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা- ২১০

 

 

ইসলাম ও আধুনিক সভ্যতা (১ম পর্ব)

ইসলাম ও আধুনিক সভ্যতা (২য় পর্ব)