মাসকাওয়াথ আহসান

সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়েদের সহ-শিক্ষা কার্যক্রম না থাকার কারণে অনগ্রসর জনপদে নারী-পুরুষ বেড়ে ওঠে আলাদা গোত্র হিসেবে। এতে নারী ও পুরুষ; ‘মানুষ’ হিসেবে নিজেদের মিলের জায়গাগুলো উপলব্ধি করতে পারে না । হয়ে পড়ে দুটো পক্ষ।

আর এরকম জনপদের নারীর সংস্পর্শবিহীন কবি-লেখকেরা বঞ্চিতের বেদনা থেকে নারীকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে তাতে খুব বেশি মূল্য সংযোজন করে ফেলে। নারী যেন হীরে-জহরত এমন একটা কাল্পনিক মূল্য সংযোজন ঘটে। ফলে নারীকে ছিনিয়ে নেবার পেছনে পুরুষ-সমাজ তার সমস্ত শক্তি ক্ষয় করে। পুরুষ নিজেকে মূল্যহীন ভাবার কারণেই সে হীনমন্যতা থেকে নারীকে একটা ট্রফি হিসেবে বিবেচনা করে। এই ট্রফি জেতার জন্য কেউ তাকে নিয়ে কবিতা লিখে; কেউ গান গায়; কেউ দামি উপহার দেয়, কেউ জীবনব্যাপী তাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বা ইনশিওরেন্স পলিসি দিতে চেষ্টা করে। আর যারা ট্রফি জিততে পারে না; তারা সেটা সহিংসভাবে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করে। নারীর ওপর অতিরিক্ত মূল্য-সংযোজনের কারণেই তার জীবন অনিরাপদ হয়ে ওঠে।

রূপকথার নারীকে না জেনে শিশুকাল থেকে বন্ধু হিসেবে জানতে পারলে; ছেলে-বন্ধু আর মেয়ে-বন্ধুর পার্থক্য ঘুঁচে যায়। কেবলই মানুষের বন্ধুত্বে জটিলতা কম। সহজ বন্ধুত্বের অনুশীলন থাকলে কী বন্ধুত্ব-কী বন্ধুত্বচ্ছেদ দুটোই ঘটতে পারে সহজাতভাবে। ফলে একে-অন্যের প্রতি সহিংস মনোভাব তৈরির অবকাশ কমে যায়।

অনগ্রসর জনপদের অনেক মানুষ হলিউডের ছবি বা ইংরেজি ড্রামা সিরিয়াল দেখে মনে করে, পশ্চিমের নারী-পুরুষের একমাত্র কাজ নাচানাচি করা আর যৌনতা। এই ধারণা থেকে নারী-পুরুষ মেলামেশা মানেই গোল্লায় যাওয়া বলে মনে করে জীবনে নানাভাবে গোল্লায় যাওয়া মানুষেরা।

নারী-পুরুষের রূপকথার আকর্ষণের এই অনগ্রসর চিন্তা সরিয়ে ফেলতে পারার কারণেই; অগ্রসর সমাজের পুরুষেরা যখন সভ্যতার কথা ভেবে নানা উদ্ভাবন করে; তখন অনগ্রসর সমাজের পুরুষ নারীচিন্তা করে করে পেরেশান হয়। এ কারণে অনগ্রসর মানুষের উদ্ভাবক হওয়া ভাগ্যে জোটে না। ভোক্তা-সমাজ হিসেবে তুচ্ছ-গ্লানিময় এক জীবন যাপন করে।

এই ভোক্তা-সমাজ সারাজীবন অগ্রসর জনপদে দাস রপ্তনি করে; আর কালে ভদ্রে অভিবাসী সমাজে কেউ উদ্ভাবক হয়ে উঠলে গ্রামে গ্রামে ঢোল পিটিয়ে সে গর্বের প্রচার করে। কিন্তু একবারো ভাবে না; যে অগ্রসর সমাজকে তারা গোল্লায় যাওয়া সমাজ বলে ফতোয়া দেয়; সেই সমাজের সামাজিক পরিবেশ ও শিক্ষা ব্যবস্থা অনগ্রসর এলাকার বংশোদ্ভুতকে উদ্ভাবক বানিয়েছে। নিজ এলাকায় থাকলে এই উদ্ভাবক কেবলই ভোক্তা হতো; তুচ্ছ জীবন যাপন করে মারা যেতো।

নারীকে ‘ট্রফি বা সমাজের সম্মানের প্রতীক’ বানিয়ে রেখে অনগ্রসর সমাজের পুরুষ ‘নারীচিন্তায়’ জীবন তিক্ত করে; আর নারীর জীবন তিক্ততর হয়ে ওঠে। ছোট বেলাতেই যদি নারী-পুরুষ বুঝতে পারে তারা একই মানুষ;তাহলে প্রতিদিন এই নিয়ে এতো নাটকীয়তার তৈরি হয় না।

আর সহ-শিক্ষা না থাকাতেই বঞ্চিত পুরুষদের নারী সংক্রান্ত গালাগালের অভ্যাস গড়ে ওঠে। অকথ্য ভাষায় নারী-বিষয়ক যে গালাগাল সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখে পড়ে তা হতাশা ও মানসিক-বিকৃতির প্রকাশ। অবদমিত পুরুষ মনই নারী সংক্রান্ত গালাগাল করে বঞ্চনার প্রশমন করে।

অনেকে অভিযোগ করে, নারী ছলনাময়ী। এটা রূপকথা ও হালের টেলি-সিরিয়ালের সৃষ্ট ইমেজ। নারী পুরুষেরই মতো; আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর পুরুষ যেমন আছে নারীও আছে। ছলনা নারীর পেটেন্ট করা বিষয় নয়।

অনগ্রসর সমাজে যেটা ঘটে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে পুরুষের জীবনে নারী আসে বলে; স্ত্রৈণ পুরুষের সংখ্যা বেশি হয়। আবার ‘অতিরিক্ত পতিব্রতা নারীর সংখ্যা বেশি হয় একই কারণে। সেটা উভয়ের জন্যই একটা হাঁসফাঁস দশা তৈরি করে। এটা মানুষের সতত অভ্যাস যে, কাউকে বেশি গুরুত্ব দিলে সে মাথায় চড়ে বসবে। সেটা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে ঘটে। সহ-শিক্ষা কার্যক্রম প্রত্যেককেই পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শেখায়। কোন মানুষের সঙ্গে ‘নট সো ফার; নট সো নিয়ার’ নীতিতে মেলামেশা করতে শিখলে; অযথা জটিলতার সৃষ্টি হয় না; কাজের কাজে মন দিয়ে অনগ্রসর জনপদকে বসবাসের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হয়।

0 Shares