কাকন রেজা

পেঁয়াজ নিয়েও হাইকোর্টকে কথা বলতে হচ্ছে। অতএব আমরা আর পিছিয়ে নেই। খোদ অ্যামেরিকার সমপর্যায়ে। বলতে পারেন কিছুটা এগিয়ে। কিভাবে বলি, অ্যামেরিকাতেও একবার পেঁয়াজের দাম বেড়ে গিয়েছিলো। আর সে কারণে পেঁয়াজ বিষয়ে বিশেষ একটি আইন করতে হয়েছিলো তাদের। আমাদের কোর্ট বলেছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে পেঁয়াজের দাম না কমলে, তারা হস্তক্ষেপ করবেন। তবে এগিয়ে থাকাটা হলো দামের দিক ধরে। একটা তালিকা দেখলাম অনলাইনে। আমাদের পেঁয়াজের দাম দু’শ বিশ টাকা এবং তার পরের দামটি সম্ভবত পঞ্চান্ন বা আটান্ন টাকা। আরেক পরিসংখ্যানে দেখলাম, সারা বিশ্বে পেঁয়াজের গড় পাইকারি মূল্য ছিলো আটান্ন টাকা। আর আমাদের পাইকারি মূল্য এক’শ সত্তর টাকা। অর্থাৎ আমরা অ্যামেরিকাসহ সারাবিশ্বের তুলনায় এক’শ বারো টাকা এগিয়ে। সারাবিশ্বের তুলনায় এতটা এগিয়ে যাওয়া কিন্তু কম কথা নয়। গণিত বলছে আমরা বিশ্ব থেকে প্রায় তিনগুন এগিয়ে।

পেঁয়াজের দাম বেড়েছে দেখে অনেকে পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানাচ্ছেন। ফেসবুকে এমন ঘোষণা পাচ্ছি অহরহ। কেউ কেউ তো পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার সচিত্র রেসিপি আপলোড করছেন ফেসবুকে। তবে এসবের বিপরীতে একজনের পাল্টা প্রশ্নে খুব মজা পেয়েছি। তিনি বলেছেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়াতে পেঁয়াজ ছেড়েছেন, কাপড়ের মূল্যবৃদ্ধিতে কি কাপড়টাও ছাড়বেন?’ সামাজিকমাধ্যমে গায়েপড়ে মন্তব্য করাটা আমার স্বভাব নয় বলেই পাল্টা বলিনি। না হলে তাকে সেই ন্যাংটো রাজার কাহিনিটা বলতাম। সাথে বলতাম, বোকারা রাজার কাপড় দেখতে পায় না, বুদ্ধিমানরাই পায়। অতএব বোকা বনতে না চাইলে কাপড়ের ব্যাপারটি চেপে যান।

অনেক গণমাধ্যমে দেখলাম একটা পেঁয়াজের ছবি দিয়ে শিরোনাম করেছেন অনেকটা এরকম, ‘একটা পেঁয়াজের দাম আটচল্লিশ টাকা’। আগের এক লেখাতেই বলেছিলাম, পেঁয়াজ আপেলকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। গতকাল অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় আপেল কিনেছি এক’শ চল্লিশ টাকা দরে। বাসায় গিয়ে শুনি পেঁয়াজ দু’শ বিশ টাকা। এক কেজি পেঁয়াজে প্রায় দু’কেজি আপেল! আবার সেই তেল আর ঘিয়ের দাম সমান হওয়ার গল্পটা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই গল্পের পরবর্তী সিক্যুয়াল করেছি আমরা, সেই সিক্যুয়ালে ঘিয়ের চেয়ে বেড়ে গেছে তেলের দাম। অবশ্য তেলের দাম না বেড়ে উপায় কী। চারিদিকে তেলের ব্যবহার যে পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে দাম না বেড়ে যায় কোথায়! কলিগ বললেন, পেঁয়াজের দাম ‍বৃদ্ধির পেছনেও কারণটা তেমনি। এখন কথায়-কথায় কাঁদতে হয়। আমপাবলিক কাঁদে শোক আর ‘শকে’ এবং বিশেষ মানুষেরা কাঁদেন শখে।

অবশ্য পেঁয়াজ নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। ইতোমধ্যে পেঁয়াজের বিকল্প বের করে ফেলেছেন আমাদের বিজ্ঞানীরা। ‘চিভ’ নামে সাইবেরিয়ার এক বিকল্প মশলার চাষে সফল হয়েছেন গাজীপুর কৃষি গবেষণা ইনস্টিউটের গবেষকরা। তারা বলছেন, পেঁয়াজের বিকল্পে রান্নায় এই ‘চিভ’ ব্যবহার করা যেতে পারে। আমাদের কোনো একটা ক্রাইসিস হলেই কেনো জানি মানুষ বিকল্প নিয়ে মেতে উঠে। মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের আমলে চালের দাম বেড়ে গেলো, তখন তারা বিকল্প হিসাবে আলুর উপর জোর দিলেন। ‘বেশি করে আলু খান, ভাতের উপর চাপ কমান’, এই স্লোগানটা চোখে পড়তে লাগলো সব জায়গায়। এক কেউকেটা একবার বললেন, এক দিন ভাত না খেলে কি হয়, এমনটা। আরেকজন বললেন, একদিন বাজার না করতে। গোশতের দাম বেড়ে গেলেও এমন নছিহত শুনেছি। তবে ভাগ্য ভালো গরু –খাসির দাম বেড়ে যাওয়াতে বিকল্প কোন গোশতের কথা কেউ বলেননি।

গরু, খাসির গোশত হালাল, কিন্তু বিকল্প গোশত হালাল নাও হতে পারে। বিকল্প বিষয়টি এমনি, সব বিকল্পই সহি হবে এমনটা কথা নয়। ক্ষুধা পেটে সবই খাদ্য এবং সেটা জরুরি অবস্থায়। বিকল্প প্রয়োজন হয় জরুরি কারণে। আমাদের কথায় কথায় বিকল্প খোঁজা এবং পেঁয়াজের মতন না খাওয়ার ঘোষণায় মাঝেমধ্যেই বিভ্রান্ত হই। তবে কি আমরাও জরুরি অবস্থায় আছি, বিকল্প খোঁজার মতন প্রয়োজনে!

 

0 Shares
কাকন রেজা এর ব্লগ   ৪ বার পঠিত